খুঁজুন
                               
, ,
           

সামনে ড্রোন, চারপাশে মৃত্যু; রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের বাঁচার আকুতি

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:০৯ অপরাহ্ণ
সামনে ড্রোন, চারপাশে মৃত্যু; রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের বাঁচার আকুতি

অর্থ উপার্জন করে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন রাজন। কিন্তু প্রায় ১০ মাসের অভিজ্ঞতায় সেই স্বপ্নের জায়গা নিয়েছে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর দেশে ফেরার আকুতি। এখন তাঁর সবচেয়ে বড় চাওয়া, প্রাণে বেঁচে এক দিন নিরাপদে আপনজনদের কাছে ফিরে যাওয়া।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাজন জানিয়েছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর আগের ধারণা ছিল না। তাঁর ভাষায়, নিজের সিদ্ধান্তে যাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই বুঝতে পারেননি পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। একই অভিজ্ঞতার কথা বলছেন আহমেদ নামের আরেক বাংলাদেশি তরুণ। অর্থের আশায় স্বেচ্ছায় রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিলেও এখন তাঁর উপলব্ধি, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজের জীবনই পড়েছে চরম ঝুঁকিতে।

  • ‘এখানে নিরাপদ জায়গা নেই’—যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানিয়ে দেশে থাকা স্বজনদের কাছে ফিরতে চাইছেন বাংলাদেশি তরুণেরা
  • কেউ হারিয়েছেন সহযোদ্ধা, কেউ জানেন না নিজের পরিণতি
  • অসহনীয় জীবন আর প্রিয়জনের কাছে ফেরার আকুতিতে ভারী তাঁদের কণ্ঠ

আহমেদের বক্তব্য, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিটি দিন কাটে মৃত্যুভয় নিয়ে। ঘুম, বিশ্রাম কিংবা আগামীকাল বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা—কোনোটিই সেখানে স্বাভাবিক জীবনের মতো নয়। দেশে থাকা পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধে গেলেও শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন ও পরিবারের ভবিষ্যৎ দুটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

চাকরি ও মোটা অঙ্কের বেতনের প্রলোভনে রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন বাংলাদেশিরা

রাজন ও আহমেদের অভিজ্ঞতা রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি তরুণদের একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তাঁদের কেউ গিয়েছেন স্বেচ্ছায়, কেউ বিদেশে চাকরির আশ্বাসে, আবার কেউ মধ্যস্থতাকারীদের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর পর অনেকেরই সামনে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা—যেখানে অর্থের প্রতিশ্রুতির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

তিন পথে রাশিয়ায়, শেষ গন্তব্য যুদ্ধক্ষেত্র
রাশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বক্তব্য অনুযায়ী, মূলত তিন ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি তরুণেরা রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন। একদল অর্থ উপার্জনের আশায় স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যোগ দিচ্ছেন। তাঁদের কাছে রাশিয়ায় যাওয়ার প্রধান আকর্ষণ মোটা অঙ্কের বেতন, এককালীন অর্থপ্রাপ্তি এবং ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে অনেকেই বুঝতে পারছেন, উচ্চ আয়ের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে রয়েছে প্রাণ হারানোর গুরুতর ঝুঁকি।

দ্বিতীয় দলের তরুণদের অভিযোগ, তাঁদের অন্য ধরনের চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে বিভিন্ন কৌশলে বা চাপ প্রয়োগ করে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা বলছেন, বিদেশে কাজের সন্ধানে গিয়ে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দানে পৌঁছানোর বিষয়টি তাঁদের প্রত্যাশার বাইরে ছিল।

তৃতীয় দলটি বিভিন্ন প্রলোভনমূলক প্রচারণায় আকৃষ্ট হয়ে রাশিয়ায় গিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে যুদ্ধের বিনিময়ে বিপুল অর্থ, গাড়ি-বাড়ি এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এ ধরনের প্রচারণা তরুণদের কাছে যুদ্ধকে আর্থিক উন্নতির একটি দ্রুত পথ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু যাঁরা বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন, তাঁদের অনেকের বক্তব্য সেই ছবির সঙ্গে মেলে না।

৪০ লাখ টাকার গল্পের আড়ালে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে রাশিয়ায় অবস্থানরত এক বাংলাদেশি তরুণ দাবি করেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েই তিনি বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪০ লাখ টাকা পেয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে উচ্চ বেতন ও আর্থিক সুবিধার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

এ ধরনের ভিডিওতে অর্থ উপার্জন ও জীবন বদলে যাওয়ার গল্প তরুণদের আকৃষ্ট করতে পারে। বিশেষ করে বেকারত্ব, পারিবারিক দায়বদ্ধতা এবং দ্রুত আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা যাঁদের মধ্যে প্রবল, তাঁদের কাছে এসব প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু এসব ভিডিওতে দেখানো অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা কতটা বাস্তব, সেগুলোর সঙ্গে কী ধরনের চুক্তি ও দায়িত্ব যুক্ত এবং যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ঝুঁকি কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর সব সময় স্পষ্ট থাকে না।

রাজনের অভিযোগ, সোহেল সরদার নীরব নামে এক ব্যক্তি রাশিয়ায় গিয়ে অর্থ ও সম্মান পাওয়ার কথা তুলে ধরে ভিডিও তৈরি করছেন এবং সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁর দাবি, এ ধরনের প্রচারণা তরুণদের যুদ্ধের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে।

অভিযোগের বিষয়ে সোহেল সরদার নীরবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাইও পাওয়া যায়নি।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তি যুদ্ধের বিনিময়ে অর্থ পেয়েছেন—এমন দাবি সত্য হলেও তা সামগ্রিক পরিস্থিতির নিরাপদ হওয়ার প্রমাণ নয়। একজনের আর্থিক সুবিধার অভিজ্ঞতা অন্যদের জন্য একই পরিণতির নিশ্চয়তা দেয় না। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণহানি, গুরুতর আহত হওয়া, নিখোঁজ হওয়া কিংবা প্রতিশ্রুত অর্থ না পাওয়ার ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

‘প্রতি পাঁচ মিনিটে তিন-চারটি ড্রোন’
যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা এক বাংলাদেশি তরুণের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি জানান, তিনি তখন সম্মুখযুদ্ধের এলাকায় অবস্থান করছিলেন। তাঁর দাবি, প্রতি পাঁচ মিনিটে তিন-চারটি ড্রোন আসছিল, যেগুলো গুলি করে ভূপাতিত করা অত্যন্ত কঠিন।

ওই তরুণ আরও জানান, একটি এজেন্সির মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে সাতজন বাংলাদেশি যুদ্ধে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। নিহতদের পরিচয় হিসেবে তিনি মাদারীপুরের সরজি কাজি, কুমিল্লার ইউসুফ খান ও কিশোরগঞ্জের জাহাঙ্গীর হোসেনের নাম উল্লেখ করেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকটি এজেন্সি বাংলাদেশিদের অন্য কাজের কথা বলে রাশিয়ায় পাঠাচ্ছে। পরে তাঁদের সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে আল মনোয়ারা এজেন্সি ও আরাফাত এজেন্সিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

ওই তরুণ আরিফ চৌধুরী ও জালাল পাটোয়ারী নামের দুই ব্যক্তির কথাও উল্লেখ করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্তের তথ্যও এখানে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

তিনি আরও দাবি করেন, রাশিয়ায় লোক পাঠানোর বিনিময়ে মধ্যস্থতাকারীরা বড় অঙ্কের অর্থ পান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একজনকে পাঠানোর বিনিময়ে ৫ লাখ ৮০ হাজার রুবল পর্যন্ত দেওয়া হয়। তবে এই অর্থপ্রাপ্তির দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

অভিযোগগুলো সত্য হলে বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে মানুষকে যুদ্ধের ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়ার গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে। তাই এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, নিয়োগচুক্তি, ভিসার ধরন এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাই করে তদন্ত করা জরুরি।

বেতন নয়, এখন অর্থ হারানোর ভয়ও
যে অর্থের আশায় অনেকে রাশিয়ায় গিয়েছেন, সেই অর্থ পাওয়া নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। কয়েকজন বাংলাদেশির অভিযোগ, রুশ কমান্ডাররা তাঁদের কাছ থেকে জোর করে অর্থ নিয়ে নিচ্ছেন।

রাজন দাবি করেছেন, তাঁর প্রায় ১০ লাখ রুবল একজন কমান্ডার নিয়ে নিয়েছেন। তিনি এই অর্থের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক কোটি টাকা বলে উল্লেখ করেছেন। তবে অর্থের পরিমাণ ও অভিযোগের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।

অর্থ উপার্জনের জন্য বিদেশে গিয়ে যদি কেউ নিজের উপার্জন ধরে রাখতে না পারেন, তাহলে তাঁর যাওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ সীমিত থাকলে অর্থ ফেরত চাওয়া বা অভিযোগ জানানোর পথও কঠিন হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন সেখানে থাকা বাংলাদেশিরা।

তাঁদের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে তীব্র শীত, খাবারের কষ্ট, গোসলের সীমিত সুযোগ এবং প্রতিনিয়ত ড্রোন হামলার ভয়। কেউ কেউ দাবি করেছেন, দুই দিনে একবার গোসলের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে ১৫ দিনেও গোসলের সুযোগ পাওয়া যায় না।

এসব অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, বিদেশে উচ্চ আয়ের প্রতিশ্রুতি বিবেচনার সময় শুধু বেতনের অঙ্ক দেখলেই চলে না। কাজের প্রকৃতি, চুক্তির শর্ত, নিরাপত্তা, নিয়োগকর্তার পরিচয় এবং চাকরি ছেড়ে দেশে ফেরার সুযোগ সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে পরিবার
যুদ্ধে যাওয়া বাংলাদেশিদের একটি অংশের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের স্বজনেরা জানিয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের পোস্টে উঠে এসেছে অপেক্ষা, উদ্বেগ এবং প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলার কষ্ট।

উম্মে শাহজাদি তাঁর স্বামীর খোঁজ চেয়ে পোস্ট দিয়েছেন। আহমেদ সোহেল খুঁজছেন তাঁর মামাতো ভাই নয়নকে। ইব্রাহিম শান্ত জানিয়েছেন, তাঁর বোনজামাই ছয় মাস ধরে রাশিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন।

তানজিনা ইসলাম জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী ফেব্রুয়ারিতে সম্মুখযুদ্ধে যাওয়ার পর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। শামী নামের আরেকজন তাঁর ভাই রুবেলের খোঁজ চেয়েছেন। কিশোরগঞ্জের ফায়জুলও নিখোঁজ রয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।

তবে এসব পোস্টের ভিত্তিতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মোট সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাঁদের কেউ নিহত হয়েছেন, কেউ আটক হয়েছেন, নাকি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন—প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

পরিবারের জন্য এই অনিশ্চয়তা আরও কঠিন হয়ে ওঠে যখন তাঁরা জানেন না, স্বজন কোথায় আছেন বা আদৌ জীবিত আছেন কি না। যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং মরদেহ শনাক্ত করার জটিলতা এই সংকটকে আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কতজন বাংলাদেশি যুদ্ধে, সঠিক হিসাব নেই
বাংলাদেশ থেকে কতজন রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে কতজন নিহত, আহত বা নিখোঁজ হয়েছেন—তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৭১০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় গেছেন। গত ২০ বছরের মধ্যে এক বছরে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৮ হাজার ৬১৮ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে রাশিয়ায় গেছেন। অন্যদিকে, গত ৯ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, রাশিয়ায় প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন।

তবে এসব সংখ্যা রাশিয়ায় যাওয়া বা কর্মরত বাংলাদেশিদের হিসাব; তাঁদের সবাই যে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, এমন নয়। কতজন বাংলাদেশি রুশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন, তার আলাদা সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি।

পুলিশের গোয়েন্দা সূত্রের ধারণা, গত চার বছরে রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে ৫০ জনের বেশি বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তবে এই সংখ্যা সম্পর্কেও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই বা নিহতদের একটি নিশ্চিত সরকারি তালিকা পাওয়া যায়নি। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। এই সংঘাতের মধ্যে বিদেশি নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগের কারণ হয়েছে। বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া এবং সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা বিশেষভাবে জরুরি।

বিদেশে যাওয়ার আগে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা দরকার
রাশিয়ায় যাওয়া সব বাংলাদেশি যে যুদ্ধে যোগ দিচ্ছেন, এমন কোনো তথ্য নেই। বৈধভাবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো ব্যক্তিদের আলাদা করে দেখতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে যথাযথ তদন্তও প্রয়োজন। তবে যুদ্ধরত বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা বিদেশে চাকরির প্রস্তাব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা সামনে এনেছে।

চাকরির প্রকৃতি: চুক্তিতে কী কাজের কথা বলা হয়েছে এবং বাস্তবে সেই কাজই করতে হবে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। নিয়োগকর্তা ও মধ্যস্থতাকারী: প্রতিষ্ঠানটির পরিচয়, নিবন্ধন এবং বিদেশে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন যাচাই করতে হবে। চুক্তি ও অর্থপ্রাপ্তি: বেতন, এককালীন অর্থ, অন্যান্য সুবিধা এবং চাকরি ছাড়ার শর্ত লিখিতভাবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন।

নিরাপত্তা ও দেশে ফেরার সুযোগ: কাজের সঙ্গে সামরিক দায়িত্ব বা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার কোনো শর্ত যুক্ত আছে কি না, তা স্পষ্ট করা জরুরি। পরিবারকে তথ্য দেওয়া: কোথায় যাচ্ছেন, কার অধীনে কাজ করবেন এবং কী ধরনের চুক্তিতে যাচ্ছেন—এসব তথ্য পরিবারের কাছে রাখা প্রয়োজন। বিদেশে কাজের সন্ধান করা অনেক পরিবারের আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। তাই উচ্চ আয়ের প্রতিশ্রুতিকে এককভাবে দোষারোপ না করে, সেই প্রতিশ্রুতির সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ চাওয়া—নিরাপদে দেশে ফেরা
রাজন ও আহমেদের বক্তব্যে এখন আর বড় বাড়ি, গাড়ি কিংবা বিপুল অর্থের স্বপ্ন মুখ্য নয়। তাঁদের কথায় ফিরে ফিরে আসছে বেঁচে থাকার আকুতি এবং পরিবারের কাছে ফেরার ইচ্ছা। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা এই তরুণেরা অন্যদের সতর্ক করে বলছেন, শুধু অর্থের প্রলোভনে কিংবা মধ্যস্থতাকারীর আশ্বাসে রাশিয়ায় যুদ্ধে যোগ দেওয়া উচিত নয়। তাঁদের অভিজ্ঞতায়, সেখানে নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা নেই; এমনকি বিপদে পড়লে দেশে ফেরার পথও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এই সংকটের মানবিক দিকটি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের পরিবার, নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় থাকা মানুষ এবং অর্থের আশায় বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া তরুণেরাও এর সঙ্গে যুক্ত। রাশিয়ায় যুদ্ধরত বাংলাদেশিদের সঠিক সংখ্যা, নিহত ও নিখোঁজের হিসাব এবং প্রতারণার অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তথ্য সামনে আনা তাই গুরুত্বপূর্ণ।

পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে কাউকে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ, যে তরুণ পরিবারকে ভালো রাখার আশায় বিদেশে যান, তাঁর নিরাপদে ফিরে আসাটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজন ও আহমেদের মতো তরুণদের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাই মনে করিয়ে দেয়—বড় অঙ্কের আয়ের প্রতিশ্রুতি কখনোই জীবনের নিরাপত্তার বিকল্প হতে পারে না।

কালের আলো/টিইকে/এমকে

টানা ১০ দিনের ছুটি, নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছেন মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:১৪ অপরাহ্ণ
টানা ১০ দিনের ছুটি, নাড়ির টানে ঢাকা ছাড়ছেন মানুষ

শারদীয় দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন হাজারো মানুষ। কর্মব্যস্ত নগরজীবন থেকে সাময়িক বিরতি নিয়ে পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গ্রামের বাড়ির পথে ছুটছেন চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। সরকারি ছুটির সঙ্গে সাপ্তাহিক ছুটি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ অবকাশ যুক্ত হওয়ায় এবার অনেকেই আগেভাগে ঢাকা ছাড়ার পরিকল্পনা করেছেন।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর সায়েদাবাদ ও মহাখালী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা গেছে, পূজার ছুটিকে ঘিরে বাড়ি ফেরা মানুষের ভিড় বাড়ছে। বিভিন্ন গন্তব্যের বাসের টিকিট কাউন্টারে যাত্রীদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কেউ পরিবার নিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়িতে, কেউবা ছুটির দিনগুলো কাটাতে ছুটছেন আত্মীয়স্বজনের কাছে।

চলতি বছর শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি বাড়ানো হয়েছে। ২০ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত তিন দিনের সরকারি ছুটির সঙ্গে ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীরা টানা পাঁচ দিনের অবকাশ পাচ্ছেন। এ ছাড়া সনাতন ধর্মাবলম্বী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য রয়েছে ঐচ্ছিক ছুটির সুযোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটির সময় আরও দীর্ঘ। সরকারি ও বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাপ্তাহিক ছুটি ও পূজার ছুটি মিলিয়ে টানা ১০ দিন শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকছে। এ কারণে যেসব পরিবারের সন্তান স্কুলে পড়ে, তাদের জন্য একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রায় ৯ থেকে ১০ দিনের ছুটি কাজে লাগিয়ে আগেভাগেই গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।

সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে নোয়াখালী যাচ্ছিলেন সিথি রায়। তিনি বলেন, রাজধানীতে কর্মরত মানুষের জন্য পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটানোর সুযোগ খুব বেশি আসে না। কর্মব্যস্ততা, সন্তানদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন ব্যস্ততার কারণে বছরের অন্য সময়ে বাড়ি যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এবারের দীর্ঘ ছুটি সেই সুযোগ তৈরি করেছে বলে জানান তিনি। সন্তানদের গ্রামের পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিতে তাদের নিয়ে নানাবাড়ি যাচ্ছেন সিথি রায়। একই টার্মিনাল থেকে কুমিল্লাগামী যাত্রী অসিত কুমার দে বলেন, এবার পূজায় টানা ছুটি পাওয়ায় পরিবারের সবাই মিলে আগেই গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন। সাধারণত এক-দুই দিনের বেশি ছুটি পাওয়া যায় না। এবার দীর্ঘ সময় পরিবারের সঙ্গে কাটানো যাবে। সন্তানদের স্কুলও আগেভাগে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভিড় এড়াতে একটু আগেই রওনা হয়েছেন তাঁরা।

সায়েদাবাদের মতো মহাখালী বাস টার্মিনালেও দেখা গেছে বাড়ি ফেরা মানুষের ব্যস্ততা। সেখান থেকে ময়মনসিংহগামী বেসরকারি চাকরিজীবী মো. তানভীর আহমেদ জানান, সরকারি ছুটি শুরু হতে আরও দু-এক দিন বাকি থাকলেও অফিসের জমে থাকা ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে তিনি আগেই ছুটি নিয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ দিনের মতো ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা করেছেন তিনি। তানভীর আহমেদ বলেন, ঢাকায় একা থেকে সময় কাটানোর চেয়ে গ্রামের বাড়িতে স্বজনদের সঙ্গে পূজা ও ছুটির আনন্দ ভাগাভাগি করতেই তিনি যাচ্ছেন। দীর্ঘ ছুটির সুযোগে পরিবার নিয়ে বাড়ি যাওয়ার পাশাপাশি অনেকেই আগেভাগে যাত্রা করছেন, যাতে ছুটির মূল সময়ে পরিবহনের অতিরিক্ত চাপ এড়ানো যায়।

পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে স্বাভাবিক দিনের তুলনায় যাত্রীচাপ বেড়েছে। মহাখালী বাস টার্মিনালের এক পরিবহন মালিক প্রতিনিধি জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই যাত্রীচাপ বাড়তে শুরু করেছে। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের আগেই গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। সরকারি ছুটি শুরু হলে যাত্রীর চাপ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। ফলে ছুটির সময় বিভিন্ন রুটে যাত্রীদের যাতায়াতের ব্যস্ততা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজধানীর কর্মব্যস্ত জীবন থেকে বিরতি নিয়ে প্রিয়জনদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পেয়ে খুশি অনেক নগরবাসী। দীর্ঘ ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে ফেরা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা এবং উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করার প্রত্যাশা তাঁদের যাত্রাকে আরও আনন্দমুখর করে তুলেছে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

 

ইনানীতে রিসোর্টে আগুনে ১০ মৃত্যু, অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন

কক্সবাজার সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০৮ অপরাহ্ণ
ইনানীতে রিসোর্টে আগুনে ১০ মৃত্যু, অগ্নিনিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন

কক্সবাজারের ইনানী মেরিন ড্রাইভের পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। রিসোর্টটিতে অগ্নিনিরাপত্তার কোনো লাইসেন্স ছিল না। এমনকি অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য গত জুনে ফায়ার সার্ভিস সতর্ক করলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানা গেছে।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। এতে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি স্থাপনাটির প্রায় পুরো অংশ পুড়ে যায়। দুপুর ১টা পর্যন্ত ঘটনাস্থল থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। নিহত ও আহত সবাই পর্যটক বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে প্রশাসন। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। আগুনের সূত্রপাত, নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।

ফায়ার সার্ভিসের সতর্কতার পরও নেওয়া হয়নি ব্যবস্থা

ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, টুপটুপ রিসোর্টের অগ্নিনিরাপত্তার কোনো লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা উন্নত করার জন্য কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে সেই সতর্কতার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি রিসোর্টটির নিচতলায় ছিল রান্নাঘর, আর ওপরের অংশে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। ফলে আগুন লাগার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। শনিবারের অগ্নিকাণ্ডে স্থাপনাটির প্রায় পুরো অংশ পুড়ে যাওয়ার পর অগ্নিনিরাপত্তার প্রস্তুতি ও জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের নিরাপদে বের করে আনার ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সতর্কতা পাওয়ার পর ঠিক কী কী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল এবং কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।

টয়লেট থেকে উদ্ধার চারজনের মরদেহ

ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র কর্মকর্তা দোলন আচার্য জানান, প্রথমে ঘটনাস্থল থেকে পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দুপুর ১টার পর রিসোর্টের টয়লেট থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ জনে। নিহতদের মধ্যে রাজধানীর বনশ্রীর ইসরাত জাহান মালিহা (৩০) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), খিলগাঁওয়ের লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও নাফিসতা মীম (২৭) এবং চুয়াডাঙ্গার ফারিহা কবির (৩৩) ও ফায়িজান আহম্মেদ (৫) রয়েছেন। প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, নিহত ও আহত ব্যক্তিরা সবাই পর্যটক। আগুনে রিসোর্টের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।

আহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ

অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জন হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল জানান, আহত ছয়জনকে হাসপাতালে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ পুড়ে গেছে। অপর একজন পড়ে গিয়ে আহত হন। তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়। আগুনে দগ্ধদের অবস্থা ও পরবর্তী চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণ করেন।

শর্টসার্কিট না রান্নাঘরের চুলা—আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন তথ্য

রিসোর্টের ইনচার্জ মো. সুমন জানান, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে তাঁরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পরপরই তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়। তবে এরই মধ্যে রিসোর্টের শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগুনের সূত্রপাত নিয়ে ভিন্ন একটি প্রাথমিক ধারণা দেওয়া হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, রিসোর্টের রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। দুটি বক্তব্যেই আগুনের কারণ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণার কথা বলা হয়েছে। ফলে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, রান্নাঘরের চুল্লি কিংবা অন্য কোনো কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তদন্তের মাধ্যমে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।

ধোঁয়ায় অন্ধকার, স্ত্রীকে নিয়ে নালায় লাফ দেন পর্যটক

আগুন থেকে বেঁচে ফেরা পর্যটক আব্দুল মান্নান জানান, হঠাৎ দরজা খুলে তিনি দেখেন, চারপাশ ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে। পরে তিনি স্ত্রীকে নিয়ে পাশের একটি নালায় লাফ দিয়ে রিসোর্ট থেকে বের হয়ে আসেন। তিনি জানান, রিসোর্টটিতে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ জন পর্যটক থাকতে পারেন। ঢাকার মিরপুর থেকে স্ত্রীকে নিয়ে বেড়াতে এসে তাঁরা সেখানে উঠেছিলেন। তাঁদের আরও দুই দিন রিসোর্টটিতে থাকার কথা ছিল। তাঁর বর্ণনায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর পর্যটকদের সামনে তৈরি হওয়া বিপজ্জনক পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে। তবে অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে ঠিক কতজন অবস্থান করছিলেন, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। পরে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশের সহায়তায় আগুন নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্ধারকাজ শুরু হয়।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এমএ মান্নান জানান, অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে আগুন কীভাবে ছড়িয়েছে, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না এবং কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল বলে যে তথ্য পাওয়া গেছে, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স না থাকা এবং সতর্কতার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগের কারণে রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এবং অগ্নিকাণ্ডে সম্ভাব্য দায় নির্ধারণে তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

জীবন বদলাতে চান? আগে বদলান নিজের সম্পর্কে এই বিশ্বাসগুলো

ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:০১ অপরাহ্ণ
জীবন বদলাতে চান? আগে বদলান নিজের সম্পর্কে এই বিশ্বাসগুলো
জীবনে আরও ভালো করতে কে না চান! কেউ চান ক্যারিয়ারে সফল হতে, কেউ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে, আবার কেউ চান সুন্দর সম্পর্ক ও মানসিক প্রশান্তি। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানুষ পরিশ্রম করেন, নতুন অভ্যাস গড়ে তোলেন এবং নিজেকে প্রতিনিয়ত উন্নত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এত প্রচেষ্টার পরও অনেক সময় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসে না। এর পেছনে কি শুধু পরিস্থিতি দায়ী, নাকি নিজের চিন্তাভাবনা ও বিশ্বাসও অজান্তে বাধা হয়ে দাঁড়ায়?

ব্যক্তিগত উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মানুষের বিশ্বাস, আত্মপরিচয় ও মানসিকতা তার আচরণ এবং সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা থাকলে অনেক সময় মানুষ নতুন সুযোগ গ্রহণ করতে ভয় পান, ব্যর্থতার আশঙ্কায় পিছিয়ে যান কিংবা নিজের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত পদক্ষেপ নিতে পারেন না। তাই জীবন বদলাতে শুধু কাজের পরিমাণ বাড়ানো নয়, নিজের ভেতরের চিন্তাভাবনাগুলোও বোঝা জরুরি।

মনের ভেতরেও চলে অদৃশ্য সফটওয়্যার

একটি কম্পিউটারের কথা ভাবুন। এর যন্ত্রাংশ যত উন্নতই হোক, সফটওয়্যারে সমস্যা থাকলে সেটির কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি কিছুটা একই রকম। আমাদের বিশ্বাস, চিন্তা, অনুভূতি, প্রত্যাশা এবং নিজের সম্পর্কে তৈরি হওয়া ধারণাগুলো আচরণ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।

কেউ হয়তো জীবনে সফল হতে চান, কিন্তু মনে মনে বিশ্বাস করেন, ‘আমি যথেষ্ট যোগ্য নই।’ কেউ ভালোবাসার সম্পর্ক চান, অথচ তাঁর মধ্যে কাজ করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়। আবার কেউ আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে চাইলেও ভাবেন, ‘আমার মতো মানুষের পক্ষে বড় কিছু করা সম্ভব নয়।’

এ ধরনের ধারণা সব সময় বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না। কিন্তু এগুলো দৃঢ়ভাবে মনে গেঁথে গেলে মানুষ নিজের সামর্থ্যকে ছোট করে দেখতে পারেন। নতুন কাজ শুরু করা, ঝুঁকি নেওয়া কিংবা ব্যর্থতার পর আবার চেষ্টা করার ক্ষেত্রেও অনীহা তৈরি হতে পারে।

ফলে সমস্যাটি শুধু বাইরের পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; নিজের সম্পর্কে তৈরি হওয়া ধারণাও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।

নিজের সমালোচনা নয়, নিজেকে বোঝার চেষ্টা করুন

ভুল করলে অনেকেই নিজেদের কঠোরভাবে বিচার করেন। সামান্য ব্যর্থতাকে বড় করে দেখেন, অন্যের সঙ্গে তুলনা করেন কিংবা নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেন। অথচ আত্ম-উন্নয়নের জন্য নিজেকে দোষারোপ করার চেয়ে নিজের আচরণ ও চিন্তাভাবনা পর্যবেক্ষণ করা বেশি কার্যকর হতে পারে।

নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—আমি নিজের সম্পর্কে কী বিশ্বাস করি? কোনো কঠিন পরিস্থিতিতে পড়লে নিজেকে কী বলি? অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা কি এখনো আমার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে? আমার চিন্তাভাবনা কি আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে, নাকি পিছিয়ে দিচ্ছে?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হওয়া সহজ হয়। একই সঙ্গে বোঝা যায়, কোন ধারণাগুলো বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে, আর কোনগুলো ভয়, অনুমান কিংবা অতীতের নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে।

নিজেকে বোঝার অর্থ নিজের সব চিন্তাকে সঠিক বলে মেনে নেওয়া নয়। বরং কোন চিন্তা উপকারী, কোনটি অযৌক্তিক এবং কোথায় পরিবর্তন প্রয়োজন—তা নিরপেক্ষভাবে খুঁজে দেখা।

সাফল্য পেলেই কি আত্মবিশ্বাস আসে?

অনেকেই মনে করেন, ভালো চাকরি, পদোন্নতি, অর্থসম্পদ কিংবা মানুষের প্রশংসা অর্জন করতে পারলেই নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ দূর হবে। কিন্তু বাস্তবে বাহ্যিক সাফল্য সব সময় ভেতরের অনিশ্চয়তা দূর করতে পারে না।

কেউ পদোন্নতি পাওয়ার পরও ভাবতে পারেন, তিনি যথেষ্ট ভালো নন। কেউ ভালো আয় করার পরও অন্যের সঙ্গে নিজের তুলনা করে অসন্তুষ্টিতে ভুগতে পারেন। আবার কেউ পুরস্কার বা স্বীকৃতি পাওয়ার পরও আশঙ্কা করতে পারেন, পরবর্তী সময়ে হয়তো আর সফল হতে পারবেন না।

এভাবে নিজের মূল্য প্রমাণের জন্য একের পর এক অর্জনের পেছনে ছুটতে গিয়ে মানসিক চাপ বাড়তে পারে। তখন সাফল্য উপভোগ করার বদলে নতুন কোনো অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে প্রমাণ করাই প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।

এ কারণে লক্ষ্য অর্জনের পাশাপাশি নিজের প্রচেষ্টা, সামর্থ্য ও মূল্যবোধকেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, মানুষের ব্যক্তিগত মূল্য শুধু তার পদ, আয়, জনপ্রিয়তা কিংবা অর্জনের ওপর নির্ভর করে না।

পুরোনো বিশ্বাস কীভাবে অগ্রগতির পথে বাধা হয়

মানুষের অনেক বিশ্বাস তৈরি হয় শৈশব, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক অভিজ্ঞতা কিংবা জীবনের কোনো কষ্টকর ঘটনার মধ্য দিয়ে। ছোটবেলায় বারবার সমালোচনার মুখোমুখি হলে কেউ নিজের সক্ষমতা নিয়ে সন্দিহান হয়ে উঠতে পারেন। আবার কোনো কাজে ব্যর্থ হওয়ার পর কেউ ধরে নিতে পারেন, তিনি আর কখনো সফল হতে পারবেন না।

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এসব ধারণা অভ্যাসের মতো মনের মধ্যে জায়গা করে নিতে পারে। একপর্যায়ে মানুষ সেগুলোকে প্রশ্ন না করেই সত্য বলে ধরে নেন।

কিন্তু অতীতের কোনো অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি হওয়া বিশ্বাস বর্তমানের বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। একসময় ব্যর্থতার ভয় কাউকে সতর্ক থাকতে সাহায্য করলেও পরবর্তী সময়ে সেই ভয় নতুন সুযোগ গ্রহণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তাই নিজের বিশ্বাসগুলো যাচাই করা জরুরি। নিজেকে প্রশ্ন করুন—এই ধারণার পক্ষে বাস্তব প্রমাণ কী? এর বিপরীতে কোনো অভিজ্ঞতা আছে কি? এই বিশ্বাস আমাকে সাহায্য করছে, নাকি অকারণে পিছিয়ে রাখছে? চাইলে নিজের সম্পর্কে আরও বাস্তবসম্মত ও ইতিবাচক কোন ধারণা তৈরি করা সম্ভব?

নিজেকে গ্রহণ করাই পরিবর্তনের শুরু

নিজের সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করার অর্থ নিজেকে ছোট করা নয়। বরং কোথায় উন্নতির সুযোগ রয়েছে, তা বুঝতে পারাই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।

নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, ভুলকে শেখার সুযোগ হিসেবে দেখা এবং ছোট ছোট পদক্ষেপের মাধ্যমে নতুন অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। কোনো কাজে ব্যর্থ হলে নিজেকে অযোগ্য ভাবার পরিবর্তে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে, কোথায় ভুল হয়েছে এবং পরবর্তীবার কীভাবে আরও ভালো করা সম্ভব।

একই সঙ্গে নিজের অনুভূতি ও প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। সব সময় অন্যকে সন্তুষ্ট করা কিংবা নিজেকে প্রমাণ করার চাপে থাকলে মানসিক ক্লান্তি তৈরি হতে পারে। প্রয়োজনে বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে কথা বলা বা মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়াও উপকারী হতে পারে।

জীবন বদলাতে ছোট পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ

নিজের মানসিকতা পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের বিশ্বাস ও অভ্যাস বদলাতে সময় লাগতে পারে। তবে নিয়মিত আত্মপর্যালোচনা এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিবর্তনের পথ তৈরি করা যায়।

যেমন, কোনো কাজ শুরু করার আগে ‘আমি পারব না’ ভাবার পরিবর্তে বলা যেতে পারে, ‘আমি এখনো পুরোপুরি জানি না, তবে শিখতে পারি।’ কোনো ব্যর্থতার পর নিজেকে অযোগ্য ভাবার বদলে সেই অভিজ্ঞতা থেকে কী শেখা গেল, তা খুঁজে দেখা যেতে পারে।

এ ধরনের পরিবর্তন সমস্যাকে অস্বীকার করা নয়; বরং নিজের সামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা তৈরি করা। পাশাপাশি শুধু ইতিবাচক চিন্তা করলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে—এমন ধারণাও ঠিক নয়। অর্থনৈতিক অবস্থা, সামাজিক সুযোগ, পারিবারিক দায়িত্ব ও অন্যান্য বাস্তব পরিস্থিতিও মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে নিজের চিন্তাভাবনা ও আচরণ সম্পর্কে সচেতন হলে যেসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা সম্ভব, সেসব ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতে পারে।

জীবন বদলাতে তাই শুধু নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ কিংবা আরও বেশি পরিশ্রম করাই যথেষ্ট নয়। নিজের সম্পর্কে কী ভাবছি, কোন বিশ্বাস আমাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে এবং কোন অভ্যাস আমাদের এগিয়ে যেতে সাহায্য করছে—সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কখনো কখনো পরিবর্তনের প্রথম পদক্ষেপ নতুন কিছু শুরু করা নয়; বরং নিজের সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করে আসা কোনো ধারণাকে নতুন করে প্রশ্ন করা। সেখান থেকেই তৈরি হতে পারে নিজেকে আরও ভালোভাবে বোঝার এবং নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ।

কালের আলো/জেএন/এসএ