খুঁজুন
                               
, ,
           

তিন মাসে বিএনপিতে সহিংসতায় নিহত ২৪, বিএনপি-জামায়াতে ৭: এইচআরএসএস

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:০১ অপরাহ্ণ
তিন মাসে বিএনপিতে সহিংসতায় নিহত ২৪, বিএনপি-জামায়াতে ৭: এইচআরএসএস

সারাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় গত তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ ’২৬) অন্তত ৬১০টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৬ জন এবং আহত হয়েছেন চার হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে নিজেরা সহিংসতায় জড়িয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদেরই ২৪ জন নিহত ও ১৫৮৫ জন হয়েছে। এছাড়া বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে সাতজন নিহত ও এক হাজার ৬৫৪ জন আহত হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এক প্রতিবেদনে শনিবার এসব তথ্য জানিয়েছে। দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ ত্রৈমাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‍গত তিন মাসে আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে সহিংসতা, বিভিন্ন দলের সমাবেশ কেন্দ্রিক সহিংসতা, প্রার্থীর সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষ, হামলা, বাড়ি-ঘর, যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশব্যাপী ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

গত তিন মাসে সহিংসতার ৬১০টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১৯৪টি ঘটনায় নিহত ২৪ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত এক হাজার ৫৮৫ জন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষের ২৬০টি ঘটনায় আহত হয়েছে সাতজন নিহত এবং আহত হয়েছে এক হাজার ৬৫৪ জন। বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষের ৩৬টি ঘটনায় নিহত তিনজন এবং আহত ২১৯ জন।

এছাড়া ২৩টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত ২০৪ জন, আওয়ামী লীগ-এনসিপির মধ্যে তিনটি সংঘর্ষে আহত ৫১ জন, ৬০টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছে ১৬৯ জন। এর বাইরে বিভিন্ন দলের মধ্যে ৩৪টি ঘটনায় দুজন নিহত এবং আহত হয়েছেন ১৯৬ জন।

৬১০টি সহিংসতার ঘটনার ৫৭৩টিই (৯৪ শতাংশ) ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ও বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে। নিহত ৩৬ জনের মধ্যে বিএনপির ২৮ জন (৭৮ শতাংশ), জামায়াতের চারজন (১১ শতাংশ) ও আওয়ামী লীগের একজন এবং অন্যান্য তিনজন।

এর পাশাপাশি দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ৩৪টি ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় কমপক্ষে ২৯ জন আহত হয়। এর মধ্যে বিএনপির ১২ জন, আওয়ামীলীগের চারজন, জামায়াতের তিনজন ও অন্যান্য দলের তিনজনসহ মোট ২২ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

এছাড়াও সারাদেশে আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, নির্বাচনি সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক সাত শতাধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

প্রতিবেদনে এইচআরএসএস বলছে, গত জানুয়ারি-মার্চ এই তিন মাসে দেশের রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র বিশ্লেষণ করলে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। জানুয়ারি মাসে মোট ১৫১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় আটজন নিহত এবং এক হাজার ২৩৩ জন আহত হন, যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি সূচনা পর্যায় নির্দেশ করে।

তবে ফেব্রুয়ারি মাসে এই সহিংসতা হঠাৎ করেই ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়; এ মাসে ৩৪৬টি ঘটনায় অন্তত ১০ জন নিহত এবং ১৯৩৩ জন আহত হন। অন্যদিকে মার্চ মাসে সহিংসতার মোট সংখ্যা কমে ১১৩ টিতে দাঁড়ালেও নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৮ জনে পৌঁছায় এবং আহত হন ৯১২ জন। এটি নির্দেশ করে যে সহিংসতার প্রকৃতি আরও তীব্র ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে। এ সময় নির্বাচন-পরবর্তী প্রতিশোধমূলক সংঘর্ষ, আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক বিরোধ সহিংসতার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

এই সামগ্রিক সহিংসতার প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অস্থিরতা আরও তীব্র হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, যার ফলে দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।

তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার পরপরই ঢাকাসহ অন্তত ৩০টি জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ে পুনরায় প্রবেশের চেষ্টা করছেন বা কোথাও কোথাও অবস্থান নিয়েছেন বলে সংবাদমাধ্যমে জানা গেছে। এর ফলে বিভিন্ন স্থানে কার্যালয় পুনর্দখলকে কেন্দ্র করে পাল্টা দখল, হামলা, ভাঙচুর ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

কালের আলো/এসআর/এএএন

বগুড়ার উন্নয়নে ছাড় নয়: মীর শাহে আলম

বগুড়া প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ণ
বগুড়ার উন্নয়নে ছাড় নয়: মীর শাহে আলম

স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম বলেছেন, বগুড়া ২০ বছর ধরে বঞ্চিত ছিল- শূন্য ছিল উন্নয়নের বিচারে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করা হচ্ছে। কাজেই এই জেলার উন্নয়নে এক বিন্দু ছাড় দেওয়া হবে না।

 যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন বগুড়ায় যুবদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় দেশব্যাপী এআই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বগুড়ায় এসে এসব কথা বলেন তিনি।

রোববার(২ আগষ্ট)  বগুড়ার মম ইন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, বগুড়া জেলার সংসদ সদস্যরাসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে সরকারের এ উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সহায়ক হবে। তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান।

উদ্বোধনী বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে যুবসমাজকে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করতে সরকার কাজ করছে। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তিনি বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

কালের আলো/জেএন/এমএসআইপি 

পার্বত্য চট্টগ্রাম: পরিচয় বিতর্ক নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সংহতি

এ এইচ এম ফারুক:
প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩২ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রাম: পরিচয় বিতর্ক নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সংহতি

বাংলাদেশ একটি একক, অবিভাজ্য ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র। কিন্তু দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক বজায় রাখার অপচেষ্টা চলছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল স্বায়ত্তশাসন দাবি। কিন্তু ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির জন্য উপজাতিয় নেতৃবৃন্দের দাবি দাওয়া নিয়ে জিয়াউর রহমান সরকার আলোচনা শুরু করেন। এরপর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকার ৯ বছরে ৬ বার, বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯১ এর সরকার ৫ বছরে ১৩ বার এবং ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী সরকার গঠিত হলে জাতীয় কমিটির সাথে ৭ বার আলোচনা করে ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততায় চুক্তিটি স্বাক্ষর করে সম্পাদিত করেছে।

কিন্তু এরপর আবার ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সনদ (ইউএনডিআরআইপি) ঘোষণার পর থেকে শুরু হয় নতুন তৎপরতা। এখন তা গড়িয়েছে ‘উপজাতি’ বনাম ‘আদিবাসী’ শব্দগত ও পরিচয়গত টানাপোড়েন।

অথচ ১৯৯৭ সালের চুক্তির পক্ষ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) ও তার শীর্ষ নেতা সন্তু লারমা স্বজ্ঞানে ও আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজেদের ‘উপজাতি’ পরিচয়েই চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। তবে চুক্তির দীর্ঘ এক দশক পর ২০০৭ সালেরপর কেনো নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ও দেশের ভেতরে প্রতিষ্ঠা করার এক মরিয়া প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—১৯৯৬-৯৭ সালে যে গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের ‘উপজাতি’ হিসেবে মেনে নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করল, এখন তারা হঠাৎ ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবীতে সোচ্চার কেন? এর পেছনে কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক রহস্যটাই বা কী?

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মূল পাঠ পরীক্ষা করলে দেখা যায়, চুক্তির ‘ক’ খণ্ডের ১ নং ধারায় পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে ‘খ’ খণ্ডের ১ নং ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আইনে ‘উপজাতি’ শব্দটি বহাল থাকবে। চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে অন্তত ৫০ বার ‘উপজাতি’ বা ‘উপজাতীয়’ শব্দগুচ্ছটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। সন্তু লারমা ও তাঁর প্রতিনিধিরা এই প্রতিটি ধারায় স্বাক্ষর করেছেন। পরবর্তীতে এই চুক্তির আলোকেই গঠিত হয় তিনটি পার্বত্য জেলায় পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন-১৯৯৮, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইন-১৯৯৮ এবং পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন-২০০১ (সংশোধিত ২০১৬)। এসব আইনের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও উপ-অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি’ শব্দটিকেই প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি ও তার সংগঠন রাষ্ট্রের সাথে দ্বিপক্ষীয় সংলাপে নিজেদের সাংবিধানিক ও আইনি পরিচয় ‘উপজাতি’ হিসেবে মেনে নেন এবং তার ভিত্তিতে বিগত প্রায় ৩ দশক (মানে প্রায় ২৯ বছর) ধরে রাষ্ট্রের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করেন, সেখানে আজ তারাই আবার একই কণ্ঠে নিজেদের ‘আদিবাসী’ দাবি করা চরম এক স্ববিরোধিতা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ও জনমিতির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, অঞ্চলটিতে বর্তমানে বসবাসরত মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকের বেশি নাগরিকই বাঙালি (৫১%)। অবাঙ্গালি বা উপজাতি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমন্বিত হার প্রায় ৪৯%। এর মধ্যে প্রধান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলো চাকমা যা প্রায় ২৫% এর মত। আর বাকি ২৪ শতাংশ মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো। অথচ, চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তা কেবল জনসংখ্যাগত দিক থেকেই নয়, বরং মানবাধিকার ও সাংবিধানিক সমতার বিচারেও প্রচণ্ড বৈষম্যমূলক।

বাঙালিরা ৫১ শতাংশ হলেও চুক্তির শর্তানুযায়ী সংশোধিত জেলা পরিষদ আইনে নেতৃত্বে এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) রাখা হয়েছে। আর বাকি ৪৯ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে রাখা হয়েছে ৬৭ শতাংশ। কিন্তু সেটাও লঙ্ঘিত হয়ে আসছে। যেমন গত বৈষম্যবিরোধী সরকারের সময় পার্বত্য জেলা পরিষদে ১৫ সদস্যের পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। সেখানে ১৫ সদস্যের জেলা পরিষদে এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) অ-উপজাতীয় বাঙালির সদস্য সংখ্যা গড়ে মাত্র চারজন (২৬ শতাংশ), যেখানে অবাঙ্গালি উপজাতিদের প্রতিনিধিত্ব ১১ জন (৭৪ শতাংশ)। চাকরির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। উদাহরণস্বরূপ, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে সিএইচটি-ইউএনডিপির যৌথ প্রকল্পে গত ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১৯ জনের নিয়োগে মাত্র ২ জন (১০ শতাংশেরও কম) বাঙালি নিয়োগ পান, আর অবশিষ্ট ১৭ জনই (৯০ শতাংশের বেশি) অবাঙ্গালি উপজাতীয় সম্প্রদায় থেকে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, যেখানে সমতার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে পাহাড়ের অর্ধেকেরও বেশি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিয়ত সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।

‘আদিবাসী’ দাবির পেছনের ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য

আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদ (আইএলও কনভেনশন ১৬৯ এবং ইউএনডিআরআইপি) অনুযায়ী ‘আদিবাসী’ বা ‘ইনডিজেনাস’ শব্দের একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও অধিকারের রূপরেখা রয়েছে। কোনো জনগোষ্ঠী যদি ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি পায়, তবে সেই ভূখণ্ডের ওপর তাদের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ (সেলফ-ডিটারমিনেশন), নিজস্ব ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়। ফলে সেখানে মূল রাষ্ট্র বা দেশের অন্যান্য নাগরিকদের অধিকার খর্ব হয় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের আন্তর্জাতিক বৈধতা তৈরি হয়।

নৃবিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো (যেমন: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা) বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার (আরাকান), ভারত বা ত্রিপুরা থেকে অভিবাসিত হয়ে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছেন। এই ভূখণ্ডের ভূমিপুত্র বা প্রকৃত আদিবাসী বাঙালিরা। সুতরাং, আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞায় পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো কখনোই ‘আদিবাসী’ নয়, বরং তারা ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী’।

১৯৯৭ সালে যখন তারা চুক্তি করেছিলেন, তখন উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ে একটি বিশেষ প্রশাসনিক সুবিধা আদায় করা। পরবর্তীতে যখন তারা দেখলেন যে রাষ্ট্র সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ৬(২) ও ২৩(ক)-তে দেশের সকল নাগরিককে ‘বাঙালি’ এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র সম্প্রদায়কে ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করল, তখন তারা কৌশল পরিবর্তন করেন। এখন ‘আদিবাসী’ শব্দের আড়ালে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করে অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র বা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গঠনের অশুভ এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র, আলাদা মানচিত্র, নিজস্ব পতাকা ও মুদ্রার মতো বিষয়গুলোর প্রকাশ ঘটিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের অন্তর্দাহ প্রকাশ করেছে।

