খুঁজুন
                               
, ,
           

বদলাচ্ছে যুদ্ধ, বদলাতে হবে প্রস্তুতিও —ইএমই কোরকে সেনাপ্রধানের বার্তা

বিশেষ সংবাদদাতা, কালের আলো:
প্রকাশিত: সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:১৫ অপরাহ্ণ
বদলাচ্ছে যুদ্ধ, বদলাতে হবে প্রস্তুতিও —ইএমই কোরকে সেনাপ্রধানের বার্তা

সামরিক সক্ষমতার দৃশ্যমান অংশ হিসেবে অস্ত্র, সাঁজোয়া যান বা আধুনিক সরঞ্জাম যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোকে সচল রাখার প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধ কিংবা শান্তিকাল—দুই পরিস্থিতিতেই সামরিক সরঞ্জামের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করার এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স (ইএমই) কোর। সময়ের সঙ্গে সামরিক প্রযুক্তি দ্রুত পরিবর্তিত হওয়ায় কোরটির দায়িত্বও এখন প্রচলিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বিস্তৃত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় নীলফামারীর সৈয়দপুর সেনানিবাসস্থ ইএমই সেন্টার অ্যান্ড স্কুলে অনুষ্ঠিত ইএমই কোরের চলতি বছরের বাৎসরিক অধিনায়ক সম্মেলন এবং ৬ষ্ঠ কোর পুনর্মিলনী বিশেষ তাৎপর্য বহন করেছে। গত রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) থেকে সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত দুই দিনের আয়োজনে একদিকে উঠে এসেছে কোরটির ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার। অন্যদিকে, গুরুত্ব পেয়েছে আধুনিক প্রশিক্ষণ, পেশাগত উৎকর্ষ এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রস্তুতি।

  • সৈয়দপুরে অধিনায়ক সম্মেলন ও ৬ষ্ঠ কোর পুনর্মিলনী
  • আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর নির্দেশ
  • ঐতিহ্য, পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতায় গুরুত্ব

প্রযুক্তির পরিবর্তনে বদলাচ্ছে দায়িত্বের ধরন
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ইএমই কোরের বিভিন্ন ইউনিটের অধিনায়ক ও কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বক্তব্যে তিনি কোরটির কার্যক্রম, উন্নয়ন এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।

সামরিক প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে একটি বাহিনীর প্রযুক্তিগত সরঞ্জামের ধরন যেমন বদলাচ্ছে, তেমনি সেগুলোর রক্ষণাবেক্ষণেও প্রয়োজন হচ্ছে বিশেষায়িত জ্ঞান। ফলে শুধু যন্ত্রপাতি মেরামতের প্রচলিত দক্ষতা যথেষ্ট নয়; নতুন প্রযুক্তি বোঝা, দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করা এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কার্যকর সমাধান দেওয়ার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলনে আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার পেছনে এই পরিবর্তিত বাস্তবতাই গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হিসেবে কাজ করছে।

যুদ্ধক্ষমতার নেপথ্যে ইএমইর ভূমিকা
একটি সামরিক ইউনিটের অস্ত্র বা যানবাহন প্রযুক্তিগত কারণে অকার্যকর হয়ে পড়লে তার প্রভাব সরাসরি অপারেশনাল সক্ষমতার ওপর পড়ে। সে কারণে সামরিক সরঞ্জামের মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যক্ষমতা বজায় রাখার বিষয়টি যুদ্ধ প্রস্তুতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইএমই কোর দীর্ঘদিন ধরে এই দায়িত্ব পালন করে আসছে।

সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান তাঁর বক্তব্যে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী ইএমই কোরের বীর সেনানীসহ সব বীর মুক্তিযোদ্ধাকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। একই সঙ্গে তিনি ইএমই কোরের গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্য এবং যুদ্ধ ও শান্তিকালীন সময়ে সেনাবাহিনীর অস্ত্র, যানবাহন ও বিভিন্ন যন্ত্রপাতির মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে কোরটির গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা উল্লেখ করেন। অর্থাৎ, কোরটির বর্তমান সক্ষমতার আলোচনায় মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি—দুটি বিষয়ই পাশাপাশি উঠে এসেছে। অতীতের অভিজ্ঞতা ও বর্তমান প্রযুক্তির সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ সক্ষমতার ভিত্তি হতে পারে—আয়োজনের বিভিন্ন বক্তব্যে সেই বার্তাই প্রতিফলিত হয়েছে।

অধিনায়ক সম্মেলনে উন্নয়ন ও দক্ষতার সমীকরণ
বাৎসরিক অধিনায়ক সম্মেলন মূলত একটি পেশাগত পর্যালোচনা ও মতবিনিময়ের ক্ষেত্র। এখানে কোরের বিভিন্ন ইউনিটের অভিজ্ঞতা, কার্যক্রম ও উন্নয়নের বিষয়গুলো সামনে আসার সুযোগ তৈরি হয়। এবারের সম্মেলনেও ইএমই কোরের কার্যক্রম, উন্নয়ন এবং পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে উপস্থিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়। সেনাবাহিনী প্রধান একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কোরের সদস্যদের সর্বদা প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেন। এর তাৎপর্য শুধু প্রশিক্ষণের পরিধি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক ব্যবস্থায় দক্ষ জনবল তৈরি, বিশেষায়িত জ্ঞান ধরে রাখা এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত তা কাজে লাগানোর সক্ষমতাও এর অন্তর্ভুক্ত।

পুনর্মিলনীতে প্রজন্মের সেতুবন্ধন
একই আয়োজনে ইএমই কোরের ৬ষ্ঠ কোর পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়। ইএমই সেন্টার অ্যান্ড স্কুলের প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মনোমুগ্ধকর কোর পুনর্মিলনী কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। পরে তিনি ইএমই কোরের প্রাক্তন ও বর্তমান সদস্যদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন। পুনর্মিলনী সাধারণত অতীত ও বর্তমানের মধ্যে একটি সাংগঠনিক সেতু তৈরি করে। অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের অভিজ্ঞতা এবং কর্মরত সদস্যদের বর্তমান বাস্তবতা যখন একই পরিসরে মিলিত হয়, তখন পেশাগত ঐতিহ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতির ধারাবাহিকতা আরও দৃঢ় হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। সেনাবাহিনী প্রধান তাঁর বক্তব্যে কোরের সদস্যদের মধ্যে ঐক্য, সৌহার্দ্য ও পেশাগত মমত্ববোধ বৃদ্ধিতে এই ধরনের আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরেন।

নেতৃত্বের উপস্থিতিতে ঐক্য ও ধারাবাহিকতার বার্তা
দুই দিনের অনুষ্ঠানে ইএমই কোরের কর্নেল কমান্ড্যান্ট ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এস এম জিয়া-উল-আজিম, সেনাবাহিনীর মাস্টার জেনারেল অব দি অর্ডন্যান্স (এমজিও) মেজর জেনারেল আবু বকর সিদ্দিক খান, আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডের ভারপ্রাপ্ত জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) মেজর জেনারেল খন্দকার মোহাম্মদ শাহিদুল এমরান, সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল (এজি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হোসাইন আল মোরশেদ এবং ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ও রংপুরের এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল এবিএম ফয়সাল বাতেন উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়াও সেনাসদর ও রংপুর এরিয়ার ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা এবং ইএমই কোরের বিভিন্ন ইউনিটের অধিনায়কেরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের এমন উপস্থিতি সম্মেলনের পেশাগত গুরুত্বের পাশাপাশি কোরটির কার্যক্রমের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সামগ্রিক সক্ষমতার যোগসূত্রও তুলে ধরে।

ঐতিহ্যকে শক্তিতে পরিণত করে ভবিষ্যতের পথে
ইএমই কোরের এবারের অধিনায়ক সম্মেলন ও পুনর্মিলনীকে তাই শুধু নিয়মিত সামরিক আয়োজন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর একদিকে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আত্মত্যাগ ও দীর্ঘদিনের পেশাগত ঐতিহ্যের স্মরণ, অন্যদিকে রয়েছে দ্রুত পরিবর্তনশীল সামরিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষতা বাড়ানোর প্রত্যয়। অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করার প্রযুক্তিগত দায়িত্ব থেকে ভবিষ্যতের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা—ইএমই কোরের ভূমিকার পরিধি ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। সেই বাস্তবতায় আধুনিক প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্য এবং অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতাকে একসূত্রে গাঁথার ওপর এবারের আয়োজনের গুরুত্ব নিহিত। দেশ ও জাতির সেবায় নিবেদিত থাকার আহ্বানের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এই আয়োজন তাই কোরটির অতীতকে স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রস্তুতির দিকনির্দেশনাও সামনে এনেছে।

কালের আলো/এমএএএমকে

গত বছরের ক্ষতি কাটাতে আগাম আলু চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা

দিনাজপুর সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৫৮ পূর্বাহ্ণ
গত বছরের ক্ষতি কাটাতে আগাম আলু চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা

গত বছরের লোকসান পুষিয়ে নেওয়ার আশায় দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলিতে আগাম জাতের আলু চাষে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছে আলু রোপণ। অনুকূল আবহাওয়া ও ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্যমূল্য পেলে এবার লাভের মুখ দেখার আশা করছেন তাঁরা। তবে বীজ, সার, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে হিলির খট্টামাধবপাড়া এলাকায় আগাম জাতের আলু চাষ শুরু হয়। আগাম জাতের আমন ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে সেখানে বাড়তি ফসল হিসেবে আলু চাষ করেন কৃষকরা। এ অঞ্চলের উর্বর মাটি ও উপযোগী আবহাওয়ায় আলুর ভালো ফলন হয়। পাশাপাশি আগাম আলু বাজারে ওঠায় তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ কারণে প্রতিবছরই এলাকায় আগাম আলুর চাষ বাড়ছে।

তবে গত বছর বাজারে আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েন অনেক কৃষক। সেই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এবার আগাম আলু চাষে নেমেছেন তাঁরা। কেউ জমি প্রস্তুত করছেন, আবার কেউ প্রস্তুত করা জমিতে বীজ রোপণ করছেন।

খট্টামাধবপাড়া গ্রামের কৃষক মাহফুজুর রহমান বলেন, আগাম জাতের ধান কাটার পর জমি প্রস্তুত করে আলুর বীজ রোপণ করা হচ্ছে। আগাম জাতের আলুতে প্রতি বিঘায় প্রায় ৫০ থেকে ৬০ মণ ফলন পাওয়া যায়। বাজারে আগে আলু তোলা সম্ভব হওয়ায় দামও তুলনামূলক ভালো পাওয়া যায়। এতে কৃষকরা লাভবান হন।

একই গ্রামের কৃষক মাহবুব হোসেন বলেন, ধান কাটার পর এলাকার কৃষকরা আলু চাষে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার সার, বীজ, শ্রমিকের মজুরি ও জমি চাষের খরচ বেড়েছে। উৎপাদন খরচ বেশি হলেও ভালো ফলন ও দাম পাওয়া গেলে লাভের আশা করছেন তাঁরা।

কৃষক মোজাম্মেল হক বলেন, গত বছর আলু চাষ করে ভালো দাম না পাওয়ায় লোকসান হয়েছে। এ অঞ্চলে আগাম ধান কাটার পর জমিতে আলু চাষ করা হয়। আলু তোলার পর একই জমিতে ভুট্টা চাষ করা হয়। এবার বীজ, সার ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বাড়বে। তাঁর মতে, আলুর দাম মণপ্রতি দুই হাজার টাকার বেশি হলে কিছুটা লাভ হতে পারে।

কৃষক ইব্রাহিম জানান, গত বছর প্রতি মণ আলু ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছিল। এতে কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েন। সার, তেল, জমি চাষ ও কীটনাশকের দাম বাড়লেও উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় তাঁদের দুর্ভোগ বাড়ছে। গত বছর পাঁচ থেকে ছয় বিঘা জমিতে আলু চাষ করে তাঁর এক থেকে দেড় লাখ টাকা লোকসান হয়েছে।

কৃষক সিদ্দিক হোসেন বলেন, ধান কাটার পর জমি ফেলে না রেখে সেখানে আলু চাষ করেন তাঁরা। প্রায় দুই মাসের মধ্যে আলু তোলা যায়। এরপর একই জমিতে অন্য ফসল চাষের সুযোগ থাকে। বাজারে ভালো দাম পেলে কৃষক লাভবান হন, অন্যথায় লোকসান গুনতে হয়।

কৃষক সেলিম হোসেন বলেন, এবার এলাকার বেশির ভাগ কৃষকই আলু চাষে আগ্রহী। তবে গত বছরের তুলনায় বীজের দাম বেড়েছে। গত বছর যে আলুর বীজ ৮০০ টাকায় কেনা যেত, এবার তা কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ২০০ টাকায়। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ন্যায্যমূল্য না পেলে আলু চাষের প্রতি তাঁদের আগ্রহ ও আস্থা কমে যেতে পারে।

আলু রোপণ ঘিরে বেড়েছে কৃষিশ্রমিকদের ব্যস্ততাও। শ্রমিক জাকিরুল ইসলাম বলেন, কোথাও জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে, আবার কোথাও চলছে আলু রোপণ। এরপর আলু তোলার কাজ শুরু হবে। সব মিলিয়ে প্রায় দুই মাস আলু চাষের কাজে ব্যস্ততা থাকবে। এতে তাঁদের কাজ ও আয় বাড়ছে, যা দিয়ে পরিবারের খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছে।

শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এলাকায় আলু চাষ শুরু হয়েছে। এখন তাঁরা আলু রোপণের কাজ করছেন। এ কাজ আরও ১৫ দিন চলতে পারে। এরপর শুরু হবে আলু তোলার মৌসুম। কৃষিশ্রমিকের কাজ করে যে আয় হয়, তা দিয়েই তাঁদের সংসার চলে।

হাকিমপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আরজেনা বেগম বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে উপজেলায় আগাম জাতের আলু চাষ শুরু হয়েছে। প্রতি মৌসুমেই এ অঞ্চলে আগাম আলুর আবাদ হয়। খট্টামাধবপাড়া ইউনিয়নে গতকাল পর্যন্ত প্রায় ৮০ হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আগাম জাতের আলুর জীবনকাল কম। মাত্র ৫০ থেকে ৫৫ দিনের মধ্যে এ আলু তোলা যায় এবং ফলনও ভালো হয়। আগাম আলুর তুলনামূলক ভালো দাম পাওয়ার আশায় কৃষকরা প্রতিবছর এ জাতের চাষ করেন। কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করে চাষাবাদ করলে এবারও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

গত বছরের লোকসান কাটিয়ে উঠতে এবার আগাম আলু চাষে আশাবাদী হিলির কৃষকরা। তবে তাঁদের প্রত্যাশা, উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজারে আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, যাতে ভালো ফলন সত্ত্বেও লোকসানের আশঙ্কায় পড়তে না হয়।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

২২৪ স্কুলের ৭০টিতে মাঠ নেই, সংকটে শাহজাদপুরের প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা

সিরাজগঞ্জ সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ
২২৪ স্কুলের ৭০টিতে মাঠ নেই, সংকটে শাহজাদপুরের প্রাথমিক শিক্ষার্থীরা

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলায় ৭০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খেলার মাঠ নেই। এতে খেলাধুলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী। মাঠের অভাবে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি ও অংশগ্রহণেও পিছিয়ে পড়ছে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে উপজেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়মিত বসছে সাপ্তাহিক হাট।

উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, শাহজাদপুরের ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় মোট ২২৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এর মধ্যে ৭০টি বিদ্যালয়ে কোনো খেলার মাঠ নেই। শাহজাদপুর পৌর এলাকার চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও মাঠের সংকট রয়েছে।

মাঠ না থাকায় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আগে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্য বিদ্যালয়ের মাঠে গিয়ে অনুশীলন করতে হয়। এতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাবে প্রতিযোগিতায় ভালো ফল করা কঠিন হয়ে পড়ে। কোনো কোনো বিদ্যালয় ভালো ফল করলেও তা ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

উপজেলার বেলতৈল ইউনিয়নের খাষ কাদাই বাদলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়মিত সাপ্তাহিক হাট বসে। উপজেলা পরিষদ প্রতিবছর টেন্ডারের মাধ্যমে হাটটি ইজারা দিলেও এ থেকে বিদ্যালয়ের তহবিলে কোনো অর্থ জমা হয় না বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক হুমায়ুন কবির হিল্টন।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের মাঠে হাট বসানো হলেও সেখান থেকে স্কুলের তহবিলে কোনো টাকা জমা হয় না। এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের কেউ অবগত নন। তিনি যোগদানের অনেক আগে থেকেই মাঠে হাট বসছে।

শাহজাদপুর পৌর সদরের প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিরণবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দরগাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইব্রাহিম মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও মাঠসংকটে রয়েছে।

কিরণবালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফিরোজা খাতুন বলেন, মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে সমস্যায় পড়তে হয়। এমনকি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষেই অ্যাসেম্বলি করতে হয়।

শাহজাদপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম এবং সাবেক পৌর কাউন্সিলর ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য আল-মাহমুদ জানান, শত বছরের পুরোনো এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও খেলাধুলায় পিছিয়ে রয়েছে। মাঠের অভাবে জাতীয় দিবস ও আন্তবিদ্যালয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও ভালো ফল করা সম্ভব হচ্ছে না।

তাঁরা জানান, বিদ্যালয়ের কাছেই মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবন রয়েছে। সেখানে সরকারের কিছু ফাঁকা জমি আছে, যা স্থানীয় ভূমি অফিসের মাধ্যমে বরাদ্দ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এ জন্য বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিকে এগিয়ে আসতে হবে।

উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি আহসান হাবিব ও সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক পাপ্পু জানান, যেসব বিদ্যালয়ে এখনো খেলার মাঠ নেই, সেসব বিদ্যালয়ের জন্য মাঠের ব্যবস্থা করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্যোগী হতে হবে।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মুরাদ হোসেন বলেন, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি খেলাধুলাও জরুরি। যেসব বিদ্যালয়ে মাঠ নেই, সেখানে মাঠের ব্যবস্থা করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।

এদিকে বিদ্যালয়ের মাঠে নিয়মিত হাটবাজার বসানোর বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাবরিনা শারমিন বলেন, স্কুলের মাঠে নিয়মিত হাটবাজার বসানোর কোনো সুযোগ নেই। তাঁর উপজেলায় টেন্ডারের মাধ্যমে বিদ্যালয়ের জায়গায় হাট বসানো হচ্ছে—এমন বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

আজান ও কাঁসর-ঘণ্টার সুরে সম্প্রীতির বন্ধনে ফরিদপুর

ফরিদপুর সংবাদদাতা, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:৩৯ পূর্বাহ্ণ
আজান ও কাঁসর-ঘণ্টার সুরে সম্প্রীতির বন্ধনে ফরিদপুর

একদিকে মসজিদ থেকে ভেসে আসে আজানের সুর, অন্যদিকে পূজামণ্ডপে বাজে কাঁসর-ঘণ্টা। নামাজের সময় বন্ধ রাখা হয় মণ্ডপের বাদ্যযন্ত্রের শব্দ। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। ধর্মীয় সহাবস্থান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের এমন অনন্য চিত্র দেখা গেছে ফরিদপুর শহরের ভাঙা রাস্তার মোড়ে।

শহরের ভাঙা রাস্তার মোড়সংলগ্ন মডেল মসজিদের দুই পাশে রয়েছে জেলা বাস মালিক সমিতি ও জেলা মিনিবাস মালিক সমিতির দুটি দুর্গাপূজার মণ্ডপ। মসজিদ ও পূজামণ্ডপের পাশাপাশি অবস্থান ঘিরে সেখানে বিরাজ করছে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ।

সরেজমিনে দেখা যায়, শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে পূজামণ্ডপগুলোতে চলছে নানা আয়োজন। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করছেন, অন্যদিকে মুসলিম ধর্মাবলম্বীরাও মসজিদে নামাজ আদায় করছেন। দুই সম্প্রদায়ের মানুষই পরস্পরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে নিজ নিজ ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

নামাজের সময় মণ্ডপের বাদ্যযন্ত্রের শব্দ বন্ধ রাখা হয়। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সমন্বয় স্থানীয় মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ফরিদপুর ঐতিহ্যগতভাবেই অসাম্প্রদায়িক শহর। মাঝখানে মসজিদ এবং দুই পাশে পূজামণ্ডপ থাকলেও এ নিয়ে কখনো ধর্মীয় বিভেদ তৈরি হয়নি। পরস্পরের বিশ্বাস ও অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে বহু বছর ধরে পাশাপাশি ধর্মীয় উৎসব পালন করে আসছেন তাঁরা। দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরাও সম্প্রীতির এই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায় থেকেও সহযোগিতা করা হচ্ছে। উৎসবের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয় ও নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

ফরিদপুর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়া স্বপন বলেন, প্রাচীনকাল থেকেই ফরিদপুরে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে বসবাস ও উৎসব পালন করে আসছেন। এই সম্প্রীতির পরিবেশ ধরে রাখতে রাজনৈতিকভাবে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হচ্ছে।

নিরাপত্তার বিষয়ে ঢাকা রেঞ্জের আনসার ব্যাটালিয়নের উপপরিচালকের পক্ষে মাদারীপুর আনসার ব্যাটালিয়নের পরিচালক তানজিনা জানান, এলাকার সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অত্যন্ত ভালো। একই স্থানে মসজিদ ও পূজামণ্ডপের সহাবস্থান সারা দেশের জন্য অনন্য দৃষ্টান্ত। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। এখন পর্যন্ত অত্যন্ত সুষ্ঠু ও আনন্দঘন পরিবেশে পূজা উদযাপিত হচ্ছে।

ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহযোগিতার মাধ্যমে যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব, ফরিদপুরের ভাঙা রাস্তার মোড় তারই একটি দৃষ্টান্ত। উৎসবের এই পরিবেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি