খুঁজুন
                               
, ,
           

এক অনিঃশেষ দহনগাথা

আলমগীর মোহাম্মদ
প্রকাশিত: বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:৩৩ অপরাহ্ণ
এক অনিঃশেষ দহনগাথা

বর্তমান সময়ের কথাসাহিত্যে মাসউদ আহমাদ এক উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রমী নাম। আশির দশকে জন্ম নেওয়া এই লেখকের লেখায় মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা, ইতিহাসের নির্মোহ ব্যবচ্ছেদ এবং অস্তিত্বের সংকট অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে ওঠে। তার গদ্যশৈলী যেমন স্নিগ্ধ, তেমনি তীক্ষ্ণ। জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে লেখা তার আলোচিত উপন্যাস ‘লাবণ্যর মুখ’ পাঠকমহলে ব্যাপক সমাদৃত হয়েছে। এছাড়া তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস ‘নিজের সঙ্গে একা’, ‘রুপচানের আশ্চর্য কান্না’, ‘তিতাসের বুনো হাঁস’ এবং তাঁর পুরস্কারজয়ী গল্পগ্রন্থ ‘দূর পৃথিবীর গন্ধে’। কেবল জীবনীমূলক আখ্যান নয়, বরং চরিত্রের গভীরে ঢুকে তাদের দহনকে মূর্ত করে তোলাই মাসউদ আহমাদের লেখনীর বিশেষত্ব।

মাসউদ আহমাদের উপন্যাস ‘লাবণ্যর মুখ’ বাংলা সাহিত্যের নির্জনতম কবি জীবনানন্দ দাশের জীবনকে এক ভিন্ন আলোয় দেখার এক সাহসী ও নান্দনিক প্রয়াস। কবিকে নিয়ে বাংলা সাহিত্যে গবেষণার অন্ত নেই, কিন্তু তার স্ত্রী লাবণ্য দাশের দর্পণে কবির ব্যক্তিজীবন, দাম্পত্যের বিমূর্ত টানাপড়েন এবং তার ভেতরের নিঃশব্দ হাহাকারকে এমন নিপুণভাবে খুব কম লেখকই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। মাসউদ আহমাদ অত্যন্ত সংবেদনশীল গদ্যে এই উপন্যাসে কেবল একজন প্রবাদপ্রতিম কবিকে নয়, বরং একজন সাধারণ রক্ত-মাংসের মানুষ ও তার চারপাশের অবহেলিত বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন, যেখানে কবির আকাশ ছোঁয়া কল্পনা আর মাটির পৃথিবীর রূঢ় অভাব এক বিন্দুতে এসে মিলেছে।

‘লাবণ্যর মুখ’ উপন্যাসের মূল ভিত্তি লাবণ্য ও জীবনানন্দের এক অমীমাংসিত সম্পর্কের ওপর। খলিল জিবরানের ‘বিয়ে’ কবিতায় যে আদর্শিক দূরত্বের কথা বলা হয়েছে— যেখানে মন্দিরের পিলারগুলো আলাদা দাঁড়িয়ে থাকে—জীবনানন্দের জীবনে সেই দূরত্ব ছিল এক নিষ্ঠুর বিচ্ছিন্নতা বা ‘এলিনিয়েশন’। কার্ল মার্ক্স যেমন শ্রমিকের তার শ্রম ও সৃষ্টি থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কথা বলেছিলেন, জীবনানন্দও তেমনি তার পারিপার্শ্বিক সমাজ, পরিবার এমনকি নিজের সত্তা থেকেও যেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে বাস করতেন। লাবণ্যর চোখে জীবনানন্দ ছিলেন এক রহস্যময় ও দুর্বোধ্য সত্তা, যার হৃদয়ের কক্ষগুলো ছিল লাবণ্যর জন্য চিরকাল রুদ্ধ। লাবণ্য চেয়েছিলেন প্রথাগত এক ঘরোয়া জীবন, নিরাপত্তা আর সামাজিক মর্যাদা; কিন্তু কবির জগৎ ছিল নক্ষত্র, হিজল-বট, ঘাস আর এক গভীর বিষণ্নতার। এই যে বিপরীতধর্মী দুটি মানুষের এক ছাদের নিচে বছরের পর বছর বসবাস, তা উপন্যাসে এক অমোঘ ট্র্যাজেডি হিসেবে মূর্ত হয়েছে।

জীবনানন্দ দাশের চরিত্রে খলিল জিবরানের ‘কবি’ কবিতার অমর বৈশিষ্ট্যগুলো প্রবলভাবে বিদ্যমান। জিবরান কবিকে দেখেছেন ইহলোক ও পরলোকের যোগসূত্র হিসেবে, এক বিশুদ্ধ ঝরনা হিসেবে যা তৃষ্ণার্ত আত্মার তৃষ্ণা মেটায়। কিন্তু একই সাথে জিবরান বলেছিলেন, কবি তিনি যাকে মানুষ জীবদ্দশায় অবজ্ঞা করে কিন্তু মৃত্যুর পর স্বীকৃতি দেয়। মাসউদ আহমাদ তার উপন্যাসে এই রূঢ় ও তিক্ত সত্যটিকে তুলে ধরেছেন। জীবনানন্দ তার সমসাময়িক সাহিত্যিক মহলে ছিলেন ‘দুর্বোধ্য’। কর্মক্ষেত্রে বারবার পদচ্যুতি, বরিশাল থেকে কলকাতায় এসে উদ্‌বাস্তু হওয়ার মতো ‘ডায়াস্পোরিক ক্রাইসিস’ এবং সামাজিক লাঞ্ছনা তাকে তিলে তিলে কুরে খেয়েছে। ফ্রাঞ্জ কাফকার ‘দ্য হাঙ্গার আর্টিস্ট’-এর মতো জীবনানন্দও যেন তার শৈল্পিক তৃপ্তির জন্য এক আমৃত্যু উপবাস করেছেন। তার দারিদ্র্য কেবল অন্নের অভাব ছিল না, তা ছিল এক প্রকারের অস্তিত্বশীল রিক্ততা। মাসউদ আহমাদ এই দহনকে কেবল শব্দে নয়, অনুভবে চিত্রিত করেছেন।

উপন্যাসে কবির শিকড়হীনতার বেদনা এক বিশাল অনুষঙ্গ। দেশভাগ পরবর্তী সময়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে কলকাতায় আসার পর কবির যে মানসিক অস্থিরতা, তা তার ঘরোয়া জীবনেও বিষ ছড়াতো। লাবণ্যর সাথে তার সম্পর্কের যে উত্থান-পতন, তাতে প্রেম যেমন ছিল, তেমনি ছিল গভীর অপ্রেম ও মান-অভিমান। জিবরান বলেছিলেন, ‘ওক গাছ আর সাইপ্রাস একে অপরের ছায়ায় বেড়ে ওঠে না’। কিন্তু জীবনানন্দের ছায়ায় লাবণ্যর নিজস্ব সত্তা যেন ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছিল। লাবণ্যর চাওয়া-পাওয়াগুলো ছিল অতি সাধারণ— স্বাভাবিক দাম্পত্য প্রেম, আর্থিক সচ্ছলতা ও একটু সামাজিক সম্মান। কিন্তু কবির কাছে ছিল কেবল কবিতার পাণ্ডুলিপি আর ট্রামের শব্দের মতো কিছু কর্কশ বাস্তবতা। এই পার্থিব আর অপার্থিবের দ্বন্দ্বে লাবণ্যর ‘মুখ’ হয়ে উঠেছে এক বিষণ্ন দর্পণ।

মাসউদ আহমাদ লাবণ্যর চরিত্রটিকে কেবল একজন রাগী বা অভিযোগকারী স্ত্রী হিসেবে আঁকেননি। তিনি দেখিয়েছেন লাবণ্যর ভেতরের সেই অবদমিত আকাঙ্ক্ষাগুলোকে। লাবণ্য জানতেন তার স্বামী একজন মহৎ কবি, কিন্তু সেই মহত্ত্বের জন্য যে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছিল, তা বইবার ক্ষমতা এক সাধারণ নারীর ছিল না। সন্তানদের প্রতি কবির মমতা থাকলেও আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে সেই মমতা অনেক সময় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। আত্মীয়-পরিজনের বাঁকা কথা আর ‘অকর্মণ্য’ উপাধি কবির জীবনকে যেভাবে জর্জরিত করেছিল, তার ঢেউ আছড়ে পড়তো লাবণ্যর হৃদয়েও। লেখক অত্যন্ত মুনশিয়ানায় দেখিয়েছেন, কীভাবে একটি সুন্দর সম্পর্ক দারিদ্র্য আর অযত্নের পলিপড়ে ভরাট হয়ে যায়।

উপন্যাসের শেষ দিকে কবির রহস্যময় প্রস্থান বা ট্রাম দুর্ঘটনা পাঠককে নাড়া দেয় প্রবলভাবে। জীবনানন্দ কি স্বেচ্ছায় সেই অন্ধকারের পথে পা বাড়িয়েছিলেন? মাসউদ আহমাদ এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিলেও কবির যে মনস্তাত্ত্বিক বিচ্ছিন্নতা এঁকেছেন, তাতে এক ধরনের নিয়তিবাদের ছোঁয়া পাওয়া যায়। জিবরানের ‘কবি’ যেমন শেষে লরেল পাতার মুকুট পায়, জীবনানন্দও তেমনি মরণোত্তর জয়গান পেয়েছেন। কিন্তু তার জীবদ্দশায় যে মানুষটি (লাবণ্য) তার সাথে আগুনের পথ হেঁটেছেন, তার স্বীকৃতি কোথায়?

শেষে বলা যায়, ‘লাবণ্যর মুখ’ উপন্যাসটি জীবনানন্দ দাশের জীবনের এক কাব্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক পুনর্গঠন। মাসউদ আহমাদ ইতিহাস, কল্পনা এবং সাহিত্যের ব্যবচ্ছেদ করে এমন এক অনন্য আখ্যান তৈরি করেছেন, যেখানে জিবরানের দর্শন, কাফকার হাহাকার এবং মার্ক্সের বিচ্ছিন্নতাবোধ একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। গ্রন্থটি পাঠের পর পাঠক জীবনানন্দের নির্জন ব্যক্তিজীবনের রক্তক্ষরণ এবং লাবণ্যর মৌন আর্তনাদ দেখে ব্যথিত হবে। মাসউদ আহমাদের এই সৃষ্টি বাংলা জীবনীমূলক উপন্যাসের ধারায় এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন, যা পাঠককে দীর্ঘকাল আচ্ছন্ন করে রাখবে।

ঢাকায় পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ৫৮১, উদ্ধার স্বর্ণালংকার

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
ঢাকায় পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার ৫৮১, উদ্ধার স্বর্ণালংকার

রাজধানী ঢাকায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অভিযানে ২৪ ঘণ্টায় ৫৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময়ে বিভিন্ন অপরাধে ৪৮টি মামলা করা হয়েছে। অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য, মোবাইল ফোন, মোটরসাইকেল, চাকু, স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা উদ্ধার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি একজন ভুক্তভোগীকেও উদ্ধার করা হয়েছে।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় বিভিন্ন আলামত ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। ডিএমপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৪ ঘণ্টার অভিযানে সবচেয়ে বেশি গ্রেপ্তার করা হয়েছে মিরপুর বিভাগ থেকে। এ বিভাগে ১৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এ ছাড়া ওয়ারী বিভাগে ৯০ জন, মতিঝিল বিভাগে ৮৯ জন, তেজগাঁও বিভাগে ৬৮ জন, গুলশান বিভাগে ৪২ জন, উত্তরা বিভাগে ৩৯ জন, রমনা বিভাগে ১৯ জন এবং লালবাগ বিভাগে ৭১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গোয়েন্দা বিভাগ গ্রেপ্তার করেছে আরও চারজনকে।

