খুঁজুন
                               
, ,
           

ঠাকুরগাঁওয়ে অর্গানিক চা চাষ

ঠাকুরগাঁওয়ে অর্গানিক চায়ে বদলাচ্ছে জীবন

ঠাকুরগাঁও সংবাদদাতা
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯:৫৪ পূর্বাহ্ণ
ঠাকুরগাঁওয়ে অর্গানিক চায়ে বদলাচ্ছে জীবন

একসময় যে জমিগুলো পতিত পড়ে থাকত, সেসব জমিতেই এখন দুলছে চায়ের সবুজ পাতা। ভারতের সীমান্তঘেঁষা উত্তরের জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে চা চাষ ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। বিশেষ করে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ছাড়াই অর্গানিক পদ্ধতিতে চা উৎপাদন স্থানীয় কৃষি ও অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ঠাকুরগাঁও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, সম্পূর্ণ জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদিত চা জেলার চা-শিল্পে নতুন মান তৈরি করেছে। বালিয়াডাঙ্গীর ইকো সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের ২৫ একরের চা বাগানে শতভাগ অর্গানিক পদ্ধতিতে চা উৎপাদন হচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এ বাগানে চা পাতার মানও ভালো।

সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়ার ফিল্ড অফিসার জুয়েল রানা জানান, বাগানটিতে নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ৩০০ শ্রমিক নিয়মিত কাজ করছেন। কাজের সুযোগ পেয়ে স্থানীয় অনেক নারী শ্রমিকের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে।

বাগানের শ্রমিক নাজেরা বেগম, দিনোবালা ও ফাতেমা বেগম জানান, আগে কাজের সংকট থাকলেও বর্তমানে চা বাগানে কাজ করে তারা দৈনিক ১৮০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন। এতে তারা নিজেদের সংসারে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি স্বাবলম্বী হচ্ছেন।

চা বোর্ডের নিবন্ধিত তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁওয়ে বর্তমানে ৬৫৮ জন চাষি বাণিজ্যিকভাবে চা চাষের সঙ্গে যুক্ত। জেলার বালিয়াডাঙ্গী, রানীশংকৈল, পীরগঞ্জ ও হরিপুর উপজেলায় প্রায় ৫৯০ একর জমিতে চা চাষ হচ্ছে।

বালিয়াডাঙ্গীর ভান্ডারদহ গ্রামের শিক্ষক শহিদুল ইসলাম ১৬ শতক জমিতে চা চাষ করে প্রতি ৪০ দিন পরপর ২০০ কেজির বেশি চা পাতা সংগ্রহ করছেন। বছরের সাত মাসে এ জমি থেকে তার আয় হচ্ছে প্রায় ২৮ হাজার টাকা। একইভাবে মরিচপাড়া গ্রামের জগদীশ রায় ও পাটিয়াডাঙ্গী গ্রামের আহসান উল্লাহ মেহেদির মতো ক্ষুদ্র চাষিরাও চা চাষে লাভের মুখ দেখছেন।

চাষিদের ভাষ্য, আগে চা কারখানার মালিকরা ইচ্ছামতো দামে পাতা কিনলেও বর্তমানে তুলনামূলক ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় চা চাষে আগ্রহ বাড়ছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রফিকুল হক বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ে চা চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। অর্গানিক চাষ পদ্ধতি জেলার কৃষিকে আরও এগিয়ে নিতে পারে।

চা বোর্ড পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ইনচার্জ কৃষিবিদ আমির হোসেন জানান, চা চাষের জন্য ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি সিলেটের চেয়েও বেশি উপযোগী। এখানে দ্রুত বর্ধনশীল ভারতের বিটি-২, টিভি-২৩ ও টিভি-২৪ জাতের চা চাষ করা হয়। তবে সিলেটের মতো হাতে পাতা না তুলে কাস্তে দিয়ে পাতা সংগ্রহ করায় নতুন কুঁড়ি আসতে সময় লাগে। এতে কিছুটা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

পতিত জমিতে চা চাষের বিস্তার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্গানিক উৎপাদনের মাধ্যমে ঠাকুরগাঁওয়ের সীমান্তবর্তী জনপদে কৃষির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চা পাতার সবুজে বদলে যাচ্ছে মানুষের জীবন-জীবিকা।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

১৭ মিলের ১০টিই বন্ধ, অস্তিত্ব সংকটে ঝালকাঠির লবণ শিল্প

ঝালকাঠি সংবাদদাতা
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪৭ পূর্বাহ্ণ
১৭ মিলের ১০টিই বন্ধ, অস্তিত্ব সংকটে ঝালকাঠির লবণ শিল্প

একসময় লবণ শিল্পের কারণে দেশ-বিদেশে পরিচিত ছিল ঝালকাঠি। নদীপথে সহজ যোগাযোগের সুবিধায় ব্রিটিশ আমলে বাসন্ডা নদীর দুই তীরে গড়ে উঠেছিল ১৭টি লবণ কারখানা। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারে একসময় ‘দ্বিতীয় কলকাতা’ নামে পরিচিতি পাওয়া ঝালকাঠির সেই ঐতিহ্য এখন হারাতে বসেছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে জেলার ঐতিহ্যবাহী লবণ শিল্প।

সংশ্লিষ্টরা জানান, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অটোমিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারায় ঝালকাঠির অনেক লবণ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ১৭টি কারখানার মধ্যে মিতালী সল্ট, নুর সল্ট ও সুরভি সল্টসহ ১০টি ইতোমধ্যে বন্ধ হয়েছে। বর্তমানে শরীফ সল্ট, নিউ ঝালকাঠি সল্টসহ সাতটি মিল চালু রয়েছে।

তবে প্রতিকূলতার মধ্যেও বর্তমানে জেলার লবণ মিলগুলোতে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার লবণ উৎপাদন হচ্ছে। বড় কোম্পানির প্যাকেটজাত লবণ যেখানে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা, সেখানে ঝালকাঠির লবণ বিক্রি হচ্ছে ২০ থেকে ২২ টাকায়। তুলনামূলক কম দামের কারণে এ লবণের চাহিদা রয়েছে আশপাশের জেলাগুলোতে। রাজশাহী, পাবনা ও কুষ্টিয়া থেকেও পাইকাররা এসে এখান থেকে লবণ কিনে নিয়ে যান।

ঝালকাঠির বিসিকের উপ-ব্যবস্থাপক আল আমিন বলেন, লবণ শিল্পের মান ধরে রাখতে বিসিক সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করে আসছে। শিল্পটি টিকিয়ে রাখা ও আধুনিকায়নের ক্ষেত্রেও বিসিকের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

জেলা লবণ ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. জামাল শরীফ বলেন, আধুনিক কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কারখানাগুলোতে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ ও প্রয়োজনীয় ব্যাংকিং সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি শ্রমিকদের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো নিয়েও মালিক সমিতি কাজ করছে।

তিনি বলেন, পাইপলাইনে গ্যাস, পর্যাপ্ত মূলধন ও সরকারি সহযোগিতা পাওয়া গেলে দেশীয় লবণ শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। এতে বিদেশ থেকে লবণ আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি ঝালকাঠির হারানো ঐতিহ্যও ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।

ঝালকাঠিতে এখনও সনাতনী পদ্ধতিতে লবণ উৎপাদন করা হয়। কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম থেকে কাঁচামাল এনে বিভিন্ন ধাপে তা শোধন করা হয়। পরে রাসিন মেশিনে শুকিয়ে ঝরঝরে করার পর প্রয়োজন অনুযায়ী আয়োডিন মিশিয়ে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করা হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আশির দশকে দেশে লবণ উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হওয়ার পর থেকেই প্রযুক্তিগত দিক থেকে পিছিয়ে পড়তে থাকে ঝালকাঠির শিল্পটি। ফলে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য থাকলেও আধুনিক অটোমিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে স্থানীয় কারখানাগুলো। এখন সরকারি সহায়তা ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

