খুঁজুন
                               
, ,
           

কদমবুসি সংস্কৃতিকে ‘না’, সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির চর্চা তারেক রহমানের

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৬, ১০:৩৪ অপরাহ্ণ
কদমবুসি সংস্কৃতিকে ‘না’, সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির চর্চা তারেক রহমানের

কালের আলো রিপোর্ট:

দেশের রাজনীতি থেকে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি উবে গিয়েছিল। আদর্শ নীতি-নৈতিকতার বদলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ও কাদা ছোড়ার রাজনীতির প্র্যাকটিস চালু করেছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু ১৭ বছরের যুক্তরাজ্যের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেই বিভিন্ন মত-পথের নেতাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির চর্চার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিভাজন আর হিংসা ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার। দেশে ফিরে কোটি জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মানুষের স্বার্থে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্যে দিয়ে দেশের মাটিতে নতুন বছরের যাত্রা শুরু করেন।

পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হিংসা ও বিদ্বেষ পরিহার করে তিনি সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এক সময়ের মিত্র থেকে রাজনৈতিক বৈরী সম্পর্কের প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানকে নিয়ে পাশাপাশি বসেছেন। মা তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে আসা জামায়াত আমিরকে নিজের পাশে বসিয়ে কথা বলেন। একজন দলীয় প্রধান হিসেবে নিজেকে কেন্দ্রস্থলে রাখার পরিবর্তে সমমর্যাদার পরিবেশ তৈরির এই আচরণ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। একইভাবে, যে ডাকসু ছাত্র নেতারা তার বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মিছিল করেছে, তাদের সঙ্গেও তিনি সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘মতের ভিন্নতা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের ঐক্যমত অটুট থাকতে হবে।’ দেশের স্বার্থে তিনি তরুণ সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বানও জানিয়েছেন।

ডাকসু নেতাদের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকালে তারেক রহমানের আচরণে রাজনৈতিক বদান্যতা ফুটে উঠেছে, যার প্রশংসা করেছেন বিশ্লেষকরা। একইভাবে, দেশের প্রথম সারির গুরুত্বপূর্ণ দৈনিক আমার দেশের মজলুম সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতকেও সবাই ইতিবাচকভাবে দেখছেন। এই সাক্ষাৎ তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিপক্কতা ও সংযমের প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দেশে ফেরার একদিন পর যখন তিনি সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাচ্ছিলেন তখনও তিনি লাল-সবুজের বুলেটপ্রুফ বাসের ভেতরে দাঁড়িয়ে দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের কাছে হাতের ইশারায় দোয়া চেয়েছেন। সম্প্রতি গুলশান কার্যালয়ে দলটির দু’জন নেতা তাকে পা ছুঁয়ে সালাম করার জন্য এগিয়ে এলে তিনি হাত দিয়ে তাদের সরিয়ে দেন। বিষয়টিকে অনেকেই তোষামোদের রাজনীতির বিরুদ্ধে তারেক রহমানের স্পষ্ট বার্তা হিসেবেই অভিহিত করেছেন। ভাইরাল ভিডিও চিত্রে উভয় জায়গায় তারেক রহমানকে বেশ বিব্রত দেখা গেছে। পদরেণুপ্রার্থীদের হাত তাঁর পায়ে পৌঁছানোর আগেই তিনি পা সরিয়ে নিয়েছেন। এর মাধ্যমে তারেক রহমান কদমবুসি সংস্কৃতিকে ‘না’ জানিয়ে দিয়েছেন।

তারেক রহমান ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কোন অহংবোধ তাকে স্পর্শ করেনি। মায়ের অন্তিম বিদায়ের দিনে কোটি মানুষের অংশগ্রহণের জানাজায় তিনি কোন রাজনৈতিক বক্তব্য দেননি। কাউকে দোষারোপ বা কারো প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করে কোন বক্তব্য রাখেননি। দেশ-বিদেশের কোটি কোটি মানুষ তাঁর এই বিনয়াবনত কণ্ঠকে পছন্দ করেছেন। দলের প্রতিটি অনুষ্ঠানে তিনি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যদেরও যথেষ্ট শ্রদ্ধার সঙ্গে মর্যাদা দিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। রোববার (৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে গুলশানের দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতারা আসেন তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তিনি কার্যালয়ের নির্দিষ্ট সেই কক্ষে প্রবেশ করেই সবাইকে সালাম জানিয়ে হ্যান্ডশেক করে নিজের আসনে গিয়ে বসেন। তাঁর দু’পাশেই বসেছিলেন দলটির সিনিয়র নেতারা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতাদের কণ্ঠে বিনিয়োগ স্থবিরতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ক্ষোভ ও হতাশার কথাই উঠে আসে। তারেক রহমান তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাঁদের সব সমস্যার সমাধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