উচ্চ আদালতের রায় ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও চুক্তির বেশ কয়েকটি সাংবিধানিক অসংগতি নিয়ে মহামান্য হাইকোর্টে রিট (মামলা নম্বর ২৬৬৯/২০০০ এবং ৬৪৫১/২০০৭) করা হয়েছিল। ২০১০ সালের ১২ ও ১৩ এপ্রিল তৎকালীন বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। রায়ে স্পষ্ট বলা হয়, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইনের অনুচ্ছেদ ৪০ ও ৪১ রাষ্ট্রের একক সত্তাকে খর্ব করে এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১-এ রক্ষিত রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। হাইকোর্ট আঞ্চলিক পরিষদকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং জেলা পরিষদ আইনের বেশ কিছু ধারাকে অসাংবিধানিক আখ্যা দেন।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে, জেলা পরিষদ আইনের ৬ নম্বর ধারায় কোনো ব্যক্তি ‘উপজাতীয়’ বা ‘অ-উপজাতীয়’ কি না, তা নির্ধারণের ক্ষমতা সার্কেল চিফ ও হেডম্যানদের হাতে দেওয়া নিশ্চিতভাবে বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮(১), ২৯(১) ও ৩১-এর লঙ্ঘন। এর মাধ্যমে একজন বাঙালি নাগরিককে পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ ও জমির মালিকানা থেকে বেআইনিভাবে বঞ্চিত করা হয়। বর্তমানে এ মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রিভিউ শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সন্তু লারমাসহ জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা, সকল অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরকারের কাছে সমর্পণ করা এবং তালিকা জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত প্রায় আড়াই দশকে তারা পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র সমর্পণ তো করেইনি, বরং পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের মহড়া ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছে। একটি জেএসএস থেকে এখন ৪টি গ্রুপসহ মোট ৭টি সশস্ত্র সংগঠন পাহাড় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

সরকারি চাকরিতে কোটা, বিশেষ সুযোগ-সুবিধা এবং আঞ্চলিক পরিষদের সভাপতির পদসহ সকল সুবিধা উপজাতি হিসেবে গ্রহণ করার পর, এখন আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ হিসেবে ‘আদিবাসী’ পরিচয় দাবি করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে যেখানে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে পাহাড়ে বসবাসকারী ৫১ শতাংশ অ-উপজাতি তথা পার্বত্য বাঙালিকে অধিকারহারা রেখে কোনো টেকসই শান্তি সম্ভব নয়। ‘উপজাতি’ বনাম ‘আদিবাসী’ বিতর্ক বন্ধ করে সংবিধান ও উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে পাহাড়ের প্রতিটি নাগরিকের—তা সে বাঙালি হোক বা অবাঙ্গালি—সমান অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। নচেৎ, ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের আড়ালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেশের মানচিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে চক্রান্ত চলছে, তা জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

দুদক সচিব হিসেবে যোগ দিলেন সাইদুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ৮:০২ অপরাহ্ণ
দুদক সচিব হিসেবে যোগ দিলেন সাইদুর রহমান

দীর্ঘ ৫ মাস শূন্য থাকার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর সচিব হিসেবে যোগদান করেছেন মো. সাইদুর রহমান খান। যোগ দিয়েই তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে দুদক কমিশন গঠন করা হবে।

রোববার (২ আগস্ট) তিনি দুদক সচিব হিসেবে যোগদান করেন।

তিনি বলেন, আমরা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এর অংশ হিসেবে এখানে যোগ দিয়েছি। ‎দ্রুততম সময়ে কমিশন গঠন হবে। নতুন সরকার গঠন হয়েছে। সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার আছে। সংস্কারে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

এর আগে, গত ৩০ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে দুদকের সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয়। এর আগে তিনি গত ৫ জানুয়ারী থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচের একজন সদস্য।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