১০০ কোটির প্রকল্প, ৯৮% টাকা খরচ—তবু ঘাটতি সেবায়
প্রকল্প শেষ। বরাদ্দের প্রায় পুরো টাকাও খরচ। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে সেবার ফলাফল নিয়ে। সুবিধাবঞ্চিত নারী ও শিশুদের স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা নিশ্চিত করতে নেওয়া প্রায় ১০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৯৫ কোটি ২ লাখ ৫৩ হাজার টাকা। অর্থাৎ সংশোধিত বরাদ্দের ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশই খরচ হয়েছে। অথচ সব সেবা পৌঁছেনি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়।
- ২১ জেলার নারী-শিশুর স্বাস্থ্য প্রকল্পে পুষ্টি ও শিশুসেবার কয়েকটি সূচক ৭০–৮৬ শতাংশে
- পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও সরঞ্জাম ব্যবহারে উঠে এসেছে দুর্বলতা
বিশেষ করে শিশু ও পুষ্টিসেবার কয়েকটি সূচকে প্রকল্পের অর্জন নেমে এসেছে ৮৫ দশমিক ৬, ৭৬ দশমিক ৮ ও ৬৯ দশমিক ৬ শতাংশে। বিপরীতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কিছু সূচকে অর্জন ৯৯ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ফলে প্রকল্পের আর্থিক বাস্তবায়ন প্রায় পূর্ণ হলেও সেবার ফলাফলে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট বৈষম্য।
৫০ লাখ মানুষের জন্য, ফল একরকম নয়
২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত চলা ‘২১টি জেলার সুবিধাবঞ্চিত নারী ও শিশুর প্রাথমিক স্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবা প্রদান’ প্রকল্পের আওতায় আট বিভাগের ২১ জেলার প্রায় ৫০ লাখ মানুষকে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল।
আইএমইডির প্রভাব মূল্যায়নে দেখা গেছে, গর্ভকালীন সেবা গ্রহণের হার ৮৯ দশমিক ৮ শতাংশ এবং প্রসব-পরবর্তী সেবা গ্রহণের হার ৮৭ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ নারীস্বাস্থ্যসেবার কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকলেও শিশু ও পুষ্টির ক্ষেত্রে একই গতি ধরে রাখা যায়নি।
মূল্যায়নে ৭২০ জনের ওপর জরিপ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৪৮০ জন ছিলেন প্রকল্পের সেবাগ্রহীতা এবং ২৪০ জন তুলনামূলক গোষ্ঠীর সদস্য। পাশাপাশি নেওয়া হয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার, দলীয় আলোচনা ও কেস স্টাডি।
অর্থনৈতিক লাভ আছে, ব্যবস্থাপনায় ফাঁকও আছে
প্রকল্পের অর্থনৈতিক হিসাবে অবশ্য চিত্র ইতিবাচক। অর্থনৈতিক সুবিধা-ব্যয় অনুপাত ৩ দশমিক ৭০ এবং অর্থনৈতিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ৭৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। আর্থিক সুবিধা-ব্যয় অনুপাত ১ দশমিক ২৩২ এবং আর্থিক অভ্যন্তরীণ মুনাফার হার ১৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
কিন্তু আইএমইডির মূল্যায়নে অর্থের বাইরে উঠে এসেছে প্রকল্প ব্যবস্থাপনার একাধিক দুর্বলতা। অনুমোদনের আগে যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হয়নি। বড় প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালকও শুরু থেকে পাওয়া যায়নি।
দুই বছর অতিরিক্ত দায়িত্বে প্রকল্প পরিচালক
২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত উপসচিব ড. আবুল হোসেন অতিরিক্ত দায়িত্বে প্রকল্প পরিচালকের কাজ করেন। পরে ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত একই দায়িত্ব পালন করেন যুগ্ম সচিব মো. মাহমুদ আলী।
৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের প্রকল্পে পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের সরকারি নির্দেশনা থাকলেও এই প্রকল্পে দীর্ঘ সময় তা হয়নি। আইএমইডির মতে, এতে প্রকল্প পরিচালনায় প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও সমন্বয় ব্যাহত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
পরিকল্পনায় সেপ্টেম্বর, দরপত্রে মার্চ
প্রকল্পের ক্রয় পরিকল্পনায় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে দরপত্র আহ্বানের কথা ছিল। বাস্তবে তা করা হয় ২০১৯ সালের মার্চে। ছয় মাসের এই বিলম্বের প্রভাব পড়ে পরবর্তী ক্রয় ও বাস্তবায়ন কার্যক্রমেও। চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার সরঞ্জাম কিনতে ব্যয় হয় ১৫ কোটি ১২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। কেনা হয় ৪ হাজার ৫০৮টি সরঞ্জাম। ১২টি জেলার জন্য ১২টি অ্যাম্বুলেন্স কিনতে খরচ হয় আরও ৫ কোটি ৪ লাখ টাকা।
তবু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় কিছু এক্স-রে মেশিনসহ সরঞ্জাম পুরোপুরি স্থাপন ও চালু করা যায়নি। অবকাঠামো ও কারিগরি প্রস্তুতির ঘাটতিকেই এর কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
অডিট আপত্তিতেও প্রায় ২৮ লাখ টাকা
প্রকল্পের শেষ অর্থবছর ২০২০-২১-এ ২৮ লাখ ২১ হাজার ৫৬২ টাকার চারটি অডিট আপত্তি ওঠে। এর মধ্যে করোনাকালে স্যাটেলাইট ক্যাম্পে যাতায়াত বাবদ ১২ লাখ ১৭ হাজার ৯৬০ টাকা এবং প্রশিক্ষণের নামে ১২ লাখ ৪৪ হাজার ৯৩২ টাকা ব্যয়ের হিসাব নিয়ে আপত্তি রয়েছে।
এ ছাড়া নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি ভাড়ায় হলরুম ও সাউন্ড সিস্টেম বাবদ ১ লাখ ৯ হাজার ৬২০ টাকা এবং আর্থিক ক্ষমতার বাইরে মোটরগাড়ি মেরামতে ২ লাখ ৪৯ হাজার ৫০ টাকা ব্যয়ের বিষয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এর আগে ২০১৮-১৯ ও ২০১৯-২০ অর্থবছরে আরও আটটি অডিট আপত্তি উঠেছিল। সেগুলো পরে নিষ্পত্তি হলেও শেষ অর্থবছরের চারটি আপত্তি মূল্যায়নের সময়ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় ছিল।
এখন নজর পরিকল্পনার গলদে
প্রকল্প গ্রহণের আগে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সুপারিশ করেছে আইএমইডি। শুরু থেকেই পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক, বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী তদারকি কাঠামো নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
চিকিৎসা সরঞ্জাম যাতে কেনার পর পড়ে না থাকে, সে জন্য রক্ষণাবেক্ষণ ও জরুরি প্রতিস্থাপনে আলাদা তহবিল গঠনের সুপারিশ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের সেবাকে বিদ্যমান প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনা, ওষুধ সরবরাহ ও স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থায় সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আসল সাফল্য টাকা খরচে নয়
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হকের মতে, স্বাস্থ্য প্রকল্পের দুর্বলতা অনেক সময় শুরু হয় প্রকল্প তৈরির সময়ই। পর্যাপ্ত দক্ষতা ছাড়া প্রকল্প প্রণয়ন হলে পরিকল্পনা, বাজেট ও বাস্তবায়নের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। এর সঙ্গে বাজেট অনুমোদনে বিলম্ব ও প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তনের মতো বিষয় যুক্ত হলে বাস্তবায়ন আরও ধীর হয়।
এই প্রকল্পের হিসাব তাই সরল নয়। ৯৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে—এটি এক দিক। অন্যদিকে শিশু ও পুষ্টিসেবার কয়েকটি সূচক ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের ঘরে আটকে থাকা আরেক বাস্তবতা। স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্পের সাফল্যের শেষ মাপকাঠি অর্থব্যয়ের হার নয়; নির্ধারিত মানুষের কাছে কতটা মানসম্মত সেবা পৌঁছেছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array