খুঁজুন
                               
, ,
           

স্লিপার বাসের বৈধতা নিয়ে ধোঁয়াশা

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২১ পূর্বাহ্ণ
স্লিপার বাসের বৈধতা নিয়ে ধোঁয়াশা

সড়কে ছুটছে শত শত স্লিপার বাস। যাত্রী শুয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে পারছেন, ব্যবসায়ীরা দেখছেন নতুন বাজার। কিন্তু যে বাসকে ঘিরে এত আয়োজন, তার আইনগত পরিচয়ই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। বাস মালিকদের দাবি, তারা বিআরটিএর নিবন্ধন, ফিটনেস ও রুট পারমিট নিয়েই ব্যবসা করছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অবস্থান—‘স্লিপার বাস’ নামে কোনো যানকে তারা অনুমোদন বা নিবন্ধন দেয়নি। বরং সাধারণ বাসের কাঠামো পরিবর্তন করে স্লিপার বানানোর অভিযোগে বেশ কিছু বাসের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে।

গত বুধবার (০৯ সেপ্টেম্বর) এক রিটের শুনানি শেষে হাই কোর্ট বলেছে, ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন ও ২০২২ সালের সড়ক পরিবহন বিধিমালা মেনে বিআরটিএর অনুমোদন পাওয়া বাসই কেবল রাস্তায় চলতে পারবে। অনুমোদনহীন বা আইনবহির্ভূত বাসের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেও বাধা নেই। আদালতের এই অবস্থানের পর স্লিপার বাস নিয়ে মূল আলোচনাটি এখন আরও স্পষ্ট—চলমান বাসগুলোর কাগজপত্রের বৈধতা কী এবং সেই কাগজে অনুমোদিত কাঠামোর সঙ্গে বাস্তব বাসের মিল কতটা?

বিরোধটা আসলে কোথায়?
বিআরটিএর ১৯ আগস্ট হাই কোর্টে দেওয়া প্রতিবেদনের তথ্য এই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংস্থাটির তিন সদস্যের কমিটি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো ডাবল-ডেকার স্লিপার বাসের অনুমোদন বা নিবন্ধন দেওয়া হয়নি। বিআরটিএর ডাটাবেজে থাকা ৮২৯টি ডাবল-ডেকার বাস সাধারণ ডাবল-ডেকার, স্লিপার নয়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কিছু মালিক সিঙ্গেল-ডেকার বাস হিসেবে নিবন্ধন নেওয়ার পর পরে বডির ধরন পরিবর্তন করে ডাবল-ডেকার স্লিপার বাস বানিয়ে রাস্তায় চালাচ্ছেন। এমন ৪১টি রূপান্তরিত বাসের নিবন্ধন স্থগিত করা হয়েছে। এসব গাড়ির ফিটনেস নবায়ন করা হচ্ছে না এবং রুট পারমিটও দেওয়া হচ্ছে না। অর্থাৎ একটি বাসের মূল নিবন্ধন বৈধ থাকা আর সেটিকে কাঠামো পরিবর্তন করে ‘স্লিপার বাস’ হিসেবে পরিচালনার অনুমোদন থাকা—দুটি ভিন্ন বিষয়। বিআরটিএর আইনজীবী রাফিউল ইসলামের বক্তব্য, সিঙ্গেল-ডেকার বাসের অনুমোদন নিয়েও সেটিকে পরিবর্তন করে স্লিপার হিসেবে পরিচালনা করা আইনসম্মত নয়। বাসটি একতলা কিংবা দোতলা—যাই হোক, ‘স্লিপার’ নামে পরিচালনার সুযোগ প্রচলিত আইনে নেই।

মালিকদের দাবি: বিআরটিএর কাগজ নিয়েই তো চলছি
বিআরটিএর অবস্থানের সঙ্গে একমত নন বাস মালিকেরা। বাংলাদেশ স্লিপার এসি বাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বাবুর দাবি, যেসব বাসের নিবন্ধন, ফিটনেস ও রুট পারমিট রয়েছে, সেগুলো বৈধভাবেই চলছে। তার প্রশ্ন, ‘যেগুলোর রুট পারমিট আছে, বিআরটিএ ফিটনেস দিয়েছে সেগুলো কেন বন্ধ হবে?’ মালিকদের দাবি, তারা ইচ্ছেমতো কোনো গাড়ি রাস্তায় নামাননি। বিআরটিএর প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই গাড়ি নিবন্ধন করা হয়েছে, ফিটনেস নেওয়া হয়েছে এবং রুট পারমিটের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন শুরু হয়েছে।

