অসাধারণ খেলোয়াড়দের একটি বিশেষ ক্ষমতা থাকে—তাঁদের নৈপুণ্য শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা ছড়িয়ে পড়ে গ্যালারি ও ডাগআউটেও। দর্শকদের আবেগে ভাসিয়ে দেয় তাঁদের খেলা। ব্রাসেলসে গতকাল রাতেও তেমনই এক দৃশ্যের জন্ম হলো। ফরাসি মিডফিল্ডার মাইকেল ওলিসের দুর্দান্ত গোলে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন ফ্রান্সের কোচ জিনেদিন জিদান যে, ডাগআউট ছেড়ে টাচলাইনের পাশে দৌড়াতে শুরু করেন তিনি।
মাঠে ছিলেন ওলিসে, ডাগআউটে জিদান। কিন্তু ৮৮ মিনিটে ওলিসের করা অসাধারণ গোলের মুহূর্তে সেই দূরত্ব যেন আর থাকল না। গোলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে জিদানও হয়ে উঠেছিলেন সাধারণ এক ফুটবল দর্শক।
ওলিসের দৌড়ে দৌড়ালেন জিদান
বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচটি যখন গোলশূন্য ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখনই বদলি হিসেবে নামা ওলিসে বদলে দেন পুরো ম্যাচের চিত্র। নিজেদের অর্ধ থেকে বল নিয়ে মাঝমাঠ পেরিয়ে বেলজিয়ামের রক্ষণে ঢুকে পড়েন তিনি। পথে এক ডিফেন্ডারকে অসাধারণ ড্রিবলিংয়ে পরাস্ত করে বিপৎসীমায় পৌঁছে যান।
ওলিসের সেই মুভ দেখেই যেন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেননি জিদান। টাচলাইন ধরে তাঁর সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াতে শুরু করেন ফ্রান্সের কোচ। ওলিসে গোল করার পরও থামেননি জিদান। উত্তেজনার মুহূর্তে সামনে থাকা একটি বলে কিকও মেরে বসেন তিনি।
ফুটবল যে কতটা আবেগের খেলা, সেই দৃশ্যই যেন তার প্রমাণ হয়ে ওঠে।
‘ওর পেছন পেছন গেলাম’
ম্যাচ শেষে নিজের এমন উদযাপনের ব্যাখ্যাও দিয়েছেন জিদান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফরাসি কিংবদন্তি জানান, ওলিসের ড্রিবলিং দেখে তিনি মুহূর্তটির অংশ হয়ে যেতে চেয়েছিলেন।
জিদানের ব্যাখ্যায়, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ওলিসে ড্রিবলিং শুরু করেছেন এবং দুর্দান্ত একটি মুভ তৈরি করেছেন। তাই নিজের অজান্তেই তাঁর পেছন পেছন দৌড়াতে শুরু করেন। এরপর সামনে একটি বল দেখতে পেয়ে আনন্দের বশে সেটিতে কিক মেরে দেন।
জিদানের কাছে ঘটনাটি হয়তো কিছুটা হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু সেই মুহূর্তে আবেগের কাছে যুক্তির কোনো জায়গা ছিল না।
ওলিসেকে ‘নিখাদ প্রতিভা’ বললেন জিদান
শুধু গোল বা উদযাপন নয়, পুরো ম্যাচজুড়েই ওলিসের পারফরম্যান্সে মুগ্ধ জিদান। ফরাসি মিডফিল্ডারকে প্রশংসায় ভাসিয়ে তিনি বলেন, ওলিসে নিখাদ প্রতিভা। সে ফুটবল খেলতে ভালোবাসে এবং তার খেলায় সেই আবেগ স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।
জিদানের মতে, ওলিসে ফুটবলকে নিজের অনুভূতির সঙ্গে ধারণ করে খেলেন। এমন একজন খেলোয়াড়ের পাশে থাকতে পারাকে নিজের জন্যও আনন্দের বলে মনে করেন ফ্রান্সের কোচ।
এমবাপ্পে না থাকলেও জয় পেল ফ্রান্স
চোটের কারণে কিলিয়ান এমবাপ্পে এই ম্যাচে ছিলেন না। তাঁর অনুপস্থিতিতে ফ্রান্সের একাদশেও বড় পরিবর্তন আনতে হয় জিদানকে। আগের ম্যাচের তুলনায় নয়টি পরিবর্তন নিয়ে মাঠে নামে ফরাসিরা।
