কবরের জায়গাও দুর্লভ, ২৫ বছরের জন্য গুনতে হচ্ছে কোটি টাকা
রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীতে দুই হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনতে যেখানে প্রায় ৫ কোটি টাকা লাগে, সেখানে মাত্র ২০ বর্গফুটের একটি কবর ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণে গুনতে হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ জীবনের শেষ ঠিকানার সামান্য জায়গাটির দামও দাঁড়িয়েছে একটি বড় ফ্ল্যাটের কাছাকাছি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পরিচালিত বনানী কবরস্থানে দীর্ঘদিন ধরেই কবরের জায়গার সংকট চলছে। নতুন করে জায়গা তৈরির সুযোগও প্রায় নেই। ফলে পুরনো কবর পুনর্ব্যবহার করে নতুন মরদেহ দাফন করতে হচ্ছে।
কবরস্থান সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৫ বছরের জন্য একটি কবর সংরক্ষণে খরচ প্রায় ৩ কোটি টাকা। ২৫ বছরের জন্য এই খরচ বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। আর স্থায়ী কবর পুনর্ব্যবহার করে নতুন দাফনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফি ৫০ হাজার ৫০০ টাকা।
প্রতিদিনই বনানী কবরস্থানে কবরের জায়গার খোঁজে আসছেন অনেকে। কেউ স্বজনের জন্য আগাম ব্যবস্থা করতে চান, আবার কেউ নিজের শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করতে চান। তবে অর্থ থাকলেও জায়গার সংকটে অধিকাংশকেই হতাশ হয়ে ফিরতে হচ্ছে।
বনশ্রী এলাকার ৬৫ বছর বয়সী শহিদুল আলম কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন কবরস্থানে জায়গা খুঁজছেন। তিনি জানান, নিজের জন্য একটি কবরের জায়গা কিনে রাখতে ৪-৫ কোটি টাকা দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু এত টাকা দেওয়ার সামর্থ্য থাকলেও সাড়ে তিন হাত জায়গা পাচ্ছেন না।
বনানী কবরস্থানের এক কর্মীর ভাষ্য, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন কবরের জায়গার জন্য আসেন। অনেকেই অর্থ খরচ করতে রাজি থাকলেও জায়গার অভাবে তাদের কোনো আশ্বাস দেওয়া সম্ভব হয় না।
কবরস্থানের মহরার হারুনুর রশীদ জানান, বনানী কবরস্থানে বর্তমানে ৯ হাজারের বেশি কবর রয়েছে। নতুন জায়গা না থাকায় পুরনো কবর পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় দুই বছর পর একটি কবরের ওপর আরেকটি কবর দেওয়া হয়। কোনো কোনো স্থায়ী কবরে সাতজন পর্যন্ত দাফন করা হয়েছে।
রাজধানীর আরেকটি বড় কবরস্থান আজিমপুরেও একই সংকট তীব্র। প্রায় ৩২ একর জায়গাজুড়ে থাকা এই কবরস্থানে রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কবর। প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জনের দাফন হয়। সাধারণত একটি মরদেহ প্রায় ১৮ মাস কবরে রাখার পর প্রয়োজন অনুযায়ী কবরটি পুনর্ব্যবহার করা হয়।
কবরস্থানের মহরার রবিউল ইসলাম জানান, দীর্ঘমেয়াদে কবর সংরক্ষণের জন্য অর্থ জমা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও জায়গার অভাবে হাজার হাজার আবেদন জমে আছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দ্রুত নগরায়ণের সঙ্গে ঢাকার জনসংখ্যা বাড়লেও কবরস্থানের পরিমাণ সেই অনুপাতে বাড়েনি। আবাসন, সড়ক, বাণিজ্যিক স্থাপনা, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো নাগরিক সেবার জায়গা নির্ধারণ করা হলেও কবরস্থানের ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ঘাটতি রয়েছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, কবরস্থানও গুরুত্বপূর্ণ নগরসেবা। কিন্তু ঢাকার সম্প্রসারণের সঙ্গে মানুষের আবেগ ও প্রয়োজনের এই জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। জায়গার সংকটের কারণেই কবর সংরক্ষণে এত উচ্চ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ঢাকায় কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা দরকার। আগামী ২০ বছরে রাজধানীতে দাফনের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। বেসরকারি ভূমি উন্নয়ন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য এক একর কবরস্থান প্রয়োজন। ঢাকার জনসংখ্যা সাড়ে তিন কোটি হলে প্রায় ৭০০ একর কবরস্থান প্রয়োজন হতে পারে। ড্যাপেও প্রতিটি ওয়ার্ডে ছোট ছোট কবরস্থান নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।
সূত্র: বণিক বার্তা
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array