‘কেমন আছো?’, ‘কে রে?’ কিংবা ‘ভাত খাইছ?’—পরিচিত মানুষের মুখে শোনা এমন কথা হুবহু নকল করতে পারে ময়না। কখনো তার কণ্ঠস্বর এতটাই মানুষের মতো শোনায় যে মনে হয়, পাখিটি বুঝি সত্যিই মানুষের ভাষা বুঝতে পারে। কিন্তু কীভাবে সম্ভব এই বিস্ময়? মানুষের মতো স্বর তৈরি করতে ময়নার শরীরে রয়েছে বিশেষ শব্দযন্ত্র, আর মস্তিষ্কে রয়েছে শোনা শব্দ শেখা ও অনুকরণ করার ক্ষমতা।
ময়নার মানুষের মতো কথা বলার রহস্য লুকিয়ে আছে মূলত তিনটি বিষয়ে—বিশেষ শব্দ তৈরির অঙ্গ, শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থা এবং শব্দ শেখার ক্ষমতা। এই তিনের সমন্বয়েই মানুষের কণ্ঠস্বরের কাছাকাছি শব্দ তৈরি করতে পারে পাখিটি।
মানুষের স্বরযন্ত্র নয়, ময়নার আছে সিরিংক্স
মানুষের কথা বলার সময় ফুসফুস থেকে বের হওয়া বাতাস স্বরযন্ত্রের স্বরতন্ত্রীকে কাঁপিয়ে শব্দ তৈরি করে। এরপর মুখ, জিহ্বা ও ঠোঁটের নড়াচড়ায় সেই শব্দ বিভিন্ন বর্ণ ও কথায় রূপ নেয়।
পাখির ক্ষেত্রেও শব্দ তৈরির জন্য বিশেষ অঙ্গ রয়েছে। এর নাম সিরিংক্স (Syrinx)। এটি শ্বাসনালির নিচের দিকে, যেখানে শ্বাসনালি দুই ভাগ হয়ে ফুসফুসের দিকে গেছে, সেখানে অবস্থিত। সিরিংক্সের সূক্ষ্ম পর্দা ও পেশির সাহায্যে পাখি বিভিন্ন ধরনের শব্দ তৈরি করতে পারে।
কিছু পাখির সিরিংক্সের দুই পাশ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। ফলে তারা জটিল সুর ও একাধিক শব্দের সমন্বয় তৈরি করতে সক্ষম হয়। মানুষের মতো শব্দ হুবহু নকল করার ক্ষেত্রে এই বিশেষ শব্দযন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কীভাবে মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করে?
শুধু সিরিংক্স থাকলেই মানুষের কথা নকল করা সম্ভব নয়। শব্দকে মানুষের কথার কাছাকাছি নিয়ে আসতে মুখগহ্বর, জিহ্বা ও ঠোঁটের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। এসবের পরিবর্তনে শব্দের বৈশিষ্ট্য বদলে যায়। ফলে ময়নার তৈরি শব্দ মানুষের উচ্চারিত শব্দের মতো শোনাতে পারে।
পাখির শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যবস্থাও এতে সহায়তা করে। ফুসফুসের সঙ্গে যুক্ত বায়ুথলি শ্বাসপ্রশ্বাসের প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে এবং শব্দ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বায়ুপ্রবাহ বজায় রাখতে সাহায্য করে। এর ফলে ময়না একাধিক শব্দ বা বাক্যের মতো শোনায় এমন ধ্বনি তৈরি করতে পারে।
তবে মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করার ক্ষমতা সব পাখির সমান নয়। ময়না বিশেষভাবে পরিচিত তার স্পষ্ট ও বৈচিত্র্যময় শব্দ অনুকরণের জন্য।
শুনে শুনেই শেখে নতুন শব্দ
ময়নার কথা বলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো তার ভোকাল লার্নিং বা শব্দ শুনে শেখার ক্ষমতা। সব প্রাণী অন্যের শব্দ শুনে তা অনুশীলনের মাধ্যমে অনুকরণ করতে পারে না। ময়নার মতো কিছু পাখি আশপাশের শব্দ শুনে সেগুলো মনে রাখতে এবং নিজের কণ্ঠে পুনরায় তৈরি করতে পারে।
একটি ময়না বারবার মানুষের কথা শুনলে সেই শব্দের ধরন আয়ত্ত করার চেষ্টা করতে পারে। অনুশীলনের মাধ্যমে তার উচ্চারণ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। মানুষের সঙ্গে দীর্ঘ সময় বসবাস করলে বাড়ির সদস্যদের মুখে শোনা শব্দ বা বাক্যও তার অনুকরণের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সামাজিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। বন্য পরিবেশে ময়না অন্য পাখির সঙ্গে যোগাযোগ করে। মানুষের সংস্পর্শে থাকলে তার শোনার অভিজ্ঞতায় মানুষের কণ্ঠস্বরও যুক্ত হয়। তবে প্রতিটি ময়না সমান দক্ষতায় কথা নকল করতে পারে না; ব্যক্তিভেদে এই ক্ষমতার পার্থক্য রয়েছে।
মানুষের কথা বললেও কি অর্থ বোঝে ময়না?
ময়না যখন মানুষের মতো করে কোনো বাক্য বলে, তখন মনে হতে পারে সে বাক্যটির অর্থও বুঝতে পারছে। কিন্তু শব্দ নকল করা আর মানুষের মতো ভাষা বোঝা এক বিষয় নয়।
কোনো নির্দিষ্ট শব্দের সঙ্গে বিশেষ পরিস্থিতির সম্পর্ক ময়না শিখতে পারে। যেমন, কোনো পরিস্থিতিতে বারবার একই শব্দ শুনলে পরে সে সেই শব্দটি পুনরাবৃত্তি করতে পারে। তবে মানুষের ভাষার ব্যাকরণ, বিমূর্ত ধারণা ও বাক্যের পূর্ণ অর্থ বোঝার ক্ষমতা রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত শুধু কথা নকল করার ভিত্তিতে দেওয়া যায় না।
অর্থাৎ ময়নার অসাধারণ দক্ষতা হলো মানুষের কণ্ঠস্বরের অনুকরণ। তার এই ক্ষমতা পাখির শব্দ শেখার প্রক্রিয়া ও মস্তিষ্কের কার্যক্রম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়।
ময়নার বিস্ময়কর ক্ষমতা যেন বন্দিত্বের কারণ না হয়
মানুষের কথা নকল করতে পারে বলে ময়না দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রে রয়েছে। কিন্তু এই আকর্ষণ কখনো বন্য পাখিকে খাঁচায় বন্দী করার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ ময়না সামাজিক পাখি; বন্য পরিবেশে চলাফেরা, খাবার সংগ্রহ, অন্য পাখির সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিরাপদ আশ্রয় তার স্বাভাবিক জীবনের অংশ।
বন্য পাখি ধরে পোষ মানানোর পরিবর্তে তাদের প্রাকৃতিক পরিবেশে নিরাপদে থাকতে দেওয়াই দায়িত্বশীল আচরণ। বাংলাদেশে বন্য প্রাণী সংরক্ষণসংক্রান্ত আইন ও বিধিনিষেধ মেনে চলাও জরুরি।
একটি ছোট্ট পাখির মানুষের মতো শব্দ তৈরির পেছনে রয়েছে জটিল শারীরিক গঠন ও শেখার অসাধারণ ক্ষমতা। সিরিংক্স শব্দ তৈরি করে, মুখগহ্বর সেই শব্দকে বদলে দেয়, আর মস্তিষ্ক শোনা শব্দ অনুকরণ করতে সাহায্য করে। এই সমন্বয়ই ময়নাকে করে তুলেছে পাখিজগতের অন্যতম বিস্ময়কর শব্দ-অনুকরণকারী। তথ্যসূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট
কালের আলো/এসএ/জেএন
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]