খুঁজুন
                               
, ,
           

প্রথম মাসে হত্যা শূন্য: সীমান্ত কূটনীতিতে সরকারের অভূতপূর্ব সাফল্য

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬, ৯:৫৪ অপরাহ্ণ
প্রথম মাসে হত্যা শূন্য: সীমান্ত কূটনীতিতে সরকারের অভূতপূর্ব সাফল্য

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার প্রতীক—যেখানে মানবিকতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের চেয়ে বেশি প্রতিধ্বনিত হয়েছে গুলির শব্দ, লাশের মিছিল এবং অমানবিকতার করুণ চিত্র। বছরের পর বছর ধরে সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানির ঘটনা যেন এক নির্মম নিয়মে পরিণত হয়েছিল। এমন এক প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম মাসেই সীমান্ত হত্যা শূন্যে নেমে আসা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন—যা শুধু পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়, বরং কূটনৈতিক দক্ষতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নির্ধারণের এক শক্তিশালী প্রতিফলন।

১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর এক মাস পূর্ণ করেছে নতুন সরকার। এই স্বল্প সময়ের খতিয়ানে যদি একটি অর্জন আলাদাভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সেটি হলো সীমান্তে শান্তির এই নজিরবিহীন পরিস্থিতি। দীর্ঘদিনের রক্তাক্ত বাস্তবতার বিপরীতে গত এক মাসে বিএসএফ-এর গুলিতে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি—যা অতীতের ধারাবাহিকতার সঙ্গে তুলনা করলে একেবারেই ব্যতিক্রমী এবং গভীরভাবে আশাব্যঞ্জক।

সীমান্ত হত্যার বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট, যার শিকড় বহু বছরের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল কূটনীতি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে নিহিত। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সীমান্তে নিহত বাংলাদেশিদের সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

২০২৫ সালে অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া ২০২৪ সালে প্রায় ২৮ জন, ২০২৩ সালে প্রায় ২০ জন, ২০২২ সালে ১৭ জন এবং ২০২১ সালে ১৬ জন নিহত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে যে, সীমান্ত হত্যা কোনো আকস্মিক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত সংকট, যা দীর্ঘদিন ধরে চলমান ছিল।

এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি অসমাপ্ত জীবনের গল্প। বিশেষ করে ২০১১ সালের কুড়িগ্রাম সীমান্তে কিশোরী ফেলানীর নির্মম মৃত্যু—যেখানে তার মরদেহ কাঁটাতারে ঝুলে ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা—বাংলাদেশের মানুষের চেতনায় এক গভীর ক্ষত তৈরি করে। সেই ঘটনার প্রতীকী গুরুত্ব আজও সীমান্ত ইস্যুতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

শুধু অতীত নয়, চলতি বছরের জানুয়ারিতেও তিন বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। অর্থাৎ, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগ পর্যন্তও সীমান্ত পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক এবং অস্থির।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকারের প্রথম মাসেই সীমান্ত হত্যা শূন্যে নেমে আসা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী সাফল্য। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং কার্যকর নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট নীতিনির্ধারণ এবং দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থানের ফল। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিকে একটি শক্ত বার্তা দেওয়া হয়েছে—সীমান্তে বিনা কারণে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এই বার্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের ব্যাপক জনসমর্থন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সহায়তা করেছে। ফলে বিএসএফ-এর আচরণে একটি দৃশ্যমান সংযম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আরও সতর্ক, সক্রিয় এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। দুই পক্ষের এই পরিবর্তিত মনোভাব সীমান্ত পরিস্থিতিকে ইতিবাচক দিকে নিয়ে এসেছে।

নতুন সরকারের অন্যতম মূলনীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই সীমান্ত পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতীয়মান হয়। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকের জীবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, তখন সেই নীতির প্রতিফলন শুধু অভ্যন্তরীণ নীতিতে নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও দৃশ্যমান হয়। সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা সেই নীতিরই একটি বাস্তব ও কার্যকর প্রতিফলন। এটি প্রমাণ করে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কৌশলগত সঠিক পদক্ষেপের সমন্বয় ঘটলে দীর্ঘদিনের সমস্যারও সমাধান সম্ভব।

