খুঁজুন
                               
শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩
           

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৩:৪৭ অপরাহ্ণ
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও নতুন বাস্তবতার মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সামনে রেখে দীর্ঘ ১৯ বছর পর বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। দেশের ইতিহাসে এই বাজেটকে সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকাল ৩টায় বাজেট বক্তৃতা শুরু করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরুরও প্রথম বাজেট। বাজেট বক্তৃতায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের অবনতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট, ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব তুলে ধরে অর্থনীতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও ভুল নীতির কারণে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে।’

তবে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় এতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন দেখা গেলেও এর সফল বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের মতে, ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট ঘাটতি, উচ্চ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য, ঋণনির্ভর অর্থায়ন এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠাই হবে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়েছে।

এর আগে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠক শুরু হয়। রীতি অনুযায়ী জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের আগে মন্ত্রিপরিষদের এই বিশেষ সভা হয়। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সংক্রান্ত বিলে অনুমোদন সূচক সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর বিকাল তিনটায় বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। জানান, অর্থবছরের শুরু অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নবম বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের কথা। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর যাবৎ একই বেতনকাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। ইতিমধ্যে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি।’ অষ্টম বেতনকাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা; আর সর্বোচ্চ বেতনকাঠামো ৭৮ হাজার টাকা (নির্ধারিত)। নবম বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের জন্য ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আগামী অর্থবছরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত বছর এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৪০ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। এদিকে আগামী অর্থবছরে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের জন্য ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত বছর এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৪০ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, তারেক রহমানের সরকারের এই প্রথম বাজেটে কর ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবে নতুনত্ব আছে। করের আওতা বাড়ানোর বাড়ানোর ভিত্তি কি হবে, এ নিয়ে লম্বা সময়ের পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে। চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্ক কমিয়ে নূনতম পর্যায়ে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কর কাঠামোর পরিকল্পনাতেই ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে সুবিধা এবং এক ধরনের নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা।

নতুন বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানো। ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, মাংস, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি ও বীজসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া খেজুর, জিরা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গসহ বিভিন্ন মসলার ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। শিশুখাদ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করায় প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমতে পারে বলে সরকারের দাবি। তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে উৎসাহিত করতে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, মনিটর ও প্রিন্টার আমদানিতে প্রায় সব ধরনের শুল্ক ও কর তুলে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর কর কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার প্রসারে বড় ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমার সুযোগ তৈরি হলেও সেই সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

স্বস্তির পাশাপাশি কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। সিগারেটের সব স্তরে ন্যূনতম মূল্য বৃদ্ধি করায় এর দাম বাড়বে। নিকোটিন পাউচ ও নিকোটিন গ্র্যানুলসের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনচালিত মধ্যম সারির গাড়ির করভার বাড়ানো হয়েছে। ফলে এসব গাড়ির দাম বাড়তে পারে। বিদেশি কাজুবাদাম, মধু, সুপারি, পাঙাশ মাছের ফিলে, কম্পোজিট গ্যাস সিলিন্ডার এবং বিভিন্ন আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের ওপরও বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। রড, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও কিছু ইলেকট্রনিক পণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকারের সময় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। কিন্তু তা বেড়ে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্পদের অসম বণ্টন, সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতির কারণে দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বেড়েছে। ২০০৫ সালে আয়ভিত্তিক জিনি সহগ ছিল ০ দশমিক ৪৬৭, যা ২০২২ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বেড়ে ০ দশমিক ৪৯৯ হয়েছে।

রাজস্ব আহরণের দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। অন্যদিকে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। ২০০৫ সালে ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে তা ঋণাত্মক হয়ে মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

পুঁজিবাজারের প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং ভুল নীতির কারণে পুঁজিবাজার কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের ঋণের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৬ সালে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা প্রায় সাড়ে ছয় গুণ বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণ ৬৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৬ গুণের বেশি বেড়ে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ১৩ গুণের বেশি বেড়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশের ঋণঝুঁকির অবস্থান ‘নিম্ন’ ঝুঁকি থেকে ‘মধ্যম’ ঝুঁকির পর্যায়ে নেমে এসেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ২১ দশমিক ৬ এবং ১২ দশমিক ২ শতাংশ ছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উভয় সূচকের প্রবৃদ্ধিই ঋণাত্মক হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ছিল ৬৮ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছেছে, যা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।

বাজেট বক্তৃতায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার গঠনের মাত্র ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ও ভর্তুকির চাপ আরও বেড়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীদের সবচেয়ে বড় কর্মক্ষেত্র হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা প্রবাসী আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, বাণিজ্য শুল্কের অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এসব বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলা করেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

যুগান্তকারী বলছেন মির্জা ফখরুল, ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশিত: শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬, ১২:২২ পূর্বাহ্ণ
যুগান্তকারী বলছেন মির্জা ফখরুল, ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা

বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, প্রস্তাবিত নতুন বাজেট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে। তিনি মনে করেন, এই বাজেটের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। সতর্কবার্তা দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। অন্যদিকে, বাজেট নিয়ে ইতিবাচক মূল্যায়ন করেছেন ব্যবসায়ীরাও।

অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার দৃঢ় সংকল্পের প্রতিফলন
ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের দুঃশাসনে বাংলাদেশের অর্থনীতি শুধু ভঙ্গুরই হয়ে পড়েনি, একই সঙ্গে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও দুর্বল হয়ে পড়েছিল। মাঝখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও দেশকে সঠিক ট্র্যাকে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হয়েছে। যার ফলে একটি অগোছালো প্রশাসন এবং চরম দুর্দশাগ্রস্ত অর্থনীতির মধ্য দিয়ে বিএনপিকে সরকার গঠন করে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।’ এই কঠিন প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে বাজেট উপস্থাপন করেছেন, তাকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন মির্জা ফখরুল। তিনি বলেন, ‘এই বাজেটে সরকারের আন্তরিকতা ও অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করার দৃঢ় সংকল্পের প্রতিফলন ঘটেছে। বাজেটের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর সৃজনশীলতা। এতে এমন কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা আগে খুব কমই দেখা গেছে।’

বাজেটের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আগামী অর্থবছরে প্রায় ৪১ লাখ নারী পরিবারপ্রধান এই কর্মসূচির আওতায় আসবেন এবং প্রতি পরিবারকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। এজন্য ১ লক্ষ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।’ কৃষিখাতে সহায়তার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, খাল খনন কর্মসূচির মাধ্যমে সেচব্যবস্থা, পানি সংরক্ষণ এবং মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। স্থানীয় শিল্প সুরক্ষায় বাজেটের পদক্ষেপের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, ‘দেশীয় উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। যেসব পণ্য দেশে উৎপাদিত হয়, সেগুলোর সুরক্ষায় বিদেশি আমদানির ওপর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর-সুবিধাও প্রদান করা হয়েছে।’

বাজেটে ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ক্রীড়া খাতে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মাসিক সম্মানী দেওয়া হবে, ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো আয়োজন পুনরায় শুরু হবে এবং খেলাধুলার পরিবেশ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এছাড়া ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।’

সংস্কৃতি খাতের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে তিনি জানান, ‘একটি গ্রাম, একটি পণ্য’ উদ্যোগের আওতায় মৃৎশিল্প, বুননশিল্প, শীতলপাটিসহ ঐতিহ্যবাহী পণ্য বাজারজাত করা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে লোকজ ও হস্তশিল্পের প্রসারে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ঢাকার পূর্বাঞ্চলে ১৬০ একর জমির ওপর একটি বিশ্বমানের ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাজেটের অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘এসএমই খাতের বিকাশে সহজ শর্তে ঋণ, প্রবাসী কর্মীদের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার তহবিল ও ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করা হবে। হাইটেক পার্কে ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এবং গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক নারীর কাজের সুযোগ তৈরি হবে।’

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ বৃদ্ধির তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ১.৩৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ০.৫৮ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১.০১ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে। এটি মানবসম্পদ উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখবে।’ ব্যবসায়ীদের জন্য সুখবর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘ব্যবসা সহজ করতে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও নিয়ন্ত্রণ কমানো হয়েছে। কর প্রদান ও রিটার্ন দাখিল প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় করা হবে। করের হার না বাড়িয়ে বরং করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসন আধুনিকীকরণের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানো হবে।’ আমদানি সুবিধার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘রপ্তানিমুখী ও উৎপাদনমুখী খাতের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এতে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।’ মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। উৎপাদন বাড়লে মূল্যস্ফীতি স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে। সব মিলিয়ে এই বাজেট সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনবে।’

বাজেটকে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ীরা
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) বাজেটকে সামগ্রিকভাবে ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। ডিসিসিআই সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, শিল্পের কাঁচামালে উৎসে কর হ্রাস, পাঁচ বছরের কর কাঠামো আগাম ঘোষণা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে কর সুবিধা এবং অনলাইন ভ্যাট ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তিনি করমুক্ত আয়সীমা অপরিবর্তিত রাখার সমালোচনা করে বলেন, মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় এটি অন্তত ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করা প্রয়োজন ছিল। ডিসিসিআইর মতে, ঘোষিত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং অর্থনীতি নতুন গতি পাবে। তবে বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ অর্থনীতিবিদদের
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বাজেটের নীতিগত দিককে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও অর্থায়ন কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, মানবিক অর্থনীতি, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং যুব উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক কাঠামো এখনো দুর্বল। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দ আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনও বাজেট বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বাস্তবায়ন সক্ষমতার তুলনায় বড় বাজেট ঘোষণার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে। ফলে ঘোষিত বাজেটের পুরোটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে। অন্যদিকে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, করের বোঝা না বাড়িয়ে কিছু ক্ষেত্রে কমানোর উদ্যোগ ইতিবাচক। এতে ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা কিছুটা স্বস্তি পাবেন। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও সমন্বিত ও কৌশলগত পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

 

রাজশাহীতে আইজিপি শিক্ষাবৃত্তি পেল ২০ মেধাবী শিক্ষার্থী

রাজশাহী প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৯:৫৮ অপরাহ্ণ
রাজশাহীতে আইজিপি শিক্ষাবৃত্তি পেল ২০ মেধাবী শিক্ষার্থী

রাজশাহীর শহীদ মামুন মাহমুদ পুলিশ লাইন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের এসএসসি ও এইচএসসি-২০২৫ পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আইজিপি শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার( ১১ জুন)  সকাল ১১টায় বাংলাদেশ অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ফয়েজুল কবির। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ইয়াকুব আলী।

অনুষ্ঠানে পুলিশ কমিশনার বলেন, এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের উৎসাহ, উদ্দীপনা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি করে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে সফলতা অর্জন করে দেশ ও জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

তিনি বলেন, শিক্ষকদের আন্তরিক দিকনির্দেশনা, শিক্ষার্থীদের কঠোর পরিশ্রম এবং অভিভাবকদের সার্বক্ষণিক সহযোগিতার ফলেই এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ সবসময় পাশে থাকবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

অনুষ্ঠানে এসএসসি ও এইচএসসি-২০২৫ পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত ২০ জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে আইজিপি শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হয়। এছাড়া অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের হাতে নগদ অর্থ, ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেওয়া হয়। পরে ফুলেল শুভেচ্ছা ও সংবর্ধনার মাধ্যমে তাদের সম্মাননা জানানো হয়।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর) ও অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত মোহাম্মদ খোরশেদ আলম, পিপিএম; উপ-পুলিশ কমিশনার (ফোর্স) মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান; আরএমপির মুখপাত্র ও উপ-পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড সিটিটিসি) মো. গাজিউর রহমান, পিপিএমসহ আরএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ।

কালের আলো/জেএন/এমএসআইপি 

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জিতে বাংলাদেশের ইতিহাস

স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৯:৪০ অপরাহ্ণ
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জিতে বাংলাদেশের ইতিহাস

ক্রিকেটের দুনিয়ায় অন্যতম পরাশক্তি অস্ট্রেলিয়া। সেই অস্ট্রেলিয়াকে সিরিজ হারিয়েই আজ ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। ঘরের মাঠে অজিদের বিপক্ষে তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথমটিতে সহজ জয়ে লিড নিরেছিল টাইগাররা। আজ দ্বিতীয় ম্যাচে জিতে সিরিজ জয় নিশ্চিত করেছে লাল-সবুজের দল। হলুদ জার্সিধারীদের বিপক্ষে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের প্রথম সিরিজ জয় এটিই।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের এই ঐতিহাসিক জয় এলো বৃষ্টির বাধা উপেক্ষা করেই। আগে ব্যাট করতে নেমে অল আউটের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল অজিরা। ৪২ ওভারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রান করতেই নামে বৃষ্টি। এরপর লম্বা সময় খেলা বন্ধ থাকার পর বিকাল ৫.১৫ মিনিটে যখন ম্যাচ আবার মাঠে গড়ায় ততক্ষণে শুরু হয়েছে ওভার কর্তন। ফলে অজিরা আর ব্যাট করতে নামতে পারেনি। ৪১ ওভারে নেমে আসে ম্যাচ, বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৯২। সে লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতে হোঁচট খেলেও সৌম্য সরকার ও নাজমুল শান্তর ৪২ রানের ইনিংসের পর তাওহিদ হৃদয়-মেহেদি মিরাজ জুটিতে ৩৫ ওভারেই ৫ উইকেটের জয় নিশ্চিত করে টাইগাররা।

১৯২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই উইকেট হারায় বাংলাদেশ। প্রথম ওভারের দ্বিতীয় বলেই সাজঘরের পথ ধরতে হয় তানজিদ তামিমকে। বাংলাদেশি এই ওপেনার ২ বলে ০ রান করে ফিরেন জাভিয়ের বার্টলেটের বলে। শুরুতেই এক ওপেনারকে হারিয়ে তাই চাপে পড়ে বাংলাদেশ।

তবে বৃষ্টি ভেজা মাঠে এরপর আরেক ওপেনার সৌম্য সরকারকে সঙ্গে নিয়ে চাপ সামলে নেন নাজমুল শান্ত। দুজন মিলে দেখেশুনে খেলে অজি বোলারদের বিপক্ষে জুটি গড়েন।

শান্ত-সৌম্যর দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে স্কোরবোর্ডে ওঠে ৮৬ রান। সৌম্য ছিলেন ব্যক্তিগত অর্ধশতকের পথে। তবে ফিফটি থেকে ৮ রান দূরে থাকতেই ফিরতে হয় তাকে। ৪৭ বলে ৪২ রান করে ম্যাট রেনশর বলে আউট হন তিনি। দলীয় ৮৬ রানে সৌম্য ফেরার পর ক্রিজে শান্তর সঙ্গী হন লিটন দাস।

তবে লিটনের সঙ্গে বড় জুটি গড়া হয়নি শান্তর। এ জুটিতে স্কোরবোর্ডে ১২ রান ওঠতেই ব্যক্তিগত ৪২ রান করে আউট হন শান্ত। এরপর ক্রিজে হৃদয় লিটনের সঙ্গী হলেও জুটি বড় হয়নি। ব্যক্তিগত ২১ রানেই সাজঘরের পথ ধরেন লিটন। দলীয় ১২২ রানে লিটন ফেরার পর ১৪৪ রানে আউট হন আগের ম্যাচে দুর্দান্ত ইনিংস খেলা মোসাদ্দেক।

দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারালেও ষষ্ঠ উইকেটে হৃদ্যয়-মিরাজের জুটিতে নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের জয়। অজি বোলারদের বিপক্ষে এরপর আর কোনো ভুল করেননি মিরাজ-হৃদয়। দুজন মিলে দেখেশুনে খেলেন ৫১ রানের অপরাজিত জুটি। এই জুটিতেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ নিশ্চিত করে টাইগাররা। মিরাজ অপরাজিত ছিলেন ২২ রানে, হৃদয় অপরাজিত ছিলেন ৪০ রানে।

এর আগে মিরপুরে টস জিতে আজ ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক জশ ইংলিস। সিরিজের প্রথম ম্যাচে টস জিতেও ফিল্ডিং বেছে নিয়েছিলেন তিনি, কিন্তু বৃষ্টি আইনে ৮৬ রানে হারের পর আজ সিদ্ধান্ত বদলালেন। তবে ভাগ্য তার সহায় হলো না। সফরকারীদের শুরুটা হয়ে গেল রূপকথার বিপরীত গল্পের মতো।

মাত্র তিন ওভারের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া হয়ে গেল ০ রানে ৩ উইকেট। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে এ যেন এক অবিশ্বাস্য দুঃস্বপ্ন। অজিদের ৮৮২টি ওয়ানডে ম্যাচের দীর্ঘ পথচলায় মাত্র দু’বারই দুই ওপেনার শূন্য রানে আউট হয়েছিলেন ২০০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ২০২২ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে। বাংলাদেশের মাটিতে এসে সেই বিরল লজ্জার তৃতীয়বার ঘটল।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। শূন্য রানে তিন উইকেট হারানোর ঘটনা অস্ট্রেলিয়ার এক হাজারেরও বেশি ওয়ানডে ইতিহাসে এই প্রথম। আগে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়ও তারা তিন উইকেট হারিয়েছিল ৫ রানে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই ০ রানে ৩ উইকেট হারানোর লজ্জা পেয়েছে তারা। এরপর কিছুটা সামলে নিলেও বৃষ্টির জন্য খেলা বন্ধের আগে তারা ৪২ ওভারে করতে পারে ৮ উইকেটে ১৮৭ রান।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