প্রিয় মানুষটিকে হারানোর পর শূন্যতা গ্রাস করেছিল জীবন। ২৫ বছরের সংসারের সঙ্গী, আত্মার বন্ধু জ্যাকিকে ক্যানসারের কাছে হারিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন কানাডার মার্ক হার্বস্ট। কিন্তু সেই শোক তাঁকে থামিয়ে দেয়নি। বরং স্ত্রীকে দেওয়া এক প্রতিশ্রুতিই হয়ে উঠল নতুন পথচলার শক্তি। ৬৯ বছর বয়সে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন পৃথিবী প্রদক্ষিণে। সঙ্গে নিলেন প্রিয়তমা স্ত্রীর চিতাভস্ম। দীর্ঘ ৩২৪ দিনের সেই অভিযানে ৩০ হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে শেষ পর্যন্ত গড়লেন বিশ্বরেকর্ড।
শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণ নয়, মার্কের এই যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ক্যানসার গবেষণায় সহায়তা এবং প্রবীণদের জন্য একটি বার্তাও—ইচ্ছাশক্তি থাকলে বয়স কখনোই স্বপ্নের পথে শেষ কথা নয়।
২৫ বছরের সঙ্গী হারানোর পর বদলে গেল জীবন
জ্যাকি ছিলেন মার্কের কাছে শুধু স্ত্রী নন, ছিলেন তাঁর আত্মার সঙ্গী ও সবচেয়ে কাছের বন্ধু। সাত বছর ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করার পর ২০২১ সালে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে মারা যান জ্যাকি।
প্রিয় মানুষটির মৃত্যুর পর তাঁর স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরেই নতুন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন মার্ক। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস কর্তৃপক্ষকে নিজের স্ত্রী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘জ্যাকি আমার সবকিছু ছিল, আমার আত্মার সঙ্গী এবং আমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু।’ জ্যাকির অসম্পূর্ণ ইচ্ছাগুলোর কিছু পূরণ করার পাশাপাশি তাঁর স্মৃতিকে বিশ্বভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্তে বাঁচিয়ে রাখার পরিকল্পনা করেন মার্ক।
ব্যাংকক থেকে শুরু, আবার সেখানেই প্রত্যাবর্তন
২০২৫ সালের ৮ জানুয়ারি থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে শুরু হয় মার্কের ঐতিহাসিক যাত্রা। লক্ষ্য ছিল একটাই—সাইকেলে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা। এরপর একের পর এক দেশ পেরিয়ে এগিয়ে যান তিনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে মধ্য ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া হয়ে যুক্তরাষ্ট্র—দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দিতে হয়েছে তাঁকে। সব মিলিয়ে ২৫টি দেশ অতিক্রম করেন তিনি। ৩২৪ দিন পর, ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর আবারও ব্যাংককের সেই জায়গায় ফিরে আসেন মার্ক। তাঁর সাইকেলের চাকা তখন ঘুরে ফেলেছে ৩০ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ।
সঙ্গে ছিল জ্যাকির চিতাভস্ম
এই বিশ্বভ্রমণের সবচেয়ে আবেগঘন অধ্যায় ছিল জ্যাকির উপস্থিতি। জীবিত অবস্থায় জ্যাকি যেসব জায়গায় যেতে চেয়েছিলেন, সেসব স্থানে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছেন মার্ক। সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন স্ত্রীর চিতাভস্ম। যেসব জায়গা জ্যাকি দেখতে চেয়েছিলেন, সেখানে গিয়ে তাঁর চিতাভস্ম ছড়িয়ে দেন মার্ক। ফলে প্রতিটি গন্তব্য তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল স্ত্রীর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া একেকটি স্মৃতি। এক অর্থে, পৃথিবীর চারপাশে এই দীর্ঘ সাইকেলযাত্রায় মার্ক একা ছিলেন না—সঙ্গী ছিলেন তাঁর প্রিয় জ্যাকির স্মৃতিও।
রেকর্ডের চেয়ে বড় ছিল অন্য একটি লক্ষ্য
মার্কের অভিযানের উদ্দেশ্য শুধু গিনেস রেকর্ডে নাম তোলা ছিল না। ক্যানসারে স্ত্রীকে হারানোর অভিজ্ঞতা থেকেই ক্যানসার গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেন তিনি। অভিযানের মাধ্যমে কানাডার প্রিন্সেস মার্গারেট ক্যানসার ফাউন্ডেশনের জন্য প্রায় ৬৮ হাজার কানাডিয়ান ডলার সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন। অর্থাৎ তাঁর ব্যক্তিগত শোকের গল্পটি শেষ পর্যন্ত ক্যানসার গবেষণায় সহায়তার একটি উদ্যোগেও রূপ নেয়।
অচেনা মানুষ হয়ে উঠলেন আপন
হাজার হাজার কিলোমিটারের এই যাত্রায় পথের কষ্ট যেমন ছিল, তেমনি ছিল মানুষের ভালোবাসাও। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্য ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পেয়েছেন অকৃত্রিম সহযোগিতা।
মালয়েশিয়ায় পুলিশ তাঁকে এসকর্ট দিয়েছে। পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় এক নারী তাঁর ক্যাফেতে রাতে থাকার সুযোগ করে দেন। আবার অনেক অপরিচিত মানুষ নিজেদের বাড়ির দরজা খুলে দিয়েছেন তাঁর জন্য। কেউ দিয়েছেন খাবার, কেউ থাকার জায়গা, কেউবা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা। এই ছোট ছোট মানবিক মুহূর্তগুলোই মার্কের দীর্ঘ অভিযানের অন্যতম বড় প্রাপ্তি হয়ে ওঠে।
৬৯ বছর বয়সে নতুন ইতিহাস
মার্কের এই অভিযানের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিও এসেছে। সাইকেলে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করা সবচেয়ে বয়স্ক পুরুষ হিসেবে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের খেতাব এখন তাঁর এর আগে এই রেকর্ডের মালিক ছিলেন নিউজিল্যান্ডের ৬৬ বছর বয়সী ক্রিস্টোফার বেনেট। মার্ক তাঁর চেয়ে তিন বছর বেশি বয়সে এই মাইলফলক স্পর্শ করেছেন।
তবে মার্কের গল্পে সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে তাঁর যাত্রার কারণ। স্ত্রীকে হারানোর বেদনা, তাঁর স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়া, ক্যানসার গবেষণার জন্য অর্থ সংগ্রহ এবং বয়সকে উপেক্ষা করে নতুন স্বপ্নের পথে এগিয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে এটি শুধু একটি বিশ্বভ্রমণের গল্প নয়; বরং ভালোবাসা, প্রতিশ্রুতি ও অদম্য মানসিক শক্তির এক অনন্য কাহিনি।
জ্যাকিকে হারানোর চার বছর পরও তাঁর স্মৃতিকে সঙ্গে নিয়ে পৃথিবী ঘুরে দেখলেন মার্ক। আর সেই যাত্রার শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে হাতে উঠল বিশ্বরেকর্ড—যেন প্রিয় মানুষটিকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির এক প্রতীকী পূর্ণতা।
কালের আলো/জেএন
আপনার মতামত লিখুন
Array