চরে ঢেকেছে নদী, হারিয়ে গেছে যমুনেশ্বরীর নৌকাবাইচ
একসময় রংপুরের যমুনেশ্বরী নদীতে নৌকাবাইচ দেখতে দুই পাড়ে ভিড় করতেন হাজারো মানুষ। ঢাকঢোলের শব্দ, মাঝিদের বৈঠার ছন্দ আর প্রতিযোগিতার উত্তেজনায় মুখর থাকত নদীপাড়। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চেনা দৃশ্য হারিয়ে গেছে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, বিভিন্ন স্থানে চর জেগে ওঠা এবং একের পর এক সেতু নির্মাণের কারণে প্রায় এক যুগ ধরে বন্ধ রয়েছে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ।
শুধু নৌকাবাইচ নয়, নদীর ওপর নির্ভরশীল জেলে ও মাঝিদের জীবন-জীবিকাতেও পড়েছে এর প্রভাব। আগের মতো মাছ না পাওয়া, খেয়াঘাট কমে যাওয়া এবং নৌকা চালিয়ে আয় করার সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন।
শংকরপুর হরকান্তের ডাঙ্গা মৎস্যজীবী সমিতি সূত্রে জানা যায়, বদরগঞ্জের শেখটারি ও গুদামপাড়া এলাকার জেলে পরিবারগুলো একসময় যমুনেশ্বরীতে মাছ ধরা, নৌকায় যাত্রী পারাপার এবং নৌকাবাইচে অংশ নিয়ে জীবিকা ও বিনোদনের সুযোগ পেত। বর্তমানে নদীর নাব্যতা সংকট, চর জেগে ওঠা এবং বালু উত্তোলনের প্রভাবে মাছের প্রাপ্যতাও কমেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

সমিতি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেলে পরিবারের সংখ্যা দুই শতাধিকের নিচে নেমে এসেছে। আগে প্রায় প্রতিটি পরিবারের নিজস্ব নৌকা থাকলেও এখন সেই চিত্র আর নেই। অনেকেই মাছ ধরা ছেড়ে অন্য পেশায় যুক্ত হয়েছেন।
জেলে পরিবারের সদস্য বিমল দাস ও গুরুদাস এর উদাহরণ। প্রায় ছয় বছর ধরে তাঁরা মাছ ধরা ছেড়ে অটোরিকশা ও সিএনজি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তাঁদের ভাষ্য, আগে মাছ ধরা ও নৌকায় যাত্রী পারাপার ছিল আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু নদীতে মাছ কমে যাওয়া এবং খেয়াঘাটের সংখ্যা কমে যাওয়ায় পেশা পরিবর্তন করতে হয়েছে।
শংকরপুর হরকান্তের ডাঙ্গা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি সীমন্ত দাস বলেন, একসময় যমুনেশ্বরীর বিভিন্ন ঘাটে বড় নৌকাসহ ১২ থেকে ১৩টি নৌকা যাত্রী পারাপারে নিয়োজিত থাকত। নদীর প্রায় ২০ কিলোমিটার এলাকায় এরশাদ, নাগেরহাট, চান্দামারী নাটোরাম ও শেখেরহাট সেতু নির্মাণের আগে এসব স্থানে খেয়াঘাট ছিল। সেতু নির্মাণের ফলে নৌকায় পারাপারের প্রয়োজন কমে যাওয়ায় অনেক মাঝি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
তিনি আরও জানান, নৌকাবাইচের জন্য বিশেষ ধরনের শালকাঠের নৌকা প্রয়োজন হয়। একটি নৌকা তৈরি করতে প্রায় ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা খরচ পড়ে। নদীর বর্তমান পরিস্থিতি ও আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিযোগিতা আয়োজনও কঠিন হয়ে পড়েছে।
নদীপাড়ের বাসিন্দা, লেখক, গবেষক ও শিক্ষক ছাইদুল হক বলেন, নৌকাবাইচ বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক সংস্কৃতির অন্যতম ঐতিহ্য। একসময় এ প্রতিযোগিতা ঘিরে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ নদীর পাড়ে আসতেন। এটি ছিল মানুষের মিলনমেলা, যা সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করত।
তাঁর মতে, দীর্ঘদিন ধরে বদরগঞ্জ অংশে নৌকাবাইচ না হওয়া দুঃখজনক। নদীর প্রতিবন্ধকতা দূর করে ঐতিহ্যবাহী এ আয়োজন আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
যমুনেশ্বরী নদীর সংস্কার নিয়ে জানতে চাইলে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাফিজুল হক প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখে পরে তথ্য জানাবেন বলে জানান। অন্যদিকে, বদরগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা তারাগঞ্জের ইউএনও মো. মোনাববর হোসেন জানান, নৌকাবাইচ বন্ধ হওয়ার সময় ও কারণ সম্পর্কে তাঁর কাছে বিস্তারিত তথ্য নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের আন্তঃসীমান্ত নদী যমুনেশ্বরী উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুরের বিভিন্ন এলাকার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে নদীটি স্রোতস্বিনী হিসেবে পরিচিত হলেও বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ অনেক কমে যায়। স্থানীয়দের মতে, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বৃষ্টির অভাব, নাব্যতা সংকট ও চর জেগে ওঠার কারণে নদীটি আগের রূপ হারাচ্ছে। বর্ষায় আবার বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনের ঝুঁকি দেখা দেয়।

যমুনেশ্বরীর বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু একটি নদীর সংকট নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, সামাজিক বন্ধন এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেওয়া গেলে নদীকেন্দ্রিক জনজীবনে আবারও প্রাণ ফিরতে পারে।
কালের আলো/এএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array