দুই প্রিয়জনকে হারিয়ে নিঃস্ব আরিফ, তবু কারও কাছে হাত পাতেন না
জীবনের প্রতিকূলতা যেন পিছু ছাড়ছে না ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের আরিফের। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, বাবাকে হারানোর শোক, ক্যানসারে ছোট ভাইয়ের মৃত্যু, আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়াশোনা—সব মিলিয়ে কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে তাঁর জীবন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা, নিজের সংসারের খরচ এবং সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতিনিয়ত দুশ্চিন্তায় দিন কাটে তাঁর।
তবু মানুষের কাছে হাত পেতে বেঁচে থাকার পথ বেছে নেননি আরিফ। বরং কসবা বাজারের একটি ছোট্ট দোকানে মোবাইল ফোনের বিভিন্ন সরঞ্জাম বিক্রি এবং মানুষের ওজন মেপে সামান্য আয় করে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার মতো পর্যাপ্ত পুঁজি নেই, ব্যবসা বড় করার সামর্থ্যও সীমিত। তারপরও নিজের শ্রমে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন এই যুবক। তাঁর চাওয়া খুব বেশি নয়—সামান্য আর্থিক সহায়তা কিংবা কর্মসংস্থানের একটি সুযোগ। এতটুকু সহযোগিতা পেলে ব্যবসাটি সম্প্রসারণ করে পরিবারের দায়িত্ব আরও ভালোভাবে পালন করতে পারবেন বলে আশা আরিফের।
ক্যানসারে বাবা-ভাইকে হারিয়ে থমকে যায় পড়াশোনা
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা পৌরসভার নোয়াপাড়া গ্রামের হানিফ মিয়ার ছেলে আরিফ। কসবা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই ব্যবসার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নও ছিল। কিন্তু পারিবারিক আর্থিক সংকট ও একের পর এক শোক সেই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। প্রথমে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তাঁর ছোট ভাই। এই মৃত্যু তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। এরপর ২০২৪ সালে একই রোগে বাবাকেও হারান তিনি। পরিবারের দুই প্রিয়জনকে হারানোর শোকের পাশাপাশি বেড়ে যায় আর্থিক চাপ। সংসারের দায়িত্ব ও মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি আরিফ। একসময় যে শিক্ষাজীবন এগিয়ে নেওয়ার কথা ছিল, সেই জায়গায় তাঁকে নামতে হয় জীবিকার কঠিন লড়াইয়ে। নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে উপার্জনের পথ খুঁজতে থাকেন তিনি।
ওজন মাপার যন্ত্র থেকে ছোট্ট দোকান
২০২০ সালে একটি ছোট ওজন মাপার যন্ত্র দিয়ে উপার্জন শুরু করেন আরিফ। সেই সামান্য আয় দিয়েই জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা চলতে থাকে। পরে পরিবারের খরচ মেটানোর প্রয়োজন বাড়লে কসবা বাজারে ছোট্ট একটি স্টলে ব্যবসা শুরু করেন তিনি। দোকানে মোবাইল ফোনের কাভার, হেডফোন, মানিব্যাগসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন। পাশাপাশি বাজারে আসা মানুষের ওজন মেপেও কিছু টাকা আয় করেন। প্রতিদিনের এই সীমিত উপার্জন দিয়েই চলে তাঁর সংসার। আরিফের দোকানে পণ্যের চাহিদা রয়েছে বলে জানান তিনি। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী মালামাল কিনতে না পারায় ব্যবসার পরিসর বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। হাতে পর্যাপ্ত পুঁজি থাকলে আরও বেশি পণ্য সংগ্রহ করতে পারতেন, বাড়াতে পারতেন বিক্রিও। কিন্তু আর্থিক সীমাবদ্ধতায় সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারছেন না।
একদিকে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়, অন্যদিকে ব্যবসায় নতুন পণ্য তোলার খরচ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁকে।
অসুস্থ মা, সন্তানসম্ভবা স্ত্রী—দুশ্চিন্তা বাড়ছে
আরিফের জীবনের লড়াই শুধু নিজের জীবিকা নির্বাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর মা অসুস্থ। অন্যদিকে স্ত্রীও সন্তানসম্ভবা। ফলে সামনে নতুন অতিথির আগমনকে ঘিরে আনন্দের পাশাপাশি রয়েছে বাড়তি দুশ্চিন্তা। একজন উপার্জনক্ষম মানুষ হিসেবে পরিবারের সব দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। প্রতিদিনের ব্যবসা থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসারের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই কঠিন। এর মধ্যে মায়ের চিকিৎসা, স্ত্রীর যত্ন এবং অনাগত সন্তানের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে ভাবতে হচ্ছে তাঁকে। আরিফের কাছে ছোট্ট দোকানটি তাই শুধু উপার্জনের জায়গা নয়; এটি পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার অবলম্বন, নিজের আত্মমর্যাদা ধরে রাখার আশ্রয়ও।
‘ভিক্ষা ছাড়া কী করতে পারবা’—কটাক্ষেও দমেননি
অভাবের কারণে অনেকেই তাঁকে ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ কটাক্ষ করে বলেছেন, ভিক্ষা ছাড়া আর কী করতে পারবেন তিনি। কিন্তু এসব কথায় ভেঙে পড়েননি আরিফ। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাওয়ার সিদ্ধান্তেই অটল থেকেছেন। আরিফ বলেন, “আমি আমার পরিবারের উপার্জনের একমাত্র মাধ্যম। অনেকেই ভিক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কেউ কেউ বলেছেন, ভিক্ষা ছাড়া তুমি আর কী করতে পারবা? তবে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি হালালভাবে ব্যবসা করে, পরিশ্রম করে আয় করার।” তাঁর এই মনোভাবই স্থানীয় অনেকের কাছে প্রশংসা কুড়িয়েছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও নিজের শ্রমে উপার্জনের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াকে তাঁরা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
ক্রেতাদের চোখে পরিশ্রমী আরিফ
কসবা বাজারে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছেন আরিফ। তাঁর কাছ থেকে পণ্য কেনা ক্রেতাদের কেউ কেউ জানান, সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা চান, আরিফ যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পেয়ে ব্যবসাটি আরও ভালোভাবে পরিচালনা করতে পারেন। ক্রেতা ফয়েজুর রহমান বলেন, “আমি আরিফের কাছ থেকে একটি মানিব্যাগ কিনেছি। ফুটপাতে এরকম ভালো জিনিস সচরাচর পাওয়া যায় না। জিনিস খুব ভালো। আরিফ এখানে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করছে। আমরা চাই, সরকারিভাবে যেন তাকে সহায়তা দেওয়া হয়।” আরেক ক্রেতা সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বলেন, “তার বাবা নেই, মা আছেন। সঙ্গে তার পরিবারও আছে। সে ইচ্ছা করলেই মানুষের কাছে হাত পাততে পারতেন, কিন্তু সেটা না করে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।” স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও মনে করেন, উপযুক্ত সহায়তা পেলে আরিফের পক্ষে নিজের ব্যবসা আরও ভালোভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে।
আরিফের দীর্ঘদিনের এক সহকর্মী ব্যবসায়ী বলেন, তিনি প্রায় ছয় বছর ধরে আরিফের সঙ্গে ব্যবসা করছেন। আরিফ মোটামুটি শিক্ষিত। সরকার যদি তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী কোনো চাকরির ব্যবস্থা করে দেয়, তাহলে তিনি কাজটি করতে পারবেন এবং পরিবার নিয়ে ভালোভাবে চলতে পারবেন বলে আশা করেন ওই ব্যবসায়ী। পার্শ্ববর্তী ব্যবসায়ী মো. হানিফ মিয়া বলেন, “আরিফ একজন প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী হয়েও সে নিজের শ্রমের বিনিময়ে হালালভাবে উপার্জন করে যাচ্ছে। সরকার তাকে সহায়তা করলে ব্যবসাটাকে আরেকটু উন্নত করতে পারত।”
সামান্য পুঁজিই আরিফের বড় স্বপ্নের ভিত্তি
নিজের ব্যবসার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরে আরিফ বলেন, “আমি কসবা বাজারে ২০২০ সাল থেকে ব্যবসা করে আসছি। প্রথমে ছোট্ট একটি ওজন মাপার মেশিন দিয়ে শুরু করি। পরে পরিবারের চাহিদা মেটানোর জন্য ছোট্ট একটি স্টলে ব্যবসা শুরু করি। আমার পরিবার দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত। তাই সামান্য পুঁজি দিয়ে ব্যবসাটি শুরু করেছি।” তিনি আরও বলেন, পণ্যের চাহিদা থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে ব্যবসাটি ঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না। বিভিন্ন সময়ে অনেকে সহযোগিতা করলেও এখনো সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পাননি বলে জানান তিনি। আরিফের আবেদন, সরকার ও সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিরা যেন তাঁর ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনার জন্য সামান্য আর্থিক সহায়তা দেন। সেই সহায়তা দিয়ে প্রয়োজনীয় পণ্য কিনে ব্যবসার পরিসর বাড়াতে চান তিনি। এতে আয় বাড়লে পরিবারের খরচ মেটানো এবং অসুস্থ মায়ের দেখাশোনা করাও কিছুটা সহজ হবে বলে তাঁর প্রত্যাশা।
সহায়তা পেলে বদলাতে পারে পরিবারের পরিস্থিতি
আরিফের মতো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ কিংবা যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ জীবিকা নির্বাহের নতুন পথ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা ব্যক্তিদের কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ বাড়ানো গেলে তাঁরা নিজেদের সামর্থ্য কাজে লাগিয়ে পরিবার ও সমাজে অবদান রাখতে পারেন। কসবা বাজারের স্থানীয়দের প্রত্যাশা, আরিফের পরিশ্রম ও আত্মমর্যাদাবোধের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর পাশে দাঁড়ানো হবে। সরকারি সহায়তা কিংবা সামান্য পুঁজি পেলে তাঁর ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি তাঁর যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির সুযোগ তৈরি হলেও পরিবার নিয়ে একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার পথ খুলবে। কসবা উপজেলা মার্কেটের পশ্চিম কোণে ছোট্ট দোকানটিতে প্রতিদিন নিজের জীবনসংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন আরিফ। বাবা ও ভাইকে হারানোর বেদনা, বন্ধ হয়ে যাওয়া পড়াশোনা, অসুস্থ মা, সন্তানসম্ভবা স্ত্রী আর অভাবের চাপ—সবকিছুর মধ্যেও তিনি হাল ছাড়েননি।
কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array