জালিয়াতির ঘটনায় প্রশ্নের মুখে গাইবান্ধার আদালতপাড়া

গাইবান্ধা সংবাদদাতা
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ
জালিয়াতির ঘটনায় প্রশ্নের মুখে গাইবান্ধার আদালতপাড়া

গাইবান্ধার আদালত অঙ্গনে স্বল্প সময়ের ব্যবধানে জালিয়াতির দুটি পৃথক ঘটনা সামনে এসেছে। এক ঘটনায় বিচারক আদালতে না বসলেও ভুয়া জামিনের আদেশ তৈরি করে আসামির হাতে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অন্য ঘটনায় জাল জন্মসনদ ব্যবহার করে প্রাপ্তবয়স্ক চার আসামিকে শিশু সাজিয়ে জামিন করানো, আদালতের অর্ডারশিটে কাটাকাটি এবং মামলার নথি গায়েবের অভিযোগে তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

প্রথম ঘটনায় নারী নির্যাতন মামলার আসামি জান্নাতুল ইসলাম গত ২১ সেপ্টেম্বর জামিনের ‘রিকল’ হাতে পান। নিয়ম অনুযায়ী সেটি গোবিন্দগঞ্জ থানায় জমা দেওয়ার পর কয়েক দিন পর তিনি জানতে পারেন, আদেশটি ভুয়া। তার অভিযোগ, মুহুরি শাহীন ও আদালতের বেঞ্চ সহকারী গাজী আলী আহসানের মাধ্যমে মামলাটি নিষ্পত্তির আশ্বাস দিয়ে তার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়। স্বজন সাজু মিয়ার দাবি, এক লাখ ৪০ হাজার টাকা পরিশোধের পর জান্নাতুলকে জামিনের কথা জানানো হয়েছিল।

তবে আদালত সূত্র জানায়, ২১ সেপ্টেম্বর বিচারক অনুপস্থিত থাকায় গাইবান্ধার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ বসেনি। ফলে সেদিন কোনো মামলার শুনানিও হয়নি। এ অবস্থায় জামিনের রিকল কীভাবে তৈরি হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে মুহুরি শাহীন ও বেঞ্চ সহকারী গাজী আলী আহসান দাবি করেছেন, ওই ভুয়া রিকল তাদের মাধ্যমে তৈরি বা ইস্যু হয়নি। বেঞ্চ সহকারী জানান, বিষয়টি নিয়ে জিডির খসড়া তৈরি করা হলেও তা এখনো দাখিল করা হয়নি।

এদিকে এর আগে গোবিন্দগঞ্জে জাল জন্মসনদ তৈরি করে প্রাপ্তবয়স্ক চার আসামিকে শিশু দেখিয়ে জামিন করানোর অভিযোগও ওঠে। এ ঘটনায় জেলা বারের আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপন, তার মুহুরি হাসান আলী এবং তৎকালীন জিআরও পুলিশ সদস্য আব্দুস সবুরের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

আদালতের তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনের সনদ এবং তার মুহুরি হাসান আলীর নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে আব্দুস সবুরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

আদালতের নির্দেশে গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাতে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলাটি করা হয়। এর আগে ৩০ আগস্ট অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন গাইবান্ধা শিশু আদালত-২-এর বিচারক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইফতেখার বিন আজিজ।

স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দুটি ঘটনায় আদালতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও নথিপত্র ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আইনজীবীরা এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

কালের আলো/এএএন/এমএসআইপি 

নীরবে ক্ষয়, হঠাৎ বিপদ: হৃদরোগের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
নীরবে ক্ষয়, হঠাৎ বিপদ: হৃদরোগের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