‘৪৬ এক্সপ্রেস’-এর কর্ণধার আনিসুর রহমান শিল্পীর ভাষ্য, তাদের গাড়ির উচ্চতা সাধারণ বাসের মতো। বিআরটিএ থেকেই নিবন্ধন নেওয়া হয়েছে। ফলে আদালতের আদেশ অনুযায়ী অনুমোদিত গাড়ি চলতে বাধা থাকার কথা নয়। কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন—বিআরটিএর দেওয়া কাগজে বাসটি কী হিসেবে নিবন্ধিত? সেটির বডি বা অভ্যন্তরীণ কাঠামো পরিবর্তনের অনুমোদন ছিল কি না? আর ‘স্লিপার’ হিসেবে যাত্রী পরিবহনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল কি না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই নির্ধারণ করবে মালিকদের ‘বৈধ’ দাবিটি কতটা টেকসই।

কাগজের বৈধতা বনাম কাঠামোর বৈধতা
সরেজমিনে চলাচলকারী বেশ কিছু স্লিপার বাসের ক্ষেত্রে দেখা যায়, একতলা বাসের অনুমোদন নিয়ে পরে তার ভেতরে ওপর-নিচ করে শোয়ার বার্থ তৈরি করা হয়েছে। কিছু বাসের কাঠামো আবার ডাবল-ডেকারের আদলে পরিবর্তন করা হয়েছে। ফলে মূল নিবন্ধনের কাগজ থাকলেও পরবর্তী পরিবর্তনের জন্য আলাদা অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিআরটিএ বলছে, এই ধরনের পরিবর্তন অনুমোদন ছাড়া করা হয়েছে। মালিকেরা বলছেন, তাদের নিবন্ধন ও অন্যান্য কাগজপত্র রয়েছে। এই দুই বক্তব্যের মাঝেই তৈরি হয়েছে আইনি ও প্রশাসনিক প্রশ্ন—যার সমাধান এখন প্রয়োজন স্পষ্ট নথি ও নির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে।

হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ
স্লিপার বাসের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা তাই শুধু আইনি নয়, বড় অর্থনৈতিক প্রশ্নও তৈরি করেছে। মালিক সমিতির হিসাবে মহাসড়কে এখন ৮০০ থেকে ৮৫০টি স্লিপার বাস চলছে। একটি বাসের বডি তৈরিতে প্রায় ৪০ লাখ এবং চেসিসে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা খরচ হয়। ঋণ, কিস্তি, কাউন্টার, গ্যারেজ ও কর্মীসহ পুরো খাতে বিনিয়োগ দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বলে দাবি মালিকদের। অনেক মালিক ঋণ নিয়ে গাড়ি নামিয়েছেন। কেউ কেউ পারিবারিক সঞ্চয়ও বিনিয়োগ করেছেন। ফলে বাস বন্ধ হলে ঋণ পরিশোধ ও কর্মসংস্থান—দুই দিকেই সংকট তৈরি হতে পারে। এই কারণেই মালিকেরা নিষেধাজ্ঞার বদলে একটি নীতিমালা চান। তাদের দাবি, জরুরি বহির্গমনসহ যেসব নিরাপত্তা ঘাটতি রয়েছে, সেগুলো সংশোধনের সুযোগ দিয়ে নির্দিষ্ট মানদণ্ডে স্লিপার বাস চালানোর অনুমতি দেওয়া হোক।

আরামের সঙ্গে নিরাপত্তা
স্লিপার বাসের জনপ্রিয়তার প্রধান কারণ কম খরচে শুয়ে দীর্ঘপথ যাওয়ার সুবিধা। নিয়মিত ঠাকুরগাঁও যাওয়া যাত্রী আহসান হাবিবের মতে, বাস ধীরগতিতে চললে এটি আরামদায়ক। কিন্তু অতিরিক্ত গতিতে চালালে সেই আরামই আতঙ্কে পরিণত হয়। গত ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে কুয়াকাটা যাওয়ার পথে স্লিপার বাস দুর্ঘটনায় পড়েছিলেন সাংবাদিক আতাউর রহমান। তার বর্ণনা অনুযায়ী, কুয়াকাটার কাছে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে পুকুরে পড়ে যায়। স্থানীয় একটি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকেরা কাঁচ ভেঙে যাত্রীদের উদ্ধার করেন। ঘটনাটি স্লিপার বাসের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন আরও সামনে এনেছে। যাত্রী শুয়ে থাকায় আকস্মিক ব্রেক বা সংঘর্ষে আঘাতের ঝুঁকি কতটা? বাস উল্টে গেলে জরুরি বহির্গমন কতটা কার্যকর? আগুন লাগলে যাত্রীরা কত দ্রুত বের হতে পারবেন? বিআরটিএর কমিটিও এসব নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় উন্নত দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে জাতীয় নীতিমালা বা গাইডলাইন তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।

এখন প্রয়োজন স্পষ্ট নীতিমালা
স্লিপার বাসের সংকট তাই শুধু মালিক বনাম বিআরটিএর বিরোধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিয়ন্ত্রক কাঠামো, বিনিয়োগ এবং যাত্রীনিরাপত্তা। যদি স্লিপার বাসের অনুমোদন না থাকে, তাহলে চলমান বাসগুলোর নিবন্ধন ও ফিটনেসের সময় তাদের কাঠামো কী হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছিল—তা স্পষ্ট হওয়া দরকার। আবার মালিকেরা যদি বিআরটিএর কাগজপত্রের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করে থাকেন, সেই কাগজে ঠিক কী অনুমোদন ছিল, সেটিও প্রকাশ্যে আসা প্রয়োজন। হাই কোর্টের আদেশের আলোকে এখন মূল দায়িত্ব হলো বৈধ ও অবৈধ যান আলাদা করা এবং যাত্রীনিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সরকার চাইলে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্লিপার বাসের জন্য আলাদা কারিগরি ও নিরাপত্তা মানদণ্ড তৈরি করতে পারে। সেই মানদণ্ডে চলমান বাসগুলো পরীক্ষা করে যেগুলো নিরাপদ ও নিয়মসম্মত, সেগুলোকে কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ যানগুলোকে প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। কারণ স্লিপার বাস এখন আর নিছক একটি নতুন পরিবহনসেবা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৮০০ থেকে ৮৫০টি বাস, দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ, বিপুল কর্মসংস্থান এবং প্রতিদিনের হাজারো যাত্রীর যাতায়াত।

কালের আলো/এম/এএইচ

ইরানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে আলোচনা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:০০ অপরাহ্ণ
ইরানের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত ড. জলিল রহিমি জাহানাবাদি রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বঙ্গভবনে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতি বলেন, গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ ও ইরানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ককে বাংলাদেশ অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়।

তিনি বলেন, ফেরদৌসি, শেখ সাদি, হাফিজ ও জালাল উদ্দিন রুমির মতো প্রখ্যাত পারস্য কবি ও মনীষীদের সৃজনশীল কর্ম ও সাহিত্য এ অঞ্চলের মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। এ সময় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা ও গানে ইরানের মানুষের প্রতি মমত্ববোধের কথাও উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এ সংঘাতের কারণে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো ব্যাপক জ্বালানি সংকটে পড়েছে। তিনি সংলাপ, সমঝোতা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ইরানে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি ইরানের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে দেশটির মাটিতে ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় বাংলাদেশের নিন্দাও পুনর্ব্যক্ত করেন। বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

সাক্ষাৎকালে ইরানের রাষ্ট্রদূত রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ায় ইরানের রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কাছে একটি অভিনন্দনপত্র হস্তান্তর করেন।

রাষ্ট্রদূত মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনে বাংলাদেশের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকারের অংশগ্রহণের বিষয়টি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদারে বাংলাদেশ ও ইরান একযোগে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন ইরানের রাষ্ট্রদূত।

রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রদূতকে দায়িত্ব পালনে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি তার দায়িত্বকাল বাংলাদেশ-ইরান সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইরানিয়ান দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/ডিএইচ/এমএসআইপি 

হাম-ডেঙ্গুর জোড়া আঘাত: প্রতিরোধের দেয়ালেই ফাটল

কালের আলো রিপোর্ট:
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২৯ অপরাহ্ণ
হাম-ডেঙ্গুর জোড়া আঘাত: প্রতিরোধের দেয়ালেই ফাটল

একটি রোগ ছড়ায় মানুষ থেকে মানুষে, অন্যটির বাহক এডিস মশা। হাম ও ডেঙ্গুর জীবাণু, সংক্রমণপথ এবং চিকিৎসা আলাদা। কিন্তু দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দুটি রোগের পেছনে একই ধরনের দুর্বলতা সামনে এনেছে—সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়া, মাঠপর্যায়ে নজরদারির ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা। ফলে এমন দুই রোগের চাপ একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে, যেগুলোর বিস্তার অনেকটাই প্রতিরোধযোগ্য।

দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা হাজারের ঘরে পৌঁছেছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতেও বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু। গত বছর ডেঙ্গুতে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যুর পর চলতি বছর ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রাণহানি দাঁড়িয়েছে ১৩৩ জনে। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৬ হাজার ৯৩৮ জন এবং তা বাড়ছেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের প্রতিরোধব্যবস্থার দুর্বলতা এক পর্যায়ে এসে দৃশ্যমান হয়েছে।

হামের ক্ষেত্রে ফাঁকটা কোথায়?
হাম ঠেকানোর সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র টিকা। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের হার ভালো দেখালেই ঝুঁকি শেষ হয় না। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জিয়া হাসানের মতে, কোনো নির্দিষ্ট বস্তি, দুর্গম জনপদ, ভাসমান জনগোষ্ঠী কিংবা দরিদ্র সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থাকলে সেই এলাকাই ভাইরাস ছড়ানোর কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। টিকাদানের এই অসম্পূর্ণতাই তৈরি করে ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজের প্রভাষক ডা. জাকিয়া ফেরদৌসী খানের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে হাসপাতালের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টিকা। আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার পাশাপাশি কোথায় প্রথম বা দ্বিতীয় ডোজ কম হয়েছে, কোন এলাকায় শিশুরা নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবার বাইরে এবং কোথায় সংক্রমণের ক্লাস্টার তৈরি হয়েছে—এসব তথ্য দ্রুত বিশ্লেষণ করা জরুরি। অর্থাৎ হাম ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রতিরোধের ফাঁক কোথায় তৈরি হয়েছে, সেটি খুঁজে বের করাই এখন বড় কাজ।

ডেঙ্গুতে ধোঁয়া আছে, নিয়ন্ত্রণ কতটা?
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন হলেও দুর্বলতার জায়গা প্রায় একই। প্রতি বছর মশক নিধনে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জন্য ২০৮ কোটি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জন্য ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। কিন্তু বরাদ্দের বিপরীতে মশা নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত ফল মিলছে কি না, সেটিই এখন প্রশ্ন।

কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলছেন, ফগিং স্থায়ী সমাধান নয়। এতে উড়ন্ত পূর্ণবয়স্ক মশার একটি অংশ কমতে পারে; কিন্তু ডিম ও লার্ভার প্রজননস্থল ধ্বংস না করলে নতুন মশা জন্ম নিতেই থাকবে। ছাদে জমে থাকা পানি, নির্মাণাধীন ভবনের পাত্র, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব কিংবা প্লাস্টিকের পাত্র—এসব প্রজননস্থল ধ্বংস না করে রাস্তায় ধোঁয়া ছড়ানো সমস্যার সাময়িক চিকিৎসা মাত্র। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় পর্যায়ের তদারকির ঘাটতি। দীর্ঘদিন ধরে সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে নির্বাচিত মেয়র, কাউন্সিলর ও চেয়ারম্যান না থাকায় মাঠপর্যায়ে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমেও দুর্বলতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ইমরুল কায়েস জানিয়েছেন, নির্বাচিত হাসপাতালগুলো থেকে ডেঙ্গু রোগীর তথ্য সংগ্রহ এবং মশক নিধন কার্যক্রম চলছে। তবে বিশেষায়িত জনবল না থাকায় শুরুতে নজরদারিতে সমস্যা হয়েছিল। ডিএসসিসির তদারকি কমিটির এক সদস্যের ভাষ্য, কমিটি গঠনের পর মাঠপর্যায়ে তৎপরতা থাকলেও পরে তা কমে যায়; দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিজ নিজ দাপ্তরিক কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকেন।

রাজধানীর বাইরেও বাড়ছে চাপ
ডেঙ্গু এখন শুধু ঢাকার সমস্যা নয়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও রোগী বাড়ছে। কিন্তু ঢাকার বাইরে রোগ নির্ণয়, গুরুতর রোগী ব্যবস্থাপনা ও নিবিড় পরিচর্যার সক্ষমতা সব জায়গায় সমান নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হারুন অর রশিদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে জটিল রোগীকে শেষ পর্যন্ত ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। এতে রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ রোগী যখন হাসপাতালে পৌঁছাচ্ছেন, তখন সংকট অনেকটাই গভীরে চলে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ, সামনে দীর্ঘ লড়াই
ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগে ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া তিন মাসব্যাপী বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কর্মসূচিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু প্রশাসনিক তৎপরতা নয়, জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে ডেঙ্গুর প্রজননস্থল কমানো ও সচেতনতা বাড়ানো। তবে বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা, এই উদ্যোগকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল ধরে রাখা কঠিন হবে। এডিস মশার প্রজনন বন্ধে সারা বছর নিয়মিত নজরদারি ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম প্রয়োজন। একইভাবে হাম নিয়ন্ত্রণেও এককালীন কর্মসূচির চেয়ে নিয়মিত টিকাদানের প্রতিটি ফাঁক বন্ধ করা জরুরি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার বিভাগ, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, কীটতত্ত্ববিদ, রোগতত্ত্ববিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কার্যকর জাতীয় কাঠামোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতিদিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোথায় হাম বাড়ছে, কোথায় টিকার ঘাটতি, কোথায় ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে এবং কোন এলাকায় এডিসের ঘনত্ব বেশি—তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

কালের আলো/এম/এএইচ

৬ কোটি থেকে ২৫ কোটি হচ্ছে সাংবাদিক কল্যাণের বরাদ্দ: প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:২২ অপরাহ্ণ
৬ কোটি থেকে ২৫ কোটি হচ্ছে সাংবাদিক কল্যাণের বরাদ্দ: প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী

সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের বর্তমান বাজেট বরাদ্দ ৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। এ-সংক্রান্ত প্রস্তাব ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। সাংবাদিকদের পেশাগত ও সামাজিক কল্যাণে সরকারের এ উদ্যোগের কথা এমন সময়ে সামনে এলো, যখন আজ পালিত হচ্ছে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ডিআরইউর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। জাতীয় পতাকা ও সংগঠনের পতাকা উত্তোলন, বর্ণাঢ্য র‌্যালি, কেক কাটা, মধ্যাহ্নভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন আয়োজন রয়েছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কেক কাটা ও শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

এর আগে ৪ সেপ্টেম্বর নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলা পাবলিক হলে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের পেশাগত কল্যাণ ও বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে ট্রাস্টে ৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। সেটি বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকা করার প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, সরকার সংবাদমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। সাংবাদিকরা যাতে ভয়ভীতি ছাড়াই নির্বিঘ্নে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন, সে পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার সঙ্গে অপসাংবাদিকতা ও ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ রোধে পেশাগত মানদণ্ড বজায় রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের সক্ষমতা ও কার্যক্রম বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের বরাদ্দ ৬ কোটি থেকে ২৫ কোটি টাকায় উন্নীত হলে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়া সাংবাদিকদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। তবে প্রস্তাবটি বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

কালের আলো/এম/এএইচ