খুঁজুন
                               
, ,
           

দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা

অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ

কালের আলো রিপোর্ট
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১১ জুন, ২০২৬, ৩:৪৭ অপরাহ্ণ
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য, বাস্তবায়ন বড় চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও নতুন বাস্তবতার মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সামনে রেখে দীর্ঘ ১৯ বছর পর বিএনপি সরকারের এটি প্রথম বাজেট। দেশের ইতিহাসে এই বাজেটকে সবচেয়ে বড় বাজেট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকাল ৩টায় বাজেট বক্তৃতা শুরু করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একই সঙ্গে অর্থমন্ত্রী হিসেবে আমির খসরুরও প্রথম বাজেট। বাজেট বক্তৃতায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের অবনতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট, ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা, মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব তুলে ধরে অর্থনীতির একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও ভুল নীতির কারণে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনতে সরকার কাজ করছে।’

তবে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হওয়ায় এতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও অর্থনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন দেখা গেলেও এর সফল বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন। অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের মতে, ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট ঘাটতি, উচ্চ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য, ঋণনির্ভর অর্থায়ন এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠাই হবে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একই সঙ্গে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও ঘোষণা করা হয়েছে।

এর আগে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবার (১১ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠক শুরু হয়। রীতি অনুযায়ী জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের আগে মন্ত্রিপরিষদের এই বিশেষ সভা হয়। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সংক্রান্ত বিলে অনুমোদন সূচক সই করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এরপর বিকাল তিনটায় বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে আনুষ্ঠানিক ঘোষণাও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। জানান, অর্থবছরের শুরু অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে ধাপে ধাপে নবম বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের কথা। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা বিগত প্রায় ১১ বছর যাবৎ একই বেতনকাঠামোতে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। ইতিমধ্যে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিচ্ছি।’ অষ্টম বেতনকাঠামো অনুযায়ী সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা; আর সর্বোচ্চ বেতনকাঠামো ৭৮ হাজার টাকা (নির্ধারিত)। নবম বেতন কাঠামোয় সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের জন্য ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, আগামী অর্থবছরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত বছর এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৪০ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। এদিকে আগামী অর্থবছরে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের জন্য ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গত বছর এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৪০ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, তারেক রহমানের সরকারের এই প্রথম বাজেটে কর ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবে নতুনত্ব আছে। করের আওতা বাড়ানোর বাড়ানোর ভিত্তি কি হবে, এ নিয়ে লম্বা সময়ের পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে। চাল-ডালসহ নিত্যপণ্যের আমদানি শুল্ক কমিয়ে নূনতম পর্যায়ে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। কর কাঠামোর পরিকল্পনাতেই ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে সুবিধা এবং এক ধরনের নিশ্চয়তা দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা।

নতুন বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর কমানো। ধান, চাল, গম, আলু, মাছ, মাংস, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি ও বীজসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া খেজুর, জিরা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গসহ বিভিন্ন মসলার ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। শিশুখাদ্য উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রত্যাহার করায় প্রতিবার ডায়ালাইসিসে প্রায় ৮০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় কমতে পারে বলে সরকারের দাবি। তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে উৎসাহিত করতে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, মনিটর ও প্রিন্টার আমদানিতে প্রায় সব ধরনের শুল্ক ও কর তুলে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর কর কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার প্রসারে বড় ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে বাজারে কিছু পণ্যের দাম কমার সুযোগ তৈরি হলেও সেই সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছাবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

স্বস্তির পাশাপাশি কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয়ের আশঙ্কাও রয়েছে। সিগারেটের সব স্তরে ন্যূনতম মূল্য বৃদ্ধি করায় এর দাম বাড়বে। নিকোটিন পাউচ ও নিকোটিন গ্র্যানুলসের ওপর ৩৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনচালিত মধ্যম সারির গাড়ির করভার বাড়ানো হয়েছে। ফলে এসব গাড়ির দাম বাড়তে পারে। বিদেশি কাজুবাদাম, মধু, সুপারি, পাঙাশ মাছের ফিলে, কম্পোজিট গ্যাস সিলিন্ডার এবং বিভিন্ন আমদানিকৃত খাদ্যপণ্যের ওপরও বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। রড, টাইলস, স্যানিটারিওয়্যার ও কিছু ইলেকট্রনিক পণ্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকারের সময় ২০০৫-০৬ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ দশমিক ২২ শতাংশ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে। তিনি জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৭ শতাংশ। কিন্তু তা বেড়ে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্পদের অসম বণ্টন, সুশাসনের অভাব এবং দুর্নীতির কারণে দেশে অর্থনৈতিক বৈষম্যও বেড়েছে। ২০০৫ সালে আয়ভিত্তিক জিনি সহগ ছিল ০ দশমিক ৪৬৭, যা ২০২২ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বেড়ে ০ দশমিক ৪৯৯ হয়েছে।

রাজস্ব আহরণের দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনও প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। অন্যদিকে কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে তা বেড়ে ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। খেলাপি ঋণের মোট পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। ২০০৫ সালে ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষে তা ঋণাত্মক হয়ে মাইনাস ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধিও ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

পুঁজিবাজারের প্রসঙ্গ টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং ভুল নীতির কারণে পুঁজিবাজার কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের ঋণের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ২০০৬ সালে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪ সালে তা প্রায় সাড়ে ছয় গুণ বেড়ে ৮ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ ঋণ ৬৫ হাজার কোটি টাকা থেকে ১৬ গুণের বেশি বেড়ে ১০ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী জানান, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে সরকারের ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ১৩ গুণের বেশি বেড়ে ১ লাখ ১৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশের ঋণঝুঁকির অবস্থান ‘নিম্ন’ ঝুঁকি থেকে ‘মধ্যম’ ঝুঁকির পর্যায়ে নেমে এসেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যের চিত্র তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি ও আমদানির প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ২১ দশমিক ৬ এবং ১২ দশমিক ২ শতাংশ ছিল। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উভয় সূচকের প্রবৃদ্ধিই ঋণাত্মক হয়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ছিল ৬৮ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে ১২২ টাকায় পৌঁছেছে, যা বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে।

বাজেট বক্তৃতায় মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার গঠনের মাত্র ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও সারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ, কৃষি, পরিবহন ও শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ও ভর্তুকির চাপ আরও বেড়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের প্রবাসী কর্মীদের সবচেয়ে বড় কর্মক্ষেত্র হওয়ায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা প্রবাসী আয় ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, উচ্চ সুদহার, বাণিজ্য শুল্কের অনিশ্চয়তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন নতুন বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। এসব বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলা করেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ

হোটেল-রেস্তোরাঁর জন্য ডলার রাখার নতুন সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৪১ অপরাহ্ণ
হোটেল-রেস্তোরাঁর জন্য ডলার রাখার নতুন সুযোগ দিল বাংলাদেশ ব্যাংক

বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রার সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ নিজেদের বৈদেশিক মুদ্রা (এফসি) হিসাবে রাখতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, শপিংমলসহ বিদেশি পর্যটকদের পণ্য ও সেবা দেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য এ সুযোগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

রোববার (২৫ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ (এফইপিডি) এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে দেশের সব অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকে পাঠিয়েছে।

সার্কুলার অনুযায়ী, আন্তর্জাতিকভাবে ইস্যু করা কার্ড ও অন্যান্য অনুমোদিত পেমেন্ট পদ্ধতিতে বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ ব্যাংকগুলো অ্যাকোয়ারিং সেবার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে দেবে। এর সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবে রাখা যাবে। বাকি অর্থ বাংলাদেশি টাকায় রূপান্তর করতে হবে।