এই সাফল্যের পেছনে কেবল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নয়, বরং একটি সমন্বিত রাষ্ট্রযন্ত্র কাজ করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিজিবি—সবাই একযোগে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সীমান্তে উত্তেজনা কমেছে এবং সহিংসতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

বিজিবি শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং একটি প্রো-অ্যাকটিভ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। গত এক মাসে তারা প্রায় দুই শত কোটি টাকার চোরাই পণ্য জব্দ করেছে, ২০টি বিদেশি অস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে এবং মাদকসহ দুই শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করেছে। এসব কার্যক্রম সীমান্তকে শুধু শান্তই করেনি, বরং অপরাধ দমনেও কার্যকর অবদান রেখেছে।

যদিও বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক, তবুও এখনই আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। সীমান্ত একটি জটিল ও সংবেদনশীল এলাকা, যেখানে যেকোনো সময় পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। বিজিবি ইতোমধ্যেই সীমান্ত এলাকার জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম, চোরাচালান কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য জনসচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য। কারণ অনেক সময় সাধারণ মানুষের অসচেতনতা বা অর্থনৈতিক প্রয়োজনে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তই বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সীমান্ত হত্যা বন্ধ হওয়া শুধু একটি অভ্যন্তরীণ সাফল্য নয়; এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এই পরিস্থিতির উন্নতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং মানবাধিকার রক্ষায় দেশের অঙ্গীকারকে বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।

সীমান্ত কেবল একটি ভৌগোলিক বিভাজন নয়; এটি দুই দেশের মানুষের মধ্যে সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও যোগাযোগ—সবকিছুর জন্য একটি শান্ত ও নিরাপদ সীমান্ত অপরিহার্য। বর্তমান পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এই ধারা অব্যাহত রাখা গেলে সীমান্ত আর সংঘাতের প্রতীক হবে না; বরং এটি সহযোগিতা, পারস্পরিক সম্মান এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

শেষ কথা
বিএনপি সরকারের প্রথম মাসে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নেমে আসা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক নেতৃত্ব, দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান এবং সমন্বিত রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যারও কার্যকর সমাধান সম্ভব।
তবে এই সাফল্য ধরে রাখা আরও বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, সতর্কতা এবং একই মাত্রার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সীমান্তে শান্তির এই নতুন অধ্যায় যেন ক্ষণস্থায়ী না হয়—সেটিই এখন সময়ের দাবি। আমাদের প্রত্যাশা একটাই—এই সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকুক; সীমান্ত হয়ে উঠুক শান্তির, নিরাপত্তার এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা, থাকবে কিউআর কোড

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:০৮ অপরাহ্ণ
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা, থাকবে কিউআর কোড

সারা দেশে চলাচলকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইককে নিয়ন্ত্রণে আনতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে সরকার। নীতিমালার আওতায় এসব যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণের পাশাপাশি ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্তের ব্যবস্থা করা হবে।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ৭১ বিধিতে উত্থাপিত জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব তথ্য জানান।

সংসদে বিষয়টি উত্থাপন করেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানু। তিনি বলেন, দেশে বর্তমানে বিপুলসংখ্যক বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। এসব যানবাহনের অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট, বিদ্যুৎ ব্যবহার, অনিরাপদ ব্যাটারি এবং অদক্ষ চালকের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, পরিবেশ ও সড়ক নিরাপত্তায় নানা ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

তবে এসব যানবাহনের সঙ্গে বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত থাকায় এগুলোকে ঢালাওভাবে উচ্ছেদ না করে নীতিমালার আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান ব্যাহত না করে পরিবেশ ও সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। নতুন নীতিমালায় অটোরিকশার জন্য নির্দিষ্ট রুট নির্ধারণ করা হবে। মহাসড়ক ও প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল করতে পারবে না। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ ব্যাটারি ব্যবহারের শর্তও থাকবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, অতীতে একটি নিবন্ধন বা নম্বর ব্যবহার করে একাধিক যানবাহন চালানোর ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের জালিয়াতি বন্ধে প্রতিটি অটোরিকশাকে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও কিউআর কোডের মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে।

বিদ্যুৎ চুরি রোধে অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের বিরুদ্ধেও নজরদারি বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় এআইভিত্তিক ক্যামেরার ব্যবহার আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

দুই মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর দখলমুক্ত করার আশ্বাস নৌমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৯ অপরাহ্ণ
দুই মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর দখলমুক্ত করার আশ্বাস নৌমন্ত্রীর

চট্টগ্রাম বন্দরের যেসব জায়গা বিগত সরকারের সময়ে অবৈধভাবে লিজ দেওয়া হয়েছিল, সেসব লিজ বাতিল করে আগামী দুই মাসের মধ্যে বন্দর এলাকার সব জায়গা দখলমুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ আশ্বাস দেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে কয়েকটি অবৈধ লিজ বাতিল করা হয়েছে এবং দুটি জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে। তবে একটি জায়গা নিয়ে মামলা চলমান থাকায় সেটি উদ্ধারে আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়েছে।

তিনি আরও জানান, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কিছু জায়গার মালিকানা নিয়ে যে জটিলতা রয়েছে, তা আরবিট্রেশনের মাধ্যমে আগামী দুই মাসের মধ্যে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান কার্যক্রম তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বন্দরে জাহাজকে এখন দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। বর্তমানে ‘জিরো আওয়ার’ ওয়েটিং টাইমে জাহাজ পরিচালনা এবং প্রায় দুই দিনের মধ্যে পণ্য লোড-আনলোডের কার্যক্রম সম্পন্ন হচ্ছে।

তিনি জানান, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিচ্ছে। পাশাপাশি লালদিয়ায় পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে ‘গ্রিন টার্মিনাল’ নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। এতে প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আসবে এবং প্রায় ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

এ ছাড়া গত ছয় মাসে মোংলা বন্দরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২২৫ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় হয়েছে বলেও সংসদকে জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝঙ্কার: স্বাধীন দেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য আর কতকাল?

এম মহাসিন মিয়া:
প্রকাশিত: সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:৫৫ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রামে অবৈধ অস্ত্রের ঝঙ্কার: স্বাধীন দেশে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর দৌরাত্ম্য আর কতকাল?

প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম আজ আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর লাগামহীন দৌরাত্ম্যে বিভীষিকাময় এক জনপদে পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এই ভূখণ্ডের একটি বিশেষ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ আজও শান্তির বদলে প্রতিনিয়ত গানপাউডার আর বারুদের গন্ধ শুঁকে দিনাতিপাত করছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অনবদ্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঢেকে দিয়েছে অবৈধ অস্ত্রের মহড়া, আধিপত্য বিস্তারের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণকে জিম্মি করে রাখার অপকৌশল। পাহাড়ে শান্তিশৃঙ্খলা ও দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে রাষ্ট্র ও সরকারের পক্ষ থেকে যুগে যুগে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হলেও সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর অনড় অবস্থান, অপতৎপরতা এবং সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা কায়েমের অশুভ আকাঙ্ক্ষার কারণে প্রত্যাশিত স্থায়িত্ব লাভ করেনি পার্বত্য অঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সার্বভৌম ভূখণ্ডে এমন সশস্ত্র নৈরাজ্য আর কতকাল বহাল থাকবে, তা আজ গোটা জাতির কাছে এক মস্ত বড় প্রশ্ন ও চরম উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‎সম্প্রতি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়িতে ঘটে যাওয়া এক রক্তক্ষয়ী ঘটনা পাহাড়ে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর উগ্রতা ও আধিপত্য বিস্তারের চিত্রকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গি ইউনিয়নের তারাবন এলাকায় গত ৫ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পাহাড়ি দুটি প্রধান আঞ্চলিক দল, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস-মূল) এবং ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল) এর মধ্যে এক ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। সকালের দিকে জেএসএস ক্যাডারদের মহড়া ও ফাঁকা গুলির পর বিকেলে তা রূপ নেয় মুখোমুখি এক রক্তক্ষয়ী গোলাগুলিতে। বিবর্ণ চাকমার নেতৃত্বাধীন ২৫-৩০ জনের জেএসএস দল এবং সুমেন চাকমার পরিচালনায় ৩৫-৪০ জনের সুসজ্জিত ইউপিডিএফ বাহিনীর মধ্যে একটানা আড়াই ঘণ্টাব্যাপী আক্ষরিক অর্থেই যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই দুই পক্ষের মধ্যকার প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ রাউন্ড অনবরত গুলিবিনিময়ের ফলে পুরো তারাবন ও জগা পাড়া এলাকা মুহূর্তে এক রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। কোনো প্রাণহানি নিশ্চিত না হলেও অনবরত বিকট গুলির শব্দে অবরুদ্ধ সাধারণ মানুষের মনে এক বিভীষিকাময় ভীতি তৈরি হয়েছিল।

‎পানছড়ির উত্তাপ প্রশমিত হতে না হতেই ৬ সেপ্টেম্বর- ২০২৬ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটির সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় পর্যটন উপত্যকা সাজেকে ইউপিডিএফ (প্রসীত) ও জেএসএস (সন্তু) গ্রুপের সশস্ত্র ক্যাডারদের বিপজ্জনক মহড়া ও মুখোমুখি অবস্থান পাহাড়ের পরিস্থিতিকে আরও থমথমে করে তোলে। দেশের শীর্ষতম পর্যটন কেন্দ্র সাজেক উপত্যকার নোয়াপাড়া, ৮নং পাড়া, কিচিংপাড়া ও ব্রীজপাড়ার মতো স্পর্শকাতর ও ঘনবসতিপূর্ণ স্থানগুলোতে ইউপিডিএফের প্রায় নব্বইজন এবং জেএসএস গ্রুপের সত্তর-আশিজন ক্যাডার ভারি অস্ত্রশস্ত্রসহ কৌশলগত অবস্থান নেয়। ইউপিডিএফের পক্ষে সুমন চাকমা, কহেন চাকমা ও পরান্টু চাকমা এবং জেএসএসের পক্ষে বিক্রম চাকমা ও মুচং চাকমার মতো শীর্ষ সশস্ত্র কমান্ডারের সরাসরি নেতৃত্বে শতাধিক ক্যাডারের এমন মহড়া যে কোনো মুহূর্তে এক ভয়াবহ রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল। একদিকে সাধারণ স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে জীবনভীতিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন, অন্যদিকে সাজেকে বেড়াতে আসা অগণিত পর্যটকদের নিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। মূলত পাহাড়ে পর্যটন শিল্পকে ধ্বংস করা এবং সাধারণ মানুষকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেই সাজেকের মতো জায়গায় সশস্ত্র ক্যাডাররা এই অবস্থান নিয়েছিল।

‎পাহাড়জুড়ে কায়েম করা এই নৈরাজ্যের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখা গেছে খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গায় সুপরিচিত পর্যটন এলাকা রিসাং ঝর্ণা সংলগ্ন অঞ্চলে ইউপিডিএফ (প্রসীত) বাহিনীর অতর্কিত গুলিবর্ষণে। গভীর রাতে নিরবতা ভঙ্গ করে সেনাবাহিনীর মাটিরাঙ্গা জোনের অন্তর্ভুক্ত সাপমারা আর্মি ক্যাম্পের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে এই সশস্ত্র দলটি প্রথম দফায় ১০-১২ রাউন্ড এবং পরবর্তী দফায় গভীর রাত ১২টা থেকে ৩টার মধ্যে আরও প্রায় ৩০ রাউন্ড ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে গা ঢাকা দেয়। সর্বমোট ৪০-৪২ রাউন্ড ভারী অস্ত্রের গুলি চালিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন এবং পর্যটন খাতে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর মূল উদ্দেশ্য। স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রিসাং ঝর্ণার মতো জায়গায় ঘুরতে আসা পর্যটকদের মনে এই জাতীয় রাতের আঁধারে গুলিবর্ষণ গভীর আতঙ্কের জন্ম দেয়। শান্ত জনপদ মাটিরাঙ্গায় এমন প্রকাশ্য অস্ত্রের ঝঙ্কার প্রমাণ করে যে, সাধারণ মানুষের জীবন বা এলাকার অর্থনৈতিক অগ্রগতির তোয়াক্কা না করে এই সশস্ত্র দলগুলো কেবল নিজেদের কায়েমী স্বার্থ হাসিল এবং সাধারণ মানুষকে সার্বক্ষণিক ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বন্দি করে রাখতে চায়।

‎সাম্প্রতিক পার্বত্য চট্টগ্রামের এই তিনটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা কোনো আকস্মিক অগ্নিকাণ্ড নয়, বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের সুপরিকল্পিত আধিপত্য বিস্তারের ছকেরই অংশ। জেএসএস-মূল, ইউপিডিএফ-মূল, ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক, জেএসএস-সংস্কার সহ বিভিন্ন উপশাখায় বিভক্ত এই সংগঠনগুলো মুখে তাঁদের জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের কথা বললেও বাস্তবে তারা সন্ত্রাসী কার্যক্রমেই লিপ্ত। নিজেদের নির্দিষ্ট ভৌগোলিক প্রভাববলয় বা ‘টার্ফ’ ধরে রাখা এবং চাঁদাবাজির রুট সচল রাখার জন্য তারা একে অপরের বিরুদ্ধে চরম শত্রুতায় লিপ্ত হয়। গোষ্ঠীগত এই দ্বন্দ্বের বলি হতে হয় নিরীহ পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীকে, যাদের দৈনন্দিন কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি কাজ হুমকির মুখে পড়ে। নিজেদের মধ্যে অঞ্চল ভাগাভাগি এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে পুরো পাহাড়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ভেস্তে যাচ্ছে। তথাকথিত অধিকার আদায়ের নামে নিজেদের জাতির মানুষের বুক খালি করা এবং সার্বিক জনজীবনকে অচল করে দেওয়া ছাড়া এই আঞ্চলিক দলগুলোর আর কোনো জনকল্যাণমুখী ভূমিকা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না।

‎পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র দলগুলোর টিকে থাকার প্রধান রসদ এবং অর্থায়নের মূল উৎস হলো এক ভয়াবহ চাঁদা আদায় ও তোলাবাজি নেটওয়ার্ক। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে জেলা শহর পর্যন্ত প্রতিটি বাজার, যানবাহন, জুমচাষ, বাঁশ কাটা, ফল বিক্রি এমনকি সাধারণ চাকরিজীবীদের বেতন থেকেও নিয়মিত জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করা হয়। কোনো সাধারণ নাগরিক বা ব্যবসায়ী যদি এই অবৈধ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে তার কপালে জোটে অমানসিক নির্যাতন, অপহরণ কিংবা নির্মম হত্যাকাণ্ড। শুধু চাঁদা আদায়ই নয়, পাহাড়ের গহীন অরণ্যকে ব্যবহার করে অবৈধ অস্ত্রের কারবার, মাদক চোরাচালান এবং সীমান্ত পারের সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সাথে গোপন যোগসাজশের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করছে এই সংগঠনগুলো। এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ কালো টাকা দিয়েই তারা আধুনিক ও ভারী সব অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করছে, যা দিয়ে দিন দিন তারা নিজেদের সামরিক শক্তি বাড়িয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ জানানোর দুঃসাহস দেখাচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ আজ নিজস্ব ভূখণ্ডে থেকেও এক প্রকার মুক্তিপণ দিয়ে জীবনযাপনের চরম অপমানজনক পরিস্থিতি সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে।

‎গুম, খুন এবং অপহরণ পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর এক প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কোনো ব্যক্তি যদি এই সংগঠনগুলোর মতাদর্শের বাইরে গিয়ে স্বাধীন মতামত প্রকাশ করে কিংবা তাদের চাঁদা দাবির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়, তাকে রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে যাওয়া এখন পাহাড়ে নিত্যদিনের ঘটনা। অসংখ্য পাহাড়ি তরুণকে জোরপূর্বক ক্যাডার দলে রিক্রুট করা হচ্ছে এবং তা না মানলে পুরো পরিবারকে ভিটেমাটি ছাড়া করার হুমকি দেওয়া হয়। মানবাধিকারের বুলি ছড়ানো দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থা পাহাড়ে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে সোচ্চার হলেও, আঞ্চলিক সন্ত্রাসী দলগুলোর হাতে অগণিত নিরীহ মানুষের এই নির্মম গুম ও খুনের ঘটনায় অদ্ভুত নীরবতা পালন করে। এই সন্ত্রাসী দলগুলো সাধারণ পাহাড়িদের ভয় দেখিয়ে এমন এক স্তব্ধতার সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে প্রতিবাদের কোনো ভাষা অবশিষ্ট থাকে না। স্বজনহারা পরিবারগুলোর আর্তনাদ পাহাড়ের উপত্যকাগুলোতে প্রতিধ্বনি হলেও সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রক্তচক্ষু ও প্রতিশোধের ভয়ে কেউ পুলিশ বা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সাহস পর্যন্ত পায় না।

‎বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পার্বত্য অঞ্চলের রয়েছে বিপুল সম্ভাবনাময় ভূমিকা, বিশেষ করে পর্যটন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহারে। কিন্তু সাজেক, রিসাং ঝর্ণা, পানছড়ি বা বান্দরবানের মতো আকর্ষণীয় এলাকাগুলোতে প্রতিনিয়ত সশস্ত্র সংঘাত ও গোলাগুলির খবর ছড়িয়ে পড়ায় পর্যটন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা যখন পাহাড়ে নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার হুমকি অনুভব করেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই তারা এসব স্থান ভ্রমণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। ফলে পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য, হোটেল-রিসোর্ট শিল্প এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের রুটি-রুজির ওপর নেমে আসে চরম বিপর্যয়। শুধু পর্যটনই নয়, এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে পাহাড়ের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, যেমন, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সংযোগ সম্প্রসারণের কাজ বারবার থমকে যায়। ঠিকাদারদের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি এবং চাঁদা না দিলে নির্মাণকাজে নিয়োজিত কর্মীদের অপহরণ বা হত্যা করার মাধ্যমে পুরো অঞ্চলের উন্নয়ন থমকে দেওয়ার অপচেষ্টা করে চলেছে এই গোষ্ঠীগুলো। ফলে পার্বত্য অঞ্চলকে মূল অর্থনীতির ধারার সাথে যুক্ত করা চরম চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

‎স্বাধীন বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কোনো অবস্থাতেই নিজের ভূখণ্ডের একটি নির্দিষ্ট অংশে সমান্তরাল সশস্ত্র শাসন বা সন্ত্রাসী ক্যাডারদের রাজত্ব মেনে নিতে পারে না। পাহাড়ের অখণ্ডতা রক্ষা, সাধারণ জনগণের মৌলিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে এখনই এই আঞ্চলিক দলগুলোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির শর্তাবলি যারা বছরের পর বছর ধরে লঙ্ঘন করে আসছে এবং অবৈধ অস্ত্র সমর্পণ না করে উল্টো তা দিয়ে রাষ্ট্রকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সময় এসেছে। পাহাড়ে আস্তানা গড়া প্রতিটি অবৈধ অস্ত্রের জোগানদাতা ও ক্যাডারদের চিরুনি অভিযানের মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে হবে। সার্বভৌম রাষ্ট্রে কোনো বিশেষ অঞ্চলকে অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে পরিণত হতে দেওয়া যায় না, এবং এ বিষয়ে কোনো প্রকার শিথিলতা বা আপসকামিতা মেনে নেওয়ার সুযোগ নেই।

‎সবমিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও উপত্যকাগুলোতে স্থায়ী শান্তি, সম্প্রীতি ও প্রগতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে হলে সশস্ত্র দলগুলোর দৌরাত্ম্য চিরতরে বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি, উভয় জনগোষ্ঠীর শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ আজ সশস্ত্র দলগুলোর হাত থেকে মুক্তি পেতে ব্যাকুল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে পার্বত্য অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করা, সকল অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বিত যৌথ অভিযান জোরদার করা এবং চাঁদাবাজি-অস্ত্র ব্যবসা বন্ধে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো। একই সাথে পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ যুবসমাজকে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর প্রলোভন ও ভয়ভীতি থেকে মুক্ত করে মূলধারার শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্রকে পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে যে, সার্বভৌম বাংলাদেশে ক্ষমতার একমাত্র উৎস জনগণ ও সংবিধান, কোনো অবৈধ অস্ত্রের নলের মুখ নয়। সরকারের সমউপযোগী, কঠোর ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই কেবল পারে পার্বত্য অঞ্চল থেকে সশস্ত্র সহিংসতার কালো ছায়া দূর করে দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে এবং পাহাড়িদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

‎লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
‎ইমেইল: mmohasinmiah013@gmail.com