পদ্মায় বিলীন ২০০ ঘরবাড়ি, ভিটেমাটি হারিয়ে দিশাহারা মানুষ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের পদ্মা নদীতে ভয়াবহ ভাঙনে গত পাঁচ দিনে শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের বাদশাহপাড়া ও নামো জগন্নাথপুর এলাকায় অন্তত ২০০ বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে। নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন বহু পরিবার। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে, কেউ খোলা জায়গায় ত্রিপল টাঙিয়ে দিন পার করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, উজানের ঢল ও নদীর তীব্র ঘূর্ণিস্রোতে গত তিন দিনে প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জের নামো জগন্নাথপুর, ফিল্ডের হাট, বাদশাহপাড়া, বিশরশিয়া ও মনোহরপুর এলাকায় ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছর সদর ও শিবগঞ্জের নদীতীরবর্তী এলাকায় ছয় শতাধিক বাড়িঘর এবং শতাধিক বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
নদীভাঙনের শিকার ৭০ বছর বয়সী মোস্তফা আলী এক দশকে চারবার বসতভিটা হারিয়েছেন। এবার তাঁর ১৪ বিঘা জমি ও ইটের পাকা বাড়িও পদ্মায় বিলীন হয়েছে। প্রতিবন্ধী ছেলেসহ সাত সন্তান নিয়ে এখন অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাঁর।
একইভাবে বসতবাড়ি ও তিন বিঘা জমি হারিয়েছেন রাজমিস্ত্রি মেরাজুল ইসলাম। কর্মস্থলে ভবন থেকে পড়ে শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে যাওয়ার পর এখন তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে বিদ্যালয়ের মাঠে ত্রিপল টাঙিয়ে বসবাস করছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, পরিবার নিয়ে দিন কাটছে অনাহারে-অর্ধাহারে।
নামো জগন্নাথপুরের বাসিন্দা রাজু আলী বলেন, তাঁরা ত্রাণের চেয়ে স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ চান। তাঁর পরিবারেরও বিপুল পরিমাণ জমি পদ্মায় বিলীন হয়েছে। আগে নিজেদের জমিতে কাজ করে সংসার চললেও এখন অন্যের জমিতে দিনমজুরি করতে হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছর থেকে নদীভাঙন রোধে কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আগে ভাঙন বাড়লে জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরোধের চেষ্টা করা হলেও এবার তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এতে ক্ষোভ বাড়ছে নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিজিবি ক্যাম্পও।
দুর্লভপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম আযম জানান, তাঁর ইউনিয়নের অন্তত চারটি এলাকায় ভাঙন চলছে। এসব এলাকায় ৫০ পরিবারের বাড়িঘর বিলীন হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কাছে ৪০টি পরিবারের তালিকা দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে তাঁদের সহায়তা করা হবে।
শিবগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম বলেন, বন্যার সময় সাধ্যমতো ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি দ্রুত লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। নদীর পানি নেমে গেলে স্থায়ী বাঁধের কাজ শুরু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নদীভাঙন প্রতিরোধে ৭৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। কয়েকটি প্যাকেজের দরপত্র প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে। তবে নদীতে পানির স্রোত বেশি থাকায় এখন কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। পানি কমলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও সিসি ব্লক ফেলে নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।
ভিটেমাটি ও জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় থাকা পদ্মাপাড়ের মানুষের দাবি, অস্থায়ী উদ্যোগের পাশাপাশি দ্রুত স্থায়ী ও শক্তিশালী নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণ করতে হবে। তাঁদের মতে, সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও বিস্তীর্ণ জনপদ নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে।
কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

আপনার মতামত লিখুন
Array