এফসি হিসাবে রাখা বৈদেশিক মুদ্রা চলতি লেনদেনসংক্রান্ত বৈধ বৈদেশিক মুদ্রার দায় পরিশোধে ব্যবহার করা যাবে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধও অন্তর্ভুক্ত। এ ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জারি করা এফইপিডি-১ সার্কুলার নং ৪০-এর নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, প্রযোজ্য কর ও ভ্যাট কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিষয়টি ব্যাংকগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক কার্ড ও অনুমোদিত অন্যান্য পেমেন্ট পদ্ধতিতে অর্থ গ্রহণের উপযুক্ত ব্যবস্থা রেখেছে কি না, তা যাচাই করতে হবে।

এ ছাড়া গ্রাহক পরিচিতি (কেওয়াইসি), অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ (এএমএল/সিএফটি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রতিবেদন দাখিলের নিয়ম যথাযথভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনসংক্রান্ত গাইডলাইন্স, ২০১৮-এর ত্রয়োদশ অধ্যায়ের ৩ নম্বর অনুচ্ছেদে আগে কেবল ডিপ্লোম্যাটিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস বা শুল্কমুক্ত দোকানের নামে বৈদেশিক মুদ্রার হিসাব খোলার সুযোগ ছিল। নতুন সার্কুলারের মাধ্যমে এ সুবিধা আরও বিস্তৃত করা হলো।

কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি 

অক্টোবরে ২৪ দিনে প্রবাসী আয় ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৫ অপরাহ্ণ
অক্টোবরে ২৪ দিনে প্রবাসী আয় ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা

চলতি অক্টোবর মাসের প্রথম ২৪ দিনে দেশে ২১৩ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলারের প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এসেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ৬৫ পয়সা হিসাবে এর পরিমাণ প্রায় ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা।

রোববার (২৫ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্রের দপ্তর থেকে এ তথ্য জানানো হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ২০০ কোটি ২০ লাখ ডলার। সেই হিসাবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অক্টোবরের প্রথম ২৪ দিনে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ।

অর্থবছরের শুরু থেকেও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোট ১ হাজার ৭২ কোটি ৯০ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৯৫৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরু থেকে প্রবাসী আয়ে বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ও রিজার্ভের জন্য সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি 

শখের গাছেই বদলে গেল জীবন, মাসে লাখ লাখ টাকা আয় তানজিলার

মাদারীপুর সংবাদদাতা,কালের আলো
প্রকাশিত: রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:২৯ অপরাহ্ণ
শখের গাছেই বদলে গেল জীবন, মাসে লাখ লাখ টাকা আয় তানজিলার

শখ করে ঘরের বারান্দায় গড়ে তুলেছিলেন ইনডোর প্ল্যান্টের ছোট্ট বাগান। সেই শখই একসময় হয়ে ওঠে জীবিকার উৎস। নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নিজের পরিশ্রম ও পরিবারের সহযোগিতায় গড়ে তুলেছেন ইনডোর প্ল্যান্টের বাগান ‘ওয়ান্ডার গার্ডেন বিডি’। বর্তমানে এ বাগান থেকে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা আয় করছেন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার নারী উদ্যোক্তা তানজিলা আখি। কোনো কোনো মাসে তাঁর আয় তিন থেকে চার লাখ টাকায়ও পৌঁছায়।

তানজিলা একসময় ঢাকায় চাকরি করতেন। ২০১৯ সালের দিকে একটি ডিজাইনার হাউসে কাজ করার সময় গাছের প্রতি ভালোবাসা থেকে ঘরের বারান্দায় ইনডোর প্ল্যান্টের বাগান গড়ে তোলেন। তখন শখের বশে গাছ সংগ্রহ ও পরিচর্যা করলেও ভবিষ্যতে এই উদ্যোগ যে তাঁর পেশা হয়ে উঠবে, তা ভাবেননি।

২০২০ সালে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর হোম কোয়ারেন্টিনে থাকতে হয় তাঁকে। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন সেই সময়ে বারান্দার গাছগুলো হয়ে ওঠে তাঁর সঙ্গী। গাছের পরিচর্যা করতে গিয়ে প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর হয়। বাড়তে থাকে বিভিন্ন জাতের গাছ সংগ্রহের আগ্রহ।

একপর্যায়ে চাকরি ছেড়ে নিজের সংগ্রহের গাছগুলো নিয়ে স্বামীর কর্মস্থল নরসিংদীতে চলে যান তানজিলা। সেখানে নতুন করে বাগান গড়ে তোলেন। ধীরে ধীরে শখের বাগানকে ব্যবসায় রূপ দেন। শুরু করেন গাছের চারা বিক্রি এবং বিভিন্ন বৃক্ষমেলায় ইনডোর প্ল্যান্টের স্টল দেওয়া।

তবে ব্যবসার পথ সহজ ছিল না। ২০২৪ সালে নরসিংদীতে ভাড়া বাসায় থাকার সময় বাগান নিয়ে প্রতিবেশীদের আপত্তির মুখে পড়েন তিনি। একপর্যায়ে সব গাছ নিয়ে শিবচরে ফিরে আসেন। নতুন করে শুরু করতে হয় সবকিছু।

পরিবারের সহযোগিতায় শিবচরে নিজেদের আট শতাংশ জমিতে গড়ে তোলেন ‘ওয়ান্ডার গার্ডেন বিডি’। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে গাছের সংগ্রহ, ক্রেতার আগ্রহ এবং ব্যবসার পরিধি।

বাগানে এক হাজারের বেশি প্রজাতির গাছ

বর্তমানে তানজিলার বাগানে রয়েছে ফিলোডেনড্রন, মনস্টেরা, অ্যাগলোনিমা, সিঙ্গোনিয়াম, থাই লিলি, অর্কিড, ফিটোনিয়া, পারলার পাম, বেগোনিয়া ও পথোসসহ বিভিন্ন ধরনের ইনডোর প্ল্যান্ট। তাঁর দাবি, বাগানে এক হাজারের বেশি প্রজাতির গাছ রয়েছে। এসব গাছের চারার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২৫ লাখ টাকা।

বর্তমানে তাঁর এই উদ্যোগে কাজ করছেন দুজন কর্মচারী। বাগানকে আরও বড় করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।

নিজের উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প বলতে গিয়ে তানজিলা আখি বলেন, করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর গাছের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও গভীর হয়। সেখান থেকেই গাছ সংগ্রহ শুরু করেন। ধীরে ধীরে গড়ে তোলেন ‘ওয়ান্ডার গার্ডেন বিডি’। ব্যবসা শুরু করার পর নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হলেও সেগুলো অতিক্রম করে এখন মাসে দুই লাখ টাকার বেশি আয় করছেন। আগামী মাস থেকে আরও একটি বাগান শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তানজিলার উদ্যোগে গর্বিত এলাকাবাসী

তানজিলার এই উদ্যোগে গর্বিত স্থানীয় বাসিন্দারাও। প্রতিবেশী মিলন বলেন, একজন নারী নিজের পরিশ্রমে এত সুন্দর একটি বাগান গড়ে তুলেছেন, যা এলাকাবাসীর জন্য গর্বের বিষয়। তাঁর মতে, বাগানটি অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করতে পারে।

আরেক প্রতিবেশী সাজ্জাদ হোসেন খান বলেন, শিবচরের মতো এলাকায় এমন পরিবেশবান্ধব নার্সারি দেখে তিনি আনন্দিত। নতুন ও পুরোনো উদ্যোক্তাদের এ ধরনের উদ্যোগে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলিমুজ্জামান খান বলেন, কৃষি ও নার্সারিভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ধরনের উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে পাশে থাকবে কৃষি বিভাগ।

বারান্দার ছোট্ট বাগান থেকে বাণিজ্যিক নার্সারি গড়ে তোলা তানজিলা আখির এই উদ্যোগ দেখিয়েছে, ব্যক্তিগত শখও পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে আয়ের উৎস হয়ে উঠতে পারে। নিজের বাগানকে আরও বড় করার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলেছেন এই নারী উদ্যোক্তা।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি