হারিয়ে যাচ্ছে শহরের কাক, নীরব হচ্ছে চেনা নগরজীবন
একসময় ভোরের ঘুম ভাঙত কাকের ডাকে। ছাদের কার্নিশে, বৈদ্যুতিক তারে, পুরোনো গাছের ডালে কিংবা বাড়ির উঠানে দেখা মিলত কালো পালকের চিরচেনা পাখিটির। দুপুরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসত ‘কা-কা’ শব্দ। কখনো বিরক্তির কারণ, কখনো নিঃসঙ্গ দুপুরের সঙ্গী—কাক ছিল শহুরে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অথচ সেই পরিচিত দৃশ্য ও শব্দ এখন অনেক জায়গাতেই যেন অতীতের স্মৃতি। কংক্রিটের বিস্তারে বদলে যাওয়া শহরে প্রশ্ন উঠছে, কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে কাকেরা?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু একটি পাখির অনুপস্থিতি নয়, বরং বদলে যাওয়া নগরজীবন, সংকুচিত সবুজ, আবাসস্থলের সংকট এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির ক্রমশ দূরত্ব তৈরি হওয়ার চিত্র সামনে আসে। যে শহর একসময় কাকের সঙ্গে সহাবস্থানে অভ্যস্ত ছিল, সেই শহরেই এখন পাখিটির অস্তিত্ব নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
কাকের ডাকে জড়িয়ে ছিল শৈশবের শহর
শহরের পুরোনো দিনের স্মৃতিতে কাকের উপস্থিতি ছিল অনিবার্য। সকালে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি, ছুটির দিনের অলস দুপুর, ছাদের রোদে শুকাতে দেওয়া কাপড় কিংবা বাড়ির আঙিনায় পড়ে থাকা খাবার—সবকিছুর সঙ্গেই কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে ছিল কাক।
মা যখন ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন, বাইরে তখন কাকের ডাক শোনা যেত। স্কুল থেকে ফিরে জানালা দিয়ে তাকালে দেখা মিলত ছাদের কার্নিশে বসে থাকা কয়েকটি কাকের। বাড়ির কেউ খাবার ফেললে মুহূর্তেই সেখানে হাজির হতো তারা। কখনো কাপড়ের ওপর বসে বিরক্ত করত, কখনো আবার দল বেঁধে উড়ে যেত এক ছাদ থেকে অন্য ছাদে। এসব দৃশ্যের মধ্যে আলাদা কোনো বিস্ময় ছিল না। কারণ, কাক ছিল শহরের স্বাভাবিক বাসিন্দা। তাদের উপস্থিতি এতটাই পরিচিত ছিল যে অনুপস্থিতি নিয়ে ভাবার প্রয়োজন পড়ত না।
কিন্তু সময় বদলেছে। বদলেছে বাড়িঘর, মানুষের জীবনযাপন ও শহরের শব্দ। সেই পরিবর্তনের ভিড়ে কাকের ডাকও যেন ধীরে ধীরে পেছনে পড়ে যাচ্ছে। কোথাও এখনো তাদের দেখা মেলে, তবে অনেকের স্মৃতিতে থাকা সেই সর্বত্র উপস্থিতির দৃশ্য আর আগের মতো চোখে পড়ে না।
গাছ কমেছে, সংকুচিত হয়েছে পাখির আবাস
শহরে কাকের উপস্থিতি কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আবাসস্থলের পরিবর্তন। একসময় পাড়া-মহল্লায় ছিল বড় বড় গাছ, পুরোনো বাড়ির কার্নিশ, খোলা ছাদ এবং পাখির বাসা তৈরির উপযোগী নানা জায়গা। নগরায়ণের বিস্তারে এসব জায়গার অনেকগুলোই হারিয়ে যাচ্ছে। একতলা কিংবা দোতলা বাড়ির জায়গায় তৈরি হচ্ছে বহুতল ভবন। বাড়ছে সড়ক, পার্কিংয়ের জায়গা ও বাণিজ্যিক স্থাপনা। উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনে অনেক এলাকায় গাছপালাও কমে যাচ্ছে। ফলে পাখিদের আশ্রয়, বিশ্রাম এবং বাসা তৈরির উপযোগী জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।
কাক তুলনামূলকভাবে অভিযোজনক্ষম পাখি। মানুষের বসতির কাছাকাছি থেকেও তারা খাবার সংগ্রহ করতে পারে, গাছ কিংবা ভবনের বিভিন্ন অংশে আশ্রয় নিতে পারে। তবে অভিযোজনক্ষমতা থাকলেই যে সব ধরনের নগর পরিবর্তনের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নেওয়া সম্ভব, তা নয়। নিরাপদ বাসা, উপযুক্ত খাদ্য এবং বিশ্রামের জায়গার অভাব তাদের বসতি বদলে দিতে পারে। শহরের গাছ কমে যাওয়ার অর্থ তাই শুধু ছায়া হারানো নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় অসংখ্য পাখি ও ক্ষুদ্র প্রাণীর আবাসের সুযোগও।
পরিচ্ছন্ন শহর, কিন্তু খাবার কোথায়?
কাকের জীবনযাপনের সঙ্গে মানুষের ফেলে দেওয়া খাবারের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাসাবাড়ি, বাজার, খাবারের দোকান এবং উন্মুক্ত বর্জ্যস্থল থেকে তারা খাবার সংগ্রহ করে। এ কারণে কাককে শহরের পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পাখি হিসেবেও দেখা হয়।
কিন্তু নগর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এলে তাদের খাদ্য সংগ্রহের সুযোগও বদলে যেতে পারে। আবর্জনা ঢেকে রাখা, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য সংরক্ষণ এবং দ্রুত বর্জ্য অপসারণের ফলে কাকের জন্য সহজলভ্য খাবার কমে যেতে পারে। এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—পরিচ্ছন্নতা অবশ্যই জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য প্রয়োজনীয়। শহরকে অপরিচ্ছন্ন রেখে পাখিদের খাবারের ব্যবস্থা করার কোনো যুক্তি নেই। বরং প্রয়োজন এমন নগর ব্যবস্থাপনা, যেখানে বর্জ্য সঠিকভাবে নিষ্পত্তি হবে, একই সঙ্গে গাছপালা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক আবাসও সংরক্ষিত থাকবে।
খাদ্যের সহজলভ্যতা কমে গেলে কাক অন্য এলাকায় চলে যেতে পারে কিংবা বিকল্প খাদ্যের সন্ধানে তাদের আচরণ বদলাতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট শহরে কাক কমে যাওয়ার পেছনে খাদ্যসংকট কতটা দায়ী, তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন।
শব্দের শহরে হারিয়ে যায় পাখির ডাক
শহরের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো অবিরাম শব্দ। যানবাহনের হর্ন, নির্মাণকাজ, জেনারেটর, শিল্পকারখানা ও মানুষের কোলাহল মিলিয়ে নগরজীবনে শব্দের বিরাম খুব কম। পাখিদের যোগাযোগ, সঙ্গী খোঁজা এবং বিপদের সংকেত দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত শব্দ তাদের যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। শব্দদূষণ বিভিন্ন পাখির আচরণ ও আবাস নির্বাচনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
কাকের ক্ষেত্রেও নগরের শব্দের প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। তবে শুধু শব্দদূষণের কারণেই শহর থেকে কাক হারিয়ে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য নির্দিষ্ট তথ্য প্রয়োজন। আবাসস্থল, খাদ্যের প্রাপ্যতা, প্রজননের সাফল্য এবং পরিবেশগত অন্যান্য পরিবর্তনের সঙ্গে বিষয়টি মিলিয়ে দেখতে হবে। শহর যত বেশি যান্ত্রিক হয়ে উঠছে, ততই প্রকৃতির স্বাভাবিক শব্দগুলো যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তন মানুষের অনুভূতিতেও প্রভাব ফেলে। একসময় যে শব্দকে বিরক্তিকর মনে হতো, তার অনুপস্থিতিই এখন কারও কারও মনে শূন্যতা তৈরি করছে।
কাক কমে যাওয়া কি পরিবেশের সতর্কবার্তা?
কাক কেবল পরিচিত একটি পাখি নয়; নগর বাস্তুতন্ত্রেও তাদের ভূমিকা রয়েছে। তারা বিভিন্ন ধরনের খাদ্য গ্রহণ করে এবং মৃত প্রাণী ও জৈব বর্জ্য খেয়ে পরিবেশে পচনশীল উপাদান অপসারণে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে তারা খাদ্যজালেরও অংশ। তবে কাকের সংখ্যা কমে গেলে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে—এমন দাবি করার আগে প্রমাণ প্রয়োজন। কোনো এলাকায় কাকের প্রকৃত সংখ্যা কমেছে কি না, নাকি তাদের চলাচলের স্থান পরিবর্তিত হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শহরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত পাখি গণনা, বাসা ও প্রজননের তথ্য সংগ্রহ এবং খাদ্য ও আবাসস্থলের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব। পরিবেশবিদ, নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বিত উদ্যোগ এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে। কাকের উপস্থিতি নিয়ে মানুষের স্মৃতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও স্মৃতি দিয়ে একা কোনো প্রজাতির সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না। প্রয়োজন পর্যবেক্ষণ, তথ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা।
কাক ফিরিয়ে আনতে শহরকে কি নতুন করে ভাবতে হবে?
নগর উন্নয়ন থামিয়ে দেওয়া নয়, বরং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শহর গড়ে তোলাই হতে পারে কার্যকর পথ। পুরোনো গাছ সংরক্ষণ, নতুন গাছ লাগানো, ছাদবাগান ও সবুজ জায়গা বাড়ানো এবং পাখির নিরাপদ আবাস বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে খাবারের উচ্ছিষ্ট যত্রতত্র পড়ে না থাকে এবং পরিবেশও দূষিত না হয়। কীটনাশক ও অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কমানো এবং পাখিদের প্রজননস্থল সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শহরের কোন এলাকায় কাকের উপস্থিতি কমছে, কোথায় তারা এখনো নিয়মিত আসে এবং কী ধরনের পরিবেশে তাদের দেখা বেশি মেলে—এসব তথ্য সংগ্রহ করা গেলে পরিকল্পনা গ্রহণ সহজ হবে। নাগরিকদেরও পাখি পর্যবেক্ষণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে যুক্ত করা যেতে পারে। কাককে ভালোবাসতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু মানুষের সঙ্গে সহাবস্থানকারী একটি প্রজাতির জন্য শহরে উপযুক্ত পরিবেশ রাখা প্রকৃতি সংরক্ষণেরই অংশ।
কাকের ডাক কি ফিরবে শহরে?
শহর বদলাবে, নতুন ভবন উঠবে, সড়ক বাড়বে, মানুষের জীবনযাপনও পরিবর্তিত হবে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যে প্রকৃতির জন্য কতটুকু জায়গা থাকবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। কাকের ডাক হয়তো একসময় অনেকের কাছে ছিল বিরক্তির, আবার কারও কাছে ছিল শৈশবের পরিচিত শব্দ। আজ সেই ডাক কম শোনা গেলে স্মৃতির পাশাপাশি সামনে আসে পরিবেশের প্রশ্নও। যে শহর একসময় পাখির সঙ্গে নিজের দৈনন্দিন জীবন ভাগ করে নিত, সেখানে পাখিদের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে কি না, তা ভেবে দেখার সময় এসেছে।
কাকেরা কি সত্যিই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছে, নাকি শহরের ভেতরেই তাদের পরিচিত আবাস ও খাদ্য সংগ্রহের জায়গা বদলে যাচ্ছে? নিশ্চিত উত্তর পেতে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—শহরকে শুধু মানুষের বসবাসের উপযোগী করলেই চলবে না, সেখানে অন্য প্রাণীর অস্তিত্বের সুযোগও রাখতে হবে। হয়তো কোনো এক ভোরে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আবার শোনা যাবে সেই পরিচিত ‘কা-কা’ ডাক। তখন সেটি শুধু একটি পাখির শব্দ থাকবে না; মনে করিয়ে দেবে, কংক্রিটের শহরেও প্রকৃতির জন্য জায়গা রাখা সম্ভব।
কারণ, শহর শুধু ভবন, সড়ক আর মানুষের সমষ্টি নয়। শহরের প্রাণ আছে তার গাছপালা, পাখি, আলো-বাতাস এবং মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সহাবস্থানে। কাকের অনুপস্থিতি সেই সহাবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবারই একটি উপলক্ষ।
কালের আলো/জেএন/এসএ


আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]