হৃদরোগের শুরুটা অনেক সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নয়, তার বহু বছর আগেই। অতিরিক্ত লবণ, ধূমপান, স্থির জীবনযাপন, বাড়তি ওজন কিংবা অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ—প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস ধীরে ধীরে তৈরি করতে পারে বড় ঝুঁকি। কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে চলতে পারে ক্ষয়। একদিন সেটিই প্রকাশ পেতে পারে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো আকস্মিক ঘটনায়। বাংলাদেশে হৃদ্‌রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝা তাই শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এটি জীবনযাপন, জনস্বাস্থ্যনীতি ও অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।

  • উচ্চ রক্তচাপে অল্প বয়সেই তৈরি হচ্ছে হৃদরোগের ঝুঁকি
  • প্রতিরোধে পিছিয়ে জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা
  • তামাক, লবণ, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপে বাড়ছে বিপদ

বড় জনস্বাস্থ্য সংকট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কার্ডিওভাসকুলার রোগে আনুমানিক ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই বছরে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে স্ট্রোকে মৃত্যুর হার ছিল ৮০ দশমিক ২ এবং ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজে ৫৮ দশমিক ৫।এই সংখ্যা শুধু হাসপাতালের একটি পরিসংখ্যান নয়। একজন কর্মক্ষম মানুষের অকালমৃত্যু মানে একটি পরিবারের আয় কমে যাওয়া, নির্ভরশীল সদস্যদের ওপর বাড়তি চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয়। ফলে হৃদরোগের অভিঘাত পৌঁছে যায় পরিবার থেকে জাতীয় অর্থনীতিতেও।

তরুণরা কি সত্যিই নিরাপদ?
হৃদরোগ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি সম্ভবত এখানেই—ঝুঁকির উপাদানগুলো আর কেবল প্রবীণদের জীবনে সীমাবদ্ধ নেই। ‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে’র তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সিদের প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।তবে এর অর্থ এই নয় যে ওই বয়সের প্রতি আটজনের একজন হৃদরোগে আক্রান্ত। বিষয়টি হলো, হৃদরোগের ঝুঁকির ভিত্তি তৈরি হচ্ছে জীবনের অনেক আগেই। উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, তামাক, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বছরের পর বছর চলতে থাকলে পরবর্তী জীবনে তার সম্মিলিত প্রভাব মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।অর্থাৎ বয়সের সীমা ভাঙার চেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—ঝুঁকি জমছে বয়স হওয়ার আগেই।

সবচেয়ে নীরব বিপদ উচ্চ রক্তচাপ
হৃদরোগের ঝুঁকির তালিকায় উচ্চ রক্তচাপের অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দীর্ঘ সময় কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই শরীরে ক্ষতি করতে পারে। হৃদ্‌যন্ত্রের পাশাপাশি মস্তিষ্ক, কিডনি ও রক্তনালিও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে আক্রান্ত হতে পারে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ হাইপারটেনশন প্রোফাইল অনুযায়ী, দেশে হৃদ্‌রক্তনালিজনিত রোগে মৃত্যুর আনুমানিক ৫২ শতাংশের সঙ্গে উচ্চ সিস্টোলিক রক্তচাপের সম্পর্ক ছিল। অথচ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার মাত্র ১৬ শতাংশ। এখানেই বড় ঘাটতিটি স্পষ্ট হয়। সমস্যা শুধু মানুষ জানে না যে তার রক্তচাপ বেড়েছে—তা নয়; শনাক্ত হওয়ার পরও নিয়মিত চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিরোধযোগ্য একটি ঝুঁকি ধীরে ধীরে প্রাণঘাতী জটিলতায় রূপ নিতে পারে।

বদলে যাওয়া জীবনযাপন, বাড়ছে ঝুঁকি
শহুরে জীবনে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, হাঁটাচলা কমে যাওয়া এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব এখন স্বাভাবিক বাস্তবতার অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত লবণ, চর্বি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার, তামাক এবং বাড়তি ওজন।২৫ বছর ও তার বেশি বয়সিদের দৈনিক গড় লবণ গ্রহণ প্রায় ৯ গ্রাম—এমন তথ্যও উঠে এসেছে। অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে, আর দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।অন্যদিকে তামাকের প্রভাব আরও বিস্তৃত। তামাক শুধু হৃদরোগ নয়, ক্যান্সার ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগেরও বড় ঝুঁকিকারক। এর সঙ্গে বায়ুদূষণ যুক্ত হওয়ায় হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপর পরিবেশগত চাপও বাড়ছে।

