ঐতিহ্যের শীতলপাটি এবার পায়ের নিচে, স্বপ্ন বুনছেন চার শিক্ষার্থী
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চার শিক্ষার্থী ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটিকে আধুনিক পণ্যে রূপ দিয়ে নতুন বাজার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। ‘বুনন বাজার’ নামে তাদের উদ্যোগের প্রথম পণ্য শীতলপাটির তৈরি স্যান্ডেল। দেশীয় উপকরণের ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় কারিগরদের নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিই তাদের লক্ষ্য।
একসময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে শীতলপাটির ব্যাপক ব্যবহার ছিল। গরমের দিনে মেঝেতে বিছিয়ে স্বস্তি পাওয়ার পাশাপাশি এর নকশা ও বুননে ফুটে উঠত বাংলার লোকজ ঐতিহ্য। সময়ের সঙ্গে জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আসায় শীতলপাটির ব্যবহার কমেছে। এতে সংকুচিত হয়েছে বাজার, অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এ কারুশিল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেক কারিগর।
এই বাস্তবতা থেকেই উদ্যোগের ভাবনা আসে রাবির ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষার্থী অপূর্ব কৃষ্ণ দের। টাঙ্গাইলের গ্রামের বাড়িতে ছোটবেলা থেকেই মূর্তা বা বেতি গাছ, শীতলপাটি ও কারিগরদের কাজ দেখে বড় হয়েছেন তিনি। পরিবারের অনেকেই মূর্তা চাষের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় শীতলপাটির কাঁচামাল সংগ্রহ ও তৈরির প্রক্রিয়াও তার পরিচিত ছিল।
শীতলপাটির চাহিদা কমে যাওয়ার বিষয়টি তাকে ভাবিয়ে তোলে। ঐতিহ্যবাহী এই উপকরণকে আধুনিক পণ্যে ব্যবহার করা গেলে নতুন বাজার তৈরি হওয়ার পাশাপাশি কারিগরদের বাড়তি আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে—এমন চিন্তা থেকেই শুরু হয় উদ্যোগটি।
পরে তার সঙ্গে যুক্ত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী আবির দে, মো. আশিক মিয়া ও চৌধুরী খুবাইব বিন করিম। চারজন মিলে উদ্যোগটির নাম দেন ‘বুনন বাজার’।
ক্লাসরুমের ধারণা থেকে বাস্তব উদ্যোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট কোর্সের ব্যবহারিক অংশে ব্যবসায়িক ধারণাটি উপস্থাপন করেন তারা। প্রায় ১০টি প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে সমস্যা চিহ্নিতকরণ, ক্রেতার চাহিদা, বাজার সম্ভাবনা, ব্যবসায়িক মডেল, বিপণন কৌশল ও আর্থিক সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ করেন শিক্ষার্থীরা।
পরে বিভিন্ন পিচিং ও উদ্যোক্তা প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ক্রেতাদের মতামত এবং মেন্টরদের পরামর্শের ভিত্তিতে উদ্যোগটিকে আরও পরিণত করেন তারা।
শীতলপাটি থেকে স্যান্ডেল
শীতলপাটি দিয়ে স্যান্ডেল তৈরি করতে গিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে উদ্যোক্তাদের। পাটির বুনন, ঘনত্ব, নমনীয়তা, আকার, কাটিং, স্ট্র্যাপের অবস্থান এবং সোলের সঙ্গে সংযোগ—প্রতিটি বিষয় নিয়ে একাধিকবার কাজ করতে হয়েছে।
স্যান্ডেলটি যেন দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি আরামদায়ক ও টেকসই হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দিয়েছেন তারা। এজন্য সাধারণ শীতলপাটির পরিবর্তে স্যান্ডেল তৈরির উপযোগী মান ও ঘনত্বের পাটি তৈরিতে মনোযোগ দেওয়া হয়।
