দলের নামে অপকর্মে বিএনপিতে শুদ্ধি অভিযান
একজন সংসদ সদস্যের পদত্যাগ, তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি বিলুপ্ত, এক দিনে ১৪ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বহিষ্কারসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা—মাত্র কয়েক দিনের এই ধারাবাহিকতায় বিএনপির ভেতরে নতুন এক সাংগঠনিক বার্তা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। দলের নাম ব্যবহার করে দখল, চাঁদাবাজি, হামলা-ভাঙচুর কিংবা ব্যক্তিস্বার্থে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগকে এবার শুধু স্থানীয় পর্যায়ের অনিয়ম হিসেবে দেখছে না কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। অভিযোগ যাচাই করে পদ-পদবি বা রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে দলীয় সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে।
- মিষ্টির পদত্যাগে কঠোর বার্তা
- এক দিনের ব্যবধানে তিন কমিটি বিলুপ্ত
- এক দিনে ১৪ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
- ৫ আগস্টের পর ব্যবস্থা ১,০২৩ জনের বিরুদ্ধে
- রাজধানী ছাড়িয়ে জেলাতেও একই অভিযোগ
- দলীয় শাস্তি আলাদা, বিচার হবে আইনে
মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগের নির্দেশ এবং তার পদত্যাগের পরদিনই ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি, উত্তর যুবদল ও পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্তির ঘটনা এই বার্তাকে আরও দৃশ্যমান করেছে। একই সময়ে বিভিন্ন পর্যায়ের ১৪ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে সাংগঠনিক ব্যবস্থা।
বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের তথ্য বলছে, এই প্রক্রিয়া অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন অভিযোগে ১ হাজার ২৩ জন নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বৈশিষ্ট্য আলাদা—অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন শুধু দলীয় শৃঙ্খলা নয়, দখল, চাঁদাবাজি, সহিংসতা ও রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহারের মতো অপরাধের অভিযোগও উঠে আসছে। ফলে দলীয় শুদ্ধি কার্যক্রম এবার কোন পর্যায়ে গিয়ে থামে, নজর সেদিকেই।
কয়েক দিনের সিদ্ধান্তে বদলে যাচ্ছে বার্তা
রাড্ডার ঘটনায় মিষ্টির পদত্যাগের নির্দেশকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক বার্তা তৈরি হয়েছে, পরবর্তী কয়েক দিনের সাংগঠনিক সিদ্ধান্তে তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। একই সময়ে রাজধানীর তিনটি সংগঠনের কাঠামো ভেঙে দেওয়া এবং বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দেখিয়েছে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব মাঠপর্যায়ের কর্মকাণ্ডকে আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। তবে প্রতিটি সিদ্ধান্তকে রাড্ডা ঘটনার সরাসরি শাস্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিএনপির বিজ্ঞপ্তিতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির কমিটি বিলুপ্তির কারণ হিসেবে সাংগঠনিক বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। যুবদল ও ছাত্রদলের কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণেও বিলুপ্তির কথা বলা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক তাৎপর্য তৈরি হয়েছে সময়ের কারণে। রাড্ডার ঘটনার পরপরই এসব সাংগঠনিক পরিবর্তন এবং নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দলের ভেতরে কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে এনেছে।
মিষ্টির ঘটনা কেন গুরুত্বপূর্ণ
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি শুধু সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নন; তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়কও ছিলেন। ২০২৬ সালে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য হওয়ার আগে তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর পদত্যাগের নির্দেশ এবং তার দ্রুত পদত্যাগ দলীয় জবাবদিহির প্রশ্নে একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য স্পষ্ট করেছেন, সাংগঠনিক ব্যবস্থা আর ফৌজদারি বিচার এক বিষয় নয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, তদন্তে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা হবে; চার্জশিট হলে বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারে যাবে। অর্থাৎ দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক হলেও অপরাধের চূড়ান্ত দায় নির্ধারণ হবে আইনি প্রক্রিয়ায়।
এক দিনে ১৪ জন, সব অভিযোগের পরিণতি
তিন কমিটি বিলুপ্তির দিনই বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের তিন নেতা—শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি-ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন এবং ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুক্কুকে বহিষ্কার করা হয়। ছাত্রদলের পাঁচ নেতা, স্বেচ্ছাসেবক দলের দুই নেতা এবং শ্রমিক দলের চার নেতার বিরুদ্ধেও একই দিনে বহিষ্কারসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে দলের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে একটি বিষয় লক্ষণীয়—অভিযোগ উঠলেই সবার ক্ষেত্রে একই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে না। কোথাও বহিষ্কার, কোথাও পদ স্থগিত, কোথাও কারণ দর্শানোর নোটিস, আবার কোথাও তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। সিরাজগঞ্জের ঘটনাটি তার উদাহরণ। চেম্বার অব কমার্স কার্যালয় দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে তিন নেতাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ অভিযোগ যাচাই ও ব্যাখ্যার সুযোগ রেখে পরবর্তী সিদ্ধান্তের পথ খোলা হয়েছে।
রাজধানীর বাইরে একই ছক
ঢাকার বাইরের ঘটনাগুলোতেও অভিযোগের ধরনে মিল পাওয়া যাচ্ছে। বরিশালের গৌরনদীতে ব্যবসায়ী এসএম জামিল হাসান মিঠুর কাছে দেড় লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে স্থানীয় বিএনপির তিন নেতা এসএম জাকির হোসেন, ফরহাদ শরীফ ও নাজমুল হাসান মিঠুকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গাজীপুরে পোশাক কারখানা থেকে চাঁদা দাবি ও নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার হুমকির অভিযোগে ফারুক খান ও আবদুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই এলাকায় বিএনপির নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগে আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
খুলনায় ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগে মাহবুব হাসান পিয়ারু ও কেএম জিয়াউস সাদাতকে গ্রেপ্তারের পর বহিষ্কার করেছে মহানগর বিএনপি। নোয়াখালীতে দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্ত করে তিন নেতাকে দলীয় পদ ও প্রাথমিক সদস্যপদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রামেও দখল, আধিপত্য বিস্তার, হামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কোথাও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে, কোথাও দল বহিষ্কার করেছে, আবার কোনো ক্ষেত্রে স্থানীয় বিএনপি অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে দলের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পর্ক অস্বীকার করেছে।
১,০২৩ থেকে নতুন তালিকা—কতদূর যাবে অভিযান?
বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর একপর্যায়ে ১ হাজার ২৩ জন নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৫২৩ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিস, ৪৩৭ জনকে বহিষ্কার, ২৪ জনের পদ স্থগিত এবং ৩৫ জনকে সতর্ক করা হয়। আরও চারজনকে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের নোটিস দেওয়া হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান বলছে, দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার উদ্যোগটি সাম্প্রতিক কয়েক দিনের প্রতিক্রিয়া নয়। কিন্তু এবার যে পরিবর্তনটি লক্ষণীয়, তা হলো—দলের নাম ব্যবহার করে অপরাধের অভিযোগকে রাজনৈতিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। নতুন করে কার কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে বিএনপি আনুষ্ঠানিক কোনো তালিকা প্রকাশ করেনি। ফলে সামনে কতটা বিস্তৃত পদক্ষেপ আসছে, সেটি এখনো অনিশ্চিত।
‘জিরো টলারেন্স’ নীতি
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স বলেছেন, অভিযোগ যাচাই করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গুরুতর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আইনি ব্যবস্থার কথাও বলেছেন তিনি। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দলের নামে দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলেছেন। সরকারের অবস্থানও একই ধরনের। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, দখলদার, চাঁদাবাজ, অস্ত্রধারী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।
দলীয় শাস্তি নয়, শেষ কথা আদালতের
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে বিএনপি ও সরকারের বক্তব্যে একটি বিষয় পরিষ্কার—দলীয় বহিষ্কারকে ফৌজদারি বিচারের বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, দলীয় ব্যবস্থা দলের নিজস্ব বিষয়। তদন্তে অভিযোগ প্রাথমিকভাবে সত্য প্রমাণিত হলে চার্জশিটসহ আইনি প্রক্রিয়া এগোবে এবং শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারে যাবে।
‘আইন সবার জন্য সমান’
প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৃহস্পতিবার ফেনীতে বলেছেন, বিএনপিকে দেশের মানুষ দায়িত্ব দিয়েছে এবং দলটি সর্বশক্তি দিয়ে নিশ্চিত করবে যে আইন সবার জন্য সমান। তিনি বলেন, বিগত ১৭ বছরে আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; সেই পরিস্থিতি পরিবর্তন করে ধীরে ধীরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চান।
অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল মিষ্টির পদত্যাগের ঘটনাকে একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখেছেন। তার বক্তব্য, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে; এতে দলীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে প্রশ্রয় না দেওয়ার বার্তা গেছে।
সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কারও গাফিলতি পাওয়া গেলেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
কালের আলো/জেএন/এমকে

আপনার মতামত লিখুন
Array