খুঁজুন
                               
, ,
           

প্রথম মাসে হত্যা শূন্য: সীমান্ত কূটনীতিতে সরকারের অভূতপূর্ব সাফল্য

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৮ মার্চ, ২০২৬, ৯:৫৪ অপরাহ্ণ
প্রথম মাসে হত্যা শূন্য: সীমান্ত কূটনীতিতে সরকারের অভূতপূর্ব সাফল্য

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার প্রতীক—যেখানে মানবিকতা, আন্তর্জাতিক আইন এবং প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের চেয়ে বেশি প্রতিধ্বনিত হয়েছে গুলির শব্দ, লাশের মিছিল এবং অমানবিকতার করুণ চিত্র। বছরের পর বছর ধরে সীমান্তে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রাণহানির ঘটনা যেন এক নির্মম নিয়মে পরিণত হয়েছিল। এমন এক প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম মাসেই সীমান্ত হত্যা শূন্যে নেমে আসা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন—যা শুধু পরিসংখ্যানগত সাফল্য নয়, বরং কূটনৈতিক দক্ষতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার নির্ধারণের এক শক্তিশালী প্রতিফলন।

১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর এক মাস পূর্ণ করেছে নতুন সরকার। এই স্বল্প সময়ের খতিয়ানে যদি একটি অর্জন আলাদাভাবে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সেটি হলো সীমান্তে শান্তির এই নজিরবিহীন পরিস্থিতি। দীর্ঘদিনের রক্তাক্ত বাস্তবতার বিপরীতে গত এক মাসে বিএসএফ-এর গুলিতে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি—যা অতীতের ধারাবাহিকতার সঙ্গে তুলনা করলে একেবারেই ব্যতিক্রমী এবং গভীরভাবে আশাব্যঞ্জক।

সীমান্ত হত্যার বিষয়টি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকট, যার শিকড় বহু বছরের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল কূটনীতি এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে নিহিত। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সীমান্তে নিহত বাংলাদেশিদের সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

২০২৫ সালে অন্তত ৩৪ জন নিহত হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এছাড়া ২০২৪ সালে প্রায় ২৮ জন, ২০২৩ সালে প্রায় ২০ জন, ২০২২ সালে ১৭ জন এবং ২০২১ সালে ১৬ জন নিহত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে যে, সীমান্ত হত্যা কোনো আকস্মিক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি কাঠামোগত সংকট, যা দীর্ঘদিন ধরে চলমান ছিল।

এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যার হিসাব নয়; বরং প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন এবং একটি অসমাপ্ত জীবনের গল্প। বিশেষ করে ২০১১ সালের কুড়িগ্রাম সীমান্তে কিশোরী ফেলানীর নির্মম মৃত্যু—যেখানে তার মরদেহ কাঁটাতারে ঝুলে ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা—বাংলাদেশের মানুষের চেতনায় এক গভীর ক্ষত তৈরি করে। সেই ঘটনার প্রতীকী গুরুত্ব আজও সীমান্ত ইস্যুতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

শুধু অতীত নয়, চলতি বছরের জানুয়ারিতেও তিন বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। অর্থাৎ, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগ পর্যন্তও সীমান্ত পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক এবং অস্থির।

এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি সরকারের প্রথম মাসেই সীমান্ত হত্যা শূন্যে নেমে আসা নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী সাফল্য। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং কার্যকর নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট নীতিনির্ধারণ এবং দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থানের ফল। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে নয়াদিল্লিকে একটি শক্ত বার্তা দেওয়া হয়েছে—সীমান্তে বিনা কারণে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এই বার্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারের ব্যাপক জনসমর্থন এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সহায়তা করেছে। ফলে বিএসএফ-এর আচরণে একটি দৃশ্যমান সংযম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একই সঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) আরও সতর্ক, সক্রিয় এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। দুই পক্ষের এই পরিবর্তিত মনোভাব সীমান্ত পরিস্থিতিকে ইতিবাচক দিকে নিয়ে এসেছে।

নতুন সরকারের অন্যতম মূলনীতি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’—এই সীমান্ত পরিস্থিতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে প্রতীয়মান হয়। রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকের জীবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়, তখন সেই নীতির প্রতিফলন শুধু অভ্যন্তরীণ নীতিতে নয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও দৃশ্যমান হয়। সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা সেই নীতিরই একটি বাস্তব ও কার্যকর প্রতিফলন। এটি প্রমাণ করে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কৌশলগত সঠিক পদক্ষেপের সমন্বয় ঘটলে দীর্ঘদিনের সমস্যারও সমাধান সম্ভব।

