হৃদরোগের শুরুটা অনেক সময় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নয়, তার বহু বছর আগেই। অতিরিক্ত লবণ, ধূমপান, স্থির জীবনযাপন, বাড়তি ওজন কিংবা অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ—প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস ধীরে ধীরে তৈরি করতে পারে বড় ঝুঁকি। কোনো উপসর্গ ছাড়াই শরীরে চলতে পারে ক্ষয়। একদিন সেটিই প্রকাশ পেতে পারে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো আকস্মিক ঘটনায়। বাংলাদেশে হৃদ্রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝা তাই শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতার প্রশ্ন নয়; এটি জীবনযাপন, জনস্বাস্থ্যনীতি ও অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
- উচ্চ রক্তচাপে অল্প বয়সেই তৈরি হচ্ছে হৃদরোগের ঝুঁকি
- প্রতিরোধে পিছিয়ে জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা
- তামাক, লবণ, স্থূলতা ও অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপে বাড়ছে বিপদ
বড় জনস্বাস্থ্য সংকট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কার্ডিওভাসকুলার রোগে আনুমানিক ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই বছরে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে স্ট্রোকে মৃত্যুর হার ছিল ৮০ দশমিক ২ এবং ইস্কেমিক হার্ট ডিজিজে ৫৮ দশমিক ৫।এই সংখ্যা শুধু হাসপাতালের একটি পরিসংখ্যান নয়। একজন কর্মক্ষম মানুষের অকালমৃত্যু মানে একটি পরিবারের আয় কমে যাওয়া, নির্ভরশীল সদস্যদের ওপর বাড়তি চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয়। ফলে হৃদরোগের অভিঘাত পৌঁছে যায় পরিবার থেকে জাতীয় অর্থনীতিতেও।
তরুণরা কি সত্যিই নিরাপদ?
হৃদরোগ নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি সম্ভবত এখানেই—ঝুঁকির উপাদানগুলো আর কেবল প্রবীণদের জীবনে সীমাবদ্ধ নেই। ‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে’র তথ্য অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সিদের প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত।তবে এর অর্থ এই নয় যে ওই বয়সের প্রতি আটজনের একজন হৃদরোগে আক্রান্ত। বিষয়টি হলো, হৃদরোগের ঝুঁকির ভিত্তি তৈরি হচ্ছে জীবনের অনেক আগেই। উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, তামাক, অস্বাস্থ্যকর খাবার ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বছরের পর বছর চলতে থাকলে পরবর্তী জীবনে তার সম্মিলিত প্রভাব মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।অর্থাৎ বয়সের সীমা ভাঙার চেয়ে বড় বাস্তবতা হলো—ঝুঁকি জমছে বয়স হওয়ার আগেই।
সবচেয়ে নীরব বিপদ উচ্চ রক্তচাপ
হৃদরোগের ঝুঁকির তালিকায় উচ্চ রক্তচাপের অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দীর্ঘ সময় কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই শরীরে ক্ষতি করতে পারে। হৃদ্যন্ত্রের পাশাপাশি মস্তিষ্ক, কিডনি ও রক্তনালিও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে আক্রান্ত হতে পারে। ২০২৫ সালের বাংলাদেশ হাইপারটেনশন প্রোফাইল অনুযায়ী, দেশে হৃদ্রক্তনালিজনিত রোগে মৃত্যুর আনুমানিক ৫২ শতাংশের সঙ্গে উচ্চ সিস্টোলিক রক্তচাপের সম্পর্ক ছিল। অথচ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের হার মাত্র ১৬ শতাংশ। এখানেই বড় ঘাটতিটি স্পষ্ট হয়। সমস্যা শুধু মানুষ জানে না যে তার রক্তচাপ বেড়েছে—তা নয়; শনাক্ত হওয়ার পরও নিয়মিত চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। ফলে প্রতিরোধযোগ্য একটি ঝুঁকি ধীরে ধীরে প্রাণঘাতী জটিলতায় রূপ নিতে পারে।
বদলে যাওয়া জীবনযাপন, বাড়ছে ঝুঁকি
শহুরে জীবনে দীর্ঘ সময় বসে থাকা, হাঁটাচলা কমে যাওয়া এবং নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব এখন স্বাভাবিক বাস্তবতার অংশ। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অতিরিক্ত লবণ, চর্বি ও প্রক্রিয়াজাত খাবার, তামাক এবং বাড়তি ওজন।২৫ বছর ও তার বেশি বয়সিদের দৈনিক গড় লবণ গ্রহণ প্রায় ৯ গ্রাম—এমন তথ্যও উঠে এসেছে। অতিরিক্ত লবণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে, আর দীর্ঘদিন অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।অন্যদিকে তামাকের প্রভাব আরও বিস্তৃত। তামাক শুধু হৃদরোগ নয়, ক্যান্সার ও দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগেরও বড় ঝুঁকিকারক। এর সঙ্গে বায়ুদূষণ যুক্ত হওয়ায় হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর পরিবেশগত চাপও বাড়ছে।
হৃদরোগের লড়াই হাসপাতালের আগেই
