জামায়াতকে নতুন চোখে দেখছে কূটনীতিকরা
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপটে অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে ফ্যাসিবাদী কায়দায় দলের শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড, মামলা-হামলা, জেল-জুলুমের মাধ্যমে দমিয়ে রাখা হয়েছিল এই ইসলামিক শক্তিকে। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর বাধাহীনভাবে দলীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে নিজেদের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক শক্তিমত্তার কথা বারবার জানান দিচ্ছে দলটি।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে জোরেশোরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তাঁরা। প্রকাশ্যে ও মুক্ত পরিবেশে রাজনীতি করার সুযোগে সভা-সমাবেশসহ দেশের জনগণের কাছে দলটির আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমানের ইতিবাচক বার্তাও পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁরা। প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় আড়ালে থাকা এই বৃহৎ রাজনৈতিক দলটি ভোটের মাঠে নিজেদের ক্রমশ ফ্যাক্টর করে তুলেছে। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও তাদের নিয়ে কৌতূহল ও ইতিবাচক ভাবনা-চিন্তা তৈরি হচ্ছে। সম্পূর্ণ নতুন এই পরিস্থিতে দীর্ঘ সময় অত্যাচার-নিপীড়নের মুখে থাকা এই দলকে ঘিরে আগ্রহ বেড়েছে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের। গত দু’মাসে এমন বৈঠক হয়েছে ৩০টিরও বেশি।
এসব বৈঠকের মাধ্যমে জামায়াত সম্পর্কে দীর্ঘদিনের অপপ্রচার ও প্রচলিত নেতিবাচক ধারনা ভেঙে যাচ্ছে। গড়ে উঠছে উজ্জ্বল ভাবমূর্তি। ভোটের আগে এসব বিষয়াদি ও নানামুখী সমীকরণ দলটিকে রেখেছে চালকের আসনে। জনগণের কাক্সিক্ষত ভোটে ক্ষমতার দুয়ারে কড়া নাড়া এই দলটি রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্বে এলে তাঁরা কী করতে চায়, কীভাবে করতে চায় এসব বিষয় সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা পাচ্ছেন বিদেশিরা।
অন্যান্য বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এমন বৈঠক হলেও রাজনীতির মাঠে আধিপত্য বজায় রাখা জামায়াতের সঙ্গে কূটনীতিকদের এই বৈঠকগুলো আলোড়ন তুলেছে। এসব ঘটনা প্রবাহে উজ্জীবিত-উদ্দীপ্ত হয়ে ফুরফুরে মেজাজে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থী ও নেতা-কর্মীরা।
- এই দলকে ঘিরে আগ্রহ বেড়েছে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের
- গত দু’মাসে এমন বৈঠক হয়েছে ৩০টিরও বেশি
- এসব বৈঠকের মাধ্যমে জামায়াত সম্পর্কে দীর্ঘদিনের অপপ্রচার ও প্রচলিত নেতিবাচক ধারনা ভেঙে যাচ্ছে
- ভোটের আগে এসব বিষয়াদি ও নানামুখী সমীকরণ দলটিকে রেখেছে চালকের আসনে
জামায়াত সূত্র জানিয়েছে, গত দুই মাসে ৩০টিরও বেশি বিদেশি মিশন-সংস্থার কূটনীতিক ও কর্মকর্তারা জামায়াতের আমির ডা.শফিকুর রহমানসহ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এসব বৈঠকের ছবি ও আলোচনার বিষয়বস্তু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াও দলটির ফেসবুক পেজে নিয়মিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আগামী সংসদ নির্বাচন, গণতন্ত্রের বিকাশ ও টেকসইকরণ, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) সকাল ৯টায় রাজধানীর বসুন্ধরার জামায়াত আমিরের কার্যালয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুসান রাইল। জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধি দলে জামায়াত আমিরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য মাওলানা ইয়াসিন আরাফাত।
নাম প্রকাশে আপত্তি জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের এক সদস্য কালের আলোকে বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের ১৫ বছর জামায়াতে ইসলামীকে বিভিন্ন দেশের হাইকমিশন থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল। কিন্তু আমরা থেমে থাকিনি। জামায়াতের ওপর হওয়া অত্যাচার ও নিপীড়ন নিয়ে কূটনীতিকরা অবগত ছিলেন। জামায়াত ভবিষ্যতে কী করবে- এই সম্পর্কেও কূটনীতিকরা দলের কাছে জানতে চাইছেন। আমাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের বিষয়ে তাদের আগ্রহ বেড়েছে। আমরা আশাবাদী আমাদের সম্পর্কে তাঁরা ইতিবাচক ধারনা পেয়েছেন।
জামায়াতে ইসলামীর প্রচার বিভাগ সূত্রে জানা যায়, কূটনৈতিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বৈঠক ও সাক্ষাৎ করেছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইডেন, স্পেন, আর্জেন্টিনা, কানাডা, জার্মানি, জাপান, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, ইরান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, ভুটানসহ প্রভাবশালী অনেক দেশের প্রতিনিধিরা। এরমধ্যে চীন ও পাকিস্তানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। একই সময়ে প্রভাবশালী কয়েকটি দেশ সফর করেছেন জামায়াতের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল। এছাড়া চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস উইকস, ব্রাজিলের রাষ্ট্রদূত পাওলো ফার্নান্দো দিয়াস ফেরেস, সুইস রাষ্ট্রদূত রেতো রেংগলি, তুরস্কের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস একিঞ্চি, কসোভোর রাষ্ট্রদূত লুলজিম প্লানা, আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আবদেল ওহাব সাইদানি, ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো এবং জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়ক গোয়েন লুইস জামায়াত আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জামায়াতের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতের সিরিজ বৈঠক দেশের রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার সময়ে শুধুমাত্র প্রোপাগাণ্ডার কারণে পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা জামায়াতকে কিছুটা নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতো। তবে তারা ক্রমশ উপলব্ধি করছে যে এই দলের সাংগঠনিক ভিত্তি ও শক্তি অত্যন্ত মজবুত। একই সঙ্গে তাদের ক্ষমতার রাজনীতির সম্ভাবনাও বেশ উজ্জ্বল। ডাকসু ও জাকসু নির্বাচন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে এসব স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। ফলে পশ্চিমা কূটনীতিকরা জামায়াতকে নতুন চোখে দেখছে এবং মূল্যায়ন করতে শুরু করেছেন। এসবের ধারাবাহিকতায় তাঁরা দলটির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি হৃদ্যতাও স্থাপন করছেন।
কালের আলো/জেএন/এমএএইচ


আপনার মতামত লিখুন
Array