জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ধাক্কা এবার সরাসরি পড়ছে গণপরিবহনে। ডিজেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বেড়ে ১৩৫ টাকা হওয়ার পর বাসভাড়া পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। প্রস্তাব অনুযায়ী দূরপাল্লার বাসে কিলোমিটারে ২০ পয়সা এবং নগর পরিবহনে ১৮ পয়সা ভাড়া বাড়তে পারে। তবে কাগজে এই বৃদ্ধি যতটা, বাস্তবে যাত্রীর খরচ বাড়তে পারে তার চেয়েও বেশি। কারণ সরকারি ভাড়া নির্ধারণের হিসাব করা হয় নির্দিষ্ট আসনসংখ্যা ধরে।
- ডিজেল ২০ টাকা বাড়তেই ভাড়া বাড়ানোর তোড়জোড়
- প্রস্তাবের আগেই কোথাও কোথাও আদায় শুরু
- আসন কম হলে বাড়বে ভাড়া আরও
বাস্তবে সেই আসনসংখ্যার চেয়ে কম যাত্রী নিয়ে চলা বাসে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া স্বাভাবিকভাবেই বেশি পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেক বাস্তবতা—অনুমোদন চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কয়েকটি রুটে বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনের আগেই বাড়তি ভাড়া
রাজধানীর ফার্মগেট থেকে যাত্রাবাড়ী হয়ে সাইনবোর্ড পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় ১৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার। সরকার নির্ধারিত কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৫৩ পয়সা হিসাবে ভাড়া দাঁড়ায় প্রায় ৩৭ টাকা। কিন্তু লাব্বাইক পরিবহনে আগে থেকেই এ পথে ৪০-৪৫ টাকা নেওয়া হতো। ডিজেলের দাম বাড়ার পর সোমবার সেখানে নেওয়া হয়েছে ৫০ টাকা।
দূরপাল্লার পথেও একই চিত্র দেখা গেছে। দক্ষিণাঞ্চল থেকে ঢাকাগামী কয়েকটি বাসে যাত্রীপ্রতি ৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অথচ তখনও নতুন ভাড়ার সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি।
ফলে ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্তের আগেই বাজারে তার প্রভাব পৌঁছে গেছে। প্রশ্ন উঠছে, নতুন ভাড়া অনুমোদনের পর যাত্রীর প্রকৃত ব্যয় কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
কাগজের হিসাবে ১৮-২০ পয়সা, বাস্তবে কত?
বাস মালিকদের সংগঠন ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৭৩ পয়সা এবং দূরপাল্লায় ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে ২ টাকা ৪৩ পয়সা করার প্রস্তাব দিয়েছে। বিআরটিএর ভাড়া নির্ধারণ কমিটি অবশ্য নগর পরিবহনে ১৮ পয়সা এবং দূরপাল্লায় ২০ পয়সা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে মন্ত্রণালয় এই হার কিছুটা কমাতেও পারে।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। দূরপাল্লার বাসের ভাড়া নির্ধারণের ভিত্তি ৫২ আসন। বাস্তবে অনেক বাসে আসন থাকে ৪০টি, আর আরামদায়ক যাত্রার জন্য কোনো কোনো বাসে ৩২ থেকে ৩৬টি আসনও রাখা হয়।
ফলে ৫২ আসনের বাসে কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ২৩ পয়সা ভাড়া থাকলেও ৪০ আসনের বাসে তা দাঁড়ায় প্রায় ২ টাকা ৯০ পয়সা। নতুন প্রস্তাবিত ভাড়া ২ টাকা ৪৩ পয়সা হলে একই হিসাবে ৪০ আসনের বাসে তা প্রায় ৩ টাকা ১৬ পয়সায় পৌঁছাবে। অর্থাৎ ঘোষিত ভাড়া বৃদ্ধির চেয়ে যাত্রীর বাস্তব ব্যয় বাড়তে পারে বেশি।
ডিজেলের দামে রেকর্ড, পরিবহনে সরাসরি ধাক্কা
গত রোববার রাতে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। ডিজেলের নতুন দাম লিটারে ১৩৫ টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে এপ্রিলে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা করা হয়েছিল।
পেট্রোলের দাম এবার লিটারে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা হয়েছে। তবে পরিবহন খাতে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে ডিজেলের দাম। বাস, ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, লঞ্চ ও ইঞ্জিনচালিত নৌযানের মতো বাণিজ্যিক পরিবহনের বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। পরিবহন খাতে ব্যবহৃত জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশই ডিজেল।
শুধু বাস নয়, বাড়ছে পণ্য পরিবহনের খরচও
জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব ইতোমধ্যে পণ্য পরিবহনেও পড়তে শুরু করেছে। বেসরকারি কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ‘ফুয়েল সারচার্জ’ আরোপ করেছে।
এর অর্থ হলো জ্বালানির বাড়তি ব্যয় শুধু যাত্রী পরিবহনের ভাড়ায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়লে তার প্রভাব পড়তে পারে সরবরাহব্যবস্থা ও পণ্যের দামের ওপরও। নৌপথেও একই চাপ তৈরি হয়েছে। লঞ্চের সরকারি ভাড়া এখনো চূড়ান্ত না হলেও খেয়া ও নৌপথে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
মালিকদের যুক্তি, যাত্রীর প্রশ্ন
বাস মালিকদের দাবি, ২০২২ সালের পর ভাড়া পুনর্নির্ধারণে জ্বালানি ছাড়া অন্যান্য ব্যয় যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তাদের হিসাবে, একই সময়ে ডলারের দাম ৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১২৩ টাকা হওয়ায় বাসের যন্ত্রাংশ ও আমদানি ব্যয় বেড়েছে। তবে যাত্রীর দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নটি ভিন্ন। আয় না বাড়লে জ্বালানি, যন্ত্রাংশ ও পরিবহন ব্যয়ের সমন্বয় শেষ পর্যন্ত কতটা যাত্রী বহন করতে পারবেন?
এখন সেই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে চূড়ান্ত ভাড়া নির্ধারণের ওপর। কিন্তু তার আগেই যদি বাড়তি ভাড়া আদায় শুরু হয়, তাহলে নতুন ভাড়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হবে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অর্থ শুধু পাম্পে অতিরিক্ত টাকা গোনা নয়। এর প্রভাব বাসের আসনে, ট্রাকের ভাড়ায়, নৌপথের খরচে এবং শেষ পর্যন্ত বাজারের পণ্যমূল্যেও পড়তে পারে। তাই এবার ভাড়া সমন্বয়ের আসল পরীক্ষা শুধু মালিকের বাড়তি ব্যয় মেটানো নয়—জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির পুরো চাপটি শেষ পর্যন্ত কতটা যাত্রীর ঘাড়ে চাপছে, সেটিই।
এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array