সব মিলিয়ে ডিএমপির বিভিন্ন বিভাগ ও গোয়েন্দা পুলিশের অভিযানে ৫৮১ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। একই সময়ে ৪৮টি মামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। অভিযানকালে ৯ হাজার ৩৬০ পিস ইয়াবা, ৫০ কেজি ৪৫০ গ্রাম গাঁজা এবং ২০ বোতল ফেনসিডিল উদ্ধার করা হয়েছে। মাদকদ্রব্যের পাশাপাশি নয়টি মোবাইল ফোন, একটি মোটরসাইকেল ও একটি চাকু উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া ৬১ দশমিক ৮০ গ্রাম স্বর্ণালংকার এবং ৭ হাজার ৮০০ টাকা উদ্ধার করেছে পুলিশ। অভিযানে একজন ভুক্তভোগীকেও উদ্ধার করা হয়েছে বলে ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়।

উদ্ধার করা এসব আলামত সংশ্লিষ্ট মামলার তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ায় বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে কোন আলামত কোন মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। ডিএমপি জানিয়েছে, রাজধানীর বিভিন্ন থানা এলাকায় মঙ্গলবার অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার ও উদ্ধারের এসব ঘটনা ঘটে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।রাজধানীতে অপরাধ দমনে পুলিশের এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।

কালের আলো/এসকে/এমএসআইপি

শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক

পোশাক খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক,কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
পোশাক খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে চায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের জন্য জাপানের বিশ্বখ্যাত পোশাক প্রস্তুতকারক ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ করে ম্যান-মেড ফাইবার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং টেকসই পোশাক উৎপাদন খাতে আরও বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিং কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান, প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) তাদাশি ইয়ানাইয়ের নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতি ইউনিক্লোর আস্থা এবং ফাস্ট রিটেইলিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততার প্রশংসা করেন তারেক রহমান। একই সঙ্গে দেশের তৈরি পোশাক খাতে প্রচলিত বিনিয়োগের পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা ও পরিবেশবান্ধব শিল্পপ্রক্রিয়ায় সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

ম্যান-মেড ফাইবার ও টেকসই পোশাকে বিনিয়োগের আহ্বান
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি উচ্চমূল্য সংযোজিত ও প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক উৎপাদনের সুযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয় বৈঠকে। প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে ম্যান-মেড ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তু, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল এবং টেকসই পোশাক উৎপাদন খাতে ইউনিক্লোর বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তৈরি পোশাক খাতে পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্প খাত আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বৈঠকে প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, পণ্যে উদ্ভাবন, উন্নত উৎপাদনব্যবস্থা এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় দুই পক্ষের পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।

বিনিয়োগে সহযোগিতার আশ্বাস সরকারের
বাংলাদেশে ইউনিক্লোর কার্যক্রম সম্প্রসারণে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জমির ব্যবস্থা, বিনিয়োগ অনুমোদন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করা শিল্প খাতের সম্প্রসারণে সহায়ক হতে পারে। ইউনিক্লোর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ বাড়লে তৈরি পোশাকশিল্পে প্রযুক্তি, উৎপাদনব্যবস্থা ও পণ্যের মান উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বৈঠকে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়ে আহ্বান ও সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হলেও নতুন বিনিয়োগের নির্দিষ্ট পরিমাণ, প্রকল্পের সময়সীমা কিংবা বাস্তবায়ন পরিকল্পনার বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিতে গুরুত্ব
বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নের গুরুত্বও পুনর্ব্যক্ত করেন উভয় পক্ষ। চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার হলে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসায়িক সম্পর্ক সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা উন্নয়নে দুই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর পথও সুগম হতে পারে।

