খুঁজুন
                               
, ,
           

অবহেলায় ধ্বংসের পথে বারুহাসের প্রাচীন মসজিদ ও ইমামবাড়ি

সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ
অবহেলায় ধ্বংসের পথে বারুহাসের প্রাচীন মসজিদ ও ইমামবাড়ি

সিরাজগঞ্জের চলনবিলের বুকজুড়ে ছড়িয়ে আছে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর নানা কিংবদন্তি। এই জনপদের কোথাও দাঁড়িয়ে আছে দেড়শ বছরের পুরোনো তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ, কোথাও আবার ধ্বংসস্তূপ আর লতাপাতার আড়ালে হারিয়ে যেতে বসেছে কয়েকশ বছরের ঐতিহাসিক ইমামবাড়ি। একসময় ধর্মীয় সাধনা ও ইসলাম প্রচারের স্মৃতিবিজড়িত এসব স্থাপনা আজ সংরক্ষণের অভাবে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।

তাড়াশ উপজেলার বারুহাস গ্রামের পশ্চিমপাড়ার চৌধুরীপাড়ায় অবস্থিত দেল মাহমুদ চৌধুরী জামে মসজিদ, যা স্থানীয়ভাবে চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদ নামে পরিচিত। ১৮৭৫ সালে নির্মিত এই মসজিদ প্রায় দেড়শ বছর ধরে এলাকার ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য বহন করছে। অন্যদিকে, শাহ ইমাম (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত বারুহাস ইমামবাড়ির অধিকাংশ স্থাপনা ইতিমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। অবশিষ্ট অংশেও দেখা দিয়েছে জীর্ণতার ছাপ। স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও সরকারি উদ্যোগের অভাবে ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে। তাঁদের দাবি, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে চলনবিল অঞ্চলের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কেবল লোককথা হয়েই থেকে যাবে।

দেড়শ বছরের পুরোনো তিন গম্বুজ মসজিদ

বারুহাস গ্রামের পশ্চিমপাড়ার চৌধুরীপাড়ায় অবস্থিত দেল মাহমুদ চৌধুরী জামে মসজিদটি ১৮৭৫ সালে নির্মিত হয় বলে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো এই স্থাপনা এখনো এলাকার মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের কেন্দ্র। পাশাপাশি প্রাচীন স্থাপত্য দেখতে দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ এখানে আসেন। মসজিদটির নির্মাণশৈলীতে মোগল আমলের স্থাপত্যরীতির ছাপ রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। চুন-সুরকির গাঁথুনি, পুরু দেয়াল, তিনটি বড় গম্বুজ এবং পোড়ামাটির নকশা এর স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরে। ছাদের ওপর তিনটি গম্বুজের পাশাপাশি আটটি পিলারের ওপর রয়েছে তিনটি বড় মিনার ও পাঁচটি ছোট মিনার। কাঠের তৈরি তিনটি দরজাও বহন করছে পুরোনো নির্মাণশৈলীর স্মৃতি।

প্রায় চার শতক জায়গার ওপর নির্মিত মসজিদটির ভেতরের অংশ তুলনামূলক ছোট। প্রতি সারিতে প্রায় ২০ জন করে তিন সারিতে ৬০ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বাইরে খোলা বারান্দায় আরও দুই সারিতে নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। ভেতরের দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের অলংকরণ ও কারুকাজ দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মসজিদের দক্ষিণ পাশে রয়েছে চৌধুরী পরিবারের পুরোনো বাড়ি ও পারিবারিক কবরস্থান। আশপাশের ভদ্রাবতী নদী ও খালের পরিবেশ স্থাপনাটিকে দিয়েছে আলাদা সৌন্দর্য। সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও মসজিদটি ধর্মীয় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থাকায় এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধরে রেখেছেন স্থানীয়রা

বারুহাস গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, ১৮৭৫ সালে তাঁদের পূর্বপুরুষ দেল মাহমুদ চৌধুরী মসজিদটি নির্মাণ করেন। পূর্বপুরুষদের মতো তাঁরাও এখানে নামাজ আদায় করছেন। সরকারি উদ্যোগে মসজিদটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারবে। মসজিদ কমিটির সভাপতি মো. নাছিম চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদ খন্দকার বলেন, মসজিদটি তাঁদের গ্রামের ঐতিহ্য ও গর্বের বিষয়। সরকারি অনুদান পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও মেরামতের কাজ করা সম্ভব হবে।

মসজিদের বর্তমান ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা মো. খবির উদ্দিন জানান, তিনি ৩১ বছর ধরে এই মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর ভাষ্য, শুক্রবার জুমার নামাজের দিন মসজিদ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালন করতে পেরে তিনি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেন। স্থানীয়দের মতে, নিয়মিত ধর্মীয় কার্যক্রম চালু থাকলেও মসজিদটির ঐতিহাসিক স্থাপত্য রক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। সংস্কারের ক্ষেত্রে মূল নকশা, পুরোনো নির্মাণসামগ্রী ও অলংকরণের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

জৌলুস হারিয়েছে প্রায় ৫০০ বছরের ইমামবাড়ি

বারুহাসের আরেক ঐতিহাসিক নিদর্শন শাহ ইমাম (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ইমামবাড়ি। স্থানীয় লোককথা ও ইতিহাস অনুযায়ী, মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে এই স্থাপনা ও এর আশপাশের এলাকা ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ইয়েমেন থেকে আগত সুফি-সাধক হযরত শাহ ইমাম (রহ.) চলনবিলের বারুহাস এলাকায় বসতি স্থাপন করে ইসলাম প্রচার করেন। পরবর্তী সময়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর বাংলা পরিদর্শনে এসে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। শাহ ইমামের ইবাদত ও বসবাসের সুবিধার্থে কয়েকটি পাকা ঘর নির্মাণ এবং একটি পুকুর খননের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেও প্রচলিত রয়েছে। পাশাপাশি ইসলাম প্রচারের জন্য তাঁকে করমুক্ত জমি দেওয়ার কথাও স্থানীয় ইতিহাসে পাওয়া যায়।

এই স্থাপনাগুলোকে ঘিরেই গড়ে ওঠে বারুহাস ইমামবাড়ি। তবে এর সুনির্দিষ্ট নির্মাণকাল সম্পর্কে পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক তথ্য নেই। স্থানীয়ভাবে এটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরোনো নিদর্শন হিসেবে পরিচিত হলেও এর বয়স ও ইতিহাস নির্ভরযোগ্য নথি ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একসময় ইমামবাড়ি এলাকায় মসজিদসহ একাধিক স্থাপনা ছিল বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দারা। বর্তমানে সেগুলোর অধিকাংশই বিলুপ্ত। টিকে থাকা পুরোনো স্থাপনাগুলোর দেয়ালের আস্তর খসে পড়ছে। ইট-সুরকির গাঁথুনিতে জন্মেছে লতাপাতা ও গাছগাছালি। নষ্ট হয়ে গেছে স্থাপনার অনেক কারুকাজ। একসময়ের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্থানটি এখন কার্যত অবহেলিত।

পুকুর ও জমি দখলের অভিযোগ

ইমামবাড়ির আশপাশে রয়েছে পুরোনো সমাধি ও একটি বড় পুকুর। স্থানীয়দের অভিযোগ, পুকুর ও সংশ্লিষ্ট জমির কিছু অংশ বেদখল হয়ে গেছে। তাঁদের দাবি, জমির প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে দখলসংক্রান্ত অভিযোগ যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি অবশিষ্ট স্থাপনাগুলো সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। স্থানীয় বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, ইমামবাড়ির অধিকাংশ স্থাপনা এখন আর নেই। সমাধির সামনের প্রায় সাড়ে আট বিঘা আয়তনের পুকুরটিও দখলের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি উদ্যোগে জমি উদ্ধার ও স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ করা হলে এলাকার ইতিহাস রক্ষা পাবে।

স্থানীয়ভাবে ইমামবাড়ির দেখভালের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান নেই বলে জানা গেছে। তবে আশপাশের বাসিন্দা মো. কাবুল সরকার ও রেজা (ফারুক) মেম্বারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয়রা স্থাপনাটির স্মৃতি সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। স্থানীয়দের মতে, অবশিষ্ট স্থাপনা ও জমির বর্তমান অবস্থা নিরূপণ, সীমানা চিহ্নিতকরণ এবং দখলের অভিযোগ যাচাইয়ের মাধ্যমে সংরক্ষণকাজ শুরু করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি স্থাপনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব নির্ধারণে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।

বারুহাসের নামকরণ ঘিরেও রয়েছে নানা জনশ্রুতি

বারুহাসের পরিচয় কেবল প্রাচীন মসজিদ ও ইমামবাড়িতে সীমাবদ্ধ নয়। গ্রামটির নামকরণ নিয়েও প্রচলিত রয়েছে নানা জনশ্রুতি। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, নায়েব শেখ বাহারউদ্দিন ‘বারু শেখ’ নামে পরিচিত ছিলেন। তাঁর নাম থেকেই বারুহাস নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। স্থানীয় ইতিহাসে আরও বলা হয়, প্রায় পাঁচশ বছর আগে ইয়েমেন থেকে আগত শেখ বংশের লোকজন ভদ্রাবতী নদীর তীরবর্তী এলাকায় বসতি স্থাপন করেন। চলনবিলের উর্বর ভূমি ও নদীপথের যোগাযোগ এই জনপদের বিকাশে ভূমিকা রাখে। মোগল আমলে শাহ ইমামকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের প্রসার ঘটেছিল বলেও স্থানীয়দের বিশ্বাস।

এলাকাটিতে জমিদারবাড়ি, পুরোনো মসজিদ, ইমামবাড়ি ও বেহুলার কূপের মতো বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থানের কথাও প্রচলিত রয়েছে। এসব নিদর্শনকে ঘিরে প্রতিবছর আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী বারুহাস মেলা, যা স্থানীয় সংস্কৃতি ও জনজীবনের সঙ্গে যুক্ত। তবে লোককথা, স্থানীয় স্মৃতি ও নথিভিত্তিক ইতিহাসের মধ্যে পার্থক্য নিরূপণ করে এসব স্থানের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ করাও জরুরি। তা না হলে স্থাপনাগুলোর পাশাপাশি এগুলো ঘিরে থাকা ঐতিহাসিক তথ্য ও জনশ্রুতির অনেক অংশও হারিয়ে যেতে পারে।

সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানাল প্রশাসন

এলাকাবাসীর দাবি, প্রথমে ইমামবাড়ির অবশিষ্ট স্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট জমির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করতে হবে। এরপর জরিপের মাধ্যমে জমির সীমানা চিহ্নিত করে দখলসংক্রান্ত অভিযোগ যাচাই এবং স্থাপনাগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিরূপণ করা প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করার পাশাপাশি চৌধুরীবাড়ি জামে মসজিদের মূল স্থাপত্য অক্ষুণ্ণ রেখে সংস্কার ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও চান তাঁরা। তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো অতীত ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ধারক ও বাহক। এগুলো শুধু ইট-পাথরের স্থাপনা নয়; বরং পূর্বপুরুষদের শিল্পবোধ, স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহাসিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। দীর্ঘদিন ধরে এসব স্থাপনা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষ্য বহন করে আসছে। তাই এগুলো সংরক্ষণ করা সবার দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন, বারুহাসের ঐতিহাসিক ইমামবাড়ি ও তিন গম্বুজ মসজিদের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে মসজিদটির ইতিহাস, নির্মাণশৈলী ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি স্থাপনাটির বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রেখে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যাওয়ার আগে উদ্যোগ জরুরি

বারুহাসের প্রাচীন মসজিদ ও ইমামবাড়ি কেবল ধর্মীয় স্থাপনা নয়, চলনবিল অঞ্চলের অতীত জনজীবন, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও অংশ। একদিকে দেড়শ বছরের পুরোনো মসজিদে এখনো নিয়মিত নামাজ আদায় হচ্ছে, অন্যদিকে কয়েকশ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী ইমামবাড়ির অধিকাংশ স্থাপনা হারিয়ে গেছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

পর্যটনের স্বপ্ন দেখছে চলনবিল, কিন্তু হারাচ্ছে নিজের প্রাণ

নাটোর সংবাদদাতা
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০৭ অপরাহ্ণ
পর্যটনের স্বপ্ন দেখছে চলনবিল, কিন্তু হারাচ্ছে নিজের প্রাণ

বর্ষায় দিগন্তজোড়া জলরাশি, ভেসে চলা নৌকা আর আকাশভরা মেঘ। শরতে নীল আকাশের প্রতিবিম্ব পড়ে বিলের পানিতে, হেমন্তে বিলপাড়জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে পাকা ধানের সোনালি আভা। শীতের সকালে কুয়াশার চাদর ভেদ করে ভেসে আসে অতিথি পাখির ডাক। ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় চলনবিলের রূপ, কিন্তু প্রকৃতির এই বিশাল জলাভূমির আকর্ষণ ফুরায় না।

নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা চলনবিল দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, মৎস্য আহরণ, নৌচলাচল ও জলজ সম্পদের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকার অংশ। এখন এই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নতুন সম্ভাবনা—প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন। পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে চলনবিল হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন অঞ্চল। তৈরি হতে পারে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, বাড়তে পারে গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পথে রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ। নদী-খাল ভরাট, জলাভূমি দখল, পলি জমা, পানিপ্রবাহে বাধা এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ চলনবিলের স্বাভাবিক চরিত্র বদলে দিচ্ছে। ফলে পর্যটনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগে সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে বিলের প্রকৃতি, পানি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা।

ঋতু বদলায়, বদলায় চলনবিলের সৌন্দর্য

চলনবিল কোনো একক জলাশয় নয়। নদী, খাল, ছোট-বড় বিল এবং বিস্তীর্ণ জলাভূমি মিলিয়ে এটি একটি বৃহৎ প্রাকৃতিক ব্যবস্থা। আত্রাই, বড়াল, গুমানীসহ বিভিন্ন নদ-নদী ও খাল এই অঞ্চলের জলপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত। বর্ষায় বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ভরে উঠলে তৈরি হয় এক অনন্য জলজ ভূদৃশ্য।

নৌকায় চলতে চলতে কখনো মনে হয় নদীপথ ধরে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আবার কখনো চারপাশের জলরাশি চোখে তৈরি করে সীমাহীন জলরাজ্যের অনুভূতি। কোথাও জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা, কোথাও নৌকার সারি, আবার কোথাও বিলের পানির সঙ্গে মিশে থাকা গ্রামের দৃশ্য—সব মিলিয়ে চলনবিলের নিজস্ব সৌন্দর্য রয়েছে। শুধু বর্ষাকাল নয়, বছরের অন্য সময়েও এ অঞ্চলের প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করে। শরৎ ও হেমন্তে জল, আকাশ, ফসলি জমি এবং গ্রামীণ জীবনের দৃশ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। শীতকালে পাখি ও জলাভূমির পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং গ্রামীণ জীবন কাছ থেকে দেখার সুযোগও তৈরি হতে পারে। এই বৈচিত্র্যই চলনবিলের পর্যটন সম্ভাবনার বড় ভিত্তি। এখানে কৃত্রিম বিনোদনকেন্দ্রের চেয়ে প্রকৃতি, জলপথ ও স্থানীয় জীবনযাত্রাকে কেন্দ্র করে পর্যটন গড়ে তোলার সুযোগ বেশি।

পর্যটন হতে পারে স্থানীয় অর্থনীতির নতুন ভরসা

পরিকল্পিত পর্যটন চালু হলে চলনবিলের আশপাশের মানুষের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নিরাপদ নৌভ্রমণ, স্থানীয় গাইডের সেবা, বিলের মাছ দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী খাবার, কৃষিপণ্য বিক্রি, হস্তশিল্প এবং লোকসংস্কৃতিকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারে ছোট ছোট ব্যবসা। স্থানীয় তরুণেরা প্রশিক্ষণ নিয়ে নৌভ্রমণের গাইড, পর্যটন সহায়ক কিংবা পরিবেশ পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করতে পারেন। গ্রামের পরিবারগুলো নিজেদের তৈরি খাবার, স্থানীয় পণ্য ও হস্তশিল্প বিক্রির মাধ্যমে আয় করতে পারে। স্থানীয় লোকগান, গ্রামীণ উৎসব ও ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রাকে পরিচিত করার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলো, পর্যটন থেকে অর্জিত আয়ের একটি বড় অংশ যেন স্থানীয় মানুষের কাছে পৌঁছায়। বাইরের উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিলপাড়ের বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে পর্যটন কেবল দর্শনার্থী আকর্ষণের উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারবে। তবে পর্যটনকে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য আগে প্রয়োজন পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। শুধু পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানো নয়, তাঁদের ভ্রমণ যেন স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে ইতিবাচকভাবে যুক্ত হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

দখল, ভরাট ও পানিপ্রবাহের বাধায় বদলে যাচ্ছে বিল

পর্যটনের সম্ভাবনার বিপরীতে চলনবিলের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় নদী-খাল ভরাট, পলি জমা, জলাভূমি দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং নির্বিচারে পুকুর খননের মতো কর্মকাণ্ড পানির স্বাভাবিক প্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর জালের ব্যবহার এবং জলজ উদ্ভিদের অস্বাভাবিক বিস্তারও কিছু এলাকায় মাছের আবাসস্থল ও নৌচলাচলের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।

পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে তার প্রভাব পড়ে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন এবং জলাভূমির জীববৈচিত্র্যের ওপর। কোথাও বর্ষার পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকতে পারে, আবার কোথাও শুষ্ক মৌসুমে নদী-খাল পানিশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। এ ধরনের পরিবর্তন চলনবিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের আকর্ষণকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। জলাভূমির স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে শুধু পর্যটন নয়, এই অঞ্চলের মানুষের ঐতিহ্যবাহী জীবন-জীবিকাও চাপে পড়ে। তাই চলনবিলের পরিবেশগত সমস্যা সমাধানকে পর্যটন উন্নয়নের বাইরের কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং পরিবেশ রক্ষাই হওয়া উচিত পর্যটন পরিকল্পনার প্রথম শর্ত।

পর্যটনের নামে নতুন সংকট তৈরি করা যাবে না

পর্যটন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে গিয়ে যদি বিলপাড়ে অপরিকল্পিত কংক্রিটের স্থাপনা গড়ে ওঠে, প্লাস্টিক বর্জ্য জমে, শব্দদূষণ বাড়ে কিংবা নির্বিচারে মোটরচালিত নৌযান চলাচল শুরু হয়, তাহলে পর্যটনের উন্নয়নই একসময় পরিবেশের জন্য নতুন হুমকি হয়ে উঠতে পারে। পর্যটকদের চাপ সামলাতে গিয়ে পাখির আবাসস্থল, মাছের প্রজননক্ষেত্র ও জলজ উদ্ভিদের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে চলনবিলের সেই স্বাভাবিক সৌন্দর্যই হারিয়ে যাবে, যা মানুষকে এখানে টানতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও জীবিকার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তাই চলনবিলে পর্যটন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রকৃতিনির্ভর পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোথায় নৌভ্রমণ করা যাবে, কোথায় পর্যটকদের প্রবেশ সীমিত রাখা প্রয়োজন, কীভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হবে এবং কোন এলাকাগুলো জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা দরকার। পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ ও প্রাকৃতিক চরিত্র যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ, শব্দদূষণ কমানো এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।

নৌপথ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে ঘিরে পরিকল্পনা

চলনবিলের পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রথমেই প্রয়োজন নির্দিষ্ট ও নিরাপদ নৌপথ চিহ্নিত করা। নৌযানের নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট, প্রশিক্ষিত চালক, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ঘাট নিশ্চিত করা জরুরি। এর পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন বিশ্রামস্থল, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের ব্যবস্থা, বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণ এবং পর্যটকদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গাইড হিসেবে যুক্ত করলে পর্যটকেরা চলনবিলের ইতিহাস, প্রকৃতি, কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও গ্রামীণ সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবেন।

পর্যটনের পরিকল্পনায় স্থানীয় খাবার, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প ও লোকসংস্কৃতিরও জায়গা থাকা প্রয়োজন। এতে ভ্রমণ শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পর্যটকেরা স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের আগে পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় মানুষের মতামত এবং জলাভূমির বহনক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি। যে এলাকায় পর্যটকের চাপ প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর হতে পারে, সেখানে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ বা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও পরিকল্পনায় রাখতে হবে।

নদী-খাল পুনরুদ্ধার ছাড়া সম্ভাবনা টেকসই হবে না

চলনবিলের পর্যটন সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর করতে নদী ও খালের নাব্যতা এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ রক্ষা জরুরি। অবৈধ দখল ও ভরাটের অভিযোগ যাচাই, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নদী-খাল পুনরুদ্ধার, ক্ষতিকর জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং জলাভূমির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে বিলের পানির অবস্থা, মাছের প্রজননক্ষেত্র, পাখির আবাসস্থল ও মৌসুমি জলপ্রবাহ সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে পর্যটন কার্যক্রমের উপযুক্ত সময় ও স্থান নির্ধারণ করা গেলে প্রকৃতির ওপর চাপ কমিয়ে পর্যটন পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ ও মৎস্যসংশ্লিষ্ট দপ্তর, পর্যটন কর্তৃপক্ষ, গবেষক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। পরিকল্পনা তৈরির সময় বিলপাড়ের মানুষের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিলে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেওয়া সহজ হবে।

চলনবিলের সৌন্দর্যই হোক পর্যটনের মূল আকর্ষণ

চলনবিলের আসল সৌন্দর্য কোনো কৃত্রিম রিসোর্ট বা বড় স্থাপনায় নয়। এর আকর্ষণ দিগন্তজোড়া জলে, আকাশের প্রতিবিম্বে, নৌকার ছইয়ে, পাখির ডানায়, জেলের জালে এবং কৃষকের মাঠে। এই প্রকৃতি ও জীবনযাত্রার সমন্বয়ই চলনবিলকে অন্য অনেক পর্যটনস্থানের চেয়ে আলাদা পরিচিতি দিতে পারে। এ কারণে পর্যটনের নামে বিলের স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে ফেলার পরিবর্তে প্রকৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই পর্যটন গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন। স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো, নিরাপদ নৌভ্রমণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ—এই চারটি বিষয়কে একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। চলনবিলকে ঘিরে পর্যটনের স্বপ্ন অবশ্যই দেখা যায়। পরিকল্পিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে এই জলাভূমি প্রকৃতিপ্রেমী দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হলে আগে নিশ্চিত করতে হবে বিলের পানি, নদী-খাল, মাছ, পাখি ও প্রাকৃতিক পরিবেশের সুরক্ষা।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

সাবিলাকে ঘিরে প্রেমের গুঞ্জন, ভেঙে গেল ডিওপির সাত বছরের সম্পর্ক!

বিনোদন প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫২ পূর্বাহ্ণ
সাবিলাকে ঘিরে প্রেমের গুঞ্জন, ভেঙে গেল ডিওপির সাত বছরের সম্পর্ক!

ঢালিউডের অভিনেত্রী সাবিলা নূরকে ঘিরে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। স্বামী নেহাল সুনন্দ তাহেরের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কে টানাপড়েনের গুঞ্জনের মধ্যেই সামনে এসেছে চিত্রগ্রাহক (ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি—ডিওপি) আবদুল মামুনকে ঘিরে আরেকটি অভিযোগ। তবে এসব বিষয়ে সাবিলা নূর, তাঁর স্বামী কিংবা আবদুল মামুন—কেউই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খোলেননি।

বাংলানিউজ২৪-এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবিলা অভিনীত ‘রকস্টার’ সিনেমার শুটিংকে কেন্দ্র করে আবদুল মামুনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলে অভিযোগ করেছেন মামুনের সাবেক প্রেমিকা তিশা। তাঁর দাবি, এই সম্পর্কের জেরে আবদুল মামুনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সাত বছরের প্রেম এবং নির্ধারিত বিয়ে ভেঙে গেছে।

বিয়ের প্রস্তুতির মধ্যেই সম্পর্কের ইতি

তিশার ভাষ্য অনুযায়ী, আবদুল মামুনের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। দুই পরিবারের সম্মতিতে তাঁদের বিয়ের তারিখও নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৫ মে। বিয়ের সব প্রস্তুতি চলছিল। কিন্তু বিয়ের কয়েক দিন আগে মামুন তাঁকে জানান, তিনি আর বিয়ে করতে চান না।

তিশা বলেন, কেন মামুন বিয়ে করতে চাইছেন না, তা জানার চেষ্টা করেও প্রথমে কোনো স্পষ্ট উত্তর পাননি। পরে সাবিলা নূরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা জানতে পারেন বলে দাবি করেন তিনি। এরপর ১২ মে মামুন তাঁকে জানান, কোনোভাবেই এই বিয়ে সম্ভব নয়।

তিশার অভিযোগ, দুই পরিবারের পক্ষ থেকে মামুনকে বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত বিয়ে আর হয়নি। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ায় তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন বলেও জানান।

‘আমার ভালোবাসার মূল্য দিল না’

নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে তিশা বলেন, আবদুল মামুনের সঙ্গে তাঁর ক্যারিয়ারও প্রায় একই সময়ে শুরু হয়েছিল। ‘রকস্টার’ সিনেমায় শাকিব খানের মতো বড় তারকার সঙ্গে কাজের সুযোগ থাকায় তিনি নিজেই বিয়ে পিছিয়ে দিতে রাজি হয়েছিলেন বলে জানান।

তিশার দাবি, সিনেমাটির শুটিং শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁদের বিয়ের কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই সম্পর্ক আর টেকেনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাবিলা নূর তাঁদের সম্পর্কের বিষয়ে জানতেন। তারপরও তাঁর সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে বলে মনে করেন তিশা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সাবিলা নূর বা আবদুল মামুনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাবিলার সংসার নিয়েও গুঞ্জন

২০১৯ সালে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্কের পর নেহাল সুনন্দ তাহেরকে বিয়ে করেন সাবিলা নূর। সম্প্রতি তাঁদের দাম্পত্য জীবন নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যেই আবদুল মামুনের সঙ্গে সাবিলার কথিত সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে।

এদিকে, শাকিব খানের সঙ্গে সাবিলার ঘনিষ্ঠতা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা জল্পনা ছড়িয়েছে। ‘তাণ্ডব’ ও ‘রকস্টার’ সিনেমায় একসঙ্গে কাজ করার সূত্র ধরে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে নানা দাবি করা হলেও, এসব জল্পনার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আনুষ্ঠানিক বক্তব্য মেলেনি

সাবিলা নূর, তাঁর স্বামী নেহাল সুনন্দ তাহের এবং আবদুল মামুনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য আসেনি। ফলে তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্ক, আবদুল মামুনের সঙ্গে সাবিলার কথিত প্রেম কিংবা তিশার বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পেছনের কারণ—এসব বিষয়ে প্রকাশিত অভিযোগ ও গুঞ্জনকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আলোচনা চললেও সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

কালের আলো/জেএন/এসএ

ডেঙ্গু ও গরম মোকাবিলায় তরুণদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তিন বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ
ডেঙ্গু ও গরম মোকাবিলায় তরুণদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তিন বার্তা

ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকার বা সিটি করপোরেশনের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মকে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা ও নগরীর তাপমাত্রা কমাতে শিক্ষার্থীদের নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের জন্মদিনে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর (বিএনসিসি) ও স্কাউট সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সবুজায়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তাঁর মতে, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পরিবেশ রক্ষায় প্রত্যেক নাগরিকের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণেরা উদ্যোগী হলে নিজেদের এলাকা পরিচ্ছন্ন রাখার কার্যক্রম আরও কার্যকর হতে পারে।

ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রতিরোধেই গুরুত্ব

ডেঙ্গু মোকাবিলায় রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়াই করতে হলে সবচেয়ে ভালো উপায় হচ্ছে প্রতিরোধ। আর এ জন্য চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব শুধু সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার নয়, নাগরিকদেরও—এমন বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। শিক্ষার্থীদের নিজেদের ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পাড়া পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি সামনে রেখে তিনি তরুণদের এমন উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান, যাতে পরিচ্ছন্নতা একটি নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ নগরীতে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা কঠিন।

‘এত মানুষের শহরে শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের ওপর নির্ভর করা যায় না’

ঢাকা শহরের বিপুল জনসংখ্যার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই থেকে আড়াই কোটির বেশি মানুষের এই শহরে পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে নগরীর সব জায়গা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব শুধু তাঁদের ওপর ছেড়ে দেওয়া সম্ভব নয়।

যত্রতত্র ময়লা ফেলার প্রবণতা বন্ধ করতে নাগরিকদের সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। কেউ নির্ধারিত স্থানের বাইরে ময়লা ফেললে তাঁকে সচেতন করার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। নগরীতে ময়লা ফেলার ডাস্টবিন এবং সিটি করপোরেশনের লাগানো গাছের চারা চুরির ঘটনায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন তারেক রহমান। এসব ঘটনায় নাগরিক দায়িত্ববোধের ঘাটতি স্পষ্ট হয় বলে ইঙ্গিত দিয়ে তিনি সবাইকে আরও দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান। পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তুলতে শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কাজের ওপর নির্ভর না করে নাগরিকদের নিজেদের আচরণেও পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন তিনি। নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলা, আশপাশ পরিষ্কার রাখা এবং সরকারি সম্পদ রক্ষায় সচেতন হওয়াকে এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

জন্মদিনে অন্তত একটি গাছ লাগানোর পরামর্শ

ডেঙ্গু প্রতিরোধের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষা ও সবুজায়নের বিষয়েও শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করেন প্রধানমন্ত্রী। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও ঢাকায় সবুজের ঘাটতি নিয়ে শৈশবের স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, একসময় ঢাকা অনেক বেশি সবুজ ছিল। এখন বহুতল ভবন গড়ে ওঠায় গরমের অনুভূতি বেড়েছে।

পরিবেশ রক্ষায় শিক্ষার্থীদের নিজেদের এবং পরিবারের সদস্যদের জন্মদিনে অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর চেষ্টা করতে বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাইবোন কিংবা নানা-নানির জন্মদিনেও গাছ লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সবাই মিলে গাছ লাগালে শহরের তাপমাত্রা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব। তাঁর এই আহ্বানের মূল লক্ষ্য হলো, বিশেষ কোনো দিবসের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গাছ লাগানোকে পারিবারিক ও সামাজিক অভ্যাসে পরিণত করা। শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে গাছ লাগালে ভবিষ্যতে সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিচ্ছন্নতা ও সবুজায়নে তরুণদের অংশগ্রহণ চান প্রধানমন্ত্রী

রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে উপস্থিত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁদের পাড়া, স্কুল ও আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখার কাজে সহযোগিতা চান। শিক্ষার্থীরা তাঁর আহ্বানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইতিবাচক সাড়া দেয়।

ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং সবুজায়ন—এই তিনটি ক্ষেত্রে তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন তারেক রহমান। শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করলে পরিবার ও প্রতিবেশীদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা, আশপাশে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং গাছের চারা রক্ষা করার মতো কাজগুলোতে শিক্ষার্থীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে নাগরিক দায়িত্ববোধের চর্চা ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

নাগরিক সচেতনতাই পরিচ্ছন্ন নগরীর ভিত্তি

ঢাকার মতো জনবহুল শহরে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা ও পরিবেশ রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থার কার্যক্রমের পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বিশেষ করে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা এবং মশার বংশবিস্তারের উপযোগী স্থান তৈরি হতে না দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে তাই তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগাম সচেতনতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নাগরিক দায়িত্ব এবং পরিবেশ রক্ষায় নিয়মিত বৃক্ষরোপণ।

শিক্ষার্থী ও তরুণেরা এসব উদ্যোগে যুক্ত হলে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষার বার্তা আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে এ উদ্যোগকে কার্যকর করতে ব্যক্তি পর্যায়ের সচেতনতার পাশাপাশি নিয়মিত বর্জ্য অপসারণ, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি