নৌবাহিনীর লজিস্টিক ও অপারেশনাল সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ করলো বিএনএফসি ‘বলীয়ান’
নানা কারণে ২০০২ সালে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল দেশের প্রথম ডকইয়ার্ড, নারায়ণগঞ্জের ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড (ডিইডব্লিউ)। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনী দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের সবচেয়ে লাভজনক ডকইয়ার্ডগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে এটি। ভারতীয় উপমহাদেশে জাহাজ নির্মাণশিল্পের অন্যতম প্রাচীন এই প্রতিষ্ঠানটিকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। এবার ডিইডব্লিউ দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মাণ করেছে ৭০ টন ক্ষমতাসম্পন্ন অত্যাধুনিক ফ্লোটিং ক্রেন বিএনএফসি ‘বলীয়ান’। বিএনএফসি ‘বলীয়ান’ নৌবাহিনীর লজিস্টিক ও অপারেশনাল সক্ষমতায় নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বৃহস্পতিবার (৪ জুন) নারায়ণগঞ্জের বন্দরে নৌবাহিনী পরিচালিত ডকইয়ার্ড এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের (ডিইডব্লিউ) নির্মিত এই ক্রেন আনুষ্ঠানিকভাবে নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান বলেন, ‘প্রতিরক্ষা শিল্পে নিজস্ব কারিগরি দক্ষতায় বাংলাদেশ বড় আকারের যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের সক্ষমতা অর্জন করছে।’ তিনি বলেন, ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নীতিতে দেশীয় শিল্প গড়ে তোলার যে কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে, এই ফ্লোটিং ক্রেন প্রকল্প তারই একটি সফল অংশ। ডিইডব্লিউ লিমিটেডকে একটি স্বনির্ভর শিপইয়ার্ডে রূপান্তর করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
জানা যায়, প্রাচ্যের ডান্ডিখ্যাত নারায়ণগঞ্জের বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের সঙ্গে ডিইডব্লিউ’র ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ১৯২২ সালে ব্রিটিশ সরকার নারায়ণগঞ্জের সোনাকান্দা এলাকায় শীতলক্ষ্যা নদীতীরে ডকইয়ার্ডটি গড়ে তোলে। শুরুতে নামকরণ হয় নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড। স্থানীয়ভাবে সোনাকান্দা ডকইয়ার্ড নামে পরিচিত। ১৯৫৬ সালে ডকইয়ার্ডটির নাম পাল্টে ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার ওয়ার্কস লিমিটেড করা হয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো এই ডকইয়ার্ড ২০২২ সালে শতবর্ষপূর্তি উদযাপন করে। ‘নিরাপত্তাই প্রথম’ স্লোগান নিয়ে কাজ করা ডিইডব্লিউ আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করে সব ধরনের নৌযান তৈরি করছে। নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস বইয়ের তথ্যমতে, ‘স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে কুয়েতে চারটি মালবাহী জাহাজ রপ্তানির মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে জাহাজ রপ্তানি শুরু করেছিল শতবর্ষী ডিইডব্লিউ।’
বাংলাদেশকে জাহাজ নির্মাণে স্বনির্ভর করতে সরকার আন্তরিক

জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বিদেশি নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশীয় প্রযুক্তির বিকাশ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশকে জাহাজ নির্মাণে স্বনির্ভর করেত সরকার আন্তরিক বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল এম নাজমুল হাসান। তিনি বলেন, বন্ধুপ্রতিম বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি হস্তান্তরের (ট্রান্সফার অব টেকনোলজি) মাধ্যমে যৌথভাবে জাহাজ নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
নৌবাহিনী প্রধান বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল ও আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি দেশে উৎপাদনের কোনো বিকল্প নেই। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরকারকে অবহিত করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘নৌবাহিনীর সার্বিক অপারেশনাল ও লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবেই এই ফ্লোটিং ক্রেন নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছিল। এর সংযোজনের মাধ্যমে নৌবাহিনীর বিভিন্ন জাহাজের মেরামত, উদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
ফ্লোটিং ক্রেনটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৫ মাইল গতিতে চলতে সক্ষম

নৌবাহিনী পরিচালিত ডকইয়ার্ড এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের (ডিইডব্লিউ) এই ইয়ার্ডে ভবিষ্যতে বড় আকারের শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করা সম্ভব হবে। এটি দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। দেশীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত ৪৫ মিটার দৈর্ঘ্য, ১৫ মিটার প্রস্থ এবং ৩ মিটার গভীরতা বিশিষ্ট এই ফ্লোটিং ক্রেনটি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৫ মাইল গতিতে চলতে সক্ষম। ৭০ টন ওজন উত্তোলন ক্ষমতার এই ক্রেনটি জেটি এবং সমুদ্রে অবস্থানরত নৌবাহিনীর জাহাজসমূহের জটিল মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে বৈপ্লবিক সহায়তা প্রদান করবে। পাশাপাশি এটি ভারী যন্ত্রপাতি ও নৌ-উপকরণ স্থানান্তরে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কাজ করবে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের ৩০ জুন এই নির্মাণ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে নির্মিত এই ক্রেনটি দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন। অনুষ্ঠানে ডিইডব্লিউ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ ফয়জুল হক, নৌবাহিনী সদর দপ্তরের পিএসও এবং ডিইডব্লিউ ও নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
কালের আলো/এমএএএমকে


আপনার মতামত লিখুন
Array