হৃদরোগের লড়াই হাসপাতালের আগেই
হার্ট অ্যাটাক হলে দ্রুত চিকিৎসা, দক্ষ চিকিৎসক, আধুনিক প্রযুক্তি ও হাসপাতালের সক্ষমতা জীবন বাঁচাতে পারে। কিন্তু জনসংখ্যার সামগ্রিক হৃদরোগের বোঝা কমাতে শুধু হাসপাতাল বাড়ানো যথেষ্ট নয়। কারণ রোগের অনেক ঝুঁকি তৈরি হয় হাসপাতালের বাইরে—বাড়িতে, কর্মক্ষেত্রে, খাদ্যাভ্যাসে এবং শহরের জীবনযাপনে। তাই প্রতিরোধের কৌশলও হতে হবে বহুমুখী। নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা; তামাক বর্জন; খাবারে লবণ কমানো; নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড; স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং খাদ্যতালিকায় ফল ও সবজি বাড়ানো—এসব পদক্ষেপ ব্যক্তিগত পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করাও জরুরি।

এক রোগ, দুই ধরনের ক্ষতি
হৃদরোগে একজন মানুষ অসুস্থ হলে ক্ষতির হিসাব শুধু হাসপাতালের বিল দিয়ে করা যায় না। কর্মক্ষম বয়সে আক্রান্ত হলে আয় কমে যেতে পারে, কর্মদক্ষতা নষ্ট হতে পারে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর আর্থিক দায় বাড়তে পারে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে আসে—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী। দীর্ঘমেয়াদি হৃদরোগের চিকিৎসা তাই অনেক পরিবারের জন্য চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি আর্থিক অনিশ্চয়তাও তৈরি করতে পারে।

প্রতিরোধের জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
হৃদরোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চিকিৎসা অবকাঠামোর প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—মানুষ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, তামাকের ব্যবহার কমানো, স্বাস্থ্যকর খাবারের সহজলভ্যতা, শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি, বায়ুদূষণ কমানো এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন—এসব উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলোকে সমন্বিত জনস্বাস্থ্য কৌশলের অংশ করতে হবে।

নীরব ঝুঁকি, বড় অর্থনৈতিক চাপ
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, হৃদরোগের লক্ষণ প্রকাশের আগেই অনেকের শরীরে ঝুঁকি তৈরি হয়। রক্তনালির অন্তর্নিহিত রোগ দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে; কখনো হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকই হয়ে ওঠে এর প্রথম প্রকাশ। তাই নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও ওজন পরীক্ষা করে ঝুঁকি মূল্যায়নের পাশাপাশি ধূমপান বর্জন, লবণ কমানো, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, ফল-সবজি বেশি খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

হৃদরোগের ক্ষতি শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে পরিবারেও তৈরি হয় আর্থিক চাপ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশই মানুষ নিজ পকেট থেকে বহন করে। ফলে কর্মক্ষম একজন ব্যক্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি পরিবারের আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।

চিকিৎসার আগে প্রতিরোধে নজর
বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগজনিত অকালমৃত্যু কমাতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকে জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকারে আনতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ঝুঁকির উপাদান বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য বাজেটে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) ও প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বলা হয়, বিশ্বে প্রতিবছর হৃদরোগের কারণে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ অকালে মারা যান।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মারুফ হক খান বলেন, উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। তাঁর মতে, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা এখন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ধারাবাহিক পরিচর্যার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যয়ের বড় অংশকে শুধু চিকিৎসানির্ভর না রেখে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায়ও গুরুত্ব দিতে হবে।

কালের আলো/আরআই/এমএইচ