এই সাফল্যের পেছনে কেবল কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নয়, বরং একটি সমন্বিত রাষ্ট্রযন্ত্র কাজ করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিজিবি—সবাই একযোগে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে সীমান্তে উত্তেজনা কমেছে এবং সহিংসতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

বিজিবি শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং একটি প্রো-অ্যাকটিভ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। গত এক মাসে তারা প্রায় দুই শত কোটি টাকার চোরাই পণ্য জব্দ করেছে, ২০টি বিদেশি অস্ত্রসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে এবং মাদকসহ দুই শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করেছে। এসব কার্যক্রম সীমান্তকে শুধু শান্তই করেনি, বরং অপরাধ দমনেও কার্যকর অবদান রেখেছে।

যদিও বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক, তবুও এখনই আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। সীমান্ত একটি জটিল ও সংবেদনশীল এলাকা, যেখানে যেকোনো সময় পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। বিজিবি ইতোমধ্যেই সীমান্ত এলাকার জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম, চোরাচালান কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার জন্য জনসচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য। কারণ অনেক সময় সাধারণ মানুষের অসচেতনতা বা অর্থনৈতিক প্রয়োজনে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তই বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

সীমান্ত হত্যা বন্ধ হওয়া শুধু একটি অভ্যন্তরীণ সাফল্য নয়; এটি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনাগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। এই পরিস্থিতির উন্নতি বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং মানবাধিকার রক্ষায় দেশের অঙ্গীকারকে বিশ্বমঞ্চে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।

সীমান্ত কেবল একটি ভৌগোলিক বিভাজন নয়; এটি দুই দেশের মানুষের মধ্যে সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও যোগাযোগ—সবকিছুর জন্য একটি শান্ত ও নিরাপদ সীমান্ত অপরিহার্য। বর্তমান পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। এই ধারা অব্যাহত রাখা গেলে সীমান্ত আর সংঘাতের প্রতীক হবে না; বরং এটি সহযোগিতা, পারস্পরিক সম্মান এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।

শেষ কথা
বিএনপি সরকারের প্রথম মাসে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নেমে আসা নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন। এটি প্রমাণ করে যে, সঠিক নেতৃত্ব, দৃঢ় কূটনৈতিক অবস্থান এবং সমন্বিত রাষ্ট্রযন্ত্রের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যারও কার্যকর সমাধান সম্ভব।
তবে এই সাফল্য ধরে রাখা আরও বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, সতর্কতা এবং একই মাত্রার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। সীমান্তে শান্তির এই নতুন অধ্যায় যেন ক্ষণস্থায়ী না হয়—সেটিই এখন সময়ের দাবি। আমাদের প্রত্যাশা একটাই—এই সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকুক; সীমান্ত হয়ে উঠুক শান্তির, নিরাপত্তার এবং মানবিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আড্ডা থেকে উদ্যোগ, ৩০ হাজার টাকায় ছয় বন্ধুর ক্যাফে

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:০৩ পূর্বাহ্ণ
আড্ডা থেকে উদ্যোগ, ৩০ হাজার টাকায় ছয় বন্ধুর ক্যাফে

বিকেলের নরম রোদ এসে পড়েছে সবুজ ধানখেতে। পাশে কালভার্ট, বসার জন্য ছোট বেঞ্চ, দোলনা আর সেলফি কর্নার। কেউ চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত ক্যামেরায় ধরে রাখছেন। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের কচুখালীতে গড়ে ওঠা এই ছোট্ট ক্যাফের নাম ‘শেষ বিকেলের চায়ের আড্ডা’।

মাত্র ৩০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে মুন্সিগঞ্জ কলেজের ছয় শিক্ষার্থী নিজেদের শ্রম ও উদ্যোগে তৈরি করেছেন ক্যাফেটি। মুন্সিগঞ্জ কচুখালীতে কারিতাস কার্যালয়ের কাছে কালভার্টের পাশে, মুনসুর সরদার গ্যারেজ-হরিনগর বাজার সড়কের পাশে বাঁশ, কাঠ ও খড় দিয়ে নির্মিত এই টংঘর ক্যাফের উদ্বোধন করা হয় গত ১৪ অক্টোবর।

উদ্যোক্তা ছয় বন্ধু হলেন তায়িব, মিলন হোসেন, মেহেদী হাসান, বিপ্লব হোসেন, ইমন হোসেন ও রাকিবুল হাসান। পড়াশোনার পাশাপাশি নিজেদের উদ্যোগে কিছু করার আগ্রহ থেকেই একসঙ্গে কাজ শুরু করেন তাঁরা।

উদ্যোক্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘বন্ধুরা মিলে অবসর সময়ে প্রায়ই আড্ডা দিতাম। একসময় মনে হলো, শুধু আড্ডা না দিয়ে এই সময়টাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য কিছু করা যায়। পুঁজি খুব বেশি ছিল না, তবে নিজেদের শ্রম আর ইচ্ছা ছিল। সেই ভরসাতেই ক্যাফেটি গড়ে তুলেছি।’

ছয় বন্ধু প্রত্যেকে পাঁচ হাজার টাকা করে মোট ৩০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছেন। বাঁশ, কাঠ ও খড়ের মতো সহজলভ্য উপকরণ ব্যবহার করে নিজেরাই সাজিয়েছেন ক্যাফেটি। বাহারি সাজসজ্জার পরিবর্তে এখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সাদামাটা পরিবেশে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ তৈরিতে।

ক্যাফেতে চা-কফির পাশাপাশি পাওয়া যাচ্ছে হালকা খাবারও। দাম রাখা হয়েছে ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে। অপরাজিতা ফুলের চা ও দুধ চায়ের দাম ২০ টাকা করে, মালাই চা ২৫ টাকা এবং ব্ল্যাক কফি ১০ টাকা। মালাই রুটি ও ফুচকার দাম ৩০ টাকা করে। এ ছাড়া রয়েছে সেলফি কর্নার, দোলনা ও বিভিন্ন ধরনের বসার ব্যবস্থা।

উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, তাঁদের লক্ষ্য শুধু ব্যবসা করা নয়; এলাকার পরিবেশ উন্নয়নেও ভূমিকা রাখা। তাঁদের দাবি, কচুখালীর এই কালভার্ট এলাকায় আগে বখাটেদের উৎপাত ছিল। সেখানে মাদক সেবনসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ডও ঘটত। জায়গাটিকে মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াত ও অবসর কাটানোর উপযোগী করে তুলতে তাঁরা ক্যাফেটি গড়ে তুলেছেন।

উদ্যোক্তা মো. মিলন হোসেন বলেন, ‘আমরা চাই, জায়গাটি মানুষের কাছে ভালো একটি স্থান হিসেবে পরিচিত হোক। তরুণেরা এখানে আসবেন, চা খাবেন, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাবেন। জায়গাটিতে মানুষের স্বাভাবিক উপস্থিতি বাড়লে অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড কমাতে সহায়তা করবে বলে আমরা মনে করি।’

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম পল্টুও উদ্যোগটির প্রশংসা করেছেন। তাঁর মতে, ছয় কলেজশিক্ষার্থীর এমন উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তাঁরা নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি এলাকার পরিবেশ ভালো রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছেন।

স্বল্প পুঁজিতে ছয় বন্ধুর এই উদ্যোগ স্থানীয় তরুণদের মধ্যে আত্মকর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে কচুখালীতে মানুষের অবসর কাটানোর জন্য তৈরি হয়েছে নতুন একটি জায়গা, যেখানে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে জমে উঠতে পারে বন্ধুত্বের গল্প।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

চা-বাগান, ঝরনা আর হাওর টানছে পর্যটক, প্রস্তুত মৌলভীবাজার

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫৬ পূর্বাহ্ণ
চা-বাগান, ঝরনা আর হাওর টানছে পর্যটক, প্রস্তুত মৌলভীবাজার

শরতের নীল আকাশ, সবুজ চা-বাগান, পাহাড়ি ঝরনা আর হাওরের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে শারদীয় দুর্গাপূজার ছুটিতে মৌলভীবাজারে পর্যটকদের আগ্রহ বাড়ছে। পর্যটকদের বরণে প্রস্তুতি নিয়েছে জেলার হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজগুলো। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে আগাম বুকিং ৮০ থেকে ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে, আবার কিছু কটেজের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর ও হামহাম ঝরনা পর্যটকদের আকর্ষণ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মণিপুরি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি, নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে পূজার ছুটিকে কেন্দ্র করে জেলার পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে বাড়তি প্রত্যাশা।

হোটেল-রিসোর্টে আগাম বুকিংয়ের চাপ

দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে থাকার জায়গা বুকিংয়ের ব্যস্ততা বেড়েছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের হোটেল, রিসোর্ট এবং কটেজগুলোতে আগাম বুকিংয়ের হার উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছেছে। কমলগঞ্জের টিলাগাঁও ইকো ভিলেজের ব্যবস্থাপক সোহেল আহমেদ বলেন, পূজার দীর্ঘ ছুটিকে সামনে রেখে তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়ে গেছে।শ্রীমঙ্গলের বালিসিরা কটেজের মালিক ও রাধানগর পর্যটন কল্যাণ পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী সামছুল হক জানান, তাঁদের কটেজের সব কক্ষ আগেই বুকিং হয়েছে।

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার সভাপতি মো. সেলিম আহমদ বলেন, উৎসবের সময়ে হোটেল-রিসোর্টে সাধারণত ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কক্ষ বুকিং থাকে। জেলার পর্যটনশিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকারি উদ্যোগ আরও বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

চা-বাগান, ঝরনা ও হাওরের টানে পর্যটকেরা

মৌলভীবাজারের পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ এর বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ। বিস্তীর্ণ চা-বাগানের সবুজ, পাহাড়ি পথ, ঝরনার পানি এবং হাওরের বিস্তৃত জলরাশি ভ্রমণপিপাসুদের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করে। জেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওর ও হামহাম ঝরনা পর্যটকদের কাছে পরিচিত গন্তব্য। শরতের আবহে এসব স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটির সময় ভ্রমণের পরিকল্পনা করছেন অনেকে। পর্যটকদের আকর্ষণ শুধু প্রকৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। স্থানীয় সংস্কৃতি ও খাবারের বৈচিত্র্যও মৌলভীবাজার ভ্রমণকে ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। ফলে পূজার ছুটিতে জেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থীদের বাড়তি উপস্থিতির প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

মণিপুরি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের আকর্ষণ

কমলগঞ্জের ভানুবিল মাঝের গাঁওয়ে মণিপুরি কমিউনিটিভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র ‘মাঙাল ময়ুম’ স্থানীয় সংস্কৃতিকে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরছে। সেখানে মণিপুরি নাচ-গান, হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেন্দ্রটির উদ্যোক্তা নিরঞ্জন সিংহ বলেন, পর্যটকেরা এখানে এসে মণিপুরি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। এতে একদিকে স্থানীয় সংস্কৃতির পরিচিতি বাড়ছে, অন্যদিকে এলাকার মানুষের বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনধারা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে ভ্রমণকারীরা প্রকৃতি দেখার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি জানার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে পর্যটন কার্যক্রমের সুফল স্থানীয় পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন চান পর্যটনসংশ্লিষ্টরা

পর্যটকদের আগ্রহ বাড়লেও পর্যটনশিল্পের বিকাশে সড়ক ও রেল যোগাযোগব্যবস্থার দুরবস্থাকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াত সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ না হলে পর্যটন খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন। ট্যুর গাইড অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলম সিলেট-ঢাকা রুটে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোসহ যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, যাতায়াতের সুযোগ বাড়লে পর্যটকদের ভ্রমণ পরিকল্পনা সহজ হবে এবং স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

পর্যটকদের নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

পূজার ছুটিতে পর্যটকদের আগমন বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক রাখার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। শ্রীমঙ্গল জোনের ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ পরিদর্শক মো. কামরুল হোসেন চৌধুরী বলেন, পর্যটকদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে টহল ও হেল্পডেস্ক থাকবে। মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম জানান, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পর্যটকদের আগমন এবং পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং গুজব ও অপপ্রচার প্রতিরোধে পূজার আগে, চলাকালে ও প্রতিমা বিসর্জনের সময় সতর্ক নজরদারি থাকবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের সমন্বয়ে মৌলভীবাজারের পর্যটন খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। পূজার ছুটিতে আগাম বুকিংয়ের উচ্চ হার স্থানীয় হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা বাড়িয়েছে।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

 

ত্রিদেশীয় সিরিজে হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, জিম্বাবুয়ের দাপুটে জয়

ক্রীড়া প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৩৯ পূর্বাহ্ণ
ত্রিদেশীয় সিরিজে হার দিয়ে শুরু বাংলাদেশের, জিম্বাবুয়ের দাপুটে জয়

ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই বড় হারের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। ব্যাটিং ব্যর্থতায় জিম্বাবুয়ের দেওয়া ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৭২ রানেই অলআউট হয়েছে তাওহিদ হৃদয়ের দল। আবুধাবিতে শনিবার ৯৯ রানের জয় দিয়ে সিরিজ শুরু করেছে জিম্বাবুয়ে। ম্যাচে শুরুতে বল হাতে জিম্বাবুয়েকে চাপে ফেলেছিল বাংলাদেশ। মাত্র ২৪ রানে তিন উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে দলটি। কিন্তু ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিনের বড় জুটি জিম্বাবুয়েকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করে। পরে লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ম্যাচ থেকে ছিটকে যায় বাংলাদেশ।

টেলর-আরভিনের ১৫০ রানের জুটিতে ঘুরে দাঁড়াল জিম্বাবুয়ে

টস জিতে আগে ব্যাট করতে নেমে শুরুতেই বাংলাদেশের পেসার তাসকিন আহমেদের বোলিংয়ের সামনে বিপাকে পড়ে জিম্বাবুয়ে। মাত্র ২৪ রানের মধ্যে তিনটি উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে দলটি। তবে এই অবস্থায় দলের হাল ধরেন ব্রেন্ডন টেলর ও ক্রেইগ আরভিন। চতুর্থ উইকেটে দুজন মিলে গড়েন ১৫০ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি। টেলর ১০১ বলে ৮১ রান করেন। আরভিনের ব্যাট থেকে আসে ১০৬ বলে ৯৩ রান। তাঁদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে বড় সংগ্রহের পথে এগিয়ে যায় জিম্বাবুয়ে। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত ৫০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ২৭১ রান সংগ্রহ করে দলটি। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৭২ রান।

তাসকিনের তিন উইকেটেও থামেনি জিম্বাবুয়ে

বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন তাসকিন আহমেদ। ৪৪ রান দিয়ে তিনি নেন ৩ উইকেট। শুরুতে তাঁর বোলিংয়েই দ্রুত তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে জিম্বাবুয়ে। এ ছাড়া শরীফুল ইসলাম ও সাইফ হাসান দুটি করে উইকেট শিকার করেন। তবে টেলর ও আরভিনের জুটি ভাঙতে দেরি হওয়ায় জিম্বাবুয়ে বড় সংগ্রহ গড়তে সক্ষম হয়।

২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা খুব খারাপ ছিল না। কিন্তু সৌম্য সরকার ৯ রান করে ব্লেসিং মুজারাবানির বলে ক্যাচ দিয়ে ফিরতেই ছন্দপতন শুরু হয়। তানজিদ হাসান তামিম আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে দলকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে ৪৬ রান করে তাঁর বিদায়ের পর বাংলাদেশের চাপ আরও বাড়ে। নাজমুল হোসেন শান্তও বেশিক্ষণ উইকেটে থাকতে পারেননি। তিনি করেন ১৩ রান। দলীয় ৯৭ রানে চতুর্থ উইকেট হিসেবে আউট হন অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয়। ২১ বলে ১৩ রান করে সিকান্দার রাজার বলে এলবিডব্লিউ হন তিনি। অধিনায়কের বিদায়ের পর বাংলাদেশের জয়ের আশা আরও ক্ষীণ হয়ে যায়।

নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারিয়ে ১৭২ রানেই শেষ

হৃদয়ের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে আর ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হয়নি। নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে দলটি। মোসাদ্দেক হোসেনও বড় ইনিংস খেলতে পারেননি। শেষ দিকে রিশাদ হোসেন ও তাসকিন আহমেদ ২৬ বলে ৩২ রানের জুটি গড়ে হারের ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করেন। রিশাদ করেন ২৩ রান, আর তাসকিন ১৬ রানে অপরাজিত থাকেন। তবে তাঁদের এই প্রচেষ্টা বাংলাদেশের পরাজয় এড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল না। শেষ পর্যন্ত ১৭২ রানেই গুটিয়ে যায় দলের ইনিংস। জিম্বাবুয়ের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে সফল ছিলেন ব্র্যাড ইভান্স। তিনি নেন ৪ উইকেট। সিকান্দার রাজা ও মাসাকাদজা দুটি করে উইকেট শিকার করেন।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি