খুঁজুন
                               
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৪ আষাঢ়, ১৪৩৩
           

সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে ভোটের আশা প্রার্থীদের

ডেস্ক নিউজ
প্রকাশিত: সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫, ১১:৫৬ অপরাহ্ণ
সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে ভোটের আশা প্রার্থীদের

কালের আলো  রিপোর্ট:

আলোচনার মূল বিষয়বস্তু এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। উৎসবমুখর ভোট আয়োজনে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। স্বভাবতই মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার চাপ বেশিই ছিল। এদিন সারা দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। প্রতিটি প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মাঝে ছিল বাড়তি উৎসাহ-উদ্দীপনা। নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের জনসংযোগ শাখা জানিয়েছে, সারাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনে মোট ২ হাজার ৫৮২টি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রার্থী সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন।

মনোনয়ন ফরম দাখিলের সময় দুই দিন বাড়তে পারে বলে গুঞ্জন ছিল। তবে নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় আর বাড়ছেনা। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ জানান, মনোনয়ন দাখিলের জন্য আর সময় বাড়ানো হচ্ছে না। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, সোমবার বিকাল ৫টা পর্যন্ত আগ্রহী প্রার্থীদের রিটার্নিং বা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার নিকট মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল।

জানা যায়, গত ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ব্যালট পেপারের মাধ্যমে স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে ভোট নেওয়া হবে। ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই চলবে ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত। যাচাই-বাছাই সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি। আপিল নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি এবং প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে ২১ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র বাছাই কার্যক্রম চলবে ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত।

সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয়ের জনসংযোগ শাখা জানায়, শেষ দিনে ঢাকা অঞ্চলে ৪১টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ৪৪৪টি, ফরিদপুর অঞ্চলে ১৫টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ১৪২টি, চট্টগ্রাম অঞ্চলে ২৩টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ১৯৪টি, কুমিল্লা অঞ্চলে ৩৫টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ৩৬৫টি ও রাজশাহী অঞ্চলে ৩৯টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ২৬০টি মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়েছে। এছাড়া, খুলনা অঞ্চলে ৩৬টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ২৭৬টি, বরিশাল অঞ্চলে ২১টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ১৬৬টি, ময়মনসিংহ অঞ্চলে ৩৮টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ৩১১টি, সিলেট অঞ্চলে ১৯টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ১৪৬টি ও রংপুর অঞ্চলে ৩৩টি সংসদীয় আসনের বিপরীতে ২৭৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।

মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া প্রার্থীরা বলেন, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে মানুষ ভোট দিতে পারবে বলে তারা আশাবাদী। তারা মনে করেন, ভোটের পরিবেশ কেমন থাকবে সেটা নিয়ে জনগণের মধ্যে এখনও শঙ্কা রয়েছে। তাই তাদের শঙ্কা দূর করে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা জরুরি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নজরদারি বাড়ালে সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশ, দেশের জনগণ নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবে।

মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তিনটি সংসদীয় আসনে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুইটি আসনে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এছাড়া দলের মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য দেশের বিভিন্ন আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। দলীয় সূত্র জানায়, সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প কৌশল হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে ‘প্ল্যান বি’ও। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) দেশের সংশ্লিষ্ট জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেন বিএনপির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

জানা যায়, এবার বগুড়া-৭, ফেনী-১ ও দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বগুড়া-৭ আসনে তার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেন শাজাহানপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এনামুল হক, গাবতলী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক এবং গাবতলী পৌর বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম। ফেনী-১ আসনে খালেদা জিয়ার পক্ষে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক ও তার নির্বাচনি সমন্বয়ক রফিকুল আলম ওরফে মজনু। এর আগে রোববার দিনাজপুর-৩ আসনে তার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। অসুস্থতার কারণে খালেদা জিয়ার স্বাক্ষরের পরিবর্তে মনোনয়নপত্রে আঙুলের ছাপ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ঢাকা-১৭ আসনে তার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুস সালাম, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক এবং ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ফরহাদ হালিম। অন্যদিকে, তার পৈতৃক এলাকা বগুড়া-৬ আসনে জেলা বিএনপির সভাপতি রেজাউল করিমের নেতৃত্বে তারেক রহমানের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়।

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি জানান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছেন এবং ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটে চিকিৎসাধীন। শারীরিক অবস্থার উন্নতি নিয়ে এখনই আশাবাদী হওয়ার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি। এ পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার তিনটি আসনেই বিকল্প প্রার্থী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ফেনী-১ আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন রফিকুল আলম (মজনু)। বগুড়া-৭ আসনে উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোরশেদ মিল্টন এবং দিনাজপুর-৩ আসনে সাবেক পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। প্রয়োজনে তাঁরা বিএনপির চূড়ান্ত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবেন।

এদিকে একই দিনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঠাকুরগাঁওয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন। ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের পক্ষে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়। কুমিল্লা-১ আসনে স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং তার ছেলে ড. খন্দকার মারুফ হোসেন মনোনয়ন জমা দেন। নরসিংদী-২ আসনে মনোনয়ন দাখিল করেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান। ঢাকা-৩ আসনে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, চট্টগ্রাম-১১ আসনে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং কক্সবাজার-১ আসনে সালাহউদ্দিন আহমদ মনোনয়নপত্র জমা দেন। এছাড়া দিনাজপুর-৬ আসনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে।

জামায়াত আমিরের মনোনয়নপত্র জমা
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে ঢাকা-১৫ আসনের জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনে ঢাকার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ঢাকা-১৩ ও ১৫ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ইউনুচ আলীর কাছে জামায়াত আমিরের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। এর আগে বৃহস্পতিবার ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া শেষে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের সাংবাদিকদের বলেন, আজ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে আমরা আমিরের পক্ষ থেকে তার মনোনয়নপত্র জমা দিতে এসেছি। সুষ্ঠু, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন যাতে উপহার দিতে পারি সেই প্রত্যাশা করছি। তিনি বলেন, আমরা সবাই মিলে যাতে একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড করতে পারি তার প্রত্যাশা করছি। এটা নিয়ে আরও কাজ করার আছে। আমরা আশা করছি, নির্বাচন কমিশন এটা নিয়ে কাজ করবে।

নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্ট কিনা জানতে চাইলে জামায়াতের এই নেতা বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনের আরও কাজ করার আছে। তিনশ’ আসনে শরীক দলগুলোর কে কতটি আসন পেয়েছেন এটা কখন জানা যাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তিনশ’ আসনে প্রার্থী আমরা প্রায় নিশ্চিত করতে পেরেছি। আজ (সোমবার) রাতের মধ্যেই জানিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘আমাদের এই আসন সমঝোতা কোনও জোটবদ্ধ নির্বাচন নয়। কিন্তু এটা অন্য যেকোনও জোটের চেয়েও শক্তিশালী হবে ইনশাল্লাহ। প্রত্যেকে এখানে নিজস্ব প্রতীক নিয়ে আমরা ইলেকশন করবো। শুধু একটা আসনে একটি দলই থাকবেন। বাকিরা আমরা সমর্থন জানাবো।’ জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম বলেন, ‘আরেকটা রাজনৈতিক দল আমাদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। তার নাম পরে জানানো হবে।’ এদিকে ঢাকা-১৫ আসন থেকে আরও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপির শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন, এনসিপির আলমগীর ফেরদৌস, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এসএম ফজলুল হক, গণফোরামের একেএম শফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ডা. আহাম্মদ সাজেদুল হক রুবেল।

এছাড়াও ঢাকা ১৪ আসন থেকে জামায়াতের মনোনয়ন জমা দিয়েছেন- মীর আহমদ বিন কাশেম, ঢাকা-১৬ আসন থেকে আব্দুল বাতেন, ঢাকা -১২ আসন থেকে সাইফুল আলম মিলন, ঢাকা-২ আসন থেকে আব্দুল হক, ঢাকা-৬ আসন থেকে আব্দুল মান্নান, ঢাকা-৭ আসনে এনায়েত উল্লাহ মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন। ঢাকা ১৩ আসন থেকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মোবারক হোসাইন প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত এই আসনটি ছেড়ে দিতে হয়েছে বাংলাদেশের খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হককে। এছাড়া ঢাকার বেশ কয়েকটি আসন এনসিপি নেতাদের জন্য ছেড়ে দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। তবে জোটভুক্ত হলেও কোন কোন আসনে জামায়াতের পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বা শরীক দলের প্রার্থীরা মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।

মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন এনসিপি শীর্ষ নেতারাও
বিএনপি ও জামায়াতের মতো জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির শীর্ষ নেতা নাহিদ ইসলাম নির্বাচন করছেন ঢাকা থেকে। গত কয়েকদিনের টানা আলোচনার পর রোববার রাতে জামায়াতের সাথে নির্বাচনী জোট গঠনের কথা জানিয়েছে এনসিপি। এরপরই ঢাকার বাড্ডা রামপুরা এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১১ আসনে জামায়াত এনসিপি জোটের প্রার্থী হন নাহিদ ইসলাম। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে তার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন ও যুগ্ম সদস্যসচিব তামিম আহমেদ নাহিদ ইসলামের পক্ষে এই মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। নাহিদ ইসলাম এই আসনে প্রার্থী হওয়ায় ওই আসন থেকে নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন জামায়াতের প্রার্থী আতিকুর রহমান। নাহিদ ইসলাম ছাড়াও এনসিপির মূখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী ঢাকা-৮, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব প্রার্থী হয়েছেন ঢাকা-১৮ আসনে। এনসিপি জানিয়েছে, জামায়াতসহ আট দলের সাথে রোববার নির্বাচনী ঐক্য চূড়ান্ত হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসনে একটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ঢাকার কয়েকটি আসনসহ সারাদেশের ৪৭টি আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন তারা। আহ্বায়ক ঢাকায় প্রার্থী হলেও আখতার লড়ছেন রংপুরের একটি আসনে। এর মধ্যে জোটের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে কিছু আসন চূড়ান্ত হয়েছে। কিছু আসন এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এদিকে, এদিন বিকেলে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ এনসিপিতে যোগ দিলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হননি। এর আগে আসিফ ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে মনোনয়নপত্রও সংগ্রহ করেছিলেন।

কালের আলো/এমএএইচ/এইচএন

পুশইনের মতো অমানবিক আচরণের নজির পৃথিবীতে বিরল: মঞ্জু

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ১০:০০ অপরাহ্ণ
পুশইনের মতো অমানবিক আচরণের নজির পৃথিবীতে বিরল: মঞ্জু

পুশইনের মাধ্যমে ভারত সরকার কূটনৈতিক সৌজন্য, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন করে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা উদ্যোগ না নেওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

বুধবার (১৭ জুন) রাজধানীর বিজয়নগরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সীমান্ত হত্যা, পুশইন ও কাঁটাতারের রাজনীতি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী তার অভিবাসী নাগরিককে অন্য দেশের মানুষ বলে জোরপূর্বক সীমান্তের শূন্যরেখায় দিনের পর দিন খোলা আকাশের নিচে বসিয়ে রেখে নির্যাতন করে ঠেলে পাশের দেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো অমানবিক ও নিষ্ঠুর আচরণ পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমাদের জানা নেই। এর আগে মিয়ানমারের জান্তা সরকার তাদের নাগরিকদের ওপর নৃশংস গণহত্যা চালিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিয়েছে। কয়েক যুগ হতে যাচ্ছে, ২০ লাখের বেশি শরণার্থীর হৃদয়বিদারক জীবন চেয়ে চেয়ে দেখছে বিশ্ববাসী। তাদের পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেই।

মঞ্জু বলেন, ভারত সরকার বলেছিল নির্বাচিত সরকার এলে তারা আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। কিন্তু তাদের সহযোগিতার এই নৃশংস নমুনা অতীতের মতোই আমাদের দেখতে হচ্ছে। বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে ভারতের কাঁটাতারের রাজনীতি, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইনের মতো শত্রুসুলভ কার্যক্রম তুলে ধরার জন্য তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে দলের সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. আলতাফ হোসাইন, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, সহকারী দপ্তর সম্পাদক আব্দুল হালিম নান্নু, মশিউর রহমান মিলু, প্রবাসী নেতা নুরুন্নবী নয়ন, যাত্রাবাড়ী থানার আহ্বায়ক মিয়া সুলতান আরিফ, বরিশালের নেতা জাকির হোসেন ও ইমরান সরদার উপস্থিত ছিলেন।

কালের আলো/এসআর/এএএন

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফরের সিদ্ধান্ত একান্ত সরকারের

আহসান হাবিব বরুন:
প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৮:৫৬ অপরাহ্ণ
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফরের সিদ্ধান্ত একান্ত সরকারের

আজকের আন্তঃনির্ভরশীল বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও জাতীয় সমৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করে একটি রাষ্ট্রের কূটনৈতিক দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততার ওপর। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে কার্যকর পররাষ্ট্রনীতি অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে নিছক দুটি রাষ্ট্র সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ, যা দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়ে এসেছে। আগামী দিনের লক্ষ্য উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। সফরের ক্রম, আলোচ্যসূচি এবং সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক প্রতীকবাদের চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু রাষ্ট্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি শুধু একটি অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের আধুনিক উন্নয়নের অন্যতম সফল মডেল। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো জনশক্তি। লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে কর্মরত রয়েছেন এবং তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আরও সম্প্রসারিত হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে বর্তমান বিশ্বে শুধু শ্রম রপ্তানি নয়, দক্ষ জনশক্তি গঠনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি এই সফরে কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে। কারণ আগামী দিনের প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা।

অন্যদিকে মালয়েশিয়ার শিল্প ও বিনিয়োগ খাতেও বাংলাদেশের জন্য বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ইলেকট্রনিকস, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলে তা দেশের শিল্পায়নকে নতুন গতি দিতে পারে। তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিঃসন্দেহে চীনকে ঘিরে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দেশের বহু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল সহায়তা রয়েছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নের ইতিহাসে সড়ক, সেতু, রেল, বিদ্যুৎ, বন্দর এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর বহু প্রকল্পের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ বর্তমানে যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি, তার মধ্যে অন্যতম হলো বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে চীনা বিনিয়োগ নতুন শিল্প স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা তিস্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে নদীর নাব্যতা সংকট, ভাঙন, পানির স্বল্পতা এবং সেচ সমস্যার কারণে এ অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং সেচ অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট উৎপাদন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো আগামী দিনের অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ যদি এসব খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা আকৃষ্ট করতে পারে, তাহলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে এই সফরগুলোর গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্নও উঠে আসে। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেকেই লক্ষ্য করেছেন যে প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যদিও প্রতিবেশী ভারতও সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র কোন দেশকে কখন অগ্রাধিকার দেবে, সেটি সম্পূর্ণ তার নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

এখানে মনে রাখা দরকার, বিএনপির কূটনৈতিক দর্শন কোনো নতুন বিষয় নয়। স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে যে পররাষ্ট্রনীতি অনুসৃত হয়েছে, তার মূল ভিত্তি ছিল জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক মর্যাদা এবং সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা। এই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকেও একই ধরনের নীতিগত অবস্থান প্রত্যাশিত। কারণ একটি রাজনৈতিক দলের পররাষ্ট্রনীতি কেবল কোনো ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য, আদর্শ এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।

সুতরাং বিএনপির কূটনৈতিক রেওয়াজে হঠাৎ করে মৌলিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা খুবই কম। দলটি ঐতিহাসিকভাবেই এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা নয়, আবার কোনো দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতাও নয়; বরং জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পরিস্থিতি, কথিত পুশ-ইন, ভিসা ও কূটনৈতিক যোগাযোগসংক্রান্ত কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনাকে অনেকেই দুই দেশের সম্পর্কে বিদ্যমান কিছু অস্বস্তির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

তবে এ কথাও সত্য যে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল সরকার পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশ একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও অংশীদার। সেই কারণেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বাস্তবতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কোনো রাষ্ট্র তার নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে—এটিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক নিয়ম। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মানদণ্ডে বিচার করা পরিপক্ব কূটনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ভারতেরও উপলব্ধি করা উচিত যে আজকের বাংলাদেশ আর দুই দশক আগের বাংলাদেশ নয়। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক সংযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত বাস্তবতায় বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এখন বাংলাদেশকে নতুন দৃষ্টিতে দেখছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান তাকে একটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কও নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি এবং অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যার টেকসই সমাধানই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

বাংলাদেশ যেমন ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তেমনি সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে। কারণ আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো সমতা, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থ।

আজকের বাংলাদেশ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা নয়, বরং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সাফল্যের চাবিকাঠি।

তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তির সংখ্যা নয়, বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বহু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাই এবার প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

বাংলাদেশের মানুষ এখন বড় বড় ঘোষণার চেয়ে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা দেখতে চায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে, শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে, কৃষি ও প্রযুক্তি খাত এগিয়ে যাচ্ছে এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। যদি মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

সর্বোপরি, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। যদি এই সফরের মাধ্যমে অর্জিত সমঝোতা ও সহযোগিতাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা দেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙল ইরানের ৩ তেলবাহী জাহাজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৮:৫২ অপরাহ্ণ
মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙল ইরানের ৩ তেলবাহী জাহাজ

গত দুই মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরানের তিনটি তেলবাহী জাহাজ মার্কিন নৌ অবরোধ অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইটগুলো। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তি সমঝোতা স্মারক চূড়ান্ত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই অবরোধ অবিলম্বে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দেন।

জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম ট্যাংকার ট্র্যাকার্স জানিয়েছে, ন্যাশনাল ইরানিয়ান ট্যাংকার কোম্পানির (এনআইটিসি) মালিকানাধীন তিনটি ট্যাংকার তেলভর্তি অবস্থায় অবরোধরেখা অতিক্রম করে আরব সাগরে প্রবেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে- ‘হিরো ২’ ও ‘ডিওনা’ নামে দুটি সুপারট্যাংকার বা অত্যন্ত বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ। এই দুটি জাহাজ মিলে মোট ৩৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বহন করছে এবং তারা ভারতের দক্ষিণ উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

এছাড়াও সোনিয়া ১ নামে আরেকটি সুয়েজম্যাক্স শ্রেণির ট্যাংকার, যা প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে এগোচ্ছে বলে জানায় ট্যাংকার ট্র্যাকার্স।

এরআগে গতকাল ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা মেহের নিউজ জানিয়েছে, অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণার ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে ইরানের বন্দর থেকে ৩টি তেলবাহী ট্যাঙ্কার এবং ২টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী কার্গো জাহাজসহ মোট ৫টি জাহাজ কোনো বাধা ছাড়াই আন্তর্জাতিক জলসীমার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সোমবার সন্ধ্যায় জাহাজগুলো যাত্রা শুরু করেছে, যা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সদ্য চূড়ান্ত হওয়া সমঝোতা স্মারকের প্রথম কার্যকরী বিজয় হিসেবে চিহ্নিত করে তেহরান।

এদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি শুরু থেকেই তেহরানের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল। অবরোধ প্রত্যাহারের বিষয়টি আমরা শুরু থেকেই জোর দিয়েছিলাম। এখন তা শুরু হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের আগেই অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছে’।

এর আগে রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে জানান, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহারের অনুমোদন দিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা শুরু হলে এর প্রতিক্রিয়ায় বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত তেল-গ্যাস পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান। বিশ্বের মোট তেল-গ্যাস রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশই এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

জবাবে এপ্রিল মাসে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর এই নৌ-অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র, যা প্রায় তিন মাস ধরে কার্যকর ছিল। দীর্ঘ আলোচনার পর অবশেষে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তির ফলে এখন থেকে ইরানের তেল ট্যাঙ্কার ও পণ্যবাহী জাহাজগুলো ইরানি এবং আন্তর্জাতিক উভয় জলসীমায় সম্পূর্ণ অবাধে চলাচল করতে পারবে।

এদিকে ইরানি তেল পুনরায় বিশ্ববাজারে প্রবেশের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমার প্রবণতা দেখা গেছে। বুধবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড প্রতি ব্যারেল প্রায় ৭৮.৪২ ডলারে এবং মার্কিন বেঞ্চমার্ক ডব্লিউটিআই ক্রুড প্রতি ব্যারেল ৭৫.৩৪ ডলারে নেমে এসেছে।

সূত্র: বিবিসি, আলজাজিরা

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