বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত অন্তত দুজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নির্বাহী, বিনিয়োগকারী ও আর্থিক খাতের প্রতিনিধিদের সৌদি আরবে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। তবে সম্মেলন বাতিল বা নির্ধারিত সময় পরিবর্তনের কোনো সিদ্ধান্তের কথা প্রতিবেদনে জানানো হয়নি।
অক্টোবর, ২০২৬ এর শেষ দিকে রিয়াদে এফআইআইয়ের দশম আসর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধি, বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী, বিনিয়োগকারী এবং আর্থিক খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। সৌদি আরবের অর্থনীতি বহুমুখীকরণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনা তুলে ধরার ক্ষেত্রে সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
নিরাপত্তা ঝুঁকিতে সরাসরি অংশগ্রহণ নিয়ে উদ্বেগ
সৌদি আরবে সাম্প্রতিক হামলার কারণে সম্মেলনে অংশ নিতে আগ্রহীদের যাতায়াত পরিকল্পনায় পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। রয়টার্সকে বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন একজন ব্যক্তি বলেছেন, সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ রিয়াদের বাইরে অবস্থিত বিমানঘাঁটি কিংবা প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবতরণ করে সড়কপথে সৌদি রাজধানীতে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন।
এ ধরনের বিকল্প যাত্রাপথের পরিকল্পনা থেকে বোঝা যায়, নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সবাই এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সম্মেলনে কারা সরাসরি উপস্থিত থাকবেন এবং কতজন অনলাইনে যোগ দেবেন, সে বিষয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরে হামলার খবর আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে বড় আন্তর্জাতিক আয়োজনের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানো এবং সম্মেলন শেষে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা আয়োজকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে সৌদি সরকারের গণমাধ্যম দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
নির্ধারিত সময়েই সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতি
নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও চলতি মাসের শুরুতে সম্মেলন আয়োজকেরা জানিয়েছিলেন, নির্ধারিত সময়েই এফআইআই অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ হামলার কারণে সম্মেলন বাতিলের কোনো ঘোষণা তখন দেওয়া হয়নি। বরং অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আয়োজনটি সম্পন্ন করার প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছিল।
এফআইআই ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাহা আল সৌদ এবং নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান রিচার্ড আতিয়াসের একটি যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, সম্মেলনের দশম আসরে রিয়াদে হাজারো প্রতিনিধিকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তাঁদের নিরাপত্তা ও সুস্থতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
তবে বিবৃতিটি গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা ও হতাহতের ঘটনার আগেই দেওয়া হয়েছিল। ফলে পরবর্তী পরিস্থিতিতে আয়োজকদের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।
সম্মেলনে অনলাইনে অংশগ্রহণের সুযোগ চালু করা হলে নিরাপত্তাজনিত কারণে সরাসরি উপস্থিত হতে অনিচ্ছুক প্রতিনিধিরাও আলোচনায় যুক্ত থাকতে পারবেন। এতে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণ বজায় রাখার পাশাপাশি যাতায়াতসংক্রান্ত ঝুঁকি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
‘মরুভূমির দাভোস’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ সৌদি আরবের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সম্মেলন। বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, অবকাঠামো, আর্থিক খাত এবং বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে এখানে আলোচনা হয়। বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারক, সরকারি প্রতিনিধি, বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী ও বিনিয়োগকারীরা এতে অংশ নেন।
সুইজারল্যান্ডের দাভোসে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের সঙ্গে তুলনা করে এফআইআইকে অনেক সময় ‘মরুভূমির দাভোস’ বলা হয়। সৌদি আরবের অর্থনৈতিক রূপান্তর পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদারের ক্ষেত্রে এ সম্মেলন বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে পর্যটন, প্রযুক্তি, শিল্প, অবকাঠামো ও অন্যান্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। এফআইআই সেই প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মঞ্চ। সম্মেলনের মাধ্যমে দেশটি নতুন ব্যবসায়িক অংশীদার খুঁজে নেওয়া, বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করে।
এ কারণে সম্মেলনে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের উপস্থিতি সৌদি আরবের জন্য শুধু আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আস্থা তৈরি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
হুতিদের হামলায় চাপে সৌদির আন্তর্জাতিক আয়োজন
ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত দীর্ঘদিনের। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হস্তক্ষেপের পর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রতিক হামলাগুলো নতুন করে সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও একাধিক হামলার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার ফলে বিমান চলাচল, যাত্রীদের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ( ১০ অক্টোবর) বিমানবন্দরে চালানো হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। তবে হতাহতের সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদনের বিভিন্ন অংশে তথ্যের অসংগতি রয়েছে। তাই নির্ভরযোগ্যভাবে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট সংখ্যা উল্লেখ না করাই সমীচীন।
বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজকদের জন্যও চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। কারণ এ ধরনের আয়োজনের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের বিমানযাত্রা, হোটেলে অবস্থান, নিরাপত্তা এবং একাধিক স্থানে যাতায়াতের বিষয় জড়িত থাকে।
সরাসরি ও অনলাইনে অংশগ্রহণের বিকল্প কেন গুরুত্বপূর্ণ
আন্তর্জাতিক সম্মেলনে সরাসরি উপস্থিতি সাধারণত ব্যবসায়িক যোগাযোগ, বিনিয়োগ আলোচনা এবং নতুন অংশীদারত্ব তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে অনলাইন অংশগ্রহণ একটি বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে।
এফআইআইয়ে অনলাইনে অংশ নেওয়ার সুযোগ রাখা হলে যেসব প্রতিনিধি নিরাপত্তার কারণে রিয়াদে যেতে অনিচ্ছুক, তাঁরা দূর থেকেই আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন। এতে সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ সেশনগুলো চালিয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা সহজ হতে পারে।
অন্যদিকে সরাসরি উপস্থিতি কমে গেলে সম্মেলনের বিভিন্ন ব্যবসায়িক বৈঠক, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত আলোচনার ধরনও বদলে যেতে পারে। বড় বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সামনাসামনি আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় আয়োজকদের জন্য নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের মধ্যে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন।
তবে অনলাইনে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা চূড়ান্ত হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত ঘোষণা পাওয়া যায়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিষয়টি বিবেচনাধীন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিকল্পনায় নতুন চ্যালেঞ্জ
সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য হলো তেল থেকে অর্জিত আয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো। এ জন্য দেশটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজেদের বাজার ও উন্নয়ন প্রকল্পের সম্ভাবনা তুলে ধরছে।
এফআইআইয়ের মতো সম্মেলন সেই প্রচেষ্টার অংশ। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারী ও করপোরেট নেতাদের উপস্থিতি সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে ধারণা তৈরি করে। একই সঙ্গে বড় প্রকল্পে বিদেশি পুঁজি আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়।
কিন্তু আঞ্চলিক সংঘাত ও নিরাপত্তা উদ্বেগ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদের যাতায়াত এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। বড় আয়োজনের সময় হামলার আশঙ্কা থাকলে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হয় এবং বিকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত রাখতে হয়।
এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের জন্য একদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ অব্যাহত রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এফআইআইয়ের আয়োজকেরা অনলাইন অংশগ্রহণের বিকল্প বিবেচনা করছেন বলে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার প্রচেষ্টার অংশ হতে পারে।
সম্মেলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ওপর
চলতি মাসের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় এফআইআইয়ের দশম আসর সৌদি আরবের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক আয়োজন। তবে হুতিদের ধারাবাহিক হামলা এবং বিমান চলাচল নিয়ে উদ্বেগের কারণে আয়োজকদের বিকল্প পরিকল্পনা বিবেচনা করতে হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্মেলন নির্ধারিত সময়েই আয়োজনের প্রস্তুতি রয়েছে। একই সঙ্গে সরাসরি অংশগ্রহণের পাশাপাশি অনলাইন ব্যবস্থার সম্ভাবনাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার বিস্তারিত বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত পরিস্থিতি অনিশ্চিতই থাকছে।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের বিনিয়োগ সম্মেলন ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি দেশটির সামনে একটি দ্বৈত চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছে। একদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে স্থিতিশীল ও আকর্ষণীয় অর্থনৈতিক গন্তব্য হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। সম্মেলনে সরাসরি ও অনলাইনে অংশগ্রহণের বিকল্প শেষ পর্যন্ত কীভাবে নির্ধারিত হয়, তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আয়োজকদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।
কালের আলো/এসএ
আপনার মতামত লিখুন
Array