২২ হাজার ২১৩ কোটি টাকার অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে। আধুনিক যন্ত্রপাতিও বসানো হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর থেকে ফ্লাইট চালুর লক্ষ্য নিয়ে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিও চলছে। কিন্তু হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের সামনে এখন সবচেয়ে বড় বাধা কোনো নির্মাণকাজ নয়—কে, কী শর্তে এবং কোন কাঠামোয় টার্মিনালটি চালাবে, সেই চুক্তি।
জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। রাজস্ব ভাগাভাগি, বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং থেকে আয়ের অংশ এবং সেই আয়ের নিশ্চয়তায় রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি—একাধিক শর্তে দুই পক্ষের দরকষাকষি চলছে। বেবিচক ৩১ অক্টোবরের মধ্যে চুক্তি সেরে ফেলতে চাইছে। কারণ চুক্তি যত পিছোবে, ডিসেম্বরের চালুর সময়সূচিও তত অনিশ্চিত হবে।
- অবকাঠামো প্রস্তুত হলেও পরিচালনা চুক্তিতে অচলাবস্থা
- জাপানের সঙ্গে রাজস্ব ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়ে দরকষাকষি
- সামনে ডিসেম্বরের সময়সীমা
এর মধ্যে প্রকল্পের ব্যয়ও থামছে না। সর্বশেষ ৮৪৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় করা হয়েছে ২২ হাজার ২১৩ কোটি ৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ব্যয়ের অঙ্ক বাড়ছে, ভবন প্রস্তুত হচ্ছে; কিন্তু যাত্রীসেবা শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় অপারেশনাল কাঠামো এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
জটের কেন্দ্রে জাপানি কনসোর্টিয়াম
তৃতীয় টার্মিনালের মূল অবকাঠামোর বড় অংশের কাজ শেষ। আধুনিক ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং, বোর্ডিং ব্রিজ, মেকানিক্যাল সার্ভিস ও আইটি নেটওয়ার্কও স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু বিমানবন্দর পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল, সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন ও অপারেশনাল কাঠামো এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। পিপিপি মডেলে টার্মিনালের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব জাপানি কনসোর্টিয়ামের হাতে দেওয়ার কথা। আগস্টে তারা কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে।
মূল্যায়ন শেষে আলোচনা শুরু হলেও চুক্তির শর্ত নিয়ে এখনো সমঝোতা হয়নি। বেবিচকের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, সময়ক্ষেপণের কারণে উদ্বেগ বাড়ছে। কারণ চুক্তি স্বাক্ষরের পরও জাপানি অপারেটরের জনবল নিয়োগ, প্রযুক্তিগত সিস্টেম স্থাপন এবং ট্রায়াল রান শেষ করতে সময় লাগবে।
৮৫ শতাংশ থেকে নতুন দরকষাকষি
আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গা রাজস্ব ভাগাভাগি। আগের কাঠামোয় জাপানি অংশীদারের অংশ ছিল ৮৫ শতাংশ, বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ। নতুন প্রস্তাব ঘিরে পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, আয়-ব্যয় ও অংশীদারত্বের কাঠামো নিয়ে চলছে দরকষাকষি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবসা।
বিমান তৃতীয় টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পরিচালনা করতে পারবে—এমন কাঠামো নিয়ে আলোচনা রয়েছে। কিন্তু এই খাতের আয় থেকেও অংশ চাচ্ছে জাপানি প্রতিষ্ঠান। বিমানের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, টার্মিনাল দ্রুত চালুর স্বার্থে এ বিষয়ে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রয়েছে। তবে জাপানি পক্ষ আয় ভাগাভাগির পাশাপাশি রাষ্ট্রের কাছ থেকে লিখিত গ্যারান্টি চাইছে। ফলে একটি টার্মিনাল চালুর চুক্তি এখন শুধু অপারেশনাল বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব ও রাষ্ট্রীয় দায়ের প্রশ্নও।
চুক্তি হলেও সময় থাকবে মাত্র কয়েক সপ্তাহ
বেবিচক ৩১ অক্টোবরের মধ্যে চুক্তি করতে চাইছে। কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরই শেষ ধাপ নয়। অপারেটরকে জনবল নিয়োগ, নিজস্ব সিস্টেম স্থাপন, প্রশিক্ষণ ও ট্রায়াল রান করতে হবে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থার ছাড়পত্র, নিরাপত্তা মহড়া এবং গ্রাউন্ড অপারেশনের সক্ষমতা যাচাইও প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, টার্মিনালের সামগ্রিক প্রকল্পের প্রায় ১০ শতাংশ কাজ এখনো বাকি। এর মধ্যে রয়েছে শেষ মুহূর্তের অভ্যন্তরীণ কাজ, সফটওয়্যার ও ডেটা ইন্টিগ্রেশন, কাস্টমস-ইমিগ্রেশনের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কিছু যন্ত্রপাতি স্থাপন। ফলে অক্টোবরের শেষে চুক্তি হলেও ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ফ্লাইট চালু করতে প্রস্তুতির জন্য সময় থাকবে খুবই সীমিত।
ব্যয় বাড়ছে, সময়ও গড়াচ্ছে
প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা দিয়ে শুরু হয়েছিল তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প। কয়েক দফা সংশোধনের পর ব্যয় ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকার বেশি হয়। সর্বশেষ আরও ৮৪৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা যোগ হয়েছে। এতে প্রকল্পের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২১৩ কোটি ৯ লাখ টাকা। এখন তাই প্রকল্পের সাফল্যের মাপকাঠি শুধু নির্মাণ শেষ হওয়া নয়। এত বড় বিনিয়োগের অবকাঠামো কত দ্রুত পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছে, সেটিই হয়ে উঠেছে মূল প্রশ্ন।
কক্সবাজারে নতুন টার্মিনাল, ঢাকায় পুরোনো জট
থার্ড টার্মিনালের জটিলতার বিপরীতে কক্সবাজারে এগিয়েছে নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালের কার্যক্রম। পরীক্ষামূলক যাত্রীসেবা শুরু হয়েছে। চলতি মাসেই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর কথা। নতুন টার্মিনালে রয়েছে সাতটি স্ক্যানার, ১৪টি চেক-ইন কাউন্টার এবং ১০টি ইমিগ্রেশন ডেস্ক। হোল্ড ও কেবিন ব্যাগেজ স্ক্যানিংয়ের পাশাপাশি রয়েছে আধুনিক ব্যাগেজ কন্ট্রোল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা। কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) গোলাম মোর্তজা হোসেন জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য তারা প্রস্তুত এবং প্রয়োজনীয় জনবলও রয়েছে।
এখন প্রশ্ন একটাই
শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনালকে দেশের এভিয়েশন খাতের ‘গেম চেঞ্জার’ বলা হচ্ছে। কিন্তু ১৬ ডিসেম্বরের লক্ষ্য পূরণ এখন নির্ভর করছে কয়েকটি শর্তের ওপর—চুক্তি, অপারেটরের প্রস্তুতি, ট্রায়াল রান, নিরাপত্তা মহড়া এবং প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দরজাটি এখনো খোলেনি। ২২ হাজার কোটি টাকার টার্মিনাল দাঁড়িয়ে আছে; এখন দেখার বিষয়, ৩১ অক্টোবরের মধ্যে চুক্তির তালা খুলে ১৬ ডিসেম্বর সত্যিই আকাশে ওঠে কি না প্রথম ফ্লাইট।
কালের আলো/টিইকে/এমকে
আপনার মতামত লিখুন
Array