খুঁজুন
                               
, ,
           

হরমুজ খুলে দেওয়ার বিনিময়ে অবরোধ প্রত্যাহার, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের আলোচনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৪৩ অপরাহ্ণ
হরমুজ খুলে দেওয়ার বিনিময়ে অবরোধ প্রত্যাহার, যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের আলোচনা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত অবসানে ধাপে ধাপে একটি সমঝোতার পথ নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার সুযোগ দেবে। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে দুই দেশের আলোচকেরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ইরানি, আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রায় সাত মাস ধরে চলা সংঘাতের অবসানে হরমুজ প্রণালি এখন আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন অর্থনৈতিক চাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করা।

একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, অচলাবস্থা কাটানোর সম্ভাব্য পথ হতে পারে ধাপে ধাপে একটি ব্যবস্থা নেওয়া। এর প্রথম ধাপে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি থাকতে পারে। এর পাশাপাশি বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

তবে আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা হলো—দুই পক্ষই আগে নিজেদের হাতে থাকা চাপ প্রয়োগের উপায় ছেড়ে দিতে চাইছে না। ওয়াশিংটনের হাতে রয়েছে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ ও অবরোধ, আর তেহরানের হাতে রয়েছে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর প্রভাব। ফলে দৃশ্যমান বিনিময় ছাড়া কোনো পক্ষই নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দুর্বল করতে আগ্রহী নয়।

এর আগে জুনে দুই পক্ষের মধ্যে একটি অস্থায়ী সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও জুলাইয়ে তা ভেঙে যায়। ফলে এবার শুধু একটি চুক্তির কাঠামো তৈরি করাই নয়, দুই পক্ষের দেওয়া ছাড়গুলো দীর্ঘস্থায়ী ও বিশ্বাসযোগ্য করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ৩ নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি হতে পারে। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক মার্কিন আলোচক ডেনিস রস নির্বাচনের আগে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনাকে সীমিত বলে মনে করছেন। তার মতে, নির্বাচনের আগে দুই পক্ষেরই সমঝোতায় পৌঁছানোর কিছু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে।

হরমুজ ইস্যুতে ইরান কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিতও দিয়েছে। আঞ্চলিক সূত্রগুলোর বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরানের ট্রানজিট ফি আদায়ের দাবি মূল চুক্তির বাইরে আলাদা সংযুক্তিতে রাখার বিষয়ে তেহরান নমনীয় হতে পারে। কারণ এই মুহূর্তে অবরোধ প্রত্যাহার করানোই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে উপসাগরীয় দেশগুলো ট্রানজিট ফি দেওয়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

এর অর্থ অবশ্য হরমুজের ওপর নিজেদের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দাবি থেকে ইরান সরে যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, তেহরান প্রণালিটির প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে চায়। ফলে অর্থ বা ট্রানজিট ফি নিয়ে আপসের সুযোগ থাকলেও হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।

এদিকে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়িয়েছে। সম্প্রতি ইরানের বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হলো ইরানের অর্থনীতিকে সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ উৎসগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করা। ট্রাম্পও সতর্ক করেছেন, চুক্তি না হলে ইরানের অর্থনীতি আরও সংকটে পড়তে পারে।

অন্যদিকে ইরান আলোচনার পাশাপাশি নতুন করে সংঘাতের প্রস্তুতিও রাখছে। একজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক শক্তির হুমকি ব্যবহার করে চাপ প্রয়োগ করছে। তার মতে, কূটনীতির মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা কম হলেও তেহরান আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ করছে না।

হরমুজ নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নিউইয়র্কে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে উপসাগরীয় নেতারা হরমুজের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করেছেন। তাদের মতে, এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষেও জোর দিচ্ছেন।

আবুধাবিভিত্তিক এমিরেটস পলিসি সেন্টারের প্রেসিডেন্ট ইবতেসাম আল-কেতবি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তার মতে, ইরান হরমুজ ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিকে ঘিরে নিজেদের কৌশল নির্ধারণ করছে, কিন্তু ওয়াশিংটনের পরবর্তী পরিকল্পনা এখনো পরিষ্কার নয়।

এর আগে ২২ সেপ্টেম্বর রয়টার্স জানিয়েছিল, ইরান মার্কিন সামরিক চাপ কমানো এবং ইরানি বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নেওয়া হলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিল। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে থাকা ইরানি প্রতিনিধিদলকে কূটনৈতিক আলোচনার জন্য পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বলেও ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়।

এদিকে হরমুজ নিয়ে আলোচনার প্রভাব পড়ছে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও। প্রণালিটি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহনপথ হওয়ায় সেখানে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে খবর প্রকাশের পর তেলের বাজারে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ২৪ সেপ্টেম্বর তেলের দাম প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছিল, যদিও ওই দিনের বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাতও প্রভাব ফেলেছে।

সব মিলিয়ে নিউইয়র্কের আলোচনায় এখন মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—হরমুজ দিয়ে অবাধ জাহাজ চলাচল এবং ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ প্রত্যাহারকে কীভাবে একই সমঝোতার কাঠামোয় আনা যায়। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি। দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়ে গেছে এবং আলোচনার ফলাফল নির্ভর করছে উভয় পক্ষ কতটা বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী ছাড় দিতে প্রস্তুত তার ওপর।

কালের আলো/এসএ

নজরুলের পৌরুষ শুধু বীরত্ব নয়, এর গভীরে ছিল অভিমান, প্রেম ও আত্মদান

সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:২১ অপরাহ্ণ
নজরুলের পৌরুষ শুধু বীরত্ব নয়, এর গভীরে ছিল অভিমান, প্রেম ও আত্মদান

কাজী নজরুল ইসলামের পৌরুষকে শুধু বীরত্ব বা শক্তির প্রকাশ হিসেবে দেখলে তাঁর সৃষ্টিশীল সত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আড়ালে থেকে যায়। তাঁর পৌরুষের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল অভিমান, প্রেম, বিপন্নতা, আত্মদান এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস। উপনিবেশ, জাতপাত ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াইয়ে এই বহুমাত্রিক পৌরুষই ভিন্ন এক চরিত্র তৈরি করেছিল।

বুদ্ধদেব বসুর চোখে নজরুল ছিলেন বলিষ্ঠ শরীরের পাশাপাশি অফুরান আনন্দে ভরপুর এক ‘মনোলুণ্ঠনকারী’ মানুষ। তাঁর শারীরিক উপস্থিতির মতো সাহিত্যেও ছিল প্রবল প্রাণশক্তি। প্রচলিত ভদ্রলোকসুলভ পৌরুষের বদলে নজরুলের লেখায় দেখা যায় এমন এক সত্তা, যে পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে ধারণ করে এবং নতুন সময়ের অনুভবকে ভাষা দিতে চায়।

অভিমানী পৌরুষ

নজরুলের পৌরুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল অভিমান। তিনি নিজেই নিজেকে ‘অতিরিক্ত অভিমানী’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এই অভিমান কেবল অহমিকা নয়; এর মধ্যে ছিল ভালোবাসা, নৈকট্য ও সম্পর্কের টানাপোড়েন। প্রিয়জনের প্রতি অভিমান যেমন দূরত্ব তৈরি করে, তেমনি সেই দূরত্ব ভেঙে আবার কাছে আসার আকাঙ্ক্ষাও বহন করে।

এই জায়গাতেই নজরুলের পৌরুষ প্রচলিত কঠোর পুরুষত্বের ধারণা থেকে আলাদা। তাঁর পৌরুষ ছিল অনুভবপ্রবণ, শরীরী, রক্তাক্ত ও আবেগময়। তাঁর লেখায় রক্ত, অশ্রু, প্রেম, বেদনা ও আকাঙ্ক্ষা একই সঙ্গে উপস্থিত। ফলে তাঁর বীরত্বের সঙ্গে বিপন্নতাও পাশাপাশি অবস্থান করেছে।