বৈঠকে দুই দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবীর, ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী শাকিরুল ইসলাম খান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জাপানের প্রতিনিধিদলে ফাস্ট রিটেইলিং কোম্পানি লিমিটেডের পরিচালক তাকেশি ওকাজাকি এবং প্রতিষ্ঠানটির গ্রুপ সিনিয়র এক্সিকিউটিভ অফিসার ইয়োশিহিরো কুনিই অংশ নেন। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান, প্রেসিডেন্ট ও সিইও তাদাশি ইয়ানাই। বাংলাদেশে ইউনিক্লোর বিনিয়োগ সম্প্রসারণের আহ্বান এবং সরকারের সহযোগিতার আশ্বাসের মধ্য দিয়ে দুই পক্ষের ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও জোরদার করার বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেয়েছে।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি

১৮৪ কোটির প্রশ্ন: বাঁচবে কি তুরাগ?

নিজস্ব প্রতিবেদক, কালের আলো
প্রকাশিত: বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
১৮৪ কোটির প্রশ্ন: বাঁচবে কি তুরাগ?

নদ কালো, পানি দুর্গন্ধময়; শিল্পবর্জ্যে বিপর্যস্ত তুরাগের প্রাণপ্রকৃতি। দূষণ ঠেকাতে এবার প্রায় ১৮৪ কোটি টাকার প্রকল্প নিতে যাচ্ছে সরকার। ১৭৩টি কারখানার বর্জ্য শোধনাগার তদারকি, নদীর পানির মান তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ, ড্রোনে নজরদারি এবং অন্তত ১০০টি অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে এতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত আয়োজনের পরও কি থামবে নদে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলা? নাকি আগের অনেক প্রকল্পের মতো বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও অধরাই থেকে যাবে দৃশ্যমান সুফল?

  • ১৭৩ কারখানার ইটিপি পরীক্ষা, ড্রোনে নজরদারি ও ১০০ অভিযানের পরিকল্পনা
  • তুরাগের দূষণ ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ, বাস্তবায়নেই নির্ধারিত হবে তুরাগের ভবিষ্যৎ

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম: তুরাগ নদের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় সমন্বিত দূষণ পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োগ ব্যবস্থা’ শীর্ষক প্রকল্পটি একনেকের আসন্ন সভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয় ১৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পঋণ থেকে ১৭৩ কোটি ৬০ লাখ এবং সরকারি তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।

ইটিপি আছে, তবু নদে বিষ!
গাজীপুর, টঙ্গী ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে বহু ডাইং ও ওয়াশিং কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি থাকলেও সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। খরচ বাঁচাতে কিছু কারখানা রাতে কিংবা গোপনে শোধনাগার বন্ধ রেখে অপরিশোধিত বর্জ্য নদে ফেলছে বলে অভিযোগ। ফলে তুরাগের পানি কালচে হয়ে পড়ছে, ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে জলজ পরিবেশ।

এই বাস্তবতায় নতুন প্রকল্পের লক্ষ্য শুধু দূষণ শনাক্ত করা নয়, দূষণকারীদের চিহ্নিত করে আইন প্রয়োগের আওতায় আনা। নদীর দূষণপ্রবণ এলাকাগুলোর মানচিত্র তৈরি, ১৭৩টি কারখানার ইটিপির কার্যকারিতা যাচাই এবং পানির মান অনলাইনে তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। নদপাড়ে বর্জ্য ফেলার ঘটনা শনাক্তে ব্যবহার করা হবে ড্রোন; নৌযানে টহল এবং নদীর তলদেশ পরিষ্কারের উদ্যোগও রয়েছে।

পরিকল্পনায় আরও আছে, অন্তত ১০০টি অভিযান, নিয়মিত পরিদর্শন, নোটিশ প্রদান এবং আইন ভঙ্গকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে জরিমানা। প্রকল্পের মেয়াদে অন্তত ৩৬ দফা পানির নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের কথাও রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে একটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তরের ওপর—দূষণ ধরা পড়ার পর দায়ী কারখানার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা দ্রুত ও ধারাবাহিকভাবে নেওয়া হবে?

প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন বাপার
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির নতুন প্রকল্পটির সম্ভাব্য সুফল নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দেশে এর আগেও পরিবেশ রক্ষায় বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে; কিন্তু সেসব উদ্যোগের সুফল জনগণ ও প্রকৃতি কতটা পেয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তরের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও পরিবেশদূষণের সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হয়নি। তাঁর অভিযোগ, ট্যানারি এলাকার আশপাশে ধলেশ্বরী নদীর দূষণ ও ভূগর্ভস্থ পানির মান নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।

আলমগীর কবিরের প্রশ্ন, তুরাগের ১৭৩টি কারখানার দূষণ নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রকল্প নেওয়া হলেও দূষণকারী মালিকদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে কি না, ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে কি না এবং সরকারি অর্থ ব্যয়ের দৃশ্যমান ফল জনগণের সামনে তুলে ধরা হবে কি না। তাঁর মতে, শুধু প্রকল্প গ্রহণ ও অর্থ ব্যয় নয়, দূষণের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।

নজরদারির পর কী হবে?
প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে মাঠপর্যায়ে। ড্রোনে বর্জ্য ফেলার দৃশ্য ধরা পড়ল, অনলাইন পর্যবেক্ষণে পানির মান খারাপ পাওয়া গেল কিংবা কোনো কারখানার ইটিপি বন্ধ শনাক্ত হলো—এরপর কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটিই নির্ধারণ করবে উদ্যোগটির বাস্তব কার্যকারিতা।

কোন কারখানায় কতবার অনিয়ম ধরা পড়েছে, কতটি নোটিশ দেওয়া হয়েছে, কত টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঠেকানো গেছে কি না—এসব তথ্য প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ের হিসাবের পাশাপাশি নদীর পানির মানে পরিবর্তনের তথ্যও জনসমক্ষে আনতে হবে।

কারণ ইটিপি স্থাপন আর সেটি নিয়মিত চালানো এক বিষয় নয়; অভিযান পরিচালনা আর দূষণ বন্ধ করা আরেক বিষয়। নজরদারি ও শাস্তির মধ্যে কার্যকর সংযোগ তৈরি না হলে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

সাফল্যের হিসাব দেবে তুরাগের পানি
তুরাগ একসময় কৃষি, মাছ ধরা ও গৃহস্থালির কাজে গুরুত্বপূর্ণ মিঠাপানির উৎস ছিল। দ্রুত নগরায়ণ ও শিল্পায়নের চাপে নদটির পরিবেশগত ভারসাম্য আজ হুমকির মুখে। এ পরিস্থিতিতে দূষণ নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা থাকলেও প্রকল্পের সাফল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তিতে। ১৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার এই উদ্যোগে কতটি যন্ত্র বসানো হলো, কতটি অভিযান চালানো হলো কিংবা কত টাকা খরচ হলো—এসবের বাইরেও দেখতে হবে, নদে দূষণ কতটা কমল, পানির গুণগত মান কতটা ফিরল এবং জলজ পরিবেশের উন্নতি হলো কি না।

তুরাগের ভবিষ্যৎ তাই শুধু একটি প্রকল্পের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে না; নির্ভর করছে দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ, সরকারি দপ্তরের স্বচ্ছতা এবং ব্যয়ের বিপরীতে পরিমাপযোগ্য ফল নিশ্চিত করার ওপর। শেষ পর্যন্ত এই প্রকল্পের সাফল্যের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হবে একটাই—তুরাগের পানিতে দূষণ কমছে কি না।

কালের আলো/টিইকে/এমকে