কম্বল কেনায় ১১০ কোটি টাকা, ডায়েরি ও ক্যালেন্ডারে ৭৭ কোটি ৩৪ লাখ, আবার নিরাপত্তা ও সফটওয়্যার ব্যবস্থার নামে কোটি কোটি টাকার কার্যাদেশ—মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির বিভিন্ন খাতে বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের হিসাব এখন প্রশ্নের মুখে। এসব ব্যয়ের পেছনে স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া অনুসরণ না করা, ভুয়া বিল ও কাগজপত্র ব্যবহার এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে কর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ সংরক্ষণেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন দল তদন্ত করে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদনের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণের পর মার্কেন্টাইল ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। জবাব সন্তোষজনক না হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
১৮৭ কোটি টাকার ব্যয়ের হিসাব
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে পরিচালক হওয়ার পর মোহাম্মদ আব্দুল আওয়ালের বিরুদ্ধে ব্যাংকের বিভিন্ন ক্রয় কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। সিএসআর খাতের আওতায় কম্বল কেনার নামে প্রায় ১১০ কোটি টাকা এবং ব্যবসা উন্নয়ন খাতে ডায়েরি ও ক্যালেন্ডার কেনার নামে ৭৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগ তদন্তে নেয় পরিদর্শন দল। দুটি খাতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১৮৭ কোটি টাকা। এত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং অর্থের প্রকৃত ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিদর্শন দল। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যাও চাওয়া হয়েছে।
সিএসআর তহবিলে বড় ধাক্কা
মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সিএসআর তহবিল ব্যবহারের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বড় অঙ্কের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১১০ কোটি টাকার কম্বল কেনার হিসাব দেখানো হলেও এর মধ্যে কমপক্ষে ৮৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনায় ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ সাত পরিচালকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিশেষ সিএসআর ও অন্যান্য ক্রয় খাতের অর্থ প্রভাবশালী পরিচালক এবং রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরোক্ষ আর্থিক সুবিধা দিতে ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ডায়েরি, ক্যালেন্ডার, কম্বল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, সফটওয়্যার ও আসবাবপত্র—বিভিন্ন পণ্যের কেনাকাটায় বরাদ্দ অর্থ ব্যবহারের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শন।
কর্মীদের পাওনা নিয়েও অভিযোগ
ব্যাংকের আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতের পদ্ধতি নিয়েও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তাপস চন্দ্র পালের বিরুদ্ধে অভিযোগ, পেশাগত হিসাববিদ্যার সনদ না থাকলেও দীর্ঘদিন ফিন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন (এফডিএ) ও সিএফও অফিসে দায়িত্ব পালনের সুযোগে আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতিতে প্রভাব বিস্তার করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, কর্মীদের গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও কল্যাণ তহবিলের জন্য প্রয়োজনীয় প্রভিশন না রেখেই আর্থিক বিবরণী তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে অবসরপ্রাপ্ত ও চাকরি ছেড়ে দেওয়া অনেক কর্মী দীর্ঘদিন ধরে তাদের আইনগত পাওনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দায়িত্বে থাকাকালে এসব সুবিধা গ্রহণ করলেও অন্য কর্মীদের পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে অর্থসংকটের অজুহাত দেখানো হয়েছে। এ ঘটনায় কিছু নিয়ন্ত্রক পরিদর্শকের নীরব সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে।
বোর্ড সভার ফিতেও ‘অস্বাভাবিক’ বিল
পরিচালনা পর্ষদ ও নির্বাহী কমিটির সভার ফি পরিশোধ নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত ৮ হাজার টাকার পরিবর্তে প্রতিটি বোর্ড ও ইসি সভায় ১ লাখ টাকা করে বিল দেওয়া হয়েছে। এমডি মতিউল হাসান কোম্পানি সেক্রেটারি মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম শুহিনের সহযোগিতায় এ সুবিধা নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট অর্থ ব্যাংকের একটি সাসপেন্স হিসাবে সমন্বয়ের বিষয়টিও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। ভুয়া বিল ও জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে এ ধরনের অর্থ সমন্বয় করা হয়ে থাকলে সেটি গুরুতর আর্থিক অনিয়ম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
টেন্ডার ছাড়াই সাড়ে তিন কোটি টাকার কাজ
ব্যাংকের নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়নের নামে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার কার্যাদেশ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এমডি মতিউল হাসানের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী প্রকৌশলী মো. রেজা হোসেনের সহায়তায় স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই ওই কাজের অনুমোদন দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করায় ডিএমডি আদিল রাইহানকে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে। একই সময়ে আইটি বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মাহমুদ হাসানকে ভয়ভীতি দেখিয়ে অনিয়মে সহযোগিতা করতে বাধ্য করার অভিযোগও রয়েছে।
সফটওয়্যার কেনাকাটাতেও কোটি টাকার প্রশ্ন
২০২৫ সালের ২২ অক্টোবরের একটি সফটওয়্যার-সংক্রান্ত কার্যাদেশ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করে একটি সফটওয়্যার ল্যাবকে প্রথমে ৮ লাখ ৪০ হাজার টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এমডি মতিউল হাসানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী রেজা হাসানের সহায়তায় রেইনবো অ্যারের অনুকূলে ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখার মাধ্যমে ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
পদোন্নতির ধারাবাহিকতাও আলোচনায়
তাপস চন্দ্র পাল রূপালী ব্যাংকে কর্মজীবন শুরু করার পর মার্কেন্টাইল ব্যাংকে জুনিয়র অফিসার হিসেবে যোগ দেন। এরপর ২০১৮ সালে ভিপি, ২০২১ সালে এসভিপি, ২০২২ সালে ইভিপি এবং ২০২৪ সালে এসইভিপি হন। ২০২৬ সালে তিনি ডিএমডি পদে উন্নীত হন। অভিযোগকারীদের দাবি, পরিচালকদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকার কারণেই ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি।
ব্যাংকের বক্তব্য
অভিযোগের বিষয়ে মার্কেন্টাইল ব্যাংকের মুখপাত্র আশিম কুমার শাহ্ বলেন, এসব বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি ব্যাংকের কোন বিভাগ দেখছে, তা জেনে পরে বক্তব্য দেওয়া সম্ভব হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, পরিদর্শনে কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। ব্যাংকের ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন দেখার বিষয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশ্নের জবাবে মার্কেন্টাইল ব্যাংক কী ব্যাখ্যা দেয় এবং পরবর্তী পদক্ষেপে কার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কারণ অভিযোগগুলোর ব্যাপ্তি শুধু একটি-দুটি ক্রয় কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্যাংকের সিএসআর, আর্থিক বিবরণী, কর্মীদের তহবিল এবং অভ্যন্তরীণ ক্রয়ব্যবস্থার ওপরই বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array