তবু শেষ পর্যন্ত জয় তুলে নিতে কোনো গোলই যথেষ্ট ছিল—আর সেই গোল এসেছে ওলিসের পা থেকে। ৮৮ মিনিটে তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে বেলজিয়ামকে ১–০ গোলে হারিয়েছে ফ্রান্স।
এই জয়ের ফলে ফ্রান্সের কোচ হিসেবে নিজের প্রথম দুই ম্যাচেই জয় পেলেন জিদান। ১৯৯৪ সালে আইমে জ্যাকের পর ফ্রান্সের চতুর্থ কোচ হিসেবে দায়িত্বের প্রথম দুই ম্যাচে জয়ের কীর্তি গড়লেন তিনি।
জিদানের প্রথম দুই ম্যাচেই ওলিসের সরাসরি অবদান
জিদানের অধীনে ফ্রান্সের প্রথম দুই ম্যাচেই ওলিসের রয়েছে সরাসরি অবদান। আগের ম্যাচে তুরস্কের বিপক্ষে ১–০ গোলে জয়ের ম্যাচে গোলটির উৎস ছিলেন বায়ার্ন মিউনিখের এই মিডফিল্ডার। আর বেলজিয়ামের বিপক্ষে এবার নিজেই করলেন জয়সূচক গোল।
অর্থাৎ জিদানের অধীনে প্রথম দুই ম্যাচে ফ্রান্সের দুটি গোলেই সরাসরি অবদান রয়েছে ওলিসের।
ফ্রান্সের কোনো কোচের অধীনে দায়িত্বের প্রথম দুই গোলেই এমন সরাসরি অবদান সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল এরিক ক্যান্টোনার ক্ষেত্রে। ১৯৯২ সালে জেরার্ড হুলিয়ের কোচ হওয়ার পর তাঁর অধীনে ফ্রান্সের প্রথম দুই গোলেই একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন ক্যান্টোনা।
জাতীয় দলের জার্সিতে দুর্দান্ত ওলিসে
ফ্রান্সের জার্সিতে ওলিসের দুর্দান্ত ফর্ম অবশ্য নতুন নয়। ২০২৪ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পর এখন পর্যন্ত ২৭ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। এর মধ্যে গোল করেছেন ৮টি এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ১০টি।
অর্থাৎ জাতীয় দলের হয়ে ২৭ ম্যাচে ১৮টি গোলে সরাসরি অবদান রয়েছে তাঁর।
ফ্রান্সের হয়ে প্রথম ২৭ ম্যাচে এমন পরিসংখ্যান খুব কম খেলোয়াড়েরই ছিল। সর্বশেষ কাছাকাছি উদাহরণ খুঁজতে ফিরে যেতে হয় ১৯৯৭ সালে। ১৯৯৩ সালে অভিষেকের পর প্রথম ২৭ ম্যাচে ইউরি দিয়োরকায়েফের গোল ছিল ১৪টি, সঙ্গে ছিল ৮টি অ্যাসিস্ট।
জিদানের সঙ্গে যেন পুরোনো এক মিল
দিয়োরকায়েফের সঙ্গে ১৯৯৮ বিশ্বকাপ জিতেছিলেন জিদান। তবে ওলিসের খেলার ধরন ও পরিসংখ্যান তাঁকে আলাদা করে তুলছে। মাঝমাঠ থেকে আক্রমণে উঠে যাওয়া, ড্রিবলিং, গতি এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতায় ওলিসে ইতিমধ্যেই নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেছেন।
জিদানের চোখেও সেটিই ধরা পড়েছে। তাঁর মতে, ওলিসে এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি শুধু ফলের জন্য খেলেন না; নিজের খেলার মাধ্যমে দর্শকদের আনন্দ দিতে চান।
এই কথার মধ্যে যেন জিদানের নিজের ফুটবল-দর্শনেরও প্রতিফলন রয়েছে। একসময় তিনিও মাঝমাঠ থেকে ড্রিবলিং, নিয়ন্ত্রিত গতি আর অসাধারণ ফুটবলশৈলী দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। মাঠে জিদানের খেলা দেখে যেমন দর্শকেরা আবেগে ভেসেছেন, এবার সেই জিদানই ডাগআউটে দাঁড়িয়ে ওলিসের খেলায় সেই আবেগের স্বাদ পেলেন।
ওলিসের একটি অসাধারণ গোল তাই শুধু ফ্রান্সকে জয় এনে দেয়নি, কয়েক মুহূর্তের জন্য কিংবদন্তি জিদানকেও ফিরিয়ে নিয়েছিল তাঁর নিজের ফুটবল-দিনগুলোতে। ফুটবল যে সত্যিই সংক্রামক এক আবেগ—ব্রাসেলসের সেই রাত যেন তারই আরেকটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকল।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array