জন্মের পর থেকেই জীবন ছিল কঠিন। জন্মগত শারীরিক জটিলতার কারণে চার পায়ে দাঁড়াতে পারত না ছোট্ট ভেড়াটি। অন্য ভেড়ার মতো দৌড়ে বেড়ানো তো দূরের কথা, নিজের মায়ের কাছ থেকেও মেলেনি আশ্রয়। কিন্তু প্রতিকূলতা তার জীবন থামিয়ে দিতে পারেনি। মানুষের মমতা, যত্ন আর ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগে এখন নিজের মতো করে চলাফেরা করছে কিকি। মাথা দিয়ে জয়স্টিক নিয়ন্ত্রণ করে চালায় মোটরচালিত হুইলচেয়ার, যার নাম রাখা হয়েছে ‘ল্যাম্বরগিনি’।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের নর্থ ডার্টমাউথের প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্র ‘ডোন্ট ফরগেট আস, পেট আস’-এ এখন কিকির বসবাস। তার জীবনকাহিনি শুধু একটি অসহায় প্রাণীর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নয়, বরং সহমর্মিতা ও সহায়ক প্রযুক্তি কীভাবে জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে, তারও এক অনন্য উদাহরণ।
জন্ম থেকেই প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই
২০২১ সালের ডিসেম্বরে জন্ম হয় কিকির। জন্মগত শারীরিক জটিলতার কারণে তার পক্ষে স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানো বা হাঁটা সম্ভব ছিল না। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় কিকির মা ‘ক্যাশ ভ্যালি ভাইরাসে’ আক্রান্ত হয়েছিল। ভেড়ার ক্ষেত্রে এই সংক্রমণ গর্ভস্থ বাচ্চার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও অস্থিসন্ধির বিকাশে জটিলতা তৈরি করতে পারে। জন্মের পর কিকির মা তাকে দুধ খাওয়াতে অস্বীকার করে। ফলে তার জীবন আরও ঝুঁকির মুখে পড়ে। প্রয়োজনীয় যত্ন ও পুষ্টির অভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছিল ছোট্ট প্রাণীটি।
পরিস্থিতি বুঝতে পেরে খামারের মালিক ডেব প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্রটির বোর্ড সদস্য মেগান কিংয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর মাত্র ১১ দিন বয়সে কিকিকে আশ্রয় দেওয়া হয় ‘ডোন্ট ফরগেট আস, পেট আস’ স্যাংচুয়ারিতে। বিশেষ যত্নের প্রয়োজন এমন নানা প্রাণীর আশ্রয়স্থল এই কেন্দ্রেই শুরু হয় কিকির জীবনের নতুন অধ্যায়।
চিকিৎসায় মিলল না কাঙ্ক্ষিত সমাধান
কিকিকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করানোর জন্য পরিচর্যাকারীরা নানা চেষ্টা করেন। ফিজিওথেরাপি, চিকিৎসা এবং অস্ত্রোপচারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তার পা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
তবে কিকির পরিচর্যাকারীরা হাল ছাড়েননি। আশ্রয়কেন্দ্রের সহপ্রতিষ্ঠাতা ডেব ডেভলিন লক্ষ করেন, খেলনা ও আশপাশের জিনিসের প্রতি কিকির বেশ আগ্রহ রয়েছে। মাথা দিয়ে বিভিন্ন জিনিস ঠেলে সে সেগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করত।
কিকির এই স্বাভাবিক আচরণ থেকেই নতুন একটি ভাবনার জন্ম হয়। তাকে অন্যের সাহায্যে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেওয়ার পরিবর্তে নিজের মতো করে চলাফেরার সুযোগ দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে চিন্তা শুরু করেন পরিচর্যাকারীরা।
মাথা দিয়েই চালায় ‘ল্যাম্বরগিনি’
কিকির জন্য তৈরি করা হয় বিশেষ একটি মোটরচালিত যান। একটি মোটরচালিত হুইলচেয়ারের ভিত্তির সঙ্গে কার্গো স্ট্রলারের অংশ যুক্ত করে সেটিকে তার প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করা হয়। যানটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো জয়স্টিক। সেটি এমনভাবে বসানো হয়, যাতে কিকি মাথা বা থুতনি দিয়ে ঠেলে চলার দিক ও গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
নতুন এই যান চালানোর সুযোগ পেয়ে কিকি দ্রুত কৌশলটি আয়ত্ত করে ফেলে। এখন সে সামনে এগিয়ে যেতে পারে, পেছনে ফিরতে পারে, এমনকি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী দিকও পরিবর্তন করতে পারে।
কিকির চলার এই বিশেষ যানটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ল্যাম্বরগিনি’। নামের সঙ্গে মিল রেখে তার চলাফেরার উৎসাহও কম নয়। আশ্রয়কেন্দ্রের চত্বরে নিজের যান নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সে। কখনো এতটাই উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে যায় যে তাকে থামানোর জন্য পরিচর্যাকারীদের ডাকতে হয়। যে প্রাণীটি একসময় নিজের জায়গা থেকে নড়াচড়া করতেও পারত না, সেই কিকিই এখন নিজের চলাফেরার নিয়ন্ত্রণ নিতে শিখেছে।
কিকির গল্প ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের কাছেও
কিকির জীবন শুধু তার নিজের জন্যই নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেনি, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে অন্যদেরও। আশ্রয়কেন্দ্রটিতে তার সঙ্গে বসবাস করে আরও অনেক প্রাণী। তাদের সঙ্গেও সময় কাটায় কিকি, কখনো হয়ে ওঠে সঙ্গী, কখনো দেখায় মমতাপূর্ণ আচরণ।
তার ব্যতিক্রমী চলাফেরার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ২০২৬ সালের মে মাসে ফক্স ১১-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডেব ডেভলিন জানান, কিকির ভিডিও দেখে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পুনর্বাসনকেন্দ্র ও থেরাপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাও রোগীদের উৎসাহ দিতে কিকির ভিডিও ব্যবহার করছেন।
কিকির গল্প মানুষের সামনে তুলে ধরেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকলেই জীবনের আনন্দ কিংবা স্বাধীনতার সব পথ বন্ধ হয়ে যায় না। উপযুক্ত পরিবেশ, প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং নতুন সমাধানের সুযোগ পেলে অনেক কিছুই সম্ভব।
সীমাবদ্ধতা নয়, সুযোগই বদলে দিতে পারে জীবন
কিকি হয়তো অন্য ভেড়ার মতো চার পায়ে ভর দিয়ে দৌড়াতে পারবে না। কিন্তু তার জীবন থেমে নেই। মানুষের যত্ন আর প্রযুক্তির সহায়তায় সে খুঁজে পেয়েছে চলাফেরার নিজস্ব পথ।
জন্মের পর যে প্রাণীটি মায়ের কাছ থেকেও আশ্রয় পায়নি, আজ সেই কিকিই মানুষের ভালোবাসায় ঘুরে বেড়াচ্ছে নিজের ‘ল্যাম্বরগিনি’ নিয়ে। তার গল্প মনে করিয়ে দেয়, কাউকে শুধু তার সীমাবদ্ধতা দিয়ে বিচার করা যায় না। কখনো একটু মমতা, কখনো প্রয়োজন অনুযায়ী একটি নতুন ব্যবস্থা—এ দুয়ের সমন্বয়েই খুলে যেতে পারে স্বাধীনতার নতুন দরজা।
কালের আলো/এমএসআইপি/জেএন
আপনার মতামত লিখুন
[gs-fb-comments]