জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অর্থায়ন, পরিবেশ সুরক্ষা ও দেশের মানুষের কল্যাণকে একই উন্নয়ন কাঠামোয় যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান। তাঁর মতে, উন্নয়ন কার্যক্রমের সুফল দীর্ঘস্থায়ী করতে অর্থের সঠিক ব্যবহার, স্বচ্ছতা এবং বাস্তবভিত্তিক নীতি প্রণয়ন গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য অর্জনে সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণে সরকার সম্পূর্ণ উন্মুক্ত।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে বেসরকারি সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত ‘প্যারিস থেকে আন্তালিয়া: প্রকৃতির জন্য জলবায়ু অর্থায়নের পর্যালোচনা’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সংলাপে দেশীয় জলবায়ু বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক ও আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
- জনকল্যাণমুখী নীতি প্রণয়নে সুশীল সমাজ ও বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ গ্রহণে সরকারের প্রস্তুতির কথা জানালেন মন্ত্রী
- ঋণের স্বচ্ছ ব্যবহার, উন্নয়ন ও পরিবেশের সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ে জলবায়ু সচেতনতা বাড়ানোর আহ্বান
মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান জনগণ দ্বারা নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার সুশীল সমাজ এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সুপারিশ গ্রহণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত। আমরা এমন একটি নীতি প্রণয়ন করতে চাই যা সত্যিই দেশের মানুষের কল্যাণে আসবে।’
জলবায়ু অর্থায়নে জনস্বার্থ ও বিশেষজ্ঞ মতামতের গুরুত্ব
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কার্যকর নীতি প্রণয়ন এবং অর্থায়নের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি সংলাপে গুরুত্ব পায়। মন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান, সুশীল সমাজের সুপারিশ এবং জনস্বার্থকে নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত করার গুরুত্ব উঠে আসে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অর্থের সংস্থান যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেই অর্থের ব্যবহারও হতে হবে পরিকল্পিত ও জনকল্যাণমুখী। পরিবেশ সুরক্ষা, উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুফল বিবেচনায় নিয়ে নীতি প্রণয়ন করলে জলবায়ু অর্থায়নকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি হয়।
জলবায়ু সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দায়বদ্ধতার ওপর জোর
বৈশ্বিক জলবায়ু পদক্ষেপের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ড. মঈন খান জাতিসংঘে পরিবেশবিষয়ক তাঁর ৩৫ বছর আগের একটি ভাষণের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, সে সময় পরিবেশ সুরক্ষা নিয়ে যেসব মৌলিক বিষয় আলোচনায় এসেছিল, তার মধ্যে দূষণকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নীতিও ছিল। বিষয়টি এখনো আন্তর্জাতিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার অংশ।
তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হয়, আজ আমরা অনুভব করছি যে, ৩৫ বছর আগে আমরা জাতিসংঘে যেসব পরিবেশগত শঙ্কা ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরেছিলাম, আজও আমরা সেগুলোই পুনর্ব্যক্ত করছি। বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের জন্য দায়ী ধনী দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে তাদের দায়ভার গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে আমাদের সামগ্রিক বৈশ্বিক পরিবেশ প্রতিনিয়ত সংকটাপন্ন হচ্ছে।’ তাঁর বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে কার্যকর সহযোগিতা, অর্থায়ন এবং পরিবেশগত দায়িত্ব পালনের সমন্বয় বৈশ্বিক জলবায়ু উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার সমন্বয়ে টেকসই ভবিষ্যৎ
উন্নয়নশীল দেশগুলোর নীতিনির্ধারণী বাস্তবতা তুলে ধরে ড. মঈন খান বলেন, জনগণ রাস্তাঘাট, অবকাঠামো ও শিল্পের উন্নয়ন প্রত্যাশা করে। একই সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি জনগণের প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উন্মুক্ত মনোভাবের উল্লেখ করে বলেন, ‘তাঁর উদাহরণ এ দেশের মানুষের জন্য শিক্ষণীয়।’ দেশের মানুষের কল্যাণে কার্যকর নীতি প্রণয়নে পরামর্শ গ্রহণে সরকারের উন্মুক্ত থাকার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে অংশীজনদের মতবিনিময় ও সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী।
ঋণের অর্থ সঠিক খাতে বিনিয়োগই উন্নয়নের মূল বিবেচনা
জলবায়ু অর্থায়ন ও জাতীয় ঋণ প্রসঙ্গে ড. মঈন খান বলেন, ঋণ গ্রহণ নিজেই বড় সমস্যা নয়; বরং সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিই মূল বিবেচ্য। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ বহু বছর ধরে ঋণ নিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করলেও আন্তর্জাতিকভাবে উচ্চ ঋণগ্রস্ত দরিদ্র দেশের তালিকায় পড়েনি। তাঁর মতে, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে দেশের শক্তিশালী অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট অর্থনীতির আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যা কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রাকে সচল রাখতে সহায়তা করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির পুনর্গঠনের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ‘সঠিক জায়গায় বিনিয়োগ করা হলে ঋণ নিয়ে উন্নয়ন করা একটি সুদূরপ্রসারী কৌশল হতে পারে, যদি তা স্বচ্ছতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়।’ এখানে উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতার গুরুত্ব উঠে এসেছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর ভাষ্যে। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং অভিযোজনমূলক উদ্যোগে অর্থের পরিকল্পিত ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদি সুফল অর্জনে সহায়ক হতে পারে।
পরিবেশ রক্ষায় জনসচেতনতা ও স্থানীয় অংশগ্রহণ
প্রকৃতি সংরক্ষণে জনসচেতনতার ভূমিকা তুলে ধরে ড. মঈন খান নেপালের একটি ঐতিহাসিক জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদাহরণ দেন। তিনি দেখান, জনসচেতনতা ও পরিবেশগত আন্দোলন প্রকৃতি রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ু আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় গোষ্ঠীগুলোকে শুধু তারকা হোটেলের বলরুমে আয়োজিত আলোচনা বা প্রচারণায় সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম সম্প্রসারণের আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় সংলাপে ড. মঈন খানের বক্তব্যে জলবায়ু অর্থায়ন, স্বচ্ছ বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়নকে আরও কার্যকর করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
কালের আলো/এমএএএমকে
আপনার মতামত লিখুন
Array