রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্ম
জারিফ নিহাল, কালের আলো:
দেশের রাজনীতিতে জিয়া পরিবারের ভূমিকা ঐতিহাসিক। বিরল সম্মানের পাশাপাশি খ্যাতিরও শীর্ষে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন দেশের প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধান। তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তাদের জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার আগেই জনপ্রিয়তার মানদণ্ডে শীর্ষে। এবার রাজনীতিতে অভিষেক ঘটছে জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তারেক রহমানের জ্যেষ্ঠ সন্তান ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। তাঁর মাঝে সবাই দেখছেন দাদি বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিচ্ছবি।
রাজনীতিতে তাঁর অভিসিক্ত হওয়ার আলোচনার পালে নতুন করে হাওয়া লেগেছে রবিবার (১৮ জানুয়ারি) বিকালে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে (কেআইবি) ‘ঢাকা ফোরাম’ আয়োজিত ‘জাতি গঠনে নারী: নীতি, সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তাঁর বক্তব্য প্রদানের মধ্যে দিয়ে। গত ২৫ ডিসেম্বর বাবার সঙ্গে লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর এটিই জনপরিসরে বা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এটি তাঁর প্রথম বক্তব্য। এই বক্তব্যে রীতিমতো মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন তারেক রহমানের এই উত্তরসূরী। জনসংখ্যার অর্ধেক অংশকে পেছনে রেখে বাংলাদেশ বেশিদূর এগিয়ে যেতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, ‘নিজের ছোট্ট জায়গা থেকেও দেশ ও সমাজের জন্য কিছু করার আন্তরিকতা আমাদের সবার থাকা উচিত।’
অনেক দিন যাবতই গুঞ্জন চলছে রাজনীতিতে আসছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের একমাত্র মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এই আলোচনা আরও জোরালো হয়। অবশ্য বাবা তারেক রহমানের সঙ্গে বা তার প্রতিনিধি হয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান এই আলোচনার জন্ম দিয়েছে আরও আগেই। গত বছর বাবার প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ অনুষ্ঠানেও যোগ দিয়েছিলেন জাইমা রহমান। বিশ্লেষকরা বলছেন, তার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় ওই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে। তার এই অংশগ্রহণকে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণও বলেও উল্লেখ করেছেন তারা। এরপর প্রবাসী ভোট নিয়ে বিএনপির এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়েছিলেন খালেদা জিয়ার নাতনি। সর্বশেষ দাদি, খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শোক জানাতে আসা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠকে বাবার সঙ্গে ছিলেন জাইমা রহমান। এসব কারণেই অনেকে বলছেন, পারিবারিক ঐতিহ্য আর ধারাবাহিকতার জন্য জাইমা রহমানের রাজনীতিতে আসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
দাদি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণে শোকাহত পরিবারের পাশে ছায়াসঙ্গীর মতো দাঁড়িয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে দেখা যায় জাইমা রহমানকে। জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের এই প্রতিনিধিকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে অদম্য কৌতূহল তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাবার ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হিসেবে জাইমাকে বারবার দেখা যাওয়ায় তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তার সম্ভাবনা নিয়ে গুঞ্জন আরও প্রবল হয়।

জাইমা রহমানের জন্ম ২৬ অক্টোবর ১৯৯৫। তিনি ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল হোসেন রোডের বাসভবনে বেড়ে ওঠেন। ঢাকার ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, ঢাকা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন। এরপর ২০০৮ সালে বাবা-মায়ের সঙ্গে লন্ডন যান। সেখানে বিখ্যাত কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৯ সালে লন্ডনের ঐতিহাসিক লিংকনস ইন থেকে তিনি ‘বার অ্যাট ল’ সনদ লাভ করেন এবং একজন পেশাদার আইনজীবী হিসেবে স্বীকৃতি পান।
গত ২৫ ডিসেম্বর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে দেশে ফেরার দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। পোস্টে দাদি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পাশে থাকার কথা জানান। পাশাপাশি বাবা তারেক রহমানকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করার কথা বলেন। পোস্টে উঠে আসে দাদির সঙ্গে কাটানো শৈশবের স্মৃতি, প্রবাসজীবনের অভিজ্ঞতা এবং দেশের সেবায় নিজেকে যুক্ত করার প্রত্যয়। নিজের ফেসবুক পোস্টে তার দাদিকে নিয়ে লিখছেন। তার অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন, রাষ্ট্র পরিচালনায় তার দৃঢ়তার কথাও তুলে ধরেন পোস্টে। করেন নিজের স্মৃতিচারণ। জাইমা রহমান লেখেন, অনেক বছর পর দেশে ফিরছি। দেশে ফেরা মানে আবেগ আর অনুভূতির অনন্য সংমিশ্রণ। ইনশাআল্লাহ, দেশে ফিরে দাদির পাশে থাকতে চাই। এই সময়টাতে আব্বুকে সর্বাত্মক সহায়তা করতে চাই। তিনি লেখেন, একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশের জন্য সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে চাই। নিজের চোখে বাংলাদেশকে নতুন করে দেখতে চাই।
এদিকে খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পরদিন সকালে তার লাশ গুলশানের বাসভবনে নিয়ে আসা হলে সেখানে বসে কোরআন তিলাওয়াত করেন তারেক রহমান। অন্য স্বজনরা মোনাজাত করেন। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিওতে এ সময় শোকাহত বাবার ঠিক পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় জাইমা রহমানকে। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথা বলছেন। জাইমার চোখে-মুখেও তখন দাদিকে হারানোর গভীর বেদনা স্পষ্ট। এরপর গুলশান থেকে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজার জন্য মরদেহ নেওয়া হয়। পরে তারেক রহমান পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিশেষ বাসে জানাজাস্থলে যান। জাইমা রহমানসহ পরিবারের নারী সদস্যরা নির্ধারিত স্থানে জানাজা আদায় করেন। জানাজা ও দাফনে জিয়া পরিবারের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, মেয়ে জাইমা রহমান, মরহুম আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি, মেয়ে জাহিয়া ও জাফিয়া রহমানসহ স্বজনরা। দাফন শেষে তারা দোয়া করে বিদায় নেন।
রবিবার (১৮ জানুয়ারি) বিকালে রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে (কেআইবি) ‘ঢাকা ফোরাম’ আয়োজিত ‘জাতি গঠনে নারী: নীতি, সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় ব্যারিস্টার জাইমা রহমান বলেন, ‘আজ আমরা এখানে যারা উপস্থিত হয়েছি, আমাদের সবার আদর্শ, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। তা সত্ত্বেও আমরা একসঙ্গে বসেছি এবং আলোচনা করছি। কারণ আমরা সবাই দেশ ও দেশের মানুষের জন্য ভাবছি। এই ভিন্নতা নিয়ে একসঙ্গে কথা বলা এবং একে অপরের কথা শোনাÑএটাই গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য।’

নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তারেক-কন্যা বলেন, ‘ভিন্ন এক অনুভূতি ও আবেগ নিয়ে আজ এখানে দাঁড়িয়েছি। বাংলাদেশের কোনও পলিসি লেভেলে এটিই আমার প্রথম বক্তব্য। আমি এমন কেউ নই, যার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর আছে বা সব সমস্যার সমাধান জানা আছে।’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array