পানির প্রবাহ নেই, তবু সড়ক খুঁড়ে তিন কালভার্ট নির্মাণ!
সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে সীমান্ত সড়ক সংস্কার প্রকল্পে পাকা সড়ক কেটে নতুন করে তিনটি কালভার্ট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, সড়কের যেসব স্থানে কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেসব জায়গায় দৃশ্যমান কোনো খাল, ছড়া কিংবা পানির প্রবাহ নেই। অথচ পাশেই পানি নিষ্কাশনের জন্য আগে থেকেই কালভার্ট রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে। তাঁদের আশঙ্কা, যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবতা যাচাই ছাড়া এসব কাজ করা হলে সরকারি অর্থের অপচয় হতে পারে।
তবে প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের দাবি, এখন পানি চলাচলের পথ দৃশ্যমান না হলেও বর্ষায় পাহাড়ি ঢল নামলে এসব স্থানে পানি নিষ্কাশনের প্রয়োজন হতে পারে। পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকলে পানির চাপে সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
পাঁচ কিলোমিটার সড়কে ব্যয় প্রায় ৪৩ কোটি টাকা
ঘটনাটি ঘটছে তাহিরপুর উপজেলার ট্যাকেরঘাট থেকে কড়ইগড়া বাজার পর্যন্ত সীমান্ত সড়ক সংস্কারকাজে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন এ প্রকল্পে পাঁচটি সেতু ও ১০টি কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি কালভার্ট নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২ কোটি ৯৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৩১ টাকা। প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স নুর কনস্ট্রাকশন ইতিমধ্যে নির্মাণকাজ শুরু করেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, সড়কের যেসব স্থানে নতুন কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে পানির স্বাভাবিক প্রবাহের চিহ্ন না থাকলে এসব স্থাপনা নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কী? আগে থেকে থাকা কালভার্টগুলো সংস্কার বা কার্যকর রাখার পাশাপাশি নতুন কালভার্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
ফসলি জমির মাঝখানে সড়ক খুঁড়ে নির্মাণকাজ
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে দেখা যায়, ট্যাকেরঘাট থেকে কড়ইগড়ামুখী সড়কের বিভিন্ন অংশে সংস্কারকাজ চলছে। রাজাই গ্রামের অংশে সড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। এরই মধ্যে একটি স্থানে বিটুমিনের আস্তরণ কেটে বড় গর্ত করা হয়েছে। কোথাও কালভার্ট নির্মাণের জন্য মাটি খোঁড়া হয়েছে, আবার কোথাও সড়কের একাংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। এলাকার ভূপ্রকৃতি ও দৃশ্যমান পানিপ্রবাহের সঙ্গে নতুন কালভার্ট নির্মাণের বিষয়টি মিলিয়ে দেখতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, এসব স্থানে আগে কখনো পানি চলাচল করতে দেখেননি তাঁরা। পাশের ছড়া দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও রয়েছে।
অন্যদিকে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, কালভার্টগুলোর সামনে ও পেছনে খাল খনন করে দেওয়া হবে। এর ফলে কালভার্টের নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে পারবে বলে তাঁদের দাবি। তবে নতুন করে খাল খনন করে পানি চলাচলের ব্যবস্থা তৈরি করার পরিকল্পনা থাকলে, সেই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা, নকশা এবং বাস্তবায়নপদ্ধতি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান স্থানীয়রা।
‘এই জায়গা দিয়ে কখনো পানি চলতে দেখিনি’
সীমান্তের চানপুর গ্রামের বাসিন্দা দীন ইসলাম বলেন, সড়কের যেসব স্থানে নতুন করে কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেসব জায়গা দিয়ে কখনো পানি চলাচল করতে দেখেননি তাঁরা। পাশের ছড়া ও পানি নিষ্কাশনের জন্য আগে থেকেই কালভার্ট রয়েছে। তারপরও নতুন করে কালভার্ট নির্মাণের বিষয়টি তাঁদের কাছে যৌক্তিক মনে হচ্ছে না। রাজাই গ্রামের বাসিন্দা মো. জহুর আলী বলেন, নতুন কালভার্ট নির্মাণের স্থানটি তুলনামূলকভাবে উঁচু। সেখানে আগে মানুষের বসতিও ছিল। ওই স্থান দিয়ে কখনো পানি চলাচল করতে দেখেননি তাঁরা। তাঁর অভিযোগ, কালভার্ট নির্মাণের আগে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা কিংবা পরামর্শ করা হয়নি। স্থানীয়দের বক্তব্য, সড়ক উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। তবে উন্নয়নকাজে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি প্রকল্পের প্রতিটি স্থাপনার প্রয়োজনীয়তা এবং এলাকার বাস্তব পরিস্থিতিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
সড়ক প্রশস্ত করতে জমি চলে যাওয়ার অভিযোগ
কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি সড়ক প্রশস্ত করতে গিয়ে স্থানীয়দের রেকর্ডভুক্ত ব্যক্তিগত জমির একটি অংশ সড়কের আওতায় চলে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এ নিয়ে জমির মালিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। উত্তর বড়দল ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কফিল উদ্দিন বলেন, কড়ইগড়া-ট্যাকেরঘাট সড়কটি পাকিস্তান আমলে নির্মিত। সরকার সীমান্ত সড়ক উন্নয়নের জন্য রাস্তা প্রশস্ত করছে, যা একটি ভালো উদ্যোগ। তবে রাস্তা নির্মাণ করতে গিয়ে কারও জমি সড়কের আওতায় পড়লে জমির মালিকেরা যেন ক্ষতিপূরণ পান, সে বিষয়ে তিনি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সড়ক প্রশস্তকরণে সরকারি জমির সীমানা নির্ধারণ এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির দাবি যাচাইয়ের বিষয়টি এখন স্থানীয়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জমির মালিকদের দাবি ও সরকারি নথির মধ্যে কোনো অসংগতি থাকলে তা যাচাই করে সমাধানের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকৌশলীর দাবি, বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের পানি নিষ্কাশনে প্রয়োজন হবে কালভার্ট
তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, কড়ইগড়া-ট্যাকেরঘাট সড়কটি একটি সীমান্ত সড়ক। বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় এর নির্মাণকাজ চলছে। কাজ শেষ হলে নেত্রকোনা জেলা থেকে সুনামগঞ্জ জেলায় সীমান্তপথে সড়ক যোগাযোগ উন্নত হবে। তিনি জানান, সড়কটি বর্তমানে ১২ ফুট প্রশস্ত। নির্মাণকাজ শেষ হলে শোল্ডারসহ এর প্রস্থ ২৪ ফুট হবে। সরকারি ম্যাপে সড়কের প্রশস্ততা ৪৮ ফুট রয়েছে বলেও জানান তিনি। জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী, সড়ক নির্মাণকাজের ২০ শতাংশ স্থানে পানি নিষ্কাশনের জন্য গ্যাপ বা ফাঁকা ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা রয়েছে।
‘বর্ষায় পানি না নামলে সড়ক ভেঙে যেতে পারে’
সুনামগঞ্জ এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, সরকারি খাস জায়গায় সড়কের জন্য ৪৮ ফুট জায়গা রয়েছে। যাঁরা ব্যক্তিগত জমির দাবি করছেন, তাঁদের দাবির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে এসব স্থানে পানির প্রবাহ দৃশ্যমান না হলেও বর্ষায় আকস্মিক পাহাড়ি ঢল নামলে পানি চলাচলের পথ প্রয়োজন হবে। পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকলে পানির চাপে সড়ক ভেঙে যেতে পারে।
প্রকৌশল বিভাগের বক্তব্য অনুযায়ী, কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনায় বর্ষাকালীন পানি নিষ্কাশন ও পাহাড়ি ঢলের সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্নের নিরসনে কোন স্থানে কতটা পানি প্রবাহিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, কী ধরনের নকশা অনুসরণ করা হচ্ছে এবং বিদ্যমান কালভার্টের সক্ষমতা কতটুকু—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নয়নকাজে প্রয়োজন পরিকল্পনা ও স্বচ্ছতা
সীমান্ত সড়কের উন্নয়ন স্থানীয় যোগাযোগ, কৃষিপণ্য পরিবহন এবং আঞ্চলিক যাতায়াতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন চলাচল সহজ হওয়ার পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অর্থের সঠিক ব্যবহার, প্রকৌশলগত যৌক্তিকতা এবং স্থানীয় মানুষের জমির অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কোনো স্থানে কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট নকশা, পানি নিষ্কাশনের পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে তা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array