একাধিক প্রোটোটাইপ তৈরির পর সম্ভাব্য ক্রেতাদের মতামত নিয়ে বর্তমান নকশায় পৌঁছেছেন তারা। বর্তমানে ‘বুনন বাজার’-এর তৈরি শীতলপাটির স্যান্ডেলের বিক্রয়মূল্য ৬৫০ টাকা।
কারিগরদের নতুন বাজার তৈরির লক্ষ্য
উদ্যোক্তারা স্থানীয় কারিগরদের সঙ্গে কাজ করে স্যান্ডেল তৈরির উপযোগী শীতলপাটি সংগ্রহ করছেন। তাদের লক্ষ্য শুধু কাঁচামাল সংগ্রহ নয়, বরং ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের দক্ষতাকে আধুনিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা।
তাদের মতে, শীতলপাটির ব্যবহার কমে গেলে শুধু একটি পণ্যের বাজারই সংকুচিত হয় না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কারিগরদের কাজের সুযোগও কমে যায়। নতুন পণ্য তৈরির মাধ্যমে শীতলপাটির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি কারিগরদের জন্য নতুন বাজার তৈরি করতে চান তারা।
পেয়েছে অর্থায়ন ও স্বীকৃতি
দ্য আর্থ সোসাইটির সহযোগিতায় এবং নেদারল্যান্ডস দূতাবাসের সহায়তায় আয়োজিত গ্রিন ভয়েস মাস্টার বুটক্যাম্প থেকে এক লাখ টাকা তহবিল পেয়েছে ‘বুনন বাজার’। এই অর্থ দিয়ে প্রোটোটাইপ তৈরি ও পণ্য পরীক্ষার কাজ এগিয়ে নেন তারা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাল্ট প্রাইজ প্রতিযোগিতায় উদ্যোগটি প্রথম রানারআপ হয়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্টারপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট ক্লাব আয়োজিত প্রতিযোগিতায় সেরা আট উদ্যোগের মধ্যে জায়গা করে নেয়। ওই প্রতিযোগিতায় আকিজ রিসোর্সেসের পৃষ্ঠপোষকতায় চার উদ্যোক্তাই ইন্টার্নশিপের সুযোগ পান।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ারেও প্রদর্শিত হয়েছে তাদের তৈরি শীতলপাটির স্যান্ডেল। সেখানে কয়েক জোড়া স্যান্ডেল বিক্রিও হয়েছে।
সামনে বড় পরিসরে যাওয়ার পরিকল্পনা
শুধু স্যান্ডেলেই সীমাবদ্ধ থাকতে চান না চার শিক্ষার্থী। দেশীয় ঐতিহ্যবাহী উপকরণকে কেন্দ্র করে ‘বুনন বাজার’-কে পূর্ণাঙ্গ লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড হিসেবে গড়ে তুলতে চান তারা। ভবিষ্যতে ব্যাগ, ঘর সাজানোর সামগ্রীসহ বিভিন্ন টেকসই পণ্য তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
একই সঙ্গে স্থানীয় কারিগরদের যুক্ত করে ক্লাস্টারভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান উদ্যোক্তারা। তবে হাতে তৈরি পণ্যের উৎপাদন খরচ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় ও ক্রেতার সাধ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখা তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তবু একটি শ্রেণিকক্ষের ধারণা থেকে শুরু করে প্রোটোটাইপ তৈরি, উদ্যোক্তা প্রতিযোগিতায় সাফল্য, অর্থায়ন পাওয়া এবং বাস্তব ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার মতো কয়েকটি ধাপ ইতোমধ্যে পেরিয়েছে ‘বুনন বাজার’।
একসময় যে শীতলপাটি ঘরের মেঝেতে বিছিয়ে মানুষকে স্বস্তি দিত, সেই পরিচিত বুনন এখন নতুন রূপে জায়গা করে নিচ্ছে মানুষের পায়ের নিচেও। ঐতিহ্যকে আধুনিকতার সঙ্গে মিলিয়ে সেই বুননেই নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন রাবির চার শিক্ষার্থী।
কালের আলো/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array