দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক সরবরাহের পথে ফিরছে দেশ। সংকটের তীব্রতা কমাতে একদিকে স্পট মার্কেট থেকে দ্রুত এলএনজি আমদানির উদ্যোগ, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাসের নিজস্ব উৎস বাড়াতে নতুন কূপ খনন, পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার, দেশীয় কয়লা উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের এসব তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিতে ইতোমধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনের আভাস মিলছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ আরও বাড়বে এবং চলতি সেপ্টেম্বরেই শিল্প, বিদ্যুৎ, সিএনজি ও আবাসিক খাতে সংকট অনেকটাই কমে আসবে।
জরুরি ব্যবস্থায় সংকট সামাল
সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন এবং একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে শিল্প, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও আবাসিক খাতে। অনেক শিল্পকারখানায় উৎপাদন কমে যায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি এবং রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে রান্নাতেও ভোগান্তি তৈরি হয়। এ অবস্থায় সরকার সংকট দীর্ঘায়িত না করে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছে। মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালকে পূর্ণ সক্ষমতায় কাজে লাগানোর পাশাপাশি স্পট মার্কেট থেকে বাড়তি দামে এলএনজি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। নতুন এলএনজি কার্গো দেশে আসায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকারের এ তাৎক্ষণিক তৎপরতাই এখন সংকট কাটার সবচেয়ে বড় আশার জায়গা। আরও এলএনজি কার্গো যুক্ত হলে সরবরাহ ঘাটতি পর্যায়ক্রমে কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কয়েক দিনেই দৃশ্যমান উন্নতি
পেট্রোবাংলার হিসাবে, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। বিপরীতে সরবরাহ ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ দৈনিক ঘাটতি এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি। ঘাটতির এই চাপ সামলাতে সরকার শুধু সরবরাহ বাড়ানোর দিকেই নজর দেয়নি, গ্যাসের বিকল্প ব্যবহারের পথও খুলে দিয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর চাপ কমাতে জ্বালানি তেল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে সীমিত গ্যাস শিল্পসহ অগ্রাধিকার খাতে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আমদানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তাঁর প্রত্যাশা, কয়েক দিনের মধ্যেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয়ে আসবে। সরকারের এই সময়সীমাভিত্তিক উদ্যোগ শিল্প ও ব্যবসা খাতে নতুন করে আশাবাদ তৈরি করেছে।
শিল্পে ফিরবে গতি
গ্যাস সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে শিল্প খাত। উৎপাদন কমানো, কারখানা পরিচালনার সময় কমিয়ে আনা এবং বাড়তি উৎপাদন ব্যয়ের কারণে শিল্পোদ্যোক্তারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এর প্রভাব পড়েছে রপ্তানি কার্যক্রম ও শ্রমিকদের কর্মঘণ্টাতেও। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে শিল্পকারখানাগুলো দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে পারবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রপ্তানিতে গতি আসবে, সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে এবং বিনিয়োগের পরিবেশও উন্নত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। গ্যাস সংকট নিরসন শুধু জ্বালানি খাতের স্বস্তি নয়; এটি শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু এলএনজি নয়, নজর দেশীয় সম্পদে
বর্তমান সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি সরকার দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরির কাজও এগিয়ে নিচ্ছে। নতুন গ্যাসকূপ খনন, পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার এবং দেশের নিজস্ব গ্যাসের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লাখনি থেকে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। দেশীয় কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানো গেলে আমদানিনির্ভরতা কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে পরিবেশ ও স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও জীবিকার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনা করে পুনর্বাসনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও সামনে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ দেশীয় সম্পদ ব্যবহারের পাশাপাশি সামাজিক ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
তৈরি হচ্ছে ভবিষ্যতের জ্বালানি অবকাঠামো
গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দিতে বড় অবকাঠামো তৈরির পরিকল্পনাও এগোচ্ছে। মাতারবাড়ীতে ১ হাজার এমএমসিএফডি সক্ষমতার স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে ৬০০ এমএমসিএফডি সক্ষমতার আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের লক্ষ্যে চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতেও বহুমুখী জ্বালানি কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৭ সালের শুরুর দিকে উৎপাদনে আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। জ্বালানি মজুদের ক্ষেত্রেও সরকারের প্রস্তুতি বেড়েছে। ডিজেলের মজুদ ১৭ দিন থেকে বাড়িয়ে ৩২ দিনে উন্নীত করা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে ৯০ দিনের জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সাময়িক স্বস্তি নয়, লক্ষ্য জ্বালানি নিরাপত্তা
বর্তমান বাস্তবতায় গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান এখনো বড়। তাই এলএনজি আমদানির মাধ্যমে তাৎক্ষণিক সংকট সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। সেই জায়গায় সরকারের বর্তমান কৌশলটি গুরুত্বপূর্ণ—একদিকে জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি এনে সরবরাহ বাড়ানো, অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস ও কয়লার অনুসন্ধান-উত্তোলন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ এবং জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা বাড়ানো। ফলে বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথটি শুধু তাৎক্ষণিক সরবরাহ বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও বহুমুখী ও স্থিতিশীল করার প্রস্তুতিও এগোচ্ছে। আগামী কয়েক দিনে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে সেটি হবে সরকারের তাৎক্ষণিক উদ্যোগের সাফল্য। আর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হলে সেই সাফল্যই পরিণত হতে পারে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তিতে।
কালের আলো/এম/এএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array