নোবেলজয়ীদের ছবিতে কালো রেখা আর সোনালি আভা কেন?
বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর একটি নোবেল। প্রতিবছর এই পুরস্কারের বিজয়ীদের নাম ঘোষণার অপেক্ষায় থাকে পুরো বিশ্ব। কিন্তু বিজয়ীদের নামের পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ও ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে নোবেল পুরস্কারের পরিচিত অংশ—কালো রেখায় আঁকা মুখ, আর তার পেছনে ঝলমলে সোনালি আভা।
বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট, ডিজিটাল আর্কাইভ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে মুহূর্তেই তৈরি করা যায় নানা ধরনের প্রতিকৃতি। তাহলে নোবেলজয়ীদের ক্ষেত্রে কেন আলোকচিত্রের বদলে বেছে নেওয়া হয়েছে হাতে আঁকা এই বিশেষ শিল্পরীতি? কেন একই ধরনের রেখা ও সোনালি পটভূমিতে তুলে ধরা হয় বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, চিকিৎসক কিংবা শান্তিতে অবদান রাখা ব্যক্তিদের মুখ?
এর উত্তর শুধু শিল্পীর নান্দনিক পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংবাদ প্রকাশের বাস্তব প্রয়োজন, একটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষার বিকাশ এবং বিশ্বজুড়ে পরিচিত একটি পুরস্কারের নিজস্ব দৃশ্যমান পরিচয় গড়ে তোলার গল্প।
ছবির অভাব থেকেই শুরু ব্যতিক্রমী উদ্যোগ
নোবেলজয়ীদের এই বিশেষ প্রতিকৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুইডিশ শিল্পী নিকলাস এলমেহেডের নাম। ২০১২ সালে নোবেল মিডিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, পুরস্কার ঘোষণার মুহূর্তে অনেক বিজয়ীর ভালো মানের ছবি দ্রুত সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। বিজয়ীর নাম প্রকাশের পরপরই সংবাদমাধ্যমকে তাঁর ছবি প্রকাশ করতে হয়। কিন্তু কোনো গবেষক বা বিজ্ঞানীর উপযুক্ত ছবি সহজে না পাওয়া গেলে খবর প্রকাশে সমস্যা তৈরি হয়। অনলাইনে পাওয়া ছবির মানও সব সময় সংবাদমাধ্যমের ব্যবহারের উপযোগী হয় না।
এই সীমাবদ্ধতা কাটাতে এলমেহেড হাতে আঁকা প্রতিকৃতি তৈরির পথ বেছে নেন। কালো রেখায় মুখের বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তোলার এই পদ্ধতিতে অল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করা সম্ভব হয় পরিচিতিমূলক ছবি। ফলে দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি তৈরি হতে থাকে আলাদা একটি দৃশ্যশৈলী।
একই শৈলীতে কেন তুলে ধরা হয় সব বিজয়ীকে?
নোবেলজয়ীদের প্রত্যেকের কাজ, পরিচিতি ও অর্জন আলাদা। কেউ পদার্থবিজ্ঞানের জটিল সূত্র নিয়ে গবেষণা করেন, কেউ নতুন ওষুধ বা চিকিৎসাপদ্ধতির বিকাশে অবদান রাখেন, কেউ সাহিত্যে নতুন ভাবনার জন্ম দেন, আবার কেউ শান্তি ও মানবাধিকারের পক্ষে কাজ করেন।
এত বৈচিত্র্যের পরও তাঁদের প্রতিকৃতিতে একটি অভিন্ন শৈলী বজায় রাখা হয়। এর ফলে প্রতিটি ছবি আলাদাভাবে ব্যক্তির পরিচয় বহন করলেও সবগুলো একসঙ্গে নোবেল পুরস্কারের একটি সমন্বিত দৃশ্যমান পরিচয় তৈরি করে।
এটি একধরনের ব্র্যান্ডিংও। কোনো সংবাদে কালো রেখায় আঁকা মুখের সঙ্গে সোনালি আভা দেখা গেলে অনেক দর্শক সহজেই সেটিকে নোবেল পুরস্কারের ঘোষণার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারেন। বারবার একই ধরনের ছবি ব্যবহারের ফলে এই দৃশ্যশৈলী মানুষের মনে স্থায়ী পরিচিতি পেয়েছে।
কালো রেখার মধ্যেই মুখের পরিচয়
এই প্রতিকৃতির অন্যতম আকর্ষণ হলো এর সরলতা। মুখের প্রতিটি খুঁটিনাটি আলোকচিত্রের মতো ফুটিয়ে তোলার পরিবর্তে শিল্পী গুরুত্ব দেন চোখ, নাক, ঠোঁট, চুল ও মুখের গড়নের মতো প্রধান বৈশিষ্ট্যে।
গাঢ় কালো রেখা ছবিকে দেয় দৃঢ়তা। অপ্রয়োজনীয় রং ও জটিল ছায়া কম থাকায় ছোট আকারেও মুখের বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট থাকে। সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট, মোবাইল স্ক্রিন কিংবা সংবাদপত্র—বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই সরলতা কার্যকর।
তবে ছবিগুলোর বিশেষত্ব শুধু সহজে চেনা যায় এমন হওয়া নয়। হাতে আঁকা রেখা প্রতিটি প্রতিকৃতিতে একটি শিল্পিত অনুভূতি যোগ করে। ফলে ছবিগুলো নিছক পরিচিতিমূলক ছবি না থেকে নিজস্ব নান্দনিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে।
সোনালি আভা এল কীভাবে?
কালো রেখায় আঁকা মুখের সঙ্গে সোনালি রঙের ব্যবহার প্রতিকৃতিগুলোকে আরও স্বতন্ত্র করেছে। তবে বর্তমানের পরিচিত এই রূপ শুরু থেকেই ছিল না।
নোবেল পুরস্কারের ব্র্যান্ড পরিচয়ে সোনালি রঙের গুরুত্ব বাড়ার পর প্রতিকৃতিতেও এর ব্যবহার নতুন মাত্রা পায়। ২০১৮ সাল থেকে এলমেহেড তাঁর প্রতিকৃতিতে আসল গোল্ড ফয়েল বা সোনার পাত ব্যবহার শুরু করেন বলে প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে।
সোনালি রং নোবেল পদকের ঐতিহ্যের সঙ্গে দৃশ্যগত সম্পর্ক তৈরি করে। কালো রেখার সঙ্গে উজ্জ্বল সোনালি পাতের বৈপরীত্য ছবিকে দেয় আলাদা আকর্ষণ। ফলে প্রতিকৃতিগুলো সাধারণ ছবি থেকে আলাদা হয়ে ওঠে এবং দূর থেকেই সহজে নজরে পড়ে।
এখানে সোনালি আভা শুধু সাজসজ্জার উপাদান নয়; এটি নোবেল পুরস্কারের মর্যাদা ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত একটি দৃশ্যমান সংকেত হিসেবেও কাজ করে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও হাতে আঁকা প্রতিকৃতি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারে এখন ছবি তৈরি ও সম্পাদনার পদ্ধতি অনেক সহজ হয়েছে। কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েই তৈরি করা যায় নানা ধরনের ডিজিটাল প্রতিকৃতি। এমন সময়ে নোবেলজয়ীদের হাতে আঁকা ছবিগুলো বিশেষভাবে নজর কাড়ে।
এই প্রতিকৃতি তৈরিতে কালো অ্যাক্রিলিক রং ও মার্কার দিয়ে মুখের রেখা আঁকা হয়। এরপর বিশেষ আঠার সাহায্যে যুক্ত করা হয় ধাতব সোনার পাত। অর্থাৎ ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও ছবিগুলোর পেছনে রয়েছে বাস্তব উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি করা শিল্পকর্ম।
এই হাতে তৈরি বৈশিষ্ট্য ছবিগুলোকে আরও আলাদা করে। একই সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট শৈলী অনুসরণ করেও প্রতিটি মুখের নিজস্বতা বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
একটি প্রতিকৃতি, দুটি পরিচয়
নোবেলজয়ীদের এই ছবির দিকে তাকালে দুটি বিষয় একসঙ্গে সামনে আসে। প্রথমত, প্রতিকৃতিটি নির্দিষ্ট একজন মানুষের মুখ ও পরিচয় তুলে ধরে। দ্বিতীয়ত, একই শিল্পরীতির কারণে ছবিটি নোবেল পুরস্কারের বৃহত্তর পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
এ কারণেই প্রতিকৃতিগুলো শুধু বিজয়ীর ছবি হিসেবে ব্যবহৃত হয় না; নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা ঘিরে তৈরি হওয়া আন্তর্জাতিক সংবাদপ্রবাহেরও একটি পরিচিত দৃশ্যমান উপাদান হয়ে উঠেছে।
একসময় দ্রুত ছবি সংগ্রহের সমস্যার সমাধান হিসেবে শুরু হওয়া উদ্যোগ এখন শিল্প, সংবাদ উপস্থাপন ও ব্র্যান্ড পরিচয়ের সমন্বিত উদাহরণ। প্রয়োজন থেকে জন্ম নেওয়া এই শৈলী সময়ের সঙ্গে নিজস্ব ঐতিহ্য তৈরি করেছে।
নোবেলজয়ীদের কালো রেখায় আঁকা মুখ আর সোনালি আভা তাই কেবল সৌন্দর্যের বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে দ্রুত সংবাদ প্রকাশের প্রয়োজন, শিল্পীর নিজস্ব ভাবনা এবং একটি বিশ্বখ্যাত পুরস্কারকে আলাদা করে চেনানোর দীর্ঘ প্রক্রিয়া। প্রতিবছর বিজয়ীদের নাম ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিকৃতিগুলোও সামনে আসে—আর সেই পরিচিত দৃশ্যই মনে করিয়ে দেয়, কখনো কখনো একটি ছোট সমাধানও সময়ের সঙ্গে বড় ঐতিহ্যে পরিণত হতে পারে।
কালের আলো/জেএন

আপনার মতামত লিখুন
Array