আল্পস পর্বতমালার মঁ ব্লাঁকে ঘিরে আয়োজিত বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ আলট্রাম্যারাথন আলট্রা-ট্রেইল দ্যু মঁ ব্লাঁ (UTMB) সফলভাবে শেষ করেছেন বাংলাদেশি দৌড়বিদ পার্থ সাহা। ফ্রান্সের শামোনি থেকে শুরু হয়ে ইতালি ও সুইজারল্যান্ড হয়ে আবার শামোনিতে শেষ হওয়া প্রায় ১৭০ কিলোমিটারের এই কঠিন দৌড় শেষ করতে তাঁর সময় লেগেছে ৪৫ ঘণ্টা ২২ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড।
২৮ আগস্ট সন্ধ্যায় প্রতিযোগিতার শুরুতে আড়াই হাজারের বেশি দৌড়বিদের সঙ্গে অংশ নেন পার্থ। শুরু থেকেই ছিল বৃষ্টি ও প্রচণ্ড ঠান্ডা। এরপর দুই দিন দুই রাত ধরে পাহাড়ি পথ, অতি উচ্চতা ও কঠিন আবহাওয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয় তাঁকে।
রেসের প্রায় ১৫০ কিলোমিটার অতিক্রম করার পর ভ্যালোরসিন চেকপয়েন্টের কয়েক কিলোমিটার আগে শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন পার্থ। ঠান্ডা, জ্বর, ঘুম ও প্রচণ্ড ক্লান্তির কারণে পাহাড়ের ধারে বসে পড়েন তিনি। কিছু সময়ের জন্য বিভ্রমের মতো অবস্থাও তৈরি হয়। এমনকি দৌড়ের পোল ফেলে দিয়ে জঙ্গলের দিকে চলে গিয়েছিলেন। পরে আবার ফিরে এসে বিশ্রাম নেন।
জ্ঞান ও মনোযোগ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর বুঝতে পারেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ভ্যালোরসিন পৌঁছাতে হবে। শেষ পর্যন্ত সময়সীমার মাত্র ছয় মিনিট আগে চেকপয়েন্টে পৌঁছান তিনি। সেখানে পানি নিয়ে আবার পরের গন্তব্যের দিকে ছুটতে শুরু করেন।
শেষ দিকেও সহজ ছিল না পরিস্থিতি। একটি চেকপয়েন্টে গিয়ে মাথা ঘুরতে থাকলে চিকিৎসাসহায়তা নেন পার্থ। পরীক্ষা করে তাঁর রক্তে শর্করা কমে যাওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। কিছু খাবার খাওয়ার পর ফের দৌড় শুরু করেন তিনি। ধীরে ধীরে শরীরের শক্তি ফিরে এলে এগিয়ে যান ফিনিশ লাইনের দিকে।
ফিনিশ লাইনের কাছে পৌঁছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা হাতে তুলে নেন পার্থ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তখন মনের মধ্যে বেজে উঠেছিল ‘আমার সোনার বাংলা’। ৪৫ ঘণ্টা ২২ মিনিট ৩৮ সেকেন্ড পর শামোনির ফিনিশ লাইনে পৌঁছে পূর্ণ হয় তাঁর দীর্ঘ অভিযাত্রা।
মিরপুর থেকে মঁ ব্লাঁ
পার্থের আলট্রাম্যারাথনের যাত্রা শুরু হয় মিরপুর থেকে। কলেজে পড়ার সময় সাইক্লিংয়ের মাধ্যমে খেলাধুলায় আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। ২০১৮ সালে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করার পাশাপাশি সরকারি প্রকল্পে চাকরি করতেন। মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেনে নিয়মিত অনুশীলন করতেন তিনি।
পরে ভারতের লাদাখ ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে ম্যারাথনের জগতে প্রবেশ করেন। ধীরে ধীরে আলট্রাম্যারাথনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। লাদাখ সিল্ক রুট আলট্রা, খারদুংলা লা চ্যালেঞ্জ, দার্জিলিংয়ের বুদ্ধা ট্রেইল আলট্রাসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।
UTMB-এর যোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্যে ২০২৪ সাল থেকে নেপাল, থাইল্যান্ড ও জাপানের বিভিন্ন দীর্ঘ দূরত্বের দৌড়েও অংশ নেন। এরপর লটারির মাধ্যমে UTMB ফাইনালে অংশগ্রহণের সুযোগ পান।
তবে ইউরোপের এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার পথেও ছিল নানা বাধা। অর্থসংকটের পাশাপাশি প্রথমবার ভিসা প্রত্যাখ্যাত হয়। দ্বিতীয়বার আবেদন করে শেষ পর্যন্ত ভিসা পান পার্থ। দৌড় শুরুর মাত্র ৬০ ঘণ্টা আগে মঁ ব্লাঁ ভিলেজে পৌঁছানোর কারণে আবহাওয়া ও উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ারও পর্যাপ্ত সময় পাননি তিনি।
বর্তমানে পার্থ সাহা স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশনিং ট্রেইনার হিসেবে কাজ করছেন। নিজের সীমাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরাই তাঁর এই অভিযানের অন্যতম বড় অর্জন।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array