তবে এই অনুভবপ্রবণতা তাঁকে ভীরু করেনি। বরং তাঁর পৌরুষ ছিল বীরত্বব্যঞ্জক। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন যোদ্ধার মতো—শুধু সৈনিকের মতো নিয়ম মেনে চলা নয়, প্রয়োজন হলে প্রচলিত নিয়মের বিরুদ্ধেও অবস্থান নেওয়া ছিল তাঁর চরিত্রের অংশ।

বীরত্বের কেন্দ্রে আত্মদান

নজরুলের বীরত্ব ছিল দখল বা আধিপত্যের বীরত্ব নয়। এর কেন্দ্রে ছিল আত্মদান। জুলুম ও উপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে যে শক্তির প্রয়োজন, নজরুল সেই শক্তির সাধনার কথা বলেছেন। তাঁর কাছে পৌরুষ মানে ছিল নিজের স্বার্থ রক্ষা কিংবা অন্যকে দমন করা নয়; বরং বৃহত্তর মুক্তির জন্য নিজের শক্তি ও প্রাণশক্তি উৎসর্গ করা।

এই কারণেই নজরুলের পৌরুষকে আগ্রাসী পুরুষত্বের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। প্রেমের ক্ষেত্রেও তিনি জবরদখল বা জোর করে অধিকার প্রতিষ্ঠার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর কাছে প্রেম মানে প্রিয় মানুষকে নিজের সম্পত্তি করে রাখা নয়।

জাতপাত ও পরিচয়ের দেয়াল ভাঙা

নজরুলের বিদ্রোহ শুধু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সীমাবদ্ধ ছিল না। জাতপাত, ধর্মীয় বিভাজন ও সামাজিক পরিচয়ের সংকীর্ণতার বিরুদ্ধেও তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট।

তিনি নিজের পরিচয়কে অস্বীকার না করেও পরিচয়বাদী বিভাজনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। জাতপাতের কাঠামো মানুষকে যে কৃত্রিম শ্রেণিতে ভাগ করে, নজরুল সেই কাঠামোকেই প্রশ্ন করেছেন। সমাজের প্রান্তিক মানুষের পরিচয় ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা তাঁর সাহিত্যকর্মে বারবার দেখা যায়।

‘সাম্যবাদী’ ও ‘সর্বহারা’র মতো রচনায় চণ্ডাল, কুলি-মজুর, মাঝি, কৃষক, ধীবর, চোর-ডাকাত ও সমাজের অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের কথা উঠে এসেছে। হিন্দু-মুসলমানের বিভাজন অতিক্রম করে নতুন সামাজিক সম্পর্ক তৈরির আকাঙ্ক্ষাও ছিল তাঁর চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

নারী-পুরুষের সমতা, নারীর উচ্চশিক্ষার অধিকার, নারী সাহিত্যিকদের মূল্যায়ন এবং অবরোধ প্রথার বিরুদ্ধেও নজরুলের অবস্থান ছিল প্রগতিশীল। ফলে তাঁর বিদ্রোহ ছিল বহুমাত্রিক—রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক।

‘পুরুষকারই আসল জিনিস’

নজরুলের চিন্তায় জন্মপরিচয়ের চেয়ে মানুষের নিজস্ব কর্ম ও সক্ষমতার গুরুত্ব বেশি। তিনি মনে করতেন, বংশ বা জাতিগত পরিচয় মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করতে পারে না। নিজের কর্ম ও মনুষ্যত্বের ওপর দাঁড়ানোই গুরুত্বপূর্ণ।

এই ভাবনাই তাঁর পৌরুষের একটি মৌলিক দিককে সামনে আনে—জন্ম নয়, পুরুষকার। অর্থাৎ মানুষের পরিচয়ের চূড়ান্ত ভিত্তি তার কাজ, সাহস ও মনুষ্যত্ব।

নেতৃত্বের মহিমাকেও প্রশ্ন

নজরুল প্রচলিত ক্ষমতা ও নেতৃত্বের অন্ধ আনুগত্যও মেনে নেননি। তরুণদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল অনেকটা বন্ধুত্বপূর্ণ ও অনুভূমিক। তিনি নিজেই ‘নেতা হওয়ার লোভ’ থেকে দূরে থাকার কথা বলেছেন।

কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি অন্ধ শ্রদ্ধার বদলে নিজের বোধ দিয়ে সত্যকে যাচাই করার ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, বিদ্রোহ মানে কাউকে না-মানা নয়; বরং যা বোঝা যায় না, সেটিকে মাথা উঁচু করে ‘বুঝি না’ বলতে পারাও বিদ্রোহের অংশ।

প্রযুক্তি ও আধুনিকতার অন্ধ উচ্ছ্বাসও নয়

নজরুলকে শুধু বিদ্রোহী কবি হিসেবে দেখলে তাঁর আধুনিকতা-বিষয়ক সংশয়ও চোখ এড়িয়ে যায়। বৈদ্যুতিক ও শিল্পযুগের সম্ভাবনা যেমন তিনি অনুভব করেছিলেন, তেমনি প্রযুক্তির কারণে শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের ওপর তৈরি হওয়া নতুন ধরনের শোষণও তিনি দেখতে পেয়েছিলেন।

রেল, স্টিমার, বিদ্যুৎ, কলকারখানা মানুষের আরাম বাড়ালেও শিল্পায়নের প্রতিযোগিতায় বহু শ্রমজীবী মানুষ তাদের পেশা হারাচ্ছে—নজরুল তাঁর লেখায় এই সংকটের কথা উল্লেখ করেছেন। এই কারণে তাঁর চিন্তায় আধুনিকতা ছিল না অন্ধ প্রযুক্তিপূজা; বরং মানুষের জীবনে প্রযুক্তির প্রভাবকে প্রশ্ন করার প্রবণতাও ছিল।

শেষ পর্যন্ত মানুষের মুক্তিই লক্ষ্য

জীবনের শেষ অভিভাষণেও নজরুল তাঁর মূল আকাঙ্ক্ষার কথা স্পষ্ট করে গেছেন—হিন্দু-মুসলমানের সংঘাত, জাতিগত বিদ্বেষ, যুদ্ধ, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা। তাঁর নিজের ভাষায়, এই অসাম্য ও ভেদজ্ঞান দূর করতেই তিনি এসেছিলেন।

তাই নজরুলের পৌরুষকে কেবল শক্তি, বীরত্ব কিংবা কর্তৃত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করলে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর পৌরুষের ভেতরে ছিল অভিমানী প্রেমিক, বিপন্ন মানুষ, বিদ্রোহী যোদ্ধা এবং আত্মদানকারী সত্তা—যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়, কিন্তু অন্যকে দখল করে নিজের শক্তি প্রমাণ করতে চায় না।

নজরুলের স্বতন্ত্রতা সম্ভবত এখানেই—তিনি পরিচয়ের অলংকার গ্রহণ করেছেন, কিন্তু পরিচয়ের খাঁচায় নিজেকে বন্দী করেননি; বিদ্রোহ করেছেন, কিন্তু বিদ্রোহকে নিছক ধ্বংসে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর পৌরুষের কেন্দ্রে ছিল মানুষের মুক্তি, মর্যাদা ও বেঁচে থাকার অধিকার।

কালের আলো/এসএ

ঢাকা কর অঞ্চল-১ এ ৩৪ পদে নিয়োগ, আবেদন ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত

চাকরি ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:১৭ অপরাহ্ণ
ঢাকা কর অঞ্চল-১ এ ৩৪ পদে নিয়োগ, আবেদন ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত

ঢাকা কর অঞ্চল-১ জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। ১৩ থেকে ২০ গ্রেডের বিভিন্ন পদে মোট ৩৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। আগ্রহী প্রার্থীদের অনলাইনে আবেদন করতে হবে। আগামী ১৪ অক্টোবর ২০২৬ বিকেল ৫টা পর্যন্ত আবেদন করা যাবে।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, একজন প্রার্থী একাধিক পদে আবেদন করতে পারবেন না। পদভেদে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

কোন পদে কত নিয়োগ

১. কম্পিউটার অপারেটর
পদসংখ্যা: ১টি
গ্রেড: ১৩
বেতন স্কেল: ২৪,০০০–৫৮,০০০ টাকা।

২. সাঁট লিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর
পদসংখ্যা: ৪টি
গ্রেড: ১৩
বেতন স্কেল: ২৪,০০০–৫৮,০০০ টাকা।

৩. উচ্চমান সহকারী
পদসংখ্যা: ৮টি
গ্রেড: ১৪
বেতন স্কেল: ২৩,৫০০–৫৬,৮০০ টাকা।

৪. সাঁটমুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর
পদসংখ্যা: ১০টি
গ্রেড: ১৪
বেতন স্কেল: ২৩,৫০০–৫৬,৮০০ টাকা।

৫. অফিস সহকারী কাম অফিস কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক
পদসংখ্যা: ৬টি
গ্রেড: ১৬
বেতন স্কেল: ২১,৯০০–৫২,৯০০ টাকা।

৬. গাড়িচালক
পদসংখ্যা: ১টি
গ্রেড: ১৬
বেতন স্কেল: ২১,৯০০–৫২,৯০০ টাকা।

৭. অফিস সহায়ক
পদসংখ্যা: ৪টি
গ্রেড: ২০
বেতন স্কেল: ২০,০০০–৪৮,৪০০ টাকা।

সব মিলিয়ে সাতটি পদে ৩৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে।

যেভাবে আবেদন

নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিতে আগ্রহী প্রার্থীদের অনলাইনে আবেদন করতে হবে। আবেদনপত্র পূরণ করতে হবে ঢাকা কর অঞ্চল-১-এর নির্ধারিত টেলিটক ওয়েবসাইটে।

আবেদনের ওয়েবসাইট: tax1.teletalk.com.bd

আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে পদভেদে। ১ থেকে ৬ নম্বর পদের জন্য আবেদন ফি ১১২ টাকা এবং ৭ নম্বর পদের জন্য ৫৬ টাকা।

আবেদনের সময়সূচি

অনলাইনে আবেদন শুরু হয়েছে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সকাল ১০টা থেকে। আবেদনপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ১৪ অক্টোবর ২০২৬ বিকেল ৫টা।

প্রার্থীদের আবেদন করার আগে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখিত শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়সসীমা, অভিজ্ঞতা, কোটাসহ অন্যান্য শর্ত ভালোভাবে দেখে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আবেদন শুরু: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১০টা
আবেদনের শেষ সময়: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৫টা
আবেদন পদ্ধতি: অনলাইন
আবেদন ওয়েবসাইট: tax1.teletalk.com.bd

কালের আলো/এসএ

জাতিসংঘে বাংলায় তারেক রহমান; এক ভাষণে দেশের প্রতিচ্ছবি ও বিশ্বকে বড় বার্তা

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:১৬ অপরাহ্ণ
জাতিসংঘে বাংলায় তারেক রহমান; এক ভাষণে দেশের প্রতিচ্ছবি ও বিশ্বকে বড় বার্তা

নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ। বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিত্বকারী সেই মঞ্চে এবার বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বক্তব্য উচ্চারিত হলো বাংলায়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কণ্ঠে। বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে দেওয়া তাঁর প্রথম ভাষণ তাই শুরু থেকেই আলাদা মাত্রা পেয়েছে। মাতৃভাষায় আন্তর্জাতিক মঞ্চে রাষ্ট্রের বক্তব্য তুলে ধরার প্রতীকী গুরুত্বের পাশাপাশি এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পারিবারিক ইতিহাসও। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়া একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য তিনি।

  • জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার পর একই পরিবারের তৃতীয় কণ্ঠ
  • গণতন্ত্র, ‘থ্রি-আর’, রোহিঙ্গা, জলবায়ু, নারী, শিক্ষা ও এআই—এক বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রায় সব বড় অগ্রাধিকার

তবে ভাষণের ঐতিহাসিকতা কেবল এই দুই জায়গায় সীমাবদ্ধ নয়। বক্তব্যের বিষয়বস্তুও ছিল বিস্তৃত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা, ফিলিস্তিন, বিশ্বশান্তি, অভিবাসন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—একটি ভাষণের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারই স্থান পেয়েছে।

বাংলায় শুরু, ‘বাংলাদেশ’কে সামনে রেখে
ভাষণের শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। বিশেষভাবে স্মরণ করেন ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের। এরপরই আসে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যের ভিত্তি—’জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।’ এই বাক্যটি নিছক রাজনৈতিক ঘোষণা নয়। পুরো ভাষণের পরবর্তী অংশ বোঝার একটি চাবিকাঠি। কারণ তাঁর বক্তব্যে গণতন্ত্রকে শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক ব্যবস্থা হিসেবে দেখানো হয়নি। রাজনৈতিক ক্ষমতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকেও তিনি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামোর অংশ হিসেবে হাজির করেছেন।

বাবা-মায়ের পর তৃতীয় অধ্যায়
জাতিসংঘের মঞ্চে তারেক রহমানের উপস্থিতির সঙ্গে পারিবারিক ইতিহাসের যোগটি ভাষণের শুরুতেই স্পষ্ট হয়েছে। তিনি নিজেই স্মরণ করেছেন তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার কথা। তিনি বলেন, ‘এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়েই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ এবং জনগণের স্বার্থের পক্ষে এবং একটি শান্তিময় বিশ্বসমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।’ ফলে এটি একই পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতার পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের একটি নতুন অধ্যায়ও তৈরি করেছে।

‘থ্রি-আর’ দিয়ে রাষ্ট্র মেরামতের ঘোষণা
ভাষণের সবচেয়ে আলোচিত ধারণাগুলোর একটি ‘থ্রি-আর’—রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন। বাংলায় পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শাসনে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ মেরামতের জন্য সরকার পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন অর্থাৎ ‘থ্রি-আর’ কৌশল অনুসরণ করছে।’ এই তিনটি শব্দের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের একটি কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, মানবসম্পদ ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টিও এতে যুক্ত হয়েছে।

তরুণদের দক্ষ করে তোলা, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বাংলাদেশকে ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলা এবং তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ—এই পরিকল্পনার বাস্তব দিকগুলোও ভাষণে এসেছে। অর্থাৎ ‘থ্রি-আর’ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের একটি ছাতার ধারণা হিসেবেও উপস্থাপিত হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের সরাসরি বার্তা
জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী সংকটগুলোর একটি ছিল রোহিঙ্গা ইস্যু। এখানে প্রধানমন্ত্রী কোনো অস্পষ্ট বার্তা দেননি। তাঁর বক্তব্য, ‘বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।’ বাংলাদেশের অবস্থানের মূল কথাটি এখানেই—সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, সমাধানও সেখানে। তবে প্রত্যাবাসনের আগ পর্যন্ত মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি সংকটটির তাৎক্ষণিক মানবিক দিকটিও সামনে রেখেছেন। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তাঁর প্রত্যাশা ছিল ‘দৃঢ় এবং কার্যকর সমর্থন।’ অর্থাৎ বাংলাদেশের দাবি শুধু সহায়তা অব্যাহত রাখা নয়; নিরাপদ, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ ও কার্যকর উদ্যোগও নিশ্চিত করা।

জলবায়ু প্রশ্নে দাবি ও কর্মপরিকল্পনা একসঙ্গে
জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানও ছিল স্পষ্ট। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান সীমিত হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বহনের বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আন্তর্জাতিক পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তবে শুধু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে দাবি তোলেননি। দেশের অভ্যন্তরে নেওয়া উদ্যোগগুলোরও হিসাব দিয়েছেন। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারেজ বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি। এখানে বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাংলাদেশকে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে নয়, অভিযোজন ও পরিবেশ সুরক্ষায় নিজস্ব কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী দেশ হিসেবেও তুলে ধরা হয়েছে।

নারীর হাতে অর্থনৈতিক ক্ষমতা
ভাষণে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। নারীশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নকে যুক্ত করেছেন তিনি। নারী প্রধানের নামে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি ‘নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক’। ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের সঙ্গে ভবিষ্যতে একটি ‘সার্বজনীন কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। এই অংশে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে আরও সমন্বিত করার একটি ধারণা সামনে এসেছে। একই সঙ্গে পরিবারভিত্তিক সহায়তায় নারীর ভূমিকা ও নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দেওয়ার রাজনৈতিক বার্তাও রয়েছে।

শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ
শিক্ষা খাতে প্রধানমন্ত্রী যে প্রতিশ্রুতিটি দিয়েছেন, সেটিও বড়। আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা খাতে জাতীয় বাজেটের হিস্যা বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা বলেছেন তিনি। কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের স্কুলব্যাগ ও পোশাক এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থার কথাও এসেছে। খেলাধুলাকেও শিক্ষার অংশ করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষা তাই শুধু শ্রেণিকক্ষের বিষয় নয়; দক্ষতা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির বৃহত্তর প্রকল্পের অংশ।

বিশ্বশান্তিতে কূটনীতির পক্ষে বাংলাদেশ
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থানও তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।’ আরও বলেছেন, ‘মারণাস্ত্র নয় বরং পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠবে যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা।’ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। ফিলিস্তিনের প্রশ্নে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতিও বাংলাদেশের সমর্থন পুনরায় ঘোষণা করেছেন তিনি।

এআই নিয়ে নতুন বৈশ্বিক বৈষম্যের আশঙ্কা
ভাষণের শেষাংশে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেছেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ যেন নতুন বৈষম্য তৈরি না করে। তাঁর বক্তব্য, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত হোক।’ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি ও আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকারের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের একটি কার্যকর বৈশ্বিক নীতিমালার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। এখানে বাংলাদেশের বক্তব্যটি শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে নয়; ভবিষ্যতের প্রযুক্তি অর্থনীতিতে বৈশ্বিক সমতার প্রশ্নও সামনে এনেছে।

এক ভাষণে দেশের আয়না
তারেক রহমানের প্রথম জাতিসংঘ ভাষণের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এর বিস্তৃতি। তিনি কোনো একটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখেননি। দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন থেকে অর্থনীতি, রোহিঙ্গা থেকে জলবায়ু, নারী থেকে শিক্ষা, ফিলিস্তিন থেকে বিশ্বশান্তি, অভিবাসন থেকে এআই—প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রশ্নেই বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তবে এতগুলো বিষয়কে বিচ্ছিন্ন মনে হয়নি। বক্তব্যের ভেতরে একটি অভিন্ন সূত্র ছিল—রাষ্ট্রের কেন্দ্রে জনগণ, আর উন্নয়নের কেন্দ্রে মানবিক মর্যাদা ও ক্ষমতায়ন।

শেষে তাঁর উচ্চারণ, ‘সবার আগে বাংলাদেশ: সবার জন্য বাংলাদেশ।’ এই বাক্যটি পুরো ভাষণের রাজনৈতিক দর্শনকে সংক্ষেপ করেছে। বাংলায় জাতিসংঘে প্রথম ভাষণ—ঐতিহাসিকতার জায়গাটি এখানেই শেষ নয়। এর ভেতর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের গল্প, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পরিকল্পনা এবং বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের প্রত্যাশা—তিনটিই এক মঞ্চে হাজির করেছেন। বিশ্বমঞ্চে বাংলার এই উচ্চারণ তাই শুধু ভাষার বিষয় নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের নতুন সময়কে নিজের ভাষায় নিজের মতো করে তুলে ধরার একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক বার্তা।

কালের আলো/এমএএএমকে