১১ প্রকল্পে একসঙ্গে পিডি বদল, নেপথ্যে কারা?
একসঙ্গে ১১ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) বদলের উদ্যোগে তোলপাড় শুরু হয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে (ডিএই)। নতুন পিডি নিয়োগের জন্য পাঠানো তালিকায় কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তার নাম থাকায় ক্ষোভ ছড়িয়েছে কর্মকর্তাদের মধ্যে। প্রশ্ন উঠেছে, এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে একই সময়ে কেন নেতৃত্ব বদলের প্রয়োজন হলো, আর সুপারিশের ভিত্তিই বা কী? পরিস্থিতি সামাল দিতে আপাতত পুরো প্রক্রিয়া থামিয়ে দিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী। মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, তালিকাটি পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে। তবে এর মধ্যেই সামনে এসেছে পিডি পদকে ঘিরে প্রভাব বিস্তার, বদলিবাণিজ্য এবং পছন্দের কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বসানোর নানা অভিযোগ।
- ডিএইর তালিকা ঘিরে অসন্তোষ
- বিতর্কিত কর্মকর্তার নাম নিয়ে প্রশ্ন
- আপাতত সবুজ সংকেত নেই মন্ত্রণালয়ের
এক ঝটকায় ১১ প্রকল্পে রদবদল
ডিএইর পাঠানো তালিকায় পার্টনার, কুমিল্লা অঞ্চলে টেকসই কৃষিপ্রযুক্তি সম্প্রসারণ, কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, স্মলহোল্ডার অ্যাগ্রিকালচার কম্পিটিটিভনেস, রংপুর অঞ্চলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন, ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন এবং ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ওয়াটার ম্যানেজমেন্টসহ ১১টি প্রকল্প রয়েছে।
একসঙ্গে এতগুলো প্রকল্পের নেতৃত্ব পরিবর্তনের উদ্যোগই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ এসব প্রকল্পের আর্থিক পরিসর যেমন বড়, তেমনি মাঠপর্যায়ে কৃষি উন্নয়নেও রয়েছে প্রত্যক্ষ প্রভাব।
তালিকায় বিতর্কিত নাম
ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের বর্তমান পিডি আব্দুল কায়ূম মজুমদারকে সরিয়ে বান্দরবনে কর্মরত অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আব্দুল গফফারকে দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ২০১৭ সালে আর্থিক অনিয়মের কারণে তিনি শাস্তি পেয়েছিলেন।
সম্প্রতি একটি প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার আবেদনে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না নেওয়া এবং বিভাগীয় প্রধানের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ওঠে। স্মলহোল্ডার অ্যাগ্রিকালচার কম্পিটিটিভনেস প্রকল্পের ডিএই উইংয়ের পিডি হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. আবুল বাসার মিয়াকে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, একই প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করা মনিটরিং অফিসার ও উপপ্রকল্প পরিচালকের চেয়েও তিনি জুনিয়র। তার রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কর্মকর্তাদের কেউ কেউ।
পিডি পদ ঘিরে চাপের অভিযোগ
কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা প্রকল্পের পিডি হিসেবে সুপারিশের শীর্ষে রয়েছেন মাশরুম প্রকল্পের দীর্ঘদিনের সিনিয়র মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন অফিসার মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান। সম্প্রতি রংপুরে বদলি হওয়া মো. আকলিমুজ্জামানকে আবার রংপুর অঞ্চলের টেকসই কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের পিডি করার সুপারিশ করা হয়েছে।
ক্লাইমেট স্মার্ট অ্যাগ্রিকালচার প্রকল্পে আনা হয়েছে দীর্ঘদিন অন্য প্রকল্পে কর্মরত ডিপিডি এমএম আব্দুর রাজ্জাকের নাম। এসব সুপারিশ ঘিরে কর্মকর্তাদের প্রশ্ন—পিডি বাছাইয়ে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা ও দক্ষতার পাশাপাশি আর কোনো প্রভাব কাজ করেছে কি না।
‘অ্যাবের চাপ’, উত্তপ্ত বৈঠক
কৃষি বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই অ্যাগ্রিকালচারিস্ট অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (অ্যাব) কিছু নেতা পিডি পদায়নকে ঘিরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। তাদের অভিযোগ, বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে অ্যাবের নাম ব্যবহার করে আগেও মন্ত্রণালয়ে একাধিক তালিকা দেওয়া হয়েছিল। এবার ডিএইর দাপ্তরিক তালিকা পাঠানোর পরও ক্ষোভ থামেনি।
নেতাদের সুপারিশের বড় অংশ তালিকায় না থাকায় ডিএই মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিমের সঙ্গে বৈঠক করেন তারা। বৈঠকে অ্যাবের আহ্বায়ক কামরুজ্জামান কায়সার ও সদস্য সচিব শাহাদাত হোসেন বিপ্লবসহ পিডি পদপ্রত্যাশী কয়েকজন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া নিয়ে মহাপরিচালকের কাছে জবাবদিহি চাওয়া হয় বলে বৈঠকে থাকা একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলেও দাবি তাদের। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মহাপরিচালক আব্দুর রহিম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সামনে যোগ্যতার পরীক্ষা
মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, তালিকায় থাকা সব কর্মকর্তাকে একইভাবে দেখছে না মন্ত্রণালয়। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অতীতে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। কর্মকর্তাদের একটি অংশের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক পরিচয় নয়—প্রকল্প পরিচালনার সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা, জ্যেষ্ঠতা ও পেশাগত রেকর্ডের ভিত্তিতেই এবার সিদ্ধান্ত হবে।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array