দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বলিউড তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম, বিচ্ছেদ, বন্ধুত্ব ও নানা বিতর্কিত মন্তব্যের সাক্ষী হয়েছে করণ জোহরের জনপ্রিয় সেলিব্রিটি চ্যাট শো ‘কফি উইথ করণ’। তারকাদের হাসি-ঠাট্টার আড়ালে কখনো বেরিয়ে এসেছে অজানা তথ্য, কখনো একটি মন্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে তুমুল বিতর্ক। এবার নবম মৌসুমের মধ্য দিয়ে বিদায় নিতে যাচ্ছে অনুষ্ঠানটি। ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর জিওহটস্টারে শুরু হয়েছে এর শেষ অধ্যায়।
২০০৪ সালে যাত্রা শুরু করা অনুষ্ঠানটির আটটি মৌসুমে প্রচারিত হয়েছে ১৬১টি পর্ব। দীর্ঘ এই সময়ে করণের বিখ্যাত ‘কফি কাউচে’ বসেছেন বলিউডের অসংখ্য তারকা। তাঁদের কেউ জানিয়েছেন প্রেমের গল্প, কেউ খুলে বলেছেন সম্পর্কের টানাপোড়েন, আবার কারও মন্তব্য জন্ম দিয়েছে জাতীয় পর্যায়ের বিতর্ক। অনুষ্ঠানটির আলোচিত ১০টি ঘটনা ফিরে দেখা যাক।
১. রণবীর কাপুরকে নিয়ে দীপিকা ও সোনমের মন্তব্য

২০১০ সালে ‘কফি উইথ করণ’-এর তৃতীয় মৌসুমে অতিথি হয়ে এসেছিলেন দীপিকা পাড়ুকোন ও সোনম কাপুর। কথোপকথনের একপর্যায়ে উঠে আসে দীপিকার সাবেক প্রেমিক রণবীর কাপুরের প্রসঙ্গ। রণবীরের ব্যক্তিগত জীবন ও স্টাইল নিয়ে তাঁদের মন্তব্য দ্রুত আলোচনায় আসে।
সোনম ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, রণবীরের একজন স্টাইলিস্ট প্রয়োজন। প্রেমিক হিসেবে তাঁকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যও করেছিলেন তিনি। দুই অভিনেত্রীর কথাবার্তা ঘিরে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়। তারকাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে টেলিভিশনের আড্ডা কীভাবে বড় বিতর্কে রূপ নিতে পারে, সেটির অন্যতম উদাহরণ হয়ে আছে এই পর্ব।
২. রণবীরকে কনডমের বিজ্ঞাপন করার পরামর্শ দীপিকার

একই মৌসুমে দ্রুত প্রশ্নোত্তরপর্বে করণ জোহর জানতে চেয়েছিলেন, কোন পণ্যের বিজ্ঞাপন করলে রণবীর কাপুরকে মানাবে। জবাবে দীপিকা বলেছিলেন, কনডমের বিজ্ঞাপন।
মন্তব্যটি প্রচারের পরপরই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। অনেকে এটিকে সাবেক প্রেমিককে উদ্দেশ করে করা রসিকতা হিসেবে দেখেছিলেন। আবার কারও কাছে এটি ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে প্রকাশ্য খোঁচা। দীপিকা পরে জানান, তিনি কথাটি মজা করেই বলেছিলেন। তবে সেই সংক্ষিপ্ত মন্তব্য দীর্ঘদিন ধরে বলিউডের আলোচিত টেলিভিশন মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে রয়েছে।
৩. করণ জোহরকে ‘স্বজনপ্রীতির পতাকাবাহক’ বলেছিলেন কঙ্গনা

২০১৭ সালে ‘রেঙ্গুন’ সিনেমার প্রচারে করণের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন কঙ্গনা রনৌত ও সাইফ আলী খান। সেখানেই করণকে সরাসরি বলিউডের স্বজনপ্রীতির পতাকাবাহক বলে আখ্যা দেন কঙ্গনা।
তাঁর অভিযোগ ছিল, বলিউডে তারকা পরিবারের সন্তানরা তুলনামূলক বেশি সুযোগ পান, অথচ চলচ্চিত্রশিল্পের বাইরে থেকে আসা শিল্পীদের নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। কঙ্গনার মন্তব্যে প্রথমে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হলেও পরে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্ক শুরু হয়।
এরপর স্বজনপ্রীতি নিয়ে করণ ও কঙ্গনার মতবিরোধ আরও আলোচনায় আসে। বলিউডে সুযোগের বণ্টন, তারকা সন্তানদের সুবিধা এবং বহিরাগত শিল্পীদের সংগ্রাম নিয়ে যে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলছে, এই ঘটনা সেটিকে আরও সামনে নিয়ে আসে।
৪. হার্দিক পান্ডিয়া ও লোকেশ রাহুলের মন্তব্যে ক্রিকেটেও বিতর্ক

২০১৯ সালে ক্রিকেটার হার্দিক পান্ডিয়া ও লোকেশ রাহুলের অংশগ্রহণে প্রচারিত পর্বটি অনুষ্ঠানটির সবচেয়ে বড় বিতর্কগুলোর একটি হয়ে ওঠে। নারীদের নিয়ে হার্দিকের কিছু মন্তব্যকে অসম্মানজনক বলে সমালোচনা করেন দর্শকদের অনেকে।
বিষয়টি শুধু বিনোদনজগতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; ক্রিকেটাঙ্গনেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রশাসক কমিটি দুজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় এবং তাঁদের সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। পরে তাঁদের জরিমানাও করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। বিতর্কের পর সংশ্লিষ্ট পর্বটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
এই ঘটনা দেখিয়ে দেয়, জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠানে করা মন্তব্য একজন তারকার পেশাগত জীবনেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
৫. রাষ্ট্রপতির নাম ভুল বলে মিমের শিকার আলিয়া ভাট

২০১৩ সালে ‘স্টুডেন্ট অব দ্য ইয়ার’ সিনেমার সহশিল্পী বরুণ ধাওয়ান ও সিদ্ধার্থ মালহোত্রার সঙ্গে ‘কফি উইথ করণ’-এ এসেছিলেন আলিয়া ভাট। দ্রুত প্রশ্নোত্তরপর্বে তাঁকে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতির নাম জিজ্ঞেস করা হয়। উত্তরে তিনি ভুল নাম বলেছিলেন; তখন ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন প্রণব মুখার্জি।
পর্বটি প্রচারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলিয়ার সাধারণ জ্ঞান নিয়ে অসংখ্য মিম তৈরি হয়। দীর্ঘদিন তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ চলে। তবে আলিয়া বিষয়টিকে এড়িয়ে যাননি। নিজের ভুলকে কেন্দ্র করে তৈরি হাস্যরসেও পরে অংশ নেন। ‘জিনিয়াস অব দ্য ইয়ার’ নামের একটি ব্যঙ্গাত্মক ভিডিওতেও দেখা যায় তাঁকে।
৬. ঐশ্বরিয়া রাইকে ‘প্লাস্টিক’ বলেছিলেন ইমরান হাশমি

২০১৪ সালে ‘কফি উইথ করণ’-এর দ্রুত প্রশ্নোত্তরপর্বে ঐশ্বরিয়া রাই বচ্চনের নাম শুনে ইমরান হাশমি এক শব্দে উত্তর দিয়েছিলেন—‘প্লাস্টিক’। মন্তব্যটি ঐশ্বরিয়ার চেহারা ও সৌন্দর্য নিয়ে অপমানজনক ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হয়।
ঘটনাটি নিয়ে পরে আলোচনা অব্যাহত থাকে। ঐশ্বরিয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁর সম্পর্কে বলা সবচেয়ে খারাপ কথাগুলোর মধ্যে ‘প্লাস্টিক’ মন্তব্যটির কথা উল্লেখ করেছিলেন। ইমরানও পরে এ মন্তব্যের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন। একটি শব্দের উত্তর কীভাবে দীর্ঘস্থায়ী বিতর্ক তৈরি করতে পারে, ঘটনাটি তার উদাহরণ।
৭. কারিনা কাপুর ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার অ্যাকসেন্ট নিয়ে খোঁচা

বলিউডের দুই অভিনেত্রী কারিনা কাপুর ও প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুঞ্জন একসময় বেশ আলোচিত ছিল। ‘কফি উইথ করণ’-এর তৃতীয় মৌসুমে সাইফ আলী খানের সঙ্গে এসে কারিনা প্রিয়াঙ্কার উচ্চারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। জানতে চেয়েছিলেন, প্রিয়াঙ্কা ওই ধরনের অ্যাকসেন্ট কোথা থেকে পেয়েছেন।
পরে শহীদ কাপুরের সঙ্গে অনুষ্ঠানে এসে প্রিয়াঙ্কাও পাল্টা জবাব দেন। তিনি বলেন, কারিনার তৎকালীন প্রেমিক সাইফ আলী খান যেখান থেকে তাঁর উচ্চারণ পেয়েছেন, তিনিও সেখান থেকেই পেয়েছেন।
দুই অভিনেত্রীর এই কথার লড়াই বিনোদনমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে গুঞ্জন থাকলেও তাঁদের মন্তব্যগুলো অনুষ্ঠানটির স্মরণীয় মুহূর্তের তালিকায় জায়গা করে নেয়।
৮. আনুশকা শর্মাকে নিয়ে রণবীর সিংয়ের মন্তব্য

‘ব্যান্ড বাজা বারাত’ সিনেমার সাফল্যের পর রণবীর সিং ও আনুশকা শর্মা একসঙ্গে ‘কফি উইথ করণ’-এ হাজির হয়েছিলেন। সেই পর্বে আনুশকাকে উদ্দেশ করে রণবীরের একটি যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য দর্শকদের একাংশের কাছে আপত্তিকর মনে হয়েছিল।
আনুশকাও তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে এভাবে কথা না বলতে। পরবর্তী সময়ে পুরোনো ভিডিও ক্লিপটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ঘটনাটি আবার আলোচনায় আসে। বিশেষ করে অনুষ্ঠানে তারকাদের কথাবার্তার সীমা ও পারস্পরিক সম্মান নিয়ে বিতর্কের সময় এই পর্বের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
৯. ‘আমি এখনো ভার্জিন’—সালমান খানের মন্তব্য

২০১৩ সালে ‘কফি উইথ করণ’-এর চতুর্থ মৌসুমের প্রথম পর্বে অতিথি হয়েছিলেন সালমান খান। তাঁর বিয়ে না করা ও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে দর্শকদের কৌতূহল দীর্ঘদিনের। করণের প্রশ্নের জবাবে সালমান বলেছিলেন, তিনি এখনো ভার্জিন।
সালমানের এই মন্তব্য সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভক্তদের মধ্যে শুরু হয় নানা জল্পনা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয় মিম। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সাধারণত সংযত থাকা সালমানের এমন বক্তব্য তাই বিশেষভাবে নজর কেড়েছিল।
১০. তুষার কাপুরের ‘বোটক্স’ উত্তর নিয়ে বিতর্ক

অনুষ্ঠানের তৃতীয় মৌসুমে দ্রুত প্রশ্নোত্তরপর্বে ‘বোটক্স’ শব্দের সঙ্গে অভিনেতা তুষার কাপুর প্রীতি জিনতার নাম উল্লেখ করেছিলেন। মন্তব্যটি প্রীতির চেহারা ও সম্ভাব্য প্রসাধনী চিকিৎসা নিয়ে ব্যক্তিগত ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়।
পরে তুষার এ মন্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তাঁর ব্যাখ্যা ছিল, দ্রুত উত্তর দেওয়ার খেলায় চিন্তাভাবনার সময় খুব কম থাকে। তবু ঘটনাটি আলোচনায় আসে তারকাদের ব্যক্তিগত চেহারা নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে।
শেষ মৌসুমে বিদায় নিচ্ছে ‘কফি উইথ করণ’

২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর করণ জোহর ঘোষণা করেন, নবম মৌসুমের পর আর ফিরবে না ‘কফি উইথ করণ’। ১৪ অক্টোবর জিওহটস্টারে শুরু হয়েছে অনুষ্ঠানটির বিদায়ী মৌসুম। প্রথম পর্বের অতিথি হিসেবে এসেছেন সালমান খান।
নতুন মৌসুমে আরও কয়েকজন জনপ্রিয় বলিউড ও দক্ষিণি চলচ্চিত্র তারকার উপস্থিতি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে অনুষ্ঠানটির বিদায়ের ঘোষণাই এখন ভক্তদের কাছে সবচেয়ে বড় খবর। দুই দশকের বেশি সময় ধরে তারকাদের ব্যক্তিগত গল্প ও বিতর্ককে দর্শকের সামনে তুলে ধরা এই শো শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে ভারতীয় বিনোদনজগতের একটি পরিচিত অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে।
কালের আলো/জেএন/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array