আগুনের সময় চার সিঁড়ি তালাবদ্ধ, নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (মমেক) অগ্নিকাণ্ডের সময় নতুন ভবনের পাঁচটি সিঁড়ির মধ্যে চারটিই তালাবদ্ধ ছিল। আগুন ও ধোঁয়ার মধ্যে আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনেরা নিচে নামতে গিয়ে এসব সিঁড়ি ব্যবহার করতে পারেননি। পরে অনেকে তালা ও গেট ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টা করেন। এতে হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা ৬টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের আটতলায় ১১ নম্বর লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগে। খবর ছড়িয়ে পড়লে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। জীবন বাঁচাতে অনেকে দ্রুত ভবন থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করলে হুড়োহুড়ির পরিস্থিতি তৈরি হয়।
চার সিঁড়িতে তালা
হাসপাতালের নতুন ভবনে সাতটি লিফট ও পাঁচটি সিঁড়ি রয়েছে। এর মধ্যে একটি সিঁড়ি নিয়মিত ব্যবহার করা হতো। বাকি চারটি সিঁড়ির বিভিন্ন তলার প্রবেশপথে গ্রিল লাগিয়ে তালাবদ্ধ রাখা ছিল।
অগ্নিকাণ্ডের পর আতঙ্কিত রোগী ও স্বজনেরা বিকল্প সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করলে বাধার মুখে পড়েন। কয়েকটি গেটের তালা ভেঙে বের হওয়ার চেষ্টার চিহ্নও দেখা যায়।
রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, সব সিঁড়ি খোলা থাকলে কাছাকাছি সিঁড়ি দিয়ে মানুষ বের হতে পারতেন। এতে একটি সিঁড়িতে অতিরিক্ত চাপ ও হুড়োহুড়ি কমানো সম্ভব হতো।
এক রোগীর স্বজন বলেন, আগুন দেখে সবাই প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন। কিন্তু কয়েকটি সিঁড়ির গেটে তালা থাকায় অনেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাননি। পরে বাধ্য হয়ে তালা ভেঙে বের হতে হয়েছে।
শিশু ওয়ার্ডেও আতঙ্ক
নতুন ভবনের অষ্টম তলায় থাকা শিশু রোগী ও তাদের স্বজনেরাও আগুনের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। আগুনের তাপ ও ধোঁয়ায় অনেকেই শ্বাসকষ্টে ভুগেছেন বলে স্বজনেরা জানান।
এক রোগীর স্বজনের ভাষ্য, আতঙ্কিত মানুষ বিভিন্ন দিক দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করছিলেন। সিঁড়িতে বেড, বেডশিটসহ বিভিন্ন জিনিস পড়ে থাকায় নামার সময় অনেকে সমস্যায় পড়েন। শিশুদের নিয়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন তথ্য
অগ্নিকাণ্ডের পর প্রাথমিকভাবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বরাতে ছয়জন নিহত ও অন্তত ২০ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. জাকিউল ইসলামও ছয়জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন।
প্রাথমিকভাবে নিহতদের মধ্যে হাজেরা বেগম (৫০), শাহজাহান (৪০), রমজান (৩৮), জাহানারা (৫০) ও কুলসুমা (৩৫) নামের পাঁচজনের পরিচয় পাওয়া যায়। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় এক শিশুর মৃত্যুর তথ্যও জানানো হয়।
তবে পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ছয়জন নিহতের তথ্য নাকচ করে দুজনের মৃত্যুর কথা জানায়। তাঁদের মধ্যে একজন আতঙ্কে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে এবং অন্যজন আগে থেকেই অসুস্থ থাকায় মারা যান বলে জানানো হয়। পদদলিত হয়ে মৃত্যুর তথ্যও কর্তৃপক্ষ নাকচ করেছে।
এ কারণে অগ্নিকাণ্ডে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা ও মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য তৈরি হয়েছে। তদন্তের পর বিষয়টি স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এক সপ্তাহ বন্ধ ছিল লিফট
অগ্নিকাণ্ডের সময় যে ১১ নম্বর লিফটের কন্ট্রোল রুমে আগুন লাগে, সেটি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ ছিল বলে জানিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলী অর্ণব বিশ্বাস জানান, লিফটটি সচল না থাকলেও এর বৈদ্যুতিক সংযোগ চালু ছিল। কন্ট্রোল রুমের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলোতে বিদ্যুৎ সংযোগ সচল থাকায় সেখান থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, লিফটের কন্ট্রোল বোর্ড ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অংশে আগুনের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত তাপের কারণে সেখানে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। লিফটের কেব্লের মাধ্যমে আগুন ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি
অগ্নিকাণ্ডের কারণ, সম্ভাব্য গাফিলতি এবং হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে কমিটির প্রধান ও সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুজন এবং ফায়ার সার্ভিসের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন।
কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। লিফটে আগুন লাগার কারণ, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বে কোনো গাফিলতি ছিল কি না এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সিঁড়িগুলো তালাবদ্ধ রাখার কারণও তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে।
অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে জরুরি মুহূর্তে একাধিক সিঁড়ি তালাবদ্ধ রাখার বিষয়টি রোগী ও স্বজনদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করেছে। এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের অপেক্ষায় সংশ্লিষ্টরা।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি



আপনার মতামত লিখুন
Array