খুঁজুন
                               
, ,
           

রেমিট্যান্স বন্ধের চক্রান্ত জনগণকে ক্ষুধার্ত রাখার শামিল: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬, ১:১৮ পূর্বাহ্ণ
রেমিট্যান্স বন্ধের চক্রান্ত জনগণকে ক্ষুধার্ত রাখার শামিল: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বন্ধের হুমকিকে চরম দেশবিরোধী ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রেমিট্যান্স বন্ধের চক্রান্ত দেশের কোটি পরিবারের জীবন-জীবিকার ওপর আঘাত হানার শামিল। একই সঙ্গে এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কর্মময় জীবনের ওপর আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জিয়া স্মৃতি পাঠাগার ও ‘কমল কুঁড়ি’ যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

রিজভী বলেন, ‘রেমিট্যান্স দেশের কোটি পরিবারের জীবন-জীবিকা ও জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে রেমিট্যান্স বন্ধের চক্রান্ত জনগণকে ক্ষুধার্ত রাখার শামিল।’

তিনি আরও বলেন, রেমিট্যান্স শাটডাউনের মতো কর্মসূচির হুমকি দেশের স্বার্থের পরিপন্থী। যারা এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে চায়, তারা জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তা বা অন্য কাউকে আক্রমণ এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির বিষয়ে সতর্ক করে বিএনপির এই নেতা বলেন, যেকোনো অন্যায় বা অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা কিংবা সংবাদ সম্মেলন করা যেতে পারে। তবে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তা বা অন্য কাউকে আক্রমণ করা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

রিজভীর ভাষ্য, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের রক্ষা করতে এবং রাজনৈতিক সুবিধা নিতে যারা রেমিট্যান্স শাটডাউনের মতো দেশের স্বার্থবিরোধী কর্মসূচি দিচ্ছে, তারা কখনোই জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে রাজনীতি করেনি।

তিনি বলেন, ১৯৭১, ১৯৮৬ কিংবা ২০২৪—বিভিন্ন সময়ে তারা জাতীয় স্বার্থের চেয়ে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি সব সময় জনগণ ও দেশের স্বার্থকে সবার আগে স্থান দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা তুলে ধরে রিজভী বলেন, শুধু মিছিল ও স্লোগান দেওয়াই ছাত্ররাজনীতির কাজ নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রচনা প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম শিক্ষার্থীদের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সুফি সাধক হাসান বসরীর একটি উক্তি স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘অন্তরের যত্ন নিলে বাহ্যিক সত্তাও সুন্দর হয়ে ওঠে।’

দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎসের ‘সাফারিং ইজ দ্য রুট অব অল গ্রেটনেস’ উক্তি উদ্ধৃত করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে রিজভী বলেন, মহৎ কিছু অর্জন করতে হলে কষ্ট ও পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে মেধা, জ্ঞান ও গণতন্ত্রচর্চার অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হতে হবে।

২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে রিজভী বলেন, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বারবার আন্দোলনের ব্যর্থতায় যে হতাশা তৈরি হয়েছিল, ২০২৪ সালের উত্তাল ছাত্র আন্দোলন তা ভুল প্রমাণ করেছে। তরুণদের সাহসিকতা ও অগ্রণী ভূমিকার কারণেই স্বৈরাচারী শাসনের পতন সম্ভব হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও কমল কুঁড়ির আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির সদস্যসচিব ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান। উদ্বোধনী বক্তব্য দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা বেবী নাজনীন, স্বনির্ভরবিষয়ক সহসম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি, সাংস্কৃতিক সম্পাদক আশরাফউদ্দিন উজ্জ্বল, ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনি এবং জিয়া স্মৃতি পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক জহির দীপ্তি।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

ইউপি নির্বাচনের সময় নির্ধারণে ইসির বৈঠক

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৪ অপরাহ্ণ
ইউপি নির্বাচনের সময় নির্ধারণে ইসির বৈঠক

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের সময় নির্ধারণসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বৈঠকে বসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সোমবার (১২ অক্টোবর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে কমিশনের ১৩তম সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন সভায় সভাপতিত্ব করছেন। এতে অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিবসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নিয়েছেন।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সভার আলোচ্যসূচিতে স্থানীয় সরকার পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসংক্রান্ত বিষয় রাখা হয়েছে। এসব নির্বাচনের সময় নির্ধারণসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

আলোচনায় জাতীয় পরিচয়পত্র ও নির্বাচন পদক

১৩তম কমিশন সভার আলোচ্যসূচিতে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা অর্পণের বিষয়টিও রয়েছে।

এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের পার্সোনালাইজেশন সেন্টারে থাকা যন্ত্রপাতির অবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ, কার্ড মুদ্রণ, বকেয়া বিল পরিশোধ এবং নতুন চুক্তি সম্পাদনের বিষয়ে গঠিত কমিটির কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করা হবে। এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।

সভায় ‘জাতীয় নির্বাচন পদক নীতিমালা ২০২৫’-এর খসড়া অনুমোদনের বিষয়টিও আলোচ্যসূচিতে রাখা হয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে কমিশনের আলোচনার পর কী সিদ্ধান্ত আসে, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

দূষিত বাতাসে হাঁসফাঁস ঢাকা, স্কোর ১৬৯

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ
দূষিত বাতাসে হাঁসফাঁস ঢাকা, স্কোর ১৬৯

বিশ্বের দূষিত বায়ুর শহরগুলোর তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা। সোমবার (১২ অক্টোবর) ঢাকার বায়ুমান সূচক (একিউআই) ১৬৯ রেকর্ড করা হয়েছে, যা বায়ুর মানের হিসাবে ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পড়ে। একই দিনে বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভারতের কলকাতা।

সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের সূচক থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার বিশ্বের দূষিত শহরের তালিকায় ১৯৩ স্কোর নিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভারতের কলকাতা। ১৯১ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ভিয়েতনামের হ্যানয়। চীনের বেইজিং ১৭৮ স্কোর নিয়ে তৃতীয় এবং সিঙ্গাপুর ১৭২ স্কোর নিয়ে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। পঞ্চম স্থানে থাকা ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার বায়ুমান স্কোর ১৭০। আর ১৬৯ স্কোর নিয়ে ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছে ঢাকা।

কোন স্কোরে বায়ুর মান কেমন

আইকিউএয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী, বায়ুমান সূচক শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে বায়ুর মান ‘ভালো’ হিসেবে বিবেচিত হয়। ৫১ থেকে ১০০ স্কোর হলে তা ‘মাঝারি’ বা ‘সহনীয়’ পর্যায়ে থাকে। ১০১ থেকে ১৫০ স্কোর হলে বায়ুর মান সংবেদনশীল জনগোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়।

অন্যদিকে, ১৫১ থেকে ২০০ স্কোরকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে ধরা হয়। ২০১ থেকে ৩০০ স্কোর হলে বায়ুর মান ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ এবং ৩০১-এর বেশি হলে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সেই হিসাবে ঢাকার ১৬৯ স্কোরের অর্থ, শহরটির বাতাস বর্তমানে অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে রয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নগরবাসী

বায়ুদূষণের কারণে শিশু, প্রবীণ এবং শ্বাসকষ্ট বা হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। দূষিত বাতাসে দীর্ঘ সময় অবস্থান করলে সুস্থ মানুষেরও শ্বাসতন্ত্রে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বায়ুদূষণ বেশি থাকলে বাইরে দীর্ঘ সময় অবস্থান এড়িয়ে চলা উচিত। বিশেষ করে সংবেদনশীল ব্যক্তিদের প্রয়োজন অনুযায়ী সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

ঢাকার বায়ুমানের এই পরিস্থিতি নগরীর দূষণ নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণকাজের ধুলা ব্যবস্থাপনা এবং যানবাহনের ধোঁয়া কমানোর প্রয়োজনীয়তাকে আবারও সামনে এনেছে। বায়ুদূষণের উৎস নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো কঠিন হবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

জীবনযাপনের ব্যয় বৃদ্ধিতে স্বস্তি নেই

সঞ্চয় ফুরোচ্ছে, মধ্যবিত্ত নামছে নিম্নবিত্তের কাতারে

গাইবান্ধা সংবাদদাতা
প্রকাশিত: সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪২ পূর্বাহ্ণ
সঞ্চয় ফুরোচ্ছে, মধ্যবিত্ত নামছে নিম্নবিত্তের কাতারে

গাইবান্ধা শহরের পুরাতন বাজারে সকালে ক্রেতার ভিড় থাকে। তবে সেই ভিড়ের অনেকেই পণ্য কিনতে নয়, দাম জানতে আসেন। কেউ সবজির ঝুড়ি থেকে আধা কেজি তুলে আবার নামিয়ে রাখেন, কেউ ডিমের দাম শুনে চলে যান ডালের দোকানে। মাসের পর মাস ধরে চলা এই চিত্র যেন জানিয়ে দিচ্ছে, সংসারের আয়-ব্যয়ের হিসাব আর মিলছে না। নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের ব্যয় সামলাতে গিয়ে ফুরিয়ে আসছে সঞ্চয়। অনেকে বাধ্য হচ্ছেন ঋণ করতে, কমাতে হচ্ছে প্রয়োজনীয় খরচও। এই চাপে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে মধ্যবিত্তের আর্থিক নিরাপত্তা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে দেশে সাধারণ মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে, আগস্টে যা ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ খাবারের পাশাপাশি বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের মতো খাতেও ব্যয়ের চাপ বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ২১ শতাংশ। একই সময়ে মানুষের আয় বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। ফলে আয় বাড়লেও ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছেন না অনেকেই। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের চাপও পণ্য ও সেবার দামে প্রভাব ফেলছে।

আয় বাড়লেও কমছে সংসারের স্বস্তি

গাইবান্ধা পৌর এলাকায় রিকশা চালান সাহারুল ইসলাম (৪৫)। প্রতিদিন গড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করেন তিনি। পাঁচ বছর আগেও এই আয়ে স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সংসার মোটামুটি ভালোই চলত। এখন ঘরভাড়া, চাল-সবজি এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।

সংসারের ব্যয় সামলাতে তাঁর স্ত্রী এখন আশপাশের বাড়িতে কাজ করেন। ছোট ছেলে স্কুলের ফাঁকে দোকানে ফরমাশ খাটে। পরিবারের মোট আয় আগের তুলনায় বাড়লেও স্বস্তি ফেরেনি। সাহারুল বলেন, ‘আয় বাড়ছে, কিন্তু শান্তি বাড়ছে না। সবজির দোকানে যেতেই এখন ভয় লাগে।’

শুধু দিনমজুর কিংবা রিকশাচালক নন, নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবীরাও একই সংকটে পড়েছেন। শহরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাজ্জাদ মাহমুদের (৩৮) বেতন কিছুটা বেড়েছে। কিন্তু মাসের ২০ তারিখ পার হলেই শুরু হয় ধারদেনার চিন্তা।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শারমিন শাম্মী (৪২) বলেন, ‘বাসাভাড়া আর গাড়িভাড়া হুট করে বাড়ানো যায়, বেতন তো ইচ্ছেমতো বাড়ে না। শখ-আহ্লাদ দূরে থাক, টিকে থাকাই এখন কঠিন।’

একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারের মাসিক বাজেটে বাড়িভাড়া, বাজার, সন্তানের পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে কিছু টাকা সঞ্চয়ের সুযোগ থাকত। এখন অনেক পরিবারের হিসাব প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। মাস শেষে সঞ্চয় তো দূরের কথা, ধারদেনা না করে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।

সঞ্চয় ভেঙে চলছে সংসার

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা অবলম্বনের নির্বাহী পরিচালক প্রবীর চক্রবর্তী বলেন, তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ধারাবাহিকভাবে কমেছে। যাঁদের আয় কাগজে-কলমে বেড়েছে, তাঁরাও বাস্তবে আর্থিকভাবে চাপে পড়েছেন।

তাঁর মতে, অনেক পরিবার জমানো টাকা তুলে সংসারের খরচ চালাচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর পাশাপাশি সস্তা পণ্য কিনছে। এমনকি চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছে অনেকে।

গাইবান্ধার পাড়া-মহল্লায় এই পরিবর্তনের চিত্র স্পষ্ট। মাছ-মাংস কেনা কমেছে অনেক পরিবারে। ডিম, ডাল ও সবজি হয়ে উঠেছে ভরসা। ছোটখাটো অসুস্থতায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার বদলে অনেকে ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনছেন। বাইরে খাওয়া কিংবা পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার মতো ব্যয় বাদ পড়ছে মাসিক বাজেট থেকে। কেউ সন্তানকে তুলনামূলক ব্যয়বহুল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সরিয়ে কম খরচের স্কুলে ভর্তি করছেন। কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছে সাহায্য চাইছেন, আবার কেউ ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতির চাপে সবচেয়ে জটিল অবস্থায় পড়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। উচ্চ আয়ের মানুষের ব্যয় সংকোচনের সুযোগ থাকলেও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রয়েছে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি। কিন্তু মধ্যবিত্তের বড়ো একটি অংশ এসব সহায়তার বাইরে থেকে যায়। ফলে সঞ্চয় শেষ হয়ে গেলে আর্থিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার বিকল্পও সীমিত হয়ে পড়ে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক মর্যাদা রক্ষার চাপ। লোকলজ্জার ভয়ে অনেকেই নিজেদের সংকটের কথা প্রকাশ করতে চান না। সহায়তার প্রয়োজন হলেও কেউ কেউ টিসিবির পণ্য কেনার লাইনে দাঁড়াতে দ্বিধা করেন। ফলে তাঁদের আর্থিক সংকট অনেক সময় পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

লেখক ও গবেষক জহুরুল কাইয়ুমের মতে, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ মানুষের সামাজিক অবস্থানকে নিচের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আজ যিনি মধ্যবিত্ত, সঞ্চয় শেষ হয়ে ঋণের বোঝা বাড়তে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে তাঁর জীবনযাত্রা নিম্নবিত্তের পর্যায়ে নেমে যেতে পারে।

কৃষিপ্রধান জেলাতেও বাড়ছে চাপ

গাইবান্ধা কৃষিপ্রধান জেলা। ধান, পাট, ভুট্টা, সবজি ও চরাঞ্চলের ফসলের ওপর নির্ভর করে এখানকার অর্থনীতির বড়ো একটি অংশ। তারপরও বাজারের বাড়তি দামের চাপ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না জেলার মানুষ। কারণ, মূল্যস্ফীতির প্রভাব শুধু শহরের ভোক্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; উৎপাদন থেকে পরিবহন, পাইকারি বাজার ও খুচরা বিক্রি—পুরো সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।

কৃষকদের সেচের ডিজেল, বিদ্যুৎ, সার ও পরিবহন বাবদ বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে। অথচ উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে তাঁদের সব সময় নিশ্চয়তা থাকে না। আবার সেই কৃষকই বাজারে গিয়ে চাল, তেল, ডাল, মাছ ও ওষুধ কিনতে উচ্চ দামের মুখোমুখি হচ্ছেন। অর্থাৎ উৎপাদক ও ভোক্তা—দুই ভূমিকাতেই তাঁদের বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।

স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দোকানি, শিক্ষক ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের আয়ও নির্ভর করে বাজারে মানুষের কেনাকাটার সক্ষমতার ওপর। সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে মানুষ যখন কেনাকাটা কমিয়ে দেন, তখন বেচাকেনাও কমে যায়। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হন ছোট ব্যবসায়ীরা, সংকুচিত হয় স্থানীয় অর্থনীতির গতি এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও বাধাগ্রস্ত হয়।

নদীভাঙন ও বন্যার ঝুঁকিতে থাকা চরাঞ্চলের মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। একটি দুর্যোগেই তাঁদের বছরের সঞ্চয় শেষ হয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে নতুন করে আর্থিক নিরাপত্তা গড়ে তোলার সুযোগও কমে যায়।

সংকটের প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতেও

ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রভাব পড়ছে ব্যবসা ও বিনিয়োগেও। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পথও সংকুচিত হয়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণায়ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে নিম্ন আয়ের পরিবারের ওপর বাড়তি চাপের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। এসব পরিবারের বাজেটের বড়ো অংশ খাবারের পেছনে ব্যয় হয়। প্রকৃত আয় কমে গেলে খাবারের ব্যয় কমানোর সুযোগ সীমিত থাকায় অন্য প্রয়োজনীয় খাত থেকে খরচ কাটতে হয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে এ সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজারের অব্যবস্থাপনা এবং পণ্য বিতরণে ত্রুটিও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। তাই বাজার তদারকি জোরদার, পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক সহায়তা

গাইবান্ধার মতো জেলায় মূল্যস্ফীতির প্রভাব মোকাবিলায় স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কৃষি উপকরণের দাম ও সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর সহায়তা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্যও এমন সহায়তা প্রয়োজন, যাতে সঞ্চয় শেষ হওয়ার আগেই তারা আর্থিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার সুযোগ পায়। পাশাপাশি শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।

গাইবান্ধার বাজারে সন্ধ্যা নামলে দোকানিরা বাতি জ্বালান, ক্রেতারা হাতে থলে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু অনেকের থলে এখন আগের তুলনায় হালকা। সেই হালকা থলে শুধু কম কেনাকাটার চিত্র নয়; এটি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসা ক্রয়ক্ষমতা, ফুরিয়ে যাওয়া সঞ্চয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতেরও প্রতীক।

মাস শেষে ঘরে চাল থাকবে কি না, সন্তানের স্কুলের ফি দেওয়া যাবে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অসংখ্য পরিবার। বাজার তদারকি, সরবরাহব্যবস্থার উন্নতি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে এই চাপ আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। ফসলের মাঠে উৎপাদন থাকলেও তাতে ঘরে ঘরে স্বস্তি ফিরবে না, যদি মানুষের হাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার মতো অর্থ না থাকে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি