সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডেঙ্গুর বড় ধাক্কা
রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছেন, বাড়ছে মৃত্যুও। স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ হিসাবে, এক দিনে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১ হাজার ৫৫৮ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন—চলতি বছরে এক দিনে হাসপাতালে ভর্তির সর্বোচ্চ সংখ্যা এটি। একই সময়ে মারা গেছেন আরও চারজন। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৭ জনে। তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা—ডেঙ্গুর প্রকোপের মূল সময় এখনও শেষ হয়নি। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরজুড়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। ফলে আগামী দুই মাসকে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর এ পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৪২ হাজার ৫৯০ জন। জুনে যেখানে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ৯০৭ জন, জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। আগস্টে সংখ্যাটি লাফিয়ে হয়েছে ২০ হাজার ৫৩৬। আর চলতি মাসেই এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৭৪৪ জন। বর্ষা শেষ হওয়ার আগেই সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি স্পষ্ট। গত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, আগস্ট থেকে অক্টোবর সাধারণত ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এবারও সেই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে।
ঢাকার বাইরে নতুন সংকেত
ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়। ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হলেও বরিশাল ও চট্টগ্রামেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ পুরো ঢাকা বিভাগে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। বরিশালে প্রায় ৬ হাজার এবং চট্টগ্রামে সাড়ে ৫ হাজারের বেশি। ঢাকার বাইরে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জও উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এ দুই জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, বাগেরহাট, বরিশাল, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরেও আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ডেঙ্গু এখন পৌঁছে গেছে গ্রামের ঘরেও। গত কয়েক বছর ধরে দেশের ৬৪ জেলাতেই ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। ২০১৯ সালের আগে রোগটি মূলত বড় শহরকেন্দ্রিক থাকলেও এখন বহু গ্রামের মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। এর অর্থ, এডিস মশার বিস্তারও আর শহরের সীমানায় আটকে নেই।
গ্রামে নিয়ন্ত্রণহীন এডিস, উপকূলে নতুন শঙ্কা
শহরে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চোখে পড়লেও গ্রামাঞ্চলে এ ধরনের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে দুর্বল। ফলে গ্রামে এডিস মশার প্রজননস্থল থাকলেও তা ধ্বংসের উদ্যোগ সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় জেলাগুলোতেও ডেঙ্গুর বিস্তার নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. আবদুল আলীমের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। আগে জুলাই-সেপ্টেম্বরকে এডিস মশার প্রধান প্রজননকাল ধরা হলেও এখন সারা দেশেই প্রায় সারা বছর এর উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে। তার মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতার কাজ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে হবে। একই সঙ্গে এডিস ও কিউলেক্স মশার জন্য পৃথক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রয়োজন।
আক্রান্ত পুরুষ বেশি, মৃত্যুতে নারী
এই বছর হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীদের প্রায় ৬২ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৮ শতাংশ নারী। কিন্তু মৃত্যুর চিত্র উল্টো—এখন পর্যন্ত মৃতদের প্রায় ৫৬ শতাংশ নারী। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, পুরুষরা কর্মস্থলের কারণে শহরে এসে সহজে পরীক্ষা করানোর সুযোগ পান। নারীদের ক্ষেত্রে সেই সুযোগ তুলনামূলক কম। ফলে আক্রান্ত নারীর প্রকৃত সংখ্যা সরকারি পরিসংখ্যানে কম প্রতিফলিত হতে পারে।
আগামী দুই মাসই মূল পরীক্ষা
ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সচিবালয়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ও করণীয় নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু সরকারি সংস্থার ওপর নির্ভর না করে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেন। বাড়িঘর ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ, ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার এবং মশার প্রজননস্থল তৈরি হতে না দেওয়ার বিষয়ে মানুষকে আরও সচেতন করার কথাও বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বিএনসিসি, রোভার স্কাউট ও রেড ক্রিসেন্ট কর্মীদের সম্পৃক্ত করার নির্দেশও দেন। তিনি বলেন, তাদের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনগণকে যুক্ত করে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়তে পারে। তাই সতর্ক হওয়ার সময় পরে নয়—এখনই। কারণ, সামনে থাকা দুই মাসে ডেঙ্গু কতটা নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তা শুধু হাসপাতালের সক্ষমতা নয়; নির্ভর করবে মশার প্রজননস্থল কতটা ধ্বংস করা যাচ্ছে, গ্রাম-শহরজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষকে কতটা কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা যাচ্ছে তার ওপর।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array