ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এবং পাল্টা হামলাকে কেন্দ্র করে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর সাত মাস পেরিয়ে গেছে। দীর্ঘ এই সংঘাতের মধ্যে একাধিকবার যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা স্থায়ী সমাধানে পৌঁছায়নি। এবার আবারও যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সোমবার মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করেছেন।
বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ইরান যে সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল, তার একটি সংশোধিত রূপ নিয়ে আরও আলোচনা হতে পারে। ওই প্রস্তাব অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে এর আগে জানিয়েছিলেন।
মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে পৃথক আলোচনা
সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্পও নিশ্চিত করেছেন যে মার্কিন কর্মকর্তারা মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে আলোচনার বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি।
অন্যদিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্কে থাকা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, সর্বশেষ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের বিষয়ে তেহরান এখনো যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনাকে দেওয়া বক্তব্যে আরাগচি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের পথ পুনরায় চালুর শর্ত নিয়েও ওয়াশিংটনের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে তেহরান।
আরাগচির ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা যদি সত্যিই কোনো চুক্তি বা শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে থাকেন, তাহলে ইরান সেই সুযোগ ইতিমধ্যে তৈরি করেছে।
ইরানের প্রস্তাবে যেসব শর্ত
ইরানের প্রস্তাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইরান ও লেবাননে সব ধরনের সংঘাতের অবসান, জব্দ করা ইরানের শত শত কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা এবং ইরানের জ্বালানি তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার।
এ ছাড়া ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবিও রয়েছে।
তেহরানের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব শর্ত পূরণ করা হলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। ফলে প্রণালিটি বন্ধ থাকায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা
হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতার পাশাপাশি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ বা ধ্বংস করার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের যে অবস্থান রয়েছে, তা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আবার আলোচনা শুরু হতে পারে।
তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি।
এর আগে দুবার যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে বর্তমান যুদ্ধের সূত্রপাত। এরপর কয়েক মাস ধরে পাল্টাপাল্টি হামলা চলেছে। এতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।
সংঘাতের প্রভাব ইরান ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর বাইরে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও পড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়েছে এবং বিশ্ববাণিজ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান দুবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল—একবার এপ্রিলে এবং আরেকবার জুনে। তবে উভয় উদ্যোগই শেষ পর্যন্ত টেকসই হয়নি।
ট্রাম্পের ভিন্ন অবস্থান
ইরানের সর্বশেষ সাত দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কথা গত শনিবার জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। তাঁর দাবি, তেহরান বর্তমানে গুরুতর অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রয়েছে এবং সে কারণেই দ্রুত একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চাইছে।
তবে এর এক দিন পর রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে ট্রাম্প বলেন, চলতি সপ্তাহে মার্কিন আলোচকেরা ইরানের সঙ্গে আরও আলোচনায় বসতে পারেন বলে তিনি আশা করছেন।
ফলে একদিকে ইরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কথা জানালেও অন্যদিকে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় তেহরান
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অবশ্য বলেছেন, ট্রাম্প প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন—এমন কোনো আনুষ্ঠানিক বার্তা মধ্যস্থতাকারীরা এখনো তেহরানকে দেয়নি। তাই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়ার আগে ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে ইরান।
আরাগচি বলেন, ইরানের শর্তগুলো স্পষ্ট এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার যেকোনো পদক্ষেপ ওই শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করবে। তাঁর মতে, আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমাধানে পৌঁছানোই বর্তমান অচলাবস্থা কাটানোর একমাত্র পথ।
তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান ‘ভয়ংকর যুদ্ধের’ জন্যও প্রস্তুত রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্য পরিবহন করা হয়।
ইরান বলছে, তাদের শর্ত পূরণ না হলে প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক সংঘাতের মতো বিষয়গুলোতে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে।
এ অবস্থায় মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নতুন করে শুরু হওয়া আলোচনা যুদ্ধবিরতির দিকে কতটা এগোয়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে এখনও বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array