বড় ধরনের ভূমিকম্পের পর একসঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স। সম্ভাব্য ‘মেগা ডিজাস্টার’ মোকাবিলায় জনবল, উদ্ধার সরঞ্জাম ও কমান্ড কাঠামো বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ঢাকা ও আশপাশের ৪১টি পয়েন্টে উদ্ধার সরঞ্জাম ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। পূর্বাচলে ৫০ থেকে ৬০ সদস্যের একটি বিশেষ রেসকিউ টিম (এসআরটি) প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একইভাবে বিভাগীয় শহরগুলোতে গঠন করা হয়েছে ২০ সদস্যের পৃথক বিশেষ রেসকিউ টিম। ঢাকার আশপাশের আরও ১০০টি ফায়ার স্টেশনকে জরুরি প্রয়োজনে রাজধানীতে সহায়তার জন্য প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।
- ৪১ পয়েন্টে উদ্ধার সরঞ্জাম
- পূর্বাচলে বিশেষ রেসকিউ টিম
- ঢাকার সহায়তায় প্রস্তুত ১০০ ফায়ার স্টেশন
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার বলেন, বড় ভূমিকম্পে একই সময়ে বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই জনবল, সরঞ্জাম ও কমান্ড ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এক জায়গায় সব সরঞ্জাম নয়
ভূমিকম্পে পুরান ঢাকার ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেখানে থাকা বিপুল পরিমাণ উদ্ধার সরঞ্জামও আটকে পড়তে পারে। এতে পুরো উদ্ধার কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই ঝুঁকি কমাতে ঢাকা ও আশপাশের ৪১টি পয়েন্টে প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম ভাগ করে রাখা হয়েছে। ফলে কোনো স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কাছাকাছি অন্য স্টেশন থেকে সরঞ্জাম এনে উদ্ধারকাজ চালানো সম্ভব হবে।
পূর্বাচলে বিশেষ রেসকিউ টিম
বড় ভূমিকম্পে সাধারণ ফায়ার স্টেশনের জনবল দিয়ে একসঙ্গে সব এলাকায় উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হতে পারে। এ জন্য পূর্বাচলে ৫০ থেকে ৬০ সদস্যের একটি স্পেশাল রেসকিউ টিম (এসআরটি) মোতায়েন রাখা হয়েছে। বিভাগীয় শহরগুলোতেও বিভিন্ন স্টেশন থেকে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়ে ২০ সদস্যের করে এসআরটি গঠন করা হয়েছে। এসব দলকে ধসে পড়া ভবনে অনুসন্ধান ও উদ্ধারকাজের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
ঢাকার সহায়তায় প্রস্তুত ১০০ স্টেশন
ভূমিকম্পে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ বড় শহরগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে বিভাগীয় শহরের বাইরের ১০০টি ফায়ার স্টেশনকে ‘এয়ারমার্ক’ করা হয়েছে। রাজধানীর কোনো স্টেশন ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা অতিরিক্ত জনবলের প্রয়োজন হলে এসব স্টেশন থেকে দ্রুত জনবল ও সরঞ্জাম এনে ঢাকার উদ্ধার অভিযানে যুক্ত করা হবে।
তবে বড় ভূমিকম্পে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কীভাবে এসব জনবল ও সরঞ্জাম ঢাকায় আনা হবে, সেটিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে হেলিকপ্টারে রেসকিউ টিম ও সরঞ্জাম স্থানান্তরের বিষয়ে বিমান বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
ভূমিকম্পে কমান্ড সচল রাখার প্রস্তুতি
ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কার্যক্রমে কমান্ড ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। তাই পুরান ঢাকার সদর দপ্তর কোনো বড় ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যাতে নেতৃত্ব ও যোগাযোগব্যবস্থা সচল থাকে, সে অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এর অংশ হিসেবে দুজন পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কমান্ড কর্মকর্তাদের মিরপুরে অফিস করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সদর দপ্তরের মিডিয়া উইংয়ের মূল অংশও সেখানে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মিরপুর-১০-এর ট্রেনিং কমপ্লেক্সের কার্যক্রম পূর্বাচলের নতুন মাল্টিপারপাস ট্রেনিং কমপ্লেক্সে স্থানান্তর করা হয়েছে।
মিরপুরে ভূমিকম্প প্রতিরোধক সদর দপ্তর
পুরান ঢাকার সদর দপ্তরের ঝুঁকি বিবেচনায় মিরপুর-১০-এ নির্মাণ করা হচ্ছে ফায়ার সার্ভিসের নতুন বহুতল সদর দপ্তর। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহযোগিতায় নির্মাণাধীন ভবনটিতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ‘বেজ আইসোলেশন প্রযুক্তি’ ব্যবহার করা হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রযুক্তিটির মাধ্যমে ভবনটি ৮ মাত্রার ভূমিকম্পেও ধসে পড়া থেকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ২০২৮ সালে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। এরপর ফায়ার সার্ভিসের পুরো অধিদপ্তর সেখানে স্থানান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিচ্ছিন্ন হলেও সচল থাকবে যোগাযোগ
বড় ভূমিকম্পে ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক, মোবাইল টাওয়ার ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে উদ্ধারকারী সংস্থাগুলোর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এ ঝুঁকি বিবেচনায় গত আগস্টে দেশব্যাপী কমিউনিকেশন এক্সারসাইজ করেছে ফায়ার সার্ভিস। অ্যামেচার রেডিও অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আরাব) সহায়তায় আয়োজিত ওই মহড়ায় বেতার, মোবাইল ও ল্যান্ডফোন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করে বিকল্প ব্যবস্থায় ফায়ার স্টেশনগুলোর মধ্যে যোগাযোগ সচল রাখার অনুশীলন করা হয়।
বড় চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে বহু বিপর্যয়
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, বড় ভূমিকম্পের পর একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত বিপর্যয় মোকাবিলাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তার ভাষ্য, ভবনধসের পাশাপাশি গ্যাসলাইন থেকে আগুন, বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ও মানুষের আটকে পড়ার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। ঢাকার সরু সড়ক, যানজট, অবৈধ পার্কিং ও ধ্বংসস্তূপের কারণে উদ্ধারকারী গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেও সমস্যা হতে পারে।
তিনি বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের স্থিতিশীলতা যাচাই না করে উদ্ধারকারীদের প্রবেশ করানোও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পরিস্থিতি দ্রুত মূল্যায়ন, আটকে পড়াদের শনাক্তকরণ, অগ্রাধিকারভিত্তিতে উদ্ধার এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্ধারকারীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।
ভূমিকম্পের পূর্বাভাস নয়, প্রস্তুতিই ভরসা
ভূমিকম্প বিশ্লেষকদের মতে, বড় ভূমিকম্পের সুনির্দিষ্ট সময় আগে থেকে জানানোর মতো প্রযুক্তি এখনো নেই। তাই ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত মহড়ার বিকল্প নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে; বিশেষ করে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, রংপুর ও ময়মনসিংহসহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ঝুঁকি বেশি। তাই সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন। তার মতে, বড় ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রশিক্ষিত জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহ, নিয়মিত মহড়া এবং সরঞ্জামের রক্ষণাবেক্ষণ ও সক্ষমতা যাচাই করতে হবে।
বড় ভূমিকম্প উন্নত দেশগুলোর জন্যও কঠিন পরিস্থিতি তৈরি করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশকেও বিদ্যমান সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করে প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে হবে।
সরঞ্জাম বাড়ানোর উদ্যোগ
ভূমিকম্প ও বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জাম বাড়াতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেছে ফায়ার সার্ভিস। এসব বৈঠকে মেগা ডিজাস্টার মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিসের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সক্ষমতার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে নতুন সরঞ্জাম সরবরাহের বিষয়ে কয়েকটি সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, বড় ভূমিকম্প কখন হবে তা আগাম বলা সম্ভব না হলেও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব। সেই লক্ষ্যেই একক সদর দপ্তরনির্ভর ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে জনবল, সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও কমান্ড কাঠামোকে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কালের আলো/এমএসআইপি/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
Array