স্লিপার বাসের বৈধতা নিয়ে ধোঁয়াশা
সড়কে ছুটছে শত শত স্লিপার বাস। যাত্রী শুয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে পারছেন, ব্যবসায়ীরা দেখছেন নতুন বাজার। কিন্তু যে বাসকে ঘিরে এত আয়োজন, তার আইনগত পরিচয়ই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বাস মালিকদের দাবি, তারা বিআরটিএর নিবন্ধন, ফিটনেস ও রুট পারমিট নিয়েই ব্যবসা করছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অবস্থান—‘স্লিপার বাস’ নামে কোনো যানকে তারা অনুমোদন বা নিবন্ধন দেয়নি। বরং সাধারণ বাসের কাঠামো পরিবর্তন করে স্লিপার বানানোর অভিযোগে বেশ কিছু বাসের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে।
গত বুধবার (০৯ সেপ্টেম্বর) এক রিটের শুনানি শেষে হাই কোর্ট বলেছে, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন ও ২০২২ সালের সড়ক পরিবহন বিধিমালা মেনে বিআরটিএর অনুমোদন পাওয়া বাসই কেবল রাস্তায় চলতে পারবে। অনুমোদনহীন বা আইনবহির্ভূত বাসের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেও বাধা নেই। আদালতের এই অবস্থানের পর স্লিপার বাস নিয়ে মূল আলোচনাটি এখন আরও স্পষ্ট—চলমান বাসগুলোর কাগজপত্রের বৈধতা কী এবং সেই কাগজে অনুমোদিত কাঠামোর সঙ্গে বাস্তব বাসের মিল কতটা?
বিরোধটা আসলে কোথায়?
বিআরটিএর ১৯ আগস্ট হাই কোর্টে দেওয়া প্রতিবেদনের তথ্য এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংস্থাটির তিন সদস্যের কমিটি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন বা নিবন্ধন দেওয়া হয়নি। বিআরটিএর ডাটাবেজে থাকা ৮২৯টি ডাবল-ডেকার বাস সাধারণ ডাবল-ডেকার, স্লিপার নয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কিছু মালিক সিঙ্গেল-ডেকার বাস হিসেবে নিবন্ধন নেওয়ার পর পরে বডির ধরন পরিবর্তন করে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস বানিয়ে রাস্তায় চালাচ্ছেন। এমন ৪১টি রূপান্তরিত বাসের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে। এসব গাড়ির ফিটনেস নবায়ন করা হচ্ছে না এবং রুট পারমিটও দেওয়া হচ্ছে না। অর্থাৎ একটি বাসের মূল নিবন্ধন বৈধ থাকা আর সেটিকে কাঠামো পরিবর্তন করে ‘স্লিপার বাস’ হিসেবে পরিচালনার অনুমোদন থাকা—দুটি ভিন্ন বিষয়। বিআরটিএর আইনজীবী রাফিউল ইসলামের বক্তব্য, সিঙ্গেল-ডেকার বাসের অনুমোদন নিয়েও সেটিকে পরিবর্তন করে স্লিপার হিসেবে পরিচালনা করা আইনসম্মত নয়। বাসটি একতলা কিংবা দোতলা—যাই হোক, ‘স্লিপার’ নামে পরিচালনার সুযোগ প্রচলিত আইনে নেই।
মালিকদের দাবি: বিআরটিএর কাগজ নিয়েই তো চলছি
বিআরটিএর অবস্থানের সঙ্গে একমত নন বাস মালিকেরা। বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবুর দাবি, যেসব বাসের নিবন্ধন, ফিটনেস ও রুট পারমিট রয়েছে, সেগুলো বৈধভাবেই চলছে। তার প্রশ্ন, ‘যেগুলোর রুট পারমিট আছে, বিআরটিএ ফিটনেস দিয়েছে সেগুলো কেন বন্ধ হবে?’ মালিকদের দাবি, তারা ইচ্ছেমতো কোনো গাড়ি রাস্তায় নামাননি। বিআরটিএর প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই গাড়ি নিবন্ধন করা হয়েছে, ফিটনেস নেওয়া হয়েছে এবং রুট পারমিটের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন শুরু হয়েছে।
‘৪৬ এক্সপ্রেস’-এর কর্ণধার আনিসুর রহমান শিল্পীর ভাষ্য, তাদের গাড়ির উচ্চতা সাধারণ বাসের মতো। বিআরটিএ থেকেই নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে। ফলে আদালতের আদেশ অনুযায়ী অনুমোদিত গাড়ি চলতে বাধা থাকার কথা নয়। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন—বিআরটিএর দেওয়া কাগজে বাসটি কী হিসেবে নিবন্ধিত? সেটির বডি বা অভ্যন্তরীণ কাঠামো পরিবর্তনের অনুমোদন ছিল কি না? আর ‘স্লিপার’ হিসেবে যাত্রী পরিবহনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল কি না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে মালিকদের ‘বৈধ’ দাবিটি কতটা টেকসই।
কাগজের বৈধতা বনাম কাঠামোর বৈধতা
সরেজমিনে চলাচলকারী বেশ কিছু স্লিপার বাসের ক্ষেত্রে দেখা যায়, একতলা বাসের অনুমোদন নিয়ে পরে তার ভেতরে ওপর-নিচ করে শোয়ার বার্থ তৈরি করা হয়েছে। কিছু বাসের কাঠামো আবার ডাবল-ডেকারের আদলে পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে মূল নিবন্ধনের কাগজ থাকলেও পরবর্তী পরিবর্তনের জন্য আলাদা অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিআরটিএ বলছে, এই ধরনের পরিবর্তন অনুমোদন ছাড়া করা হয়েছে। মালিকেরা বলছেন, তাদের নিবন্ধন ও অন্যান্য কাগজপত্র রয়েছে। এই দুই বক্তব্যের মাঝেই তৈরি হয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক প্রশ্ন—যার সমাধান এখন প্রয়োজন স্পষ্ট নথি ও নির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে।
হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ
স্লিপার বাসের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা তাই শুধু আইনি নয়, বড় অর্থনৈতিক প্রশ্নও তৈরি করেছে। মালিক সমিতির হিসাবে মহাসড়কে এখন ৮০০ থেকে ৮৫০টি স্লিপার বাস চলছে। একটি বাসের বডি তৈরিতে প্রায় ৪০ লাখ এবং চেসিসে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা খরচ হয়। ঋণ, কিস্তি, কাউন্টার, গ্যারেজ ও কর্মীসহ পুরো খাতে বিনিয়োগ দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বলে দাবি মালিকদের। অনেক মালিক ঋণ নিয়ে গাড়ি নামিয়েছেন। কেউ কেউ পারিবারিক সঞ্চয়ও বিনিয়োগ করেছেন। ফলে বাস বন্ধ হলে ঋণ পরিশোধ ও কর্মসংস্থান—দুই দিকেই সংকট তৈরি হতে পারে। এই কারণেই মালিকেরা নিষেধাজ্ঞার বদলে একটি নীতিমালা চান। তাদের দাবি, জরুরি বহির্গমনসহ যেসব নিরাপত্তা ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো সংশোধনের সুযোগ দিয়ে নির্দিষ্ট মানদণ্ডে স্লিপার বাস চালানোর অনুমতি দেওয়া হোক।
আরামের সঙ্গে নিরাপত্তা
স্লিপার বাসের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ কম খরচে শুয়ে দীর্ঘপথ যাওয়ার সুবিধা। নিয়মিত ঠাকুরগাঁও যাওয়া যাত্রী আহসান হাবিবের মতে, বাস ধীরগতিতে চললে এটি আরামদায়ক। কিন্তু অতিরিক্ত গতিতে চালালে সেই আরামই আতঙ্কে পরিণত হয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার পথে স্লিপার বাস দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন সাংবাদিক আতাউর রহমান। তার বর্ণনা অনুযায়ী, কুয়াকাটার কাছে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে পুকুরে পড়ে যায়। স্থানীয় একটি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকেরা কাঁচ ভেঙে যাত্রীদের উদ্ধার করেন। ঘটনাটি স্লিপার বাসের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আরও সামনে এনেছে। যাত্রী শুয়ে থাকায় আকস্মিক ব্রেক বা সংঘর্ষে আঘাতের ঝুঁকি কতটা? বাস উল্টে গেলে জরুরি বহির্গমন কতটা কার্যকর? আগুন লাগলে যাত্রীরা কত দ্রুত বের হতে পারবেন? বিআরটিএর কমিটিও এসব নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় উন্নত দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে জাতীয় নীতিমালা বা গাইডলাইন তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
এখন প্রয়োজন স্পষ্ট নীতিমালা
স্লিপার বাসের সংকট তাই শুধু মালিক বনাম বিআরটিএর বিরোধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিয়ন্ত্রক কাঠামো, বিনিয়োগ এবং যাত্রীনিরাপত্তা। যদি স্লিপার বাসের অনুমোদন না থাকে, তাহলে চলমান বাসগুলোর নিবন্ধন ও ফিটনেসের সময় তাদের কাঠামো কী হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল—তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। আবার মালিকেরা যদি বিআরটিএর কাগজপত্রের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করে থাকেন, সেই কাগজে ঠিক কী অনুমোদন ছিল, সেটিও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। হাই কোর্টের আদেশের আলোকে এখন মূল দায়িত্ব হলো বৈধ ও অবৈধ যান আলাদা করা এবং যাত্রীনিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সরকার চাইলে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্লিপার বাসের জন্য আলাদা কারিগরি ও নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। সেই মানদণ্ডে চলমান বাসগুলো পরীক্ষা করে যেগুলো নিরাপদ ও নিয়মসম্মত, সেগুলোকে কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ যানগুলোকে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কারণ স্লিপার বাস এখন আর নিছক একটি নতুন পরিবহনসেবা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৮০০ থেকে ৮৫০টি বাস, দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ, বিপুল কর্মসংস্থান এবং প্রতিদিনের হাজারো যাত্রীর যাতায়াত।
কালের আলো/এম/এএইচ

আপনার মতামত লিখুন
Array