কদমবুসি সংস্কৃতিকে ‘না’, সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির চর্চা তারেক রহমানের
কালের আলো রিপোর্ট:
দেশের রাজনীতি থেকে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি উবে গিয়েছিল। আদর্শ নীতি-নৈতিকতার বদলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ও কাদা ছোড়ার রাজনীতির প্র্যাকটিস চালু করেছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার। কিন্তু ১৭ বছরের যুক্তরাজ্যের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফিরেই বিভিন্ন মত-পথের নেতাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির চর্চার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিভাজন আর হিংসা ভুলে মানুষের পাশে দাঁড়ানো তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার। দেশে ফিরে কোটি জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে মানুষের স্বার্থে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সাক্ষাতের মধ্যে দিয়ে দেশের মাটিতে নতুন বছরের যাত্রা শুরু করেন।
পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে হিংসা ও বিদ্বেষ পরিহার করে তিনি সৌহার্দ্যপূর্ণ রাজনীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এক সময়ের মিত্র থেকে রাজনৈতিক বৈরী সম্পর্কের প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানকে নিয়ে পাশাপাশি বসেছেন। মা তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে আসা জামায়াত আমিরকে নিজের পাশে বসিয়ে কথা বলেন। একজন দলীয় প্রধান হিসেবে নিজেকে কেন্দ্রস্থলে রাখার পরিবর্তে সমমর্যাদার পরিবেশ তৈরির এই আচরণ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নতুন বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। একইভাবে, যে ডাকসু ছাত্র নেতারা তার বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ স্লোগান দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মিছিল করেছে, তাদের সঙ্গেও তিনি সাক্ষাৎ করেছেন। তাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘মতের ভিন্নতা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমাদের ঐক্যমত অটুট থাকতে হবে।’ দেশের স্বার্থে তিনি তরুণ সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বানও জানিয়েছেন।
ডাকসু নেতাদের সঙ্গে এই সাক্ষাৎকালে তারেক রহমানের আচরণে রাজনৈতিক বদান্যতা ফুটে উঠেছে, যার প্রশংসা করেছেন বিশ্লেষকরা। একইভাবে, দেশের প্রথম সারির গুরুত্বপূর্ণ দৈনিক আমার দেশের মজলুম সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতকেও সবাই ইতিবাচকভাবে দেখছেন। এই সাক্ষাৎ তারেক রহমানের রাজনৈতিক পরিপক্কতা ও সংযমের প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। দেশে ফেরার একদিন পর যখন তিনি সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাচ্ছিলেন তখনও তিনি লাল-সবুজের বুলেটপ্রুফ বাসের ভেতরে দাঁড়িয়ে দলীয় নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের কাছে হাতের ইশারায় দোয়া চেয়েছেন। সম্প্রতি গুলশান কার্যালয়ে দলটির দু’জন নেতা তাকে পা ছুঁয়ে সালাম করার জন্য এগিয়ে এলে তিনি হাত দিয়ে তাদের সরিয়ে দেন। বিষয়টিকে অনেকেই তোষামোদের রাজনীতির বিরুদ্ধে তারেক রহমানের স্পষ্ট বার্তা হিসেবেই অভিহিত করেছেন। ভাইরাল ভিডিও চিত্রে উভয় জায়গায় তারেক রহমানকে বেশ বিব্রত দেখা গেছে। পদরেণুপ্রার্থীদের হাত তাঁর পায়ে পৌঁছানোর আগেই তিনি পা সরিয়ে নিয়েছেন। এর মাধ্যমে তারেক রহমান কদমবুসি সংস্কৃতিকে ‘না’ জানিয়ে দিয়েছেন।
তারেক রহমান ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু কোন অহংবোধ তাকে স্পর্শ করেনি। মায়ের অন্তিম বিদায়ের দিনে কোটি মানুষের অংশগ্রহণের জানাজায় তিনি কোন রাজনৈতিক বক্তব্য দেননি। কাউকে দোষারোপ বা কারো প্রতি বিদ্বেষ প্রকাশ করে কোন বক্তব্য রাখেননি। দেশ-বিদেশের কোটি কোটি মানুষ তাঁর এই বিনয়াবনত কণ্ঠকে পছন্দ করেছেন। দলের প্রতিটি অনুষ্ঠানে তিনি দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির সদস্যদেরও যথেষ্ট শ্রদ্ধার সঙ্গে মর্যাদা দিয়ে কথা বলতে দেখা গেছে। রোববার (৪ জানুয়ারি) সন্ধ্যা ৭টার দিকে গুলশানের দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতারা আসেন তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তিনি কার্যালয়ের নির্দিষ্ট সেই কক্ষে প্রবেশ করেই সবাইকে সালাম জানিয়ে হ্যান্ডশেক করে নিজের আসনে গিয়ে বসেন। তাঁর দু’পাশেই বসেছিলেন দলটির সিনিয়র নেতারা। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতাদের কণ্ঠে বিনিয়োগ স্থবিরতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ক্ষোভ ও হতাশার কথাই উঠে আসে। তারেক রহমান তাঁদের আশ্বস্ত করেছেন, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে তাঁদের সব সমস্যার সমাধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
দেশে আসার পাঁচদিনের মাথায় মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে চিরদিনের জন্য হারিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমান। মা হারানো শোকাহত সন্তানকে সান্ত্বনা দিতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ আসছেন তাকে সমবেদনা জানাতে। সোমবার (০৫ জানুয়ারি) তারেক রহমানকে সমবেদনা জানাতে আসা একজন বয়স্ক নারীর পরম মমতায় মাতৃস্নেহে তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার দৃশ্য ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সেই বয়োবৃদ্ধ নারী বিএনপির প্রয়াত সাবেক মহাসচিব ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের সহধর্মিণী মাহমুদা সালাম। এমন একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেছেন দৈনিক দিনকালের ফটো সাংবাদিক বাবুল তালুকদার। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য ফেসবুকে শেয়ার করছেন।
পোস্টে বাবুল তালুকদার গুলশান কার্যালয়ের এমন ব্যতিক্রমী ঘটনার ছোট্ট বর্ণনা দিয়ে লিখেছেন-‘সালাম তালুকদারের স্ত্রী তারেক রহমানকে বলেন, বাবা, আমি তোমাকে দোয়া করতে এসেছি, কিন্তু আমি তোমাকে কীভাবে ডাকবো?’ পরে প্রয়াত মহাসচিবের স্ত্রী বলেন, ‘তাহলে বাবা আমি তোমাকে আমি তুমি করেই বলছি।’ তারেক রহমান বললেন, ‘জি, আপনি বলেন।’ সালাম তালুকদার স্ত্রী তখন বলেন, ‘বাবা আমি তোমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে চাই।’ এমন আগ্রহের কথা শুনে তারেক রহমান বলেন, ‘নিশ্চয়ই!’ তারপর পরম মমতায় মা হারানো শোকাহত ছেলের মাথায় মাতৃস্নেহে হাত বুলিয়ে দিলেন মাহমুদা সালাম। বাবুল তালুকদার জানান, সোমবার বিএনপির সাবেক মহাসচিব, সাবেক মন্ত্রী আবদুস সালাম তালুকদারের সহধর্মিণী মিসেস মাহমুদা সালাম গুলশান কার্যালয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শোক বইতে স্বাক্ষর করেন। পরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এ সময় বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ড. মো. শামসুজ্জামান মেহেদী, ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের একমাত্র কন্যা সালিমা তালুকদার আরুণী, জামাতা এম হাসান উপস্থিত ছিলেন।
আরও একটি ব্যস্ত দিন অতিবাহিত
দেশে ফেরার ৫ দিনের মাথায় মাকে হারিয়েছেন। বিমর্ষ ও শোকাহত তারেক রহমানকেই দেখেছেন সবাই। কিন্তু শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে প্রতিনিয়ত সময় দল ও দেশের জন্য ব্যয় করছেন। আগের দিনগুলোর মতো মঙ্গলবারও (০৬ জানুয়ারি) আরও একটি ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করেছেন তিনি। এদিন সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দল। বৈঠকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহ, বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির ও বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিন অংশগ্রহণ করেন।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বগুড়া-৬ ও ঢাকা-১৭ আসন থেকে ভোটযুদ্ধে অংশ নিবেন। তাঁরই প্রস্তুতি হিসেবে আগামী সপ্তাহে তিনি বগুড়া যাচ্ছেন। ভোটের প্রস্তুতি জোরদারে মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) বেলা ১১টায় রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ঢাকা-১৭ আসনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিশেষ মতবিনিময় সভা করেন তিনি। এই সভা শুরু হয়ে দুপুর ১টা পর্যন্ত চলে। ঢাকা-১৭ আসনের চারটি থানার মধ্যে তিনি মতবিনিময় করেন বনানী থানার নেতাকর্মীদের সঙ্গে। সভায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও ছাত্রদল সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছিরসহ থানা পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে নাছির উদ্দিন নাছির জানান, নির্বাচন নিয়ে এটি ছিল ধারাবাহিক বৈঠকেরই অংশ। তারেক রহমান ঢাকা-১৭ আসনে ভোটারদের কী কী সমস্যা আছে, তা চিহ্নিত করে সেই বিষয়ে ভোটারদের অঙ্গীকার দেবেন বলে জানান। আগামী সপ্তাহে তারেক রহমান রাজশাহী ও কক্সবাজার সফর করবেন। রাজশাহীতে শহীদ আবু সাঈদ ও কক্সবাজারে শহীদ ওয়াসিম আকরামের কবর জিয়ারত করবেন।
কালের আলো/জেএন/এমএসআইপি


আপনার মতামত লিখুন
Array