সাগরে বিলীন হচ্ছে পারকি সৈকত, ঝুঁকিতে পর্যটক
চট্টগ্রামের আনোয়ারার পারকি সমুদ্রসৈকত দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় ভাঙন, দূষণ, দখল ও অব্যবস্থাপনার কবলে পড়ে সংকুচিত হচ্ছে। এতে দেশের অন্যতম এ পর্যটনকেন্দ্রটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বিপন্ন হচ্ছে জীববৈচিত্র্য। একই সঙ্গে পর্যটক ও স্থানীয়দের দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
স্থানীয়দের দাবি, ২০২০ সালের পর থেকে ধাপে ধাপে এক হাজার মিটারের বেশি সৈকত এলাকা সাগরে বিলীন হয়েছে। কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রায় এক কিলোমিটার ঝাউবনও হারিয়ে গেছে। জলোচ্ছ্বাস, উচ্চ জোয়ার, ঘূর্ণিঝড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভাঙন আরও তীব্র হচ্ছে। জোয়ারের সময় বেলাভূমির বড় অংশ পানির নিচে চলে যায়।
সৈকত রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জিও টিউব ও জিও ব্যাগ ব্যবহার করলেও এগুলো নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন ঝুঁকি। বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। জোয়ারের পানি নেমে যাওয়ার পর এসব গর্তে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকে। এর সঙ্গে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ভাঙা স্থাপনার কংক্রিট ও বর্জ্য দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়াচ্ছে। পর্যটকদের সতর্ক করার জন্য পর্যাপ্ত সাইনবোর্ডও নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আনোয়ার বলেন, ময়লা-আবর্জনা ফেলা, গাছপালা ধ্বংস ও পরিবেশের প্রতি উদাসীনতার কারণে পারকির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে।
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবু জাফর মজুমদার বলেন, জিও টিউব ও জিও ব্যাগ নদী রক্ষার নকশায় ব্যবহার করা হচ্ছে। সমুদ্র রক্ষায় উপযোগী নকশা প্রয়োজন। এ জন্য পাউবো ‘পারকি সি-বিচ সংরক্ষণ’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে সৈকত রক্ষা করা সম্ভব হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মো. শফিউল আলম বলেন, জিও ব্যাগ সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকালেও দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই নয়। স্থায়ী ও সাশ্রয়ী বিকল্প খুঁজে বের করা জরুরি। পরিবেশবান্ধব ম্যানগ্রোভ বনায়নের পাশাপাশি আধুনিক গ্রোয়েন বাঁধের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভিন বলেন, পারকির পর্যটন সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা জরুরি। পরিকল্পিত উপকূলীয় সুরক্ষা নীতি না নিলে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা সমুদ্রে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৈকত রক্ষায় পাউবো ৫৪৮ কোটি ১৯ লাখ ২৬ হাজার টাকা ব্যয়ে ‘পারকি সি-বিচ সংরক্ষণ’ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৩ দশমিক ৪৬০ কিলোমিটার উপকূলীয় বাঁধ, ২ দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ, সড়ক নির্মাণ ও খাল খননসহ বিভিন্ন কাজ করা হবে। এতে পারকি সৈকতের পাশাপাশি কর্ণফুলী টানেল সংযোগ সড়ক, স্থানীয় বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সুরক্ষিত হবে।
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন, প্রকল্পটি বর্তমানে অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। নকশা প্রস্তুতের কাজ চলছে। অনুমোদন পেলে ২০২৭ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

পারকি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. কাশেম বলেন, ভাঙনের কারণে পর্যটক কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে পারকি তার হারানো সৌন্দর্য ফিরে পাবে।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array