এক অনিঃশেষ দহনগাথা
বর্তমান সময়ের কথাসাহিত্যে মাসউদ আহমাদ এক উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রমী নাম। আশির দশকে জন্ম নেওয়া এই লেখকের লেখায় মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, ইতিহাসের নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ এবং অস্তিত্বের সংকট অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে ওঠে। তার গদ্যশৈলী যেমন স্নিগ্ধ, তেমনি তীক্ষ্ণ। জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা তার আলোচিত উপন্যাস ‘লাবণ্যর মুখ’ পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। এছাড়া তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস ‘নিজের সঙ্গে একা’, ‘রুপচানের আশ্চর্য কান্না’, ‘তিতাসের বুনো হাঁস’ এবং তাঁর পুরস্কারজয়ী গল্পগ্রন্থ ‘দূর পৃথিবীর গন্ধে’। কেবল জীবনীমূলক আখ্যান নয়, বরং চরিত্রের গভীরে ঢুকে তাদের দহনকে মূর্ত করে তোলাই মাসউদ আহমাদের লেখনীর বিশেষত্ব।
মাসউদ আহমাদের উপন্যাস ‘লাবণ্যর মুখ’ বাংলা সাহিত্যের নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনকে এক ভিন্ন আলোয় দেখার এক সাহসী ও নান্দনিক প্রয়াস। কবিকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে গবেষণার অন্ত নেই, কিন্তু তার স্ত্রী লাবণ্য দাশের দর্পণে কবির ব্যক্তিজীবন, দাম্পত্যের বিমূর্ত টানাপড়েন এবং তার ভেতরের নিঃশব্দ হাহাকারকে এমন নিপুণভাবে খুব কম লেখকই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। মাসউদ আহমাদ অত্যন্ত সংবেদনশীল গদ্যে এই উপন্যাসে কেবল একজন প্রবাদপ্রতিম কবিকে নয়, বরং একজন সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষ ও তার চারপাশের অবহেলিত বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন, যেখানে কবির আকাশ ছোঁয়া কল্পনা আর মাটির পৃথিবীর রূঢ় অভাব এক বিন্দুতে এসে মিলেছে।
‘লাবণ্যর মুখ’ উপন্যাসের মূল ভিত্তি লাবণ্য ও জীবনানন্দের এক অমীমাংসিত সম্পর্কের ওপর। খলিল জিবরানের ‘বিয়ে’ কবিতায় যে আদর্শিক দূরত্বের কথা বলা হয়েছে— যেখানে মন্দিরের পিলারগুলো আলাদা দাঁড়িয়ে থাকে—জীবনানন্দের জীবনে সেই দূরত্ব ছিল এক নিষ্ঠুর বিচ্ছিন্নতা বা ‘এলিনিয়েশন’। কার্ল মার্ক্স যেমন শ্রমিকের তার শ্রম ও সৃষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা বলেছিলেন, জীবনানন্দও তেমনি তার পারিপার্শ্বিক সমাজ, পরিবার এমনকি নিজের সত্তা থেকেও যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাস করতেন। লাবণ্যর চোখে জীবনানন্দ ছিলেন এক রহস্যময় ও দুর্বোধ্য সত্তা, যার হৃদয়ের কক্ষগুলো ছিল লাবণ্যর জন্য চিরকাল রুদ্ধ। লাবণ্য চেয়েছিলেন প্রথাগত এক ঘরোয়া জীবন, নিরাপত্তা আর সামাজিক মর্যাদা; কিন্তু কবির জগৎ ছিল নক্ষত্র, হিজল-বট, ঘাস আর এক গভীর বিষণ্নতার। এই যে বিপরীতধর্মী দুটি মানুষের এক ছাদের নিচে বছরের পর বছর বসবাস, তা উপন্যাসে এক অমোঘ ট্র্যাজেডি হিসেবে মূর্ত হয়েছে।
জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে খলিল জিবরানের ‘কবি’ কবিতার অমর বৈশিষ্ট্যগুলো প্রবলভাবে বিদ্যমান। জিবরান কবিকে দেখেছেন ইহলোক ও পরলোকের যোগসূত্র হিসেবে, এক বিশুদ্ধ ঝরনা হিসেবে যা তৃষ্ণার্ত আত্মার তৃষ্ণা মেটায়। কিন্তু একই সাথে জিবরান বলেছিলেন, কবি তিনি যাকে মানুষ জীবদ্দশায় অবজ্ঞা করে কিন্তু মৃত্যুর পর স্বীকৃতি দেয়। মাসউদ আহমাদ তার উপন্যাসে এই রূঢ় ও তিক্ত সত্যটিকে তুলে ধরেছেন। জীবনানন্দ তার সমসাময়িক সাহিত্যিক মহলে ছিলেন ‘দুর্বোধ্য’। কর্মক্ষেত্রে বারবার পদচ্যুতি, বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে উদ্বাস্তু হওয়ার মতো ‘ডায়াস্পোরিক ক্রাইসিস’ এবং সামাজিক লাঞ্ছনা তাকে তিলে তিলে কুরে খেয়েছে। ফ্রাঞ্জ কাফকার ‘দ্য হাঙ্গার আর্টিস্ট’-এর মতো জীবনানন্দও যেন তার শৈল্পিক তৃপ্তির জন্য এক আমৃত্যু উপবাস করেছেন। তার দারিদ্র্য কেবল অন্নের অভাব ছিল না, তা ছিল এক প্রকারের অস্তিত্বশীল রিক্ততা। মাসউদ আহমাদ এই দহনকে কেবল শব্দে নয়, অনুভবে চিত্রিত করেছেন।
উপন্যাসে কবির শিকড়হীনতার বেদনা এক বিশাল অনুষঙ্গ। দেশভাগ পরবর্তী সময়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে কলকাতায় আসার পর কবির যে মানসিক অস্থিরতা, তা তার ঘরোয়া জীবনেও বিষ ছড়াতো। লাবণ্যর সাথে তার সম্পর্কের যে উত্থান-পতন, তাতে প্রেম যেমন ছিল, তেমনি ছিল গভীর অপ্রেম ও মান-অভিমান। জিবরান বলেছিলেন, ‘ওক গাছ আর সাইপ্রাস একে অপরের ছায়ায় বেড়ে ওঠে না’। কিন্তু জীবনানন্দের ছায়ায় লাবণ্যর নিজস্ব সত্তা যেন ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছিল। লাবণ্যর চাওয়া-পাওয়াগুলো ছিল অতি সাধারণ— স্বাভাবিক দাম্পত্য প্রেম, আর্থিক সচ্ছলতা ও একটু সামাজিক সম্মান। কিন্তু কবির কাছে ছিল কেবল কবিতার পাণ্ডুলিপি আর ট্রামের শব্দের মতো কিছু কর্কশ বাস্তবতা। এই পার্থিব আর অপার্থিবের দ্বন্দ্বে লাবণ্যর ‘মুখ’ হয়ে উঠেছে এক বিষণ্ন দর্পণ।
মাসউদ আহমাদ লাবণ্যর চরিত্রটিকে কেবল একজন রাগী বা অভিযোগকারী স্ত্রী হিসেবে আঁকেননি। তিনি দেখিয়েছেন লাবণ্যর ভেতরের সেই অবদমিত আকাঙ্ক্ষাগুলোকে। লাবণ্য জানতেন তার স্বামী একজন মহৎ কবি, কিন্তু সেই মহত্ত্বের জন্য যে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছিল, তা বইবার ক্ষমতা এক সাধারণ নারীর ছিল না। সন্তানদের প্রতি কবির মমতা থাকলেও আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে সেই মমতা অনেক সময় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। আত্মীয়-পরিজনের বাঁকা কথা আর ‘অকর্মণ্য’ উপাধি কবির জীবনকে যেভাবে জর্জরিত করেছিল, তার ঢেউ আছড়ে পড়তো লাবণ্যর হৃদয়েও। লেখক অত্যন্ত মুনশিয়ানায় দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি সুন্দর সম্পর্ক দারিদ্র্য আর অযত্নের পলিপড়ে ভরাট হয়ে যায়।
উপন্যাসের শেষ দিকে কবির রহস্যময় প্রস্থান বা ট্রাম দুর্ঘটনা পাঠককে নাড়া দেয় প্রবলভাবে। জীবনানন্দ কি স্বেচ্ছায় সেই অন্ধকারের পথে পা বাড়িয়েছিলেন? মাসউদ আহমাদ এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিলেও কবির যে মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা এঁকেছেন, তাতে এক ধরনের নিয়তিবাদের ছোঁয়া পাওয়া যায়। জিবরানের ‘কবি’ যেমন শেষে লরেল পাতার মুকুট পায়, জীবনানন্দও তেমনি মরণোত্তর জয়গান পেয়েছেন। কিন্তু তার জীবদ্দশায় যে মানুষটি (লাবণ্য) তার সাথে আগুনের পথ হেঁটেছেন, তার স্বীকৃতি কোথায়?
শেষে বলা যায়, ‘লাবণ্যর মুখ’ উপন্যাসটি জীবনানন্দ দাশের জীবনের এক কাব্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক পুনর্গঠন। মাসউদ আহমাদ ইতিহাস, কল্পনা এবং সাহিত্যের ব্যবচ্ছেদ করে এমন এক অনন্য আখ্যান তৈরি করেছেন, যেখানে জিবরানের দর্শন, কাফকার হাহাকার এবং মার্ক্সের বিচ্ছিন্নতাবোধ একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। গ্রন্থটি পাঠের পর পাঠক জীবনানন্দের নির্জন ব্যক্তিজীবনের রক্তক্ষরণ এবং লাবণ্যর মৌন আর্তনাদ দেখে ব্যথিত হবে। মাসউদ আহমাদের এই সৃষ্টি বাংলা জীবনীমূলক উপন্যাসের ধারায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যা পাঠককে দীর্ঘকাল আচ্ছন্ন করে রাখবে।


আপনার মতামত লিখুন
Array