দেশে আসার পাঁচদিনের মাথায় মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে চিরদিনের জন্য হারিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমান। মা হারানো শোকাহত সন্তানকে সান্ত্বনা দিতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ আসছেন তাকে সমবেদনা জানাতে। সোমবার (০৫ জানুয়ারি) তারেক রহমানকে সমবেদনা জানাতে আসা একজন বয়স্ক নারীর পরম মমতায় মাতৃস্নেহে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সেই বয়োবৃদ্ধ নারী বিএনপির প্রয়াত সাবেক মহাসচিব ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের সহধর্মিণী মাহমুদা সালাম। এমন একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেছেন দৈনিক দিনকালের ফটো সাংবাদিক বাবুল তালুকদার। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ফেসবুকে শেয়ার করছেন।

পোস্টে বাবুল তালুকদার গুলশান কার্যালয়ের এমন ব্যতিক্রমী ঘটনার ছোট্ট বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন-‘সালাম তালুকদারের স্ত্রী তারেক রহমানকে বলেন, বাবা, আমি তোমাকে দোয়া করতে এসেছি, কিন্তু আমি তোমাকে কীভাবে ডাকবো?’ পরে প্রয়াত মহাসচিবের স্ত্রী বলেন, ‘তাহলে বাবা আমি তোমাকে আমি তুমি করেই বলছি।’ তারেক রহমান বললেন, ‘জি, আপনি বলেন।’ সালাম তালুকদার স্ত্রী তখন বলেন, ‘বাবা আমি তোমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে চাই।’ এমন আগ্রহের কথা শুনে তারেক রহমান বলেন, ‘নিশ্চয়ই!’ তারপর পরম মমতায় মা হারানো শোকাহত ছেলের মাথায় মাতৃস্নেহে হাত বুলিয়ে দিলেন মাহমুদা সালাম। বাবুল তালুকদার জানান, সোমবার বিএনপির সাবেক মহাসচিব, সাবেক মন্ত্রী আবদুস সালাম তালুকদারের সহধর্মিণী মিসেস মাহমুদা সালাম গুলশান কার্যালয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শোক বইতে স্বাক্ষর করেন। পরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ড. মো. শামসুজ্জামান মেহেদী, ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের একমাত্র কন্যা সালিমা তালুকদার আরুণী, জামাতা এম হাসান উপস্থিত ছিলেন।

আরও একটি ব্যস্ত দিন অতিবাহিত
দেশে ফেরার ৫ দিনের মাথায় মাকে হারিয়েছেন। বিমর্ষ ও শোকাহত তারেক রহমানকেই দেখেছেন সবাই। কিন্তু শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে প্রতিনিয়ত সময় দল ও দেশের জন্য ব্যয় করছেন। আগের দিনগুলোর মতো মঙ্গলবারও (০৬ জানুয়ারি) আরও একটি ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেছেন তিনি। এদিন সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল। বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ, বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির ও বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিন অংশগ্রহণ করেন।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে ভোটযুদ্ধে অংশ নিবেন। তাঁরই প্রস্তুতি হিসেবে আগামী সপ্তাহে তিনি বগুড়া যাচ্ছেন। ভোটের প্রস্তুতি জোরদারে মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বেলা ১১টায় রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ঢাকা-১৭ আসনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিশেষ মতবিনিময় সভা করেন তিনি। এই সভা শুরু হয়ে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলে। ঢাকা-১৭ আসনের চারটি থানার মধ্যে তিনি মতবিনিময় করেন বনানী থানার নেতাকর্মীদের সঙ্গে। সভায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরসহ থানা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে নাছির উদ্দিন নাছির জানান, নির্বাচন নিয়ে এটি ছিল ধারাবাহিক বৈঠকেরই অংশ। তারেক রহমান ঢাকা-১৭ আসনে ভোটারদের কী কী সমস্যা আছে, তা চিহ্নিত করে সেই বিষয়ে ভোটারদের অঙ্গীকার দেবেন বলে জানান। আগামী সপ্তাহে তারেক রহমান রাজশাহী ও কক্সবাজার সফর করবেন। রাজশাহীতে শহীদ আবু সাঈদ ও কক্সবাজারে শহীদ ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করবেন।

কালের আলো/জেএন/এমএসআইপি

পর্যটনের শহর কক্সবাজারে নিরাপত্তার ঘাটতি, ঝুঁকিতে পর্যটকের জীবন

কক্সবাজার সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৯:২৬ পূর্বাহ্ণ
পর্যটনের শহর কক্সবাজারে নিরাপত্তার ঘাটতি, ঝুঁকিতে পর্যটকের জীবন

আগুনে প্রাণহানি, পাহাড়ি সড়কে ডাকাতি, সৈকতে ছিনতাই ও ডুবে মৃত্যু; অনুমোদনহীন স্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছর ৮০ থেকে ৯০ লাখ পর্যটক ছুটে আসেন কক্সবাজারে। দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, পাহাড় আর নীল জলরাশির আকর্ষণে মুখর থাকে দেশের প্রধান এই পর্যটন গন্তব্য। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি, পাহাড়ি সড়কে ডাকাতি, সৈকতে ডুবে মৃত্যু এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রমে দুর্ঘটনার ঘটনায় পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অনুমোদনহীন স্থাপনা, পর্যাপ্ত উদ্ধারসেবার অভাব এবং নজরদারির দুর্বলতা দূর করা না গেলে পর্যটনশিল্পের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গত ১৭ অক্টোবর উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুনে ১০ জনের মৃত্যু নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। তিনতলা কাঠের স্থাপনাটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়লে প্রাণ হারান ভেতরে থাকা ১০ জন। প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা অনুমোদন ছিল না। এর আগে সতর্কতা বা নোটিস দেওয়ার বিষয়টিও সামনে এসেছে। অগ্নিকাণ্ডে অবহেলার অভিযোগে ২৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। রিসোর্টের ম্যানেজারকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।

এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা চিহ্নিত হওয়ার পরও সেখানে পর্যটকদের অবস্থানের সুযোগ ছিল কীভাবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু পরিদর্শন ও নোটিস নয়, নিয়ম ভঙ্গকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকার মতে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দুই শতাধিক স্থাপনা পরিদর্শন ও নোটিস দেওয়ার বিষয়টি সামনে এলেও কতটি প্রতিষ্ঠান নিয়ম মেনেছে, কতটির কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে এবং কতটিতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে, তার স্বচ্ছ হিসাব প্রয়োজন।

পাহাড়ি সড়কে ডাকাতি, শহরে ছিনতাইয়ের অভিযোগ

রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের শোক কাটতে না কাটতেই ১৯ অক্টোবর ঈদগাঁও-ঈদগড়-বাইশারী সড়কের হিমছড়ি ঢালায় একই দিনে দুই দফা ডাকাতির ঘটনায় আতঙ্ক ছড়ায়। সকালে সিএনজিচালিত অটোরিকশার এক যাত্রীর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরে দুপুরে অস্ত্রধারীদের তৎপরতায় কয়েকটি যানবাহনের যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুটের অভিযোগ ওঠে। ভুক্তভোগীদের কেউ ১ লাখ ২০ হাজার, কেউ দেড় লাখ টাকা হারিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।

পরে অভিযান চালিয়ে লুট হওয়া মালামাল ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি দুজনকে আটকের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। তবে দিনের আলোয় এমন ঘটনার কারণে সড়কটির নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জেলা পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত কক্সবাজারে ডাকাতির ১৪টি, দস্যুতার ২৩টি এবং চুরির ১৬০টি মামলা হয়েছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে ডাকাতির মামলা ছিল ১৬টি, দস্যুতার ২৫টি এবং চুরির ১৫৭টি। অর্থাৎ ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা কমলেও চুরির মামলা বেড়েছে।

এ ছাড়া কক্সবাজার শহরে পর্যটকদের ছিনতাই, হয়রানি ও প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। অপরিচিত এলাকায় যাতায়াত ও হোটেল খোঁজার জন্য অনেক পর্যটক অটোরিকশা ও টমটমচালকদের ওপর নির্ভর করেন। এই সুযোগে কাউকে নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া বা হয়রানির অভিযোগও পাওয়া যায়। তবে সব ঘটনা থানায় নথিভুক্ত না হওয়ায় প্রকৃত পরিস্থিতি নিরূপণ কঠিন।

সৈকতে ডুবে তিন বছরে ৪০ জনের মৃত্যু

কক্সবাজারের প্রধান আকর্ষণ সমুদ্রসৈকত হলেও গোসল করতে নেমে প্রাণ হারাচ্ছেন পর্যটকেরা। প্রবল স্রোত, সমুদ্রের তলদেশের গর্ত, গুপ্তখাল এবং ঢেউয়ের আচরণ সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেকে বিপদে পড়েন। বিস্তীর্ণ সৈকতের সব এলাকায় সমানভাবে উদ্ধারসেবা না থাকায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।

সি-সেফ লাইফগার্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের সৈকতের নির্দিষ্ট এলাকায় ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ১২ জন, ২০২৫ সালে ২০ জন এবং ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আটজন মারা যান। একই সময়ে সমুদ্রে বিপদে পড়া ৪৭৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

সংস্থাটির হিসাবে, ২০১৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টে ডুবে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে অন্তত ১ হাজার ৭৭ জনকে।

প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের মধ্যে লাবণী, সুগন্ধা ও কলাতলী পয়েন্টের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর মধ্যে নিরাপদে গোসলের জন্য লাইফগার্ডের আওতাভুক্ত এলাকা প্রায় দেড় কিলোমিটার। সি-সেফের ২৭ জন লাইফগার্ডকর্মী পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।

সি-সেফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার সাইফুল্লাহ সিফাত বলেন, বিপদের মুহূর্তে দ্রুত উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং হাসপাতালে নেওয়ার সমন্বিত ব্যবস্থা জরুরি। কয়েক মিনিটের বিলম্বও প্রাণহানির কারণ হতে পারে। পর্যটকের চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উদ্ধারসেবার পরিধি ও জনবল বাড়ানো প্রয়োজন।

অনুমোদনহীন প্যারাসেইলিংয়েও প্রাণহানি

সমুদ্রসৈকতে গোসলের পাশাপাশি প্যারাসেইলিংয়ের মতো বিনোদন কার্যক্রমেও নিরাপত্তার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। গত ১ আগস্ট দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিং করতে গিয়ে সাগরে পড়ে মারা যান খুলনার পর্যটক শৌভিক রায়। ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই সময়ে প্যারাসেইলিং পরিচালনার অনুমোদন ছিল না। প্রতিকূল আবহাওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশনা অমান্য করে তা চালানোর অভিযোগও ওঠে।

একই প্রতিষ্ঠানের প্যারাসেইলিং কার্যক্রমে গত ১০ বছরে অন্তত ১৯ জন পর্যটক আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের কেউ রশি ছিঁড়ে সাগরে পড়েছেন, কেউ ঝাউবাগানে আটকে পড়েছেন, আবার কেউ বালুচরে পড়ে আহত হয়েছেন।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টুয়াক) উপদেষ্টা মফিজুর রহমানের অভিযোগ, প্রশাসনিক তদারকি ছাড়াই অনভিজ্ঞ লোকজন দিয়ে প্যারাসেইলিং পরিচালনা করা হচ্ছে। সংগঠনটির সভাপতি আনোয়ার কামালের মতে, এ ধরনের বিনোদন কার্যক্রম আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তাব্যবস্থা মেনে পরিচালনা করা জরুরি।

সড়ক ও রেলপথেও উদ্বেগ

পর্যটকের নিরাপত্তা শুধু হোটেল, সৈকত কিংবা বিনোদনকেন্দ্রে সীমাবদ্ধ নয়; যাতায়াতের পথও নিরাপদ হওয়া প্রয়োজন। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কক্সবাজার জেলার মহাসড়কে ১০৬টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হন। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬১টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ৭৪ জনের। এ ছাড়া রেলপথে পাথর নিক্ষেপের ৫০টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে, যাতে শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

কক্সবাজার হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক করিম উল্লাহ কলিম বলেন, নিরাপত্তাহীনতার প্রভাব পর্যটন ব্যবসায়ও পড়ে। ইনানীর অগ্নিকাণ্ডের পর মেরিন ড্রাইভের পাশের কিছু রিসোর্টে বুকিং কমে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে। যদিও শহরের হোটেলগুলোতে পর্যটকের উপস্থিতি বাড়ার তথ্যও রয়েছে, তবু নিরাপত্তা নিয়ে নেতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে পড়লে পুরো পর্যটন গন্তব্যের সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সমন্বিত নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, পর্যটনকে নিরাপদ করতে বিচ্ছিন্ন অভিযান কিংবা দুর্ঘটনার পর তদন্ত যথেষ্ট নয়। অনুমোদনহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ হোটেল-রিসোর্টের তালিকা প্রকাশ, অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই, নিয়ম ভাঙলে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে টহল বাড়ানো এবং সৈকতে লাইফগার্ডের পরিধি সম্প্রসারণ জরুরি।

তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন ও মাঠপর্যায়ে কার্যকর নজরদারি ছাড়া শুধু নির্দেশনা দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।

সামাজিক সংগঠন আমরা কক্সবাজারবাসীর সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিনের মতে, পর্যটন এলাকায় নিয়মিত পুলিশি টহল, হোটেল-মোটেল জোন ও নির্জন সড়কে সিসিটিভি নজরদারি, ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি পথে নিরাপত্তাচৌকি এবং সৈকতে পর্যাপ্ত উদ্ধারকর্মী নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি হোটেল-রিসোর্টের অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তা নিয়মিত যাচাই এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন কার্যক্রমে প্রশিক্ষিত কর্মী ও মানসম্মত সরঞ্জাম ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

পর্যটকেরা যাতে সহজে জানতে পারেন কোন হোটেল বা রিসোর্ট অনুমোদিত, কোন বিনোদন কার্যক্রম বৈধ এবং কোথায় লাইফগার্ডের সহায়তা পাওয়া যায়, সে ব্যবস্থাও গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, সমুদ্রের সৌন্দর্য দেখতে এসে কোনো পর্যটক যেন প্রাণ হারিয়ে কিংবা আতঙ্কের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফিরতে বাধ্য না হন, সে লক্ষ্যে কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের সঙ্গে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা জড়িত। তাই পর্যটকের জীবন রক্ষা, নিরাপদ যাতায়াত, অনুমোদিত স্থাপনা নিশ্চিত করা এবং দ্রুত উদ্ধারসেবা চালুর মাধ্যমে পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারলেই কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পের দীর্ঘমেয়াদি বিকাশ টেকসই হবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

অবরোধের জেরে সাজেক বন্ধ, পর্যটকদের জন্য সময় বেঁধে দিল প্রশাসন

রাঙামাটি সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ২:০৩ পূর্বাহ্ণ
অবরোধের জেরে সাজেক বন্ধ, পর্যটকদের জন্য সময় বেঁধে দিল প্রশাসন

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক ভ্যালি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন। বুধবার (২১ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ থাকবে। একই সঙ্গে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বিকেল ৪টার মধ্যে এলাকা ছেড়ে নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বুধবার সন্ধ্যায় রাঙামাটির  জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী স্বাক্ষরিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।

পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ সাজেক
জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার অন্তর্গত সাজেক ভ্যালি পর্যটনকেন্দ্র সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। বর্তমানে পর্যটন এলাকায় অবস্থানরত সবাইকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাজেক ত্যাগ করে নিরাপদে গন্তব্যে ফিরে যেতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের এই নির্দেশের ফলে সাজেকে ভ্রমণের পরিকল্পনা করা পর্যটকদের আপাতত সেখানে যাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পর্যটনকেন্দ্রটি পুনরায় চালুর বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকতে হবে।

সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ঘোষণা
এদিকে বুধবার বিকেলে সাজেক সড়কে আবারও অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি। সংগঠন দুটি বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) থেকে এই কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয়। সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা এবং সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কর্মসূচির কথা জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বুধবারের মধ্যেই পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল।

জরুরি যানবাহন অবরোধের আওতামুক্ত
সংগঠন দুটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত অবরোধ চলবে। তবে অবরোধের সময় জরুরি ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, লাশবাহী গাড়ি, জরুরি ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন এবং সংবাদপত্র বহনকারী যান চলাচলের ক্ষেত্রে ছাড় থাকবে। সংবাদ সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত সাংবাদিকদের গাড়িও অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে। সাজেক সড়কে নতুন করে অবরোধের ঘোষণার পরই পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধের সিদ্ধান্ত জানাল প্রশাসন। ফলে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এলাকা ছাড়তে বলা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রটি বন্ধ থাকবে।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি

ভোটার তালিকায় মৃত ঘোষণা, অথচ প্রতিবছর ভোট দিচ্ছেন তিনি!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫২ পূর্বাহ্ণ
ভোটার তালিকায় মৃত ঘোষণা, অথচ প্রতিবছর ভোট দিচ্ছেন তিনি!

ভারতের ভোটার তালিকায় মৃত হিসেবে নাম উঠেছে ৫৩ বছর বয়সী কামতা প্রসাদের। অথচ তিনি বেঁচে আছেন, নিয়মিত কাজ করছেন এবং বছরের পর বছর ভোটও দিয়েছেন। জীবিত থাকা সত্ত্বেও সরকারি নথিতে মৃত হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় এবার নিজের অস্তিত্ব ও ভোটাধিকার প্রমাণ করতে সরকারি দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হচ্ছে দিল্লির এই দর্জিকে।

ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কার্যক্রম ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্কের মধ্যে কামতা প্রসাদের ঘটনাটি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে ভোটার তালিকা হালনাগাদের প্রক্রিয়া নিয়ে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তার এই ভোগান্তির কথা উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ভোটার তালিকা সংশোধনের উদ্যোগে প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে দিল্লিতেই বাদ পড়েছেন প্রায় ৪২ লাখ ভোটার।

নাম ও পরিচয়ে ভুল, তালিকায় মৃত কামতা
কামতা প্রসাদের নাম ভোটার তালিকায় ‘কান্তা প্রসাদ’ হিসেবে লেখা হয়েছে। নতুন তালিকায় তাকে মৃত দেখানো হয়েছে। ফলে দীর্ঘদিনের ভোটার হওয়া সত্ত্বেও নিজের পরিচয় সংশোধন এবং ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পেতে তাকে প্রশাসনিক জটিলতার মুখে পড়তে হচ্ছে। একজন জীবিত নাগরিককে সরকারি নথিতে মৃত হিসেবে চিহ্নিত করার ঘটনা ভোটার তালিকা সংশোধনের নির্ভুলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। নামের ভুল, তথ্য যাচাইয়ের সীমাবদ্ধতা কিংবা প্রশাসনিক ত্রুটির কারণে কোনো ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে তাকে নিজের পরিচয় প্রমাণের জন্য দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।

১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়া নিয়ে বিতর্ক
ভারতে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন কার্যক্রম ঘিরে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। দিল্লিতেও বাদ পড়েছেন প্রায় ৪২ লাখ ভোটার। বিরোধী দল ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়ায় প্রকৃত ভোটারদের ভোটাধিকার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বিজেপি নির্বাচনে সুবিধা পেতে পারে। তবে নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে নিম্ন আয়ের মানুষ
ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষের দুর্ভোগ বিশেষভাবে সামনে এসেছে। প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাব, ঠিকানা যাচাই এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে অনেকের পক্ষে নিজেদের ভোটার পরিচয় পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কার পাশাপাশি সরকারি রেশন ও অন্যান্য জনকল্যাণমূলক সুবিধা পাওয়া নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহের সামর্থ্য সীমিত, তাদের জন্য সরকারি দপ্তরে বারবার যাতায়াত করা বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

নাম ফেরানোর সুযোগ থাকলেও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভোগান্তি
বিতর্কের মধ্যে বাদ পড়া ভোটারদের তথ্য পুনরায় যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যাদের নাম তালিকা থেকে বাদ গেছে, তারা আবেদন করে নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে আবেদন, নথিপত্র সংগ্রহ এবং পরিচয় যাচাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনেকের জন্য ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কামতা প্রসাদের ঘটনাও সেই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। জীবিত একজন নাগরিককে নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে, অথচ তার ভোট দেওয়ার অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা ছিল নির্ভুল সরকারি নথির মাধ্যমেই।

ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন
কামতা প্রসাদের ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির নাম ভুলভাবে নথিভুক্ত হওয়ার বিষয় নয়। এটি ভোটার তালিকা সংশোধনের স্বচ্ছতা, নির্ভুলতা এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার সুরক্ষার প্রশ্ন সামনে এনেছে।নির্বাচন পরিচালনার জন্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারদের নাম ভুলবশত বাদ পড়লে তার দায় ও ভোগান্তি শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিককেই বহন করতে হয়। তাই তালিকা সংশোধনের পাশাপাশি বাদ পড়া ভোটারদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং তাদের অধিকার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কামতা প্রসাদের মতো কেউ যেন জীবিত থেকেও সরকারি নথিতে মৃত হয়ে না থাকেন, তা নিশ্চিত করতে ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় নির্ভুলতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি