সামনে ড্রোন, চারপাশে মৃত্যু; রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের বাঁচার আকুতি
অর্থ উপার্জন করে পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন রাজন। কিন্তু প্রায় ১০ মাসের অভিজ্ঞতায় সেই স্বপ্নের জায়গা নিয়েছে আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা আর দেশে ফেরার আকুতি। এখন তাঁর সবচেয়ে বড় চাওয়া, প্রাণে বেঁচে এক দিন নিরাপদে আপনজনদের কাছে ফিরে যাওয়া।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রাজন জানিয়েছেন, যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর আগের ধারণা ছিল না। তাঁর ভাষায়, নিজের সিদ্ধান্তে যাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন, তাঁদের অনেকেই বুঝতে পারেননি পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। একই অভিজ্ঞতার কথা বলছেন আহমেদ নামের আরেক বাংলাদেশি তরুণ। অর্থের আশায় স্বেচ্ছায় রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিলেও এখন তাঁর উপলব্ধি, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে নিজের জীবনই পড়েছে চরম ঝুঁকিতে।
- ‘এখানে নিরাপদ জায়গা নেই’—যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জানিয়ে দেশে থাকা স্বজনদের কাছে ফিরতে চাইছেন বাংলাদেশি তরুণেরা
- কেউ হারিয়েছেন সহযোদ্ধা, কেউ জানেন না নিজের পরিণতি
- অসহনীয় জীবন আর প্রিয়জনের কাছে ফেরার আকুতিতে ভারী তাঁদের কণ্ঠ
আহমেদের বক্তব্য, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিটি দিন কাটে মৃত্যুভয় নিয়ে। ঘুম, বিশ্রাম কিংবা আগামীকাল বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা—কোনোটিই সেখানে স্বাভাবিক জীবনের মতো নয়। দেশে থাকা পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধে গেলেও শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন ও পরিবারের ভবিষ্যৎ দুটিই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
চাকরি ও মোটা অঙ্কের বেতনের প্রলোভনে রাশিয়ায় গিয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন বাংলাদেশিরা
রাজন ও আহমেদের অভিজ্ঞতা রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি তরুণদের একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তাঁদের কেউ গিয়েছেন স্বেচ্ছায়, কেউ বিদেশে চাকরির আশ্বাসে, আবার কেউ মধ্যস্থতাকারীদের প্রতারণার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছানোর পর অনেকেরই সামনে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা—যেখানে অর্থের প্রতিশ্রুতির চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
তিন পথে রাশিয়ায়, শেষ গন্তব্য যুদ্ধক্ষেত্র
রাশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের বক্তব্য অনুযায়ী, মূলত তিন ধরনের পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি তরুণেরা রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছেন। একদল অর্থ উপার্জনের আশায় স্বেচ্ছায় যুদ্ধে যোগ দিচ্ছেন। তাঁদের কাছে রাশিয়ায় যাওয়ার প্রধান আকর্ষণ মোটা অঙ্কের বেতন, এককালীন অর্থপ্রাপ্তি এবং ভবিষ্যতে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে অনেকেই বুঝতে পারছেন, উচ্চ আয়ের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে রয়েছে প্রাণ হারানোর গুরুতর ঝুঁকি।
দ্বিতীয় দলের তরুণদের অভিযোগ, তাঁদের অন্য ধরনের চাকরির কথা বলে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে বিভিন্ন কৌশলে বা চাপ প্রয়োগ করে সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে। তাঁরা বলছেন, বিদেশে কাজের সন্ধানে গিয়ে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দানে পৌঁছানোর বিষয়টি তাঁদের প্রত্যাশার বাইরে ছিল।
তৃতীয় দলটি বিভিন্ন প্রলোভনমূলক প্রচারণায় আকৃষ্ট হয়ে রাশিয়ায় গিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে যুদ্ধের বিনিময়ে বিপুল অর্থ, গাড়ি-বাড়ি এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বসবাসের সুযোগ পাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এ ধরনের প্রচারণা তরুণদের কাছে যুদ্ধকে আর্থিক উন্নতির একটি দ্রুত পথ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। কিন্তু যাঁরা বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন, তাঁদের অনেকের বক্তব্য সেই ছবির সঙ্গে মেলে না।
৪০ লাখ টাকার গল্পের আড়ালে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে রাশিয়ায় অবস্থানরত এক বাংলাদেশি তরুণ দাবি করেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েই তিনি বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪০ লাখ টাকা পেয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে উচ্চ বেতন ও আর্থিক সুবিধার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
এ ধরনের ভিডিওতে অর্থ উপার্জন ও জীবন বদলে যাওয়ার গল্প তরুণদের আকৃষ্ট করতে পারে। বিশেষ করে বেকারত্ব, পারিবারিক দায়বদ্ধতা এবং দ্রুত আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা যাঁদের মধ্যে প্রবল, তাঁদের কাছে এসব প্রতিশ্রুতি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু এসব ভিডিওতে দেখানো অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা কতটা বাস্তব, সেগুলোর সঙ্গে কী ধরনের চুক্তি ও দায়িত্ব যুক্ত এবং যুদ্ধে অংশ নেওয়ার ঝুঁকি কতটা—এসব প্রশ্নের উত্তর সব সময় স্পষ্ট থাকে না।
রাজনের অভিযোগ, সোহেল সরদার নীরব নামে এক ব্যক্তি রাশিয়ায় গিয়ে অর্থ ও সম্মান পাওয়ার কথা তুলে ধরে ভিডিও তৈরি করছেন এবং সেগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তাঁর দাবি, এ ধরনের প্রচারণা তরুণদের যুদ্ধের প্রতি আগ্রহী করে তুলছে।
অভিযোগের বিষয়ে সোহেল সরদার নীরবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাইও পাওয়া যায়নি।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ব্যক্তি যুদ্ধের বিনিময়ে অর্থ পেয়েছেন—এমন দাবি সত্য হলেও তা সামগ্রিক পরিস্থিতির নিরাপদ হওয়ার প্রমাণ নয়। একজনের আর্থিক সুবিধার অভিজ্ঞতা অন্যদের জন্য একই পরিণতির নিশ্চয়তা দেয় না। যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণহানি, গুরুতর আহত হওয়া, নিখোঁজ হওয়া কিংবা প্রতিশ্রুত অর্থ না পাওয়ার ঝুঁকিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
‘প্রতি পাঁচ মিনিটে তিন-চারটি ড্রোন’
যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা এক বাংলাদেশি তরুণের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি জানান, তিনি তখন সম্মুখযুদ্ধের এলাকায় অবস্থান করছিলেন। তাঁর দাবি, প্রতি পাঁচ মিনিটে তিন-চারটি ড্রোন আসছিল, যেগুলো গুলি করে ভূপাতিত করা অত্যন্ত কঠিন।
ওই তরুণ আরও জানান, একটি এজেন্সির মাধ্যমে প্রতারিত হয়ে সাতজন বাংলাদেশি যুদ্ধে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। নিহতদের পরিচয় হিসেবে তিনি মাদারীপুরের সরজি কাজি, কুমিল্লার ইউসুফ খান ও কিশোরগঞ্জের জাহাঙ্গীর হোসেনের নাম উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কয়েকটি এজেন্সি বাংলাদেশিদের অন্য কাজের কথা বলে রাশিয়ায় পাঠাচ্ছে। পরে তাঁদের সেনাবাহিনীতে যুক্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ বিষয়ে আল মনোয়ারা এজেন্সি ও আরাফাত এজেন্সিসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ওই তরুণ আরিফ চৌধুরী ও জালাল পাটোয়ারী নামের দুই ব্যক্তির কথাও উল্লেখ করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর স্বাধীন তদন্তের তথ্যও এখানে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও দাবি করেন, রাশিয়ায় লোক পাঠানোর বিনিময়ে মধ্যস্থতাকারীরা বড় অঙ্কের অর্থ পান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একজনকে পাঠানোর বিনিময়ে ৫ লাখ ৮০ হাজার রুবল পর্যন্ত দেওয়া হয়। তবে এই অর্থপ্রাপ্তির দাবিও স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
অভিযোগগুলো সত্য হলে বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে মানুষকে যুদ্ধের ঝুঁকিতে ঠেলে দেওয়ার গুরুতর প্রশ্ন সামনে আসে। তাই এ ধরনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, নিয়োগচুক্তি, ভিসার ধরন এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাই করে তদন্ত করা জরুরি।
বেতন নয়, এখন অর্থ হারানোর ভয়ও
যে অর্থের আশায় অনেকে রাশিয়ায় গিয়েছেন, সেই অর্থ পাওয়া নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। কয়েকজন বাংলাদেশির অভিযোগ, রুশ কমান্ডাররা তাঁদের কাছ থেকে জোর করে অর্থ নিয়ে নিচ্ছেন।
রাজন দাবি করেছেন, তাঁর প্রায় ১০ লাখ রুবল একজন কমান্ডার নিয়ে নিয়েছেন। তিনি এই অর্থের মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় এক কোটি টাকা বলে উল্লেখ করেছেন। তবে অর্থের পরিমাণ ও অভিযোগের স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।
অর্থ উপার্জনের জন্য বিদেশে গিয়ে যদি কেউ নিজের উপার্জন ধরে রাখতে না পারেন, তাহলে তাঁর যাওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ সীমিত থাকলে অর্থ ফেরত চাওয়া বা অভিযোগ জানানোর পথও কঠিন হতে পারে—এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন সেখানে থাকা বাংলাদেশিরা।
তাঁদের বক্তব্যে আরও উঠে এসেছে তীব্র শীত, খাবারের কষ্ট, গোসলের সীমিত সুযোগ এবং প্রতিনিয়ত ড্রোন হামলার ভয়। কেউ কেউ দাবি করেছেন, দুই দিনে একবার গোসলের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে ১৫ দিনেও গোসলের সুযোগ পাওয়া যায় না।
এসব অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, বিদেশে উচ্চ আয়ের প্রতিশ্রুতি বিবেচনার সময় শুধু বেতনের অঙ্ক দেখলেই চলে না। কাজের প্রকৃতি, চুক্তির শর্ত, নিরাপত্তা, নিয়োগকর্তার পরিচয় এবং চাকরি ছেড়ে দেশে ফেরার সুযোগ সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে পরিবার
যুদ্ধে যাওয়া বাংলাদেশিদের একটি অংশের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের স্বজনেরা জানিয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের পোস্টে উঠে এসেছে অপেক্ষা, উদ্বেগ এবং প্রিয়জনের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলার কষ্ট।
উম্মে শাহজাদি তাঁর স্বামীর খোঁজ চেয়ে পোস্ট দিয়েছেন। আহমেদ সোহেল খুঁজছেন তাঁর মামাতো ভাই নয়নকে। ইব্রাহিম শান্ত জানিয়েছেন, তাঁর বোনজামাই ছয় মাস ধরে রাশিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন।
তানজিনা ইসলাম জানিয়েছেন, তাঁর স্বামী ফেব্রুয়ারিতে সম্মুখযুদ্ধে যাওয়ার পর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। শামী নামের আরেকজন তাঁর ভাই রুবেলের খোঁজ চেয়েছেন। কিশোরগঞ্জের ফায়জুলও নিখোঁজ রয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে এসব পোস্টের ভিত্তিতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মোট সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাঁদের কেউ নিহত হয়েছেন, কেউ আটক হয়েছেন, নাকি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছেন—প্রতিটি ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।
পরিবারের জন্য এই অনিশ্চয়তা আরও কঠিন হয়ে ওঠে যখন তাঁরা জানেন না, স্বজন কোথায় আছেন বা আদৌ জীবিত আছেন কি না। যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা এবং মরদেহ শনাক্ত করার জটিলতা এই সংকটকে আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কতজন বাংলাদেশি যুদ্ধে, সঠিক হিসাব নেই
বাংলাদেশ থেকে কতজন রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন এবং তাঁদের মধ্যে কতজন নিহত, আহত বা নিখোঁজ হয়েছেন—তার নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৭১০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় গেছেন। গত ২০ বছরের মধ্যে এক বছরে এই সংখ্যা সর্বোচ্চ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৮ হাজার ৬১৮ জন বাংলাদেশি বৈধভাবে রাশিয়ায় গেছেন। অন্যদিকে, গত ৯ জুন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, রাশিয়ায় প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন।
তবে এসব সংখ্যা রাশিয়ায় যাওয়া বা কর্মরত বাংলাদেশিদের হিসাব; তাঁদের সবাই যে যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, এমন নয়। কতজন বাংলাদেশি রুশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন, তার আলাদা সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি।
পুলিশের গোয়েন্দা সূত্রের ধারণা, গত চার বছরে রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে ৫০ জনের বেশি বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। তবে এই সংখ্যা সম্পর্কেও পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই বা নিহতদের একটি নিশ্চিত সরকারি তালিকা পাওয়া যায়নি। ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর পর দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। এই সংঘাতের মধ্যে বিদেশি নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়টি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও উদ্বেগের কারণ হয়েছে। বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বিদেশে কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে যাওয়া এবং সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা বিশেষভাবে জরুরি।
বিদেশে যাওয়ার আগে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা দরকার
রাশিয়ায় যাওয়া সব বাংলাদেশি যে যুদ্ধে যোগ দিচ্ছেন, এমন কোনো তথ্য নেই। বৈধভাবে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো ব্যক্তিদের আলাদা করে দেখতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার আগে যথাযথ তদন্তও প্রয়োজন। তবে যুদ্ধরত বাংলাদেশিদের অভিজ্ঞতা বিদেশে চাকরির প্রস্তাব যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা সামনে এনেছে।
চাকরির প্রকৃতি: চুক্তিতে কী কাজের কথা বলা হয়েছে এবং বাস্তবে সেই কাজই করতে হবে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। নিয়োগকর্তা ও মধ্যস্থতাকারী: প্রতিষ্ঠানটির পরিচয়, নিবন্ধন এবং বিদেশে কর্মী পাঠানোর অনুমোদন যাচাই করতে হবে। চুক্তি ও অর্থপ্রাপ্তি: বেতন, এককালীন অর্থ, অন্যান্য সুবিধা এবং চাকরি ছাড়ার শর্ত লিখিতভাবে বুঝে নেওয়া প্রয়োজন।
নিরাপত্তা ও দেশে ফেরার সুযোগ: কাজের সঙ্গে সামরিক দায়িত্ব বা যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার কোনো শর্ত যুক্ত আছে কি না, তা স্পষ্ট করা জরুরি। পরিবারকে তথ্য দেওয়া: কোথায় যাচ্ছেন, কার অধীনে কাজ করবেন এবং কী ধরনের চুক্তিতে যাচ্ছেন—এসব তথ্য পরিবারের কাছে রাখা প্রয়োজন। বিদেশে কাজের সন্ধান করা অনেক পরিবারের আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। তাই উচ্চ আয়ের প্রতিশ্রুতিকে এককভাবে দোষারোপ না করে, সেই প্রতিশ্রুতির সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ চাওয়া—নিরাপদে দেশে ফেরা
রাজন ও আহমেদের বক্তব্যে এখন আর বড় বাড়ি, গাড়ি কিংবা বিপুল অর্থের স্বপ্ন মুখ্য নয়। তাঁদের কথায় ফিরে ফিরে আসছে বেঁচে থাকার আকুতি এবং পরিবারের কাছে ফেরার ইচ্ছা। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা এই তরুণেরা অন্যদের সতর্ক করে বলছেন, শুধু অর্থের প্রলোভনে কিংবা মধ্যস্থতাকারীর আশ্বাসে রাশিয়ায় যুদ্ধে যোগ দেওয়া উচিত নয়। তাঁদের অভিজ্ঞতায়, সেখানে নিরাপদ থাকার নিশ্চয়তা নেই; এমনকি বিপদে পড়লে দেশে ফেরার পথও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই সংকটের মানবিক দিকটি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁদের পরিবার, নিখোঁজ স্বজনদের অপেক্ষায় থাকা মানুষ এবং অর্থের আশায় বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া তরুণেরাও এর সঙ্গে যুক্ত। রাশিয়ায় যুদ্ধরত বাংলাদেশিদের সঠিক সংখ্যা, নিহত ও নিখোঁজের হিসাব এবং প্রতারণার অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তথ্য সামনে আনা তাই গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থানের নামে কাউকে সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। কারণ, যে তরুণ পরিবারকে ভালো রাখার আশায় বিদেশে যান, তাঁর নিরাপদে ফিরে আসাটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাজন ও আহমেদের মতো তরুণদের অভিজ্ঞতা সেই বাস্তবতাই মনে করিয়ে দেয়—বড় অঙ্কের আয়ের প্রতিশ্রুতি কখনোই জীবনের নিরাপত্তার বিকল্প হতে পারে না।
কালের আলো/টিইকে/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array