হার্ট অ্যাটাক হলে দ্রুত চিকিৎসা, দক্ষ চিকিৎসক, আধুনিক প্রযুক্তি ও হাসপাতালের সক্ষমতা জীবন বাঁচাতে পারে। কিন্তু জনসংখ্যার সামগ্রিক হৃদরোগের বোঝা কমাতে শুধু হাসপাতাল বাড়ানো যথেষ্ট নয়। কারণ রোগের অনেক ঝুঁকি তৈরি হয় হাসপাতালের বাইরে—বাড়িতে, কর্মক্ষেত্রে, খাদ্যাভ্যাসে এবং শহরের জীবনযাপনে। তাই প্রতিরোধের কৌশলও হতে হবে বহুমুখী। নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরল পরীক্ষা; তামাক বর্জন; খাবারে লবণ কমানো; নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড; স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং খাদ্যতালিকায় ফল ও সবজি বাড়ানো—এসব পদক্ষেপ ব্যক্তিগত পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় উচ্চ রক্তচাপ ও অন্যান্য অসংক্রামক রোগের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করাও জরুরি।
এক রোগ, দুই ধরনের ক্ষতি
হৃদরোগে একজন মানুষ অসুস্থ হলে ক্ষতির হিসাব শুধু হাসপাতালের বিল দিয়ে করা যায় না। কর্মক্ষম বয়সে আক্রান্ত হলে আয় কমে যেতে পারে, কর্মদক্ষতা নষ্ট হতে পারে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর আর্থিক দায় বাড়তে পারে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশ মানুষের নিজস্ব পকেট থেকে আসে—বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী। দীর্ঘমেয়াদি হৃদরোগের চিকিৎসা তাই অনেক পরিবারের জন্য চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি আর্থিক অনিশ্চয়তাও তৈরি করতে পারে।
প্রতিরোধের জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
হৃদরোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে চিকিৎসা অবকাঠামোর প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—মানুষ হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ঝুঁকি কমানোর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, তামাকের ব্যবহার কমানো, স্বাস্থ্যকর খাবারের সহজলভ্যতা, শারীরিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ তৈরি, বায়ুদূষণ কমানো এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়ন—এসব উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলোকে সমন্বিত জনস্বাস্থ্য কৌশলের অংশ করতে হবে।
নীরব ঝুঁকি, বড় অর্থনৈতিক চাপ
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, হৃদরোগের লক্ষণ প্রকাশের আগেই অনেকের শরীরে ঝুঁকি তৈরি হয়। রক্তনালির অন্তর্নিহিত রোগ দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে; কখনো হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকই হয়ে ওঠে এর প্রথম প্রকাশ। তাই নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তে শর্করা, কোলেস্টেরল ও ওজন পরীক্ষা করে ঝুঁকি মূল্যায়নের পাশাপাশি ধূমপান বর্জন, লবণ কমানো, নিয়মিত শারীরিক কর্মকাণ্ড, ফল-সবজি বেশি খাওয়া এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি।
হৃদরোগের ক্ষতি শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নয়; দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও কর্মক্ষমতা হারানোর কারণে পরিবারেও তৈরি হয় আর্থিক চাপ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৯ শতাংশই মানুষ নিজ পকেট থেকে বহন করে। ফলে কর্মক্ষম একজন ব্যক্তি হৃদরোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি পরিবারের আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে।
চিকিৎসার আগে প্রতিরোধে নজর
বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগজনিত অকালমৃত্যু কমাতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকে জনস্বাস্থ্য অগ্রাধিকারে আনতে হবে। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ঝুঁকির উপাদান বাড়তে থাকায় স্বাস্থ্য বাজেটে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই) ও প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা) আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বলা হয়, বিশ্বে প্রতিবছর হৃদরোগের কারণে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষ অকালে মারা যান।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. মারুফ হক খান বলেন, উচ্চ রক্তচাপজনিত হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। তাঁর মতে, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অসংক্রামক রোগের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা এখন দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ধারাবাহিক পরিচর্যার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যব্যয়ের বড় অংশকে শুধু চিকিৎসানির্ভর না রেখে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায়ও গুরুত্ব দিতে হবে।
কালের আলো/আরআই/এমএইচ
আপনার মতামত লিখুন
Array