মহাকাশের এমন একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলে রহস্যময় সংকেত শনাক্ত করেছে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ, যেখানে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ চালিয়েও ওই সংকেতের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো দৃশ্যমান উৎস খুঁজে পাননি বিজ্ঞানীরা। প্রায় তিন মাসের ব্যবধানে দুই দফা পর্যবেক্ষণে সংকেতটি ধরা পড়ে। কিন্তু কোথা থেকে এটি এসেছে, কী কারণে তৈরি হয়েছে কিংবা এর পেছনে কোন মহাজাগতিক ঘটনা কাজ করছে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সংকেতটি মহাকাশের এমন একটি অঞ্চলে পাওয়া গেছে, যা আগে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ দিয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও শক্তিশালী অবলোহিত প্রযুক্তি ব্যবহার করেও সেখানে এর কোনো সুস্পষ্ট উৎস শনাক্ত করা যায়নি। ফলে নতুন এই সংকেত নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মধ্যে।
যে অঞ্চলে প্রায় ১০ হাজার ছায়াপথের সন্ধান মিলেছিল
রহস্যময় সংকেতটির অবস্থান দক্ষিণ আকাশের ফর্নাক্স নক্ষত্রমণ্ডলে, ‘হাবল আল্ট্রা ডিপ ফিল্ড’ নামে পরিচিত মহাকাশের একটি ক্ষুদ্র অঞ্চলে। মহাবিশ্বের গভীরতম পর্যবেক্ষণগুলোর মধ্যে অন্যতম এই অঞ্চলটি। দূরবর্তী ও ক্ষীণ ছায়াপথের সন্ধানে হাবল স্পেস টেলিস্কোপ এখানে ২৭০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে পর্যবেক্ষণ চালিয়েছিল।
সেই পর্যবেক্ষণে প্রায় ১০ হাজার ছায়াপথের সন্ধান পাওয়া যায়। অর্থাৎ, খালি চোখে প্রায় শূন্য বলে মনে হওয়া মহাকাশের ওই ক্ষুদ্র অংশেও অসংখ্য ছায়াপথের অস্তিত্ব রয়েছে।
পরে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ আরও সংবেদনশীল অবলোহিত যন্ত্র দিয়ে একই অঞ্চল পর্যবেক্ষণ শুরু করে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা আগের পর্যবেক্ষণে শনাক্ত করা কঠিন ছিল—এমন দূরবর্তী ও ক্ষীণ মহাজাগতিক বস্তুর আলো বিশ্লেষণ করার সুযোগ পান।
কিন্তু সেই পর্যবেক্ষণেই সামনে আসে অপ্রত্যাশিত এক সংকেত, যার পরিচয় এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
পরিচিত বস্তুর বদলে অজানা সংকেতের খোঁজ
মিনেসোটা ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী মেসন হুবার্টির নেতৃত্বে গবেষকেরা জেমস ওয়েবের নিয়ার-ইনফ্রারেড স্পেকট্রোগ্রাফ বা এনআইআরস্পেক যন্ত্র ব্যবহার করে সংকেতটি শনাক্ত করেন।
সাধারণত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা আগে থেকে পরিচিত কোনো ছায়াপথ, নক্ষত্র কিংবা অন্য মহাজাগতিক বস্তুকে লক্ষ্য করে টেলিস্কোপের সাহায্যে পর্যবেক্ষণ চালান। কিন্তু এই গবেষণায় পদ্ধতিটি ছিল কিছুটা ভিন্ন। গবেষকেরা যন্ত্রটির প্রায় সব ক্ষুদ্র শাটার খুলে রেখে সংগৃহীত আলোর বর্ণালি বিশ্লেষণ করেন।
এই পদ্ধতিতে আগে থেকে নির্দিষ্ট করে লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন না করেও বিভিন্ন উৎস থেকে আসা আলো শনাক্ত করা সম্ভব। ফলে পরিচিত মহাজাগতিক বস্তুর পাশাপাশি অজানা বা আগে শনাক্ত না হওয়া কোনো উৎসের সংকেতও সামনে আসতে পারে।
গবেষকেরা প্রথমে ছয়টি সংকেতকে আগে থেকে পরিচিত দূরবর্তী ছায়াপথের সঙ্গে মেলাতে সক্ষম হন। কিন্তু সপ্তম সংকেতটির ক্ষেত্রে একই ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এর বৈশিষ্ট্য অন্য সংকেতগুলোর তুলনায় আলাদা হওয়ায় সেটিই বিজ্ঞানীদের বিশেষভাবে ভাবিয়ে তোলে।
৮৮ দিনের ব্যবধানে দুবার ধরা পড়ল সংকেত
গবেষণায় ২০২৩ সালের আগস্ট ও নভেম্বরে দুই দফা পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। এই দুই পর্যবেক্ষণের মধ্যে ব্যবধান ছিল ৮৮ দিন।
দুই দফায় পর্যবেক্ষণের দিকও আলাদা রাখা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল, কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা যন্ত্রের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে তৈরি সংকেতকে প্রকৃত মহাজাগতিক ঘটনা বলে ভুল করার ঝুঁকি কমানো।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রহস্যময় সংকেতটি দুই দফার পর্যবেক্ষণেই শনাক্ত হয়। এমনকি চারটি সম্মিলিত এক্সপোজারেও এর উপস্থিতি ছিল সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এ কারণে সংকেতটিকে নিছক যন্ত্রের ত্রুটি বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তবে একই সংকেত একাধিকবার পাওয়া গেলেই তার প্রকৃত উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না। সেটি শনাক্ত করতে আরও পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
১.৬ মাইক্রোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে উজ্জ্বল রেখা
রহস্যময় সংকেতটির অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্রায় ১ দশমিক ৬ মাইক্রোমিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্যে শনাক্ত হয়েছে। আলোর বর্ণালিতে এটি একটি উজ্জ্বল নির্গমন রেখা হিসেবে দেখা গেছে।
মহাজাগতিক বস্তু থেকে আসা আলোকে বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে বিশ্লেষণ করলে তার রাসায়নিক উপাদান, ভৌত অবস্থা এবং দূরত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু পরমাণু ও আয়ন নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে আলো নির্গত করে। তাই একটি নির্গমন রেখার পরিচয় নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানীরা সাধারণত বর্ণালিতে অন্য রেখাগুলোর উপস্থিতিও খতিয়ে দেখেন।
কিন্তু এই সংকেতের ক্ষেত্রে সমস্যাটি হলো, এর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য কোনো নির্গমন রেখা পাওয়া যায়নি। ফলে সংকেতটির পরিচয় নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় সূত্র সীমিত হয়ে পড়েছে।
আরও বিস্ময়কর বিষয়, হাবল ও জেমস ওয়েবের আগের পর্যবেক্ষণেও ওই অবস্থানে কোনো দৃশ্যমান উৎস শনাক্ত হয়নি। অর্থাৎ, সংকেতটি যে বস্তু থেকে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তার অবস্থান সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো পরিচিত তথ্য নেই।
আগে ছিল না, পরে হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল?
সংকেতটির প্রকৃতি সম্পর্কে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া গেছে আগের পর্যবেক্ষণের তথ্য থেকে।
গবেষকদের মতে, সংকেতটি এতটাই উজ্জ্বল ছিল যে ২০২২ সালের অক্টোবরে পরিচালিত জেডেস জরিপের সময় একই অবস্থায় উপস্থিত থাকলে সেটি শনাক্ত হওয়ার কথা। কিন্তু ওই পর্যবেক্ষণে সংকেতটির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, সংকেতটির উৎস হয়তো স্থায়ীভাবে উজ্জ্বল ছিল না। বরং কোনো নির্দিষ্ট সময়ে সেটি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, পরে আবার ক্ষীণ হয়ে যেতে পারে। তবে এই ব্যাখ্যাও এখনো নিশ্চিত নয়।
মহাকাশে কিছু ঘটনা অল্প সময়ের জন্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কোনো নক্ষত্রের বিস্ফোরণ, ঘন মহাজাগতিক বস্তুর আশপাশে পদার্থের আচরণ কিংবা অন্য কোনো ক্ষণস্থায়ী ঘটনা থেকে এমন সংকেত তৈরি হতে পারে। কিন্তু বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে এই সম্ভাবনাগুলোর কোনো একটিকে রহস্যময় সংকেতটির নিশ্চিত উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা যাচ্ছে না।
তাই সংকেতটি কোনো পরিচিত মহাজাগতিক ঘটনার ফল, নাকি এর পেছনে রয়েছে এখনো অজানা কোনো প্রক্রিয়া—তা জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন।
রহস্যের সমাধানে প্রয়োজন আরও পর্যবেক্ষণ
জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মহাবিশ্বের দূরবর্তী ও ক্ষীণ বস্তু শনাক্ত করার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এর উন্নত অবলোহিত যন্ত্রের সাহায্যে বিজ্ঞানীরা এমন সব সংকেতও খুঁজে পাচ্ছেন, যেগুলো আগের পর্যবেক্ষণে শনাক্ত করা কঠিন ছিল।
তবে কোনো সংকেত শনাক্ত করা এবং তার উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়। নতুন এই সংকেতের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এর বর্ণালিগত বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করা এবং সম্ভাব্য উৎসের সঙ্গে তা মিলিয়ে দেখা।
এ বিষয়ে গবেষণাপত্রটি দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নাল-এ প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণার ফল মহাকাশের অজানা ও ক্ষণস্থায়ী সংকেত অনুসন্ধানে নতুন প্রশ্ন সামনে এনেছে।
এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সংকেতটি দুই দফা পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে এবং এর উৎস শনাক্ত করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য বিজ্ঞানীদের হাতে নেই। রহস্যের সমাধান পেতে ভবিষ্যতে আরও পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
কালের আলো/জেএন/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array