ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে পথে চরবাসী
বর্ষা-বন্যার মৌসুম শেষ হওয়ার পর কিছুটা স্বস্তিতে বছর পার করার স্বপ্ন দেখেছিলেন ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। কিন্তু অসময়ে আবারও ফুঁসে উঠেছে নদী। শুরু হয়েছে তীব্র ভাঙন। একের পর এক বসতভিটা, ঘরবাড়ি ও স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় নতুন ঠিকানার খোঁজে ছুটছেন চরবাসী।
কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় প্রায় এক ঘণ্টা দূরের কালির আলগা ও গোয়ালপুরী চরে চলছে ব্যাপক ভাঙন। ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা এসব চরকে তিন দিক থেকে গিলে খাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র।
ভাঙনের শিকার মাইদুল ইসলাম ঘরবাড়ির মালামাল নৌকায় তুলে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরের দক্ষিণ কালির আলগা চরে চলে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, দুই মাসে প্রায় আধা কিলোমিটার জায়গা নদীতে বিলীন হয়েছে। থাকার মতো আশ্রয় না থাকায় বাধ্য হয়ে নতুন চরে যাচ্ছেন তিনি।
তবে নৌকা ভাড়া করে নতুন ঠিকানায় যাওয়ার সামর্থ্য নেই অনেক পরিবারের। গোয়ালপুরী চরে অন্তত ৫০টি পরিবার ঘর ভেঙে ফাঁকা জায়গায় রেখেছে। কেউ অস্থায়ীভাবে অন্যের জমি ভাড়া নিয়ে থাকছেন, আবার কেউ অর্থ ও জমির অভাবে নতুন করে বসতি গড়তে পারছেন না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন জানান, গত দুই সপ্তাহে গোয়ালপুরী ও রলাকাটা চরে প্রায় দেড় শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। চলতি বর্ষা মৌসুমে এ দুটি চরে প্রায় ৩০০ পরিবার বসতভিটা হারিয়েছে। পাশাপাশি কালির আলগা চরে গৃহহীন হয়েছে প্রায় অর্ধশত পরিবার।
ভাঙনে গত দুই সপ্তাহে গোয়ালপুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গোয়ালপুরী নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ঈদগাহ মাঠ ও একটি মাদরাসা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কিছু পরিবার সহায়তা পেলেও অনেকেই এখনো তেমন কোনো সহযোগিতা পাননি।
চরবাসী খায়রুন্নেসা বলেন, ঘর ভেঙে ফাঁকা জমিতে রেখেছেন। জমি বা টাকা কোনোটিই নেই। কোথায় যাবেন, সেটিও জানেন না। একইভাবে জেলেমন বেওয়ার দুটি ঘরের একটি অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। ঘর দুটি ভেঙে পাশের জমিতে রেখেছেন তিনি।
স্থানীয়রা জানান, নতুন চরে প্রতি বিঘা জমির দাম ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। এই অর্থ জোগাড় করতে না পেরে অনেকে টিনের চাল ও ঘরের মালামাল খোলা জায়গায় রেখে কোনোভাবে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিচ্ছেন, কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করছেন।
কালির আলগা চরের বাসিন্দারা জানান, পুরোনো কালির আলগা থেকে প্রায় ৩০০ পরিবার দক্ষিণ কালির আলগায় চলে গেছে। তবে ঠিকানা না পাওয়ায় ২০ থেকে ২২টি পরিবার এখনো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে কালির আলগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও।
যাত্রাপুর ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর বলেন, রলাকাটা, কালির আলগা ও গোয়ালপুরী ছাড়াও শিবেরপাচি, অষ্ট্রআশিসহ কয়েকটি চরে ভাঙন চলছে। অনেক পরিবার এখনো ঘর তুলতে পারেনি। ভাঙনের কারণে দিন দিন গৃহহীন মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। ভাঙনের মুখে পড়েছে সাবমেরিন ক্যাবল লাইনের বিদ্যুতের খুঁটিও।
তিনি জানান, ভাঙনের শিকার কয়েকটি পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ঘর নির্মাণের জন্য ঢেউটিন ও অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মুন্না হক বলেন, চরাঞ্চলে নদীভাঙন ঠেকাতে জিওব্যাগ ফেলার সুযোগ নেই। তবে ভাঙন রোধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অনেক সময় বিশেষ বরাদ্দ নিয়ে কাজ করা হয়।
কালের আলো/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array