মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ, তেলের বাজারে বড় ধাক্কা
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার, তেলবাহী জাহাজে একের পর এক হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তাঝুঁকি বৃদ্ধিতে অস্থির হয়ে উঠেছে বিশ্ব জ্বালানি বাজার। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারেও। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বাজারে দরপতনের পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে জ্বালানি পরিবহণ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা না চালানোর ঘোষণা দেওয়ার পর তেলের দাম কিছুটা কমে আসে।
এদিকে, বৃহস্পতিবার লেনদেন শেষে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শেয়ারবাজার সূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ প্রায় ০.৫ শতাংশ কমেছে। একই দিনে ইউরোপ ও এশিয়ার শেয়ারবাজারেও দরপতন দেখা যায়। জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতির মধ্যে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে হুথিদের এক সামরিক মুখপাত্র দাবি করেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলা চালানো হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরেও বাড়ছে অনিশ্চয়তা। গত কয়েক মাস ধরে ইরানের অবরোধের কারণে এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়েছিল। তবে মার্কিন বাহিনীর দিকনির্দেশনা ও নিরাপত্তা সহায়তায় কিছু জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আবারও এই পথে চলাচলের ঝুঁকি নিচ্ছে। গত এক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশে তেলবাহী জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সেই উদ্যোগও নতুন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত বাড়তে থাকায় এই পথে জ্বালানি পরিবহণ ও রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে একই সময়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে ঝুঁকি বাড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হচ্ছে।
জ্বালানি বাজারবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান রিস্ট্যাড এনার্জির জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট হোর্হে লিওনের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে তেলের দাম কিছুটা কমার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। লোহিত সাগর অঞ্চলের পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হওয়ায় বাজারে চাপ অব্যাহত রয়েছে।
লিওন আরও বলেন, ইরানকে ঘিরে ট্রাম্পের হুমকি তেলের বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। চলতি সপ্তাহে যুদ্ধের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনার কথা জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে বৃহস্পতিবারের বক্তব্যে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালাবে না বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা তেলের দামে সাময়িক প্রভাব ফেলে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার এবং জ্বালানি পরিবহণের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে নিরাপত্তাঝুঁকি বিশ্ববাজারকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলেছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে তেলের দাম ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা বাড়ার পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
কালের আলো/জেএন

আপনার মতামত লিখুন
Array