খুঁজুন
                               
, ,
           

জামায়াতের কোনো ব্যাংক নেই: সংসদে তাহের

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ৮:২৭ অপরাহ্ণ
জামায়াতের কোনো ব্যাংক নেই: সংসদে তাহের

জামায়াতে ইসলামীর কোনো ব্যাংক নেই বলে জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ও দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের।

তিনি বলেন, আমাদের যারা এমপি আছি, ইসলামী ব্যাংকে তাদের কেউ পরিচালক নেই। আমরা কোনো ঋণ পুনঃতফসিলও করিনি।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

এর আগে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, অনেক দল আছে তাদের নাকি ব্যাংকও আছে। বিএনপির ব্যাংক নেই।
বিষয়টির জবাব দিতে গিয়ে তাহের আরও বলেন, ইসলামী ব্যাংক ছিল একদল সৎ ও উদ্যোগী মানুষের প্রচেষ্টার ফসল। যদি বলেন ইসলামী ব্যাংক পরিচালনায় আমাদের ভূমিকা আছে, তবে আমরা তা স্বীকার করি।

রাজাকার, আল-বদর প্রসঙ্গেও নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন জামায়াতের এই নেতা। তিনি বলেন, আজ আমাদের অনেক বেশি করে রাজাকার, আল-বদর বলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা যারা এখানে বসে আছি, আমরা কেউ রাজাকার বা আল-বদর ছিলাম না। আমরা জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান নেতৃত্ব। যদি বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বলেন, তবে আমিও একজন ‘শিশু মুক্তিযোদ্ধা’।

সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের আরও বলেন, আমার বাড়ি ছিল সীমান্তের কাছে। যারা ভারতে শরণার্থী হিসেবে যেত, তারা আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিত, আমরা তাদের নাস্তা খাওয়াতাম এবং সেনাবাহিনী টহল দিচ্ছে কি না, তা পাহারা দিতাম। সেনাবাহিনী দূরে থাকলে আমরা তাদের পথ দেখিয়ে দিতাম, যাতে তারা নিরাপদে ভারতে পার হতে পারেন। সুতরাং, এ ধরনের দাবি করার অধিকার কারও নেই।

এ সময় তাহের আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় ‘রাজাকার’ মাওলানা নুরুল ইসলাম ও জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় শাহ আজিজের মতো ব্যক্তিদের রাখার কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

বক্তব্যের শেষ দিকে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সমঝোতা এবং সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে এই জামায়াত নেতা বলেন, দেশের নীতির ব্যাপারে মতপার্থক্য থাকলে আমরা তার বিরোধিতা করি, কিন্তু দলে দলে এই রেষারেষি পরিবেশকে সুন্দর রাখবে না। এতে দেশ ও আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবো।

১৯৯১ সালে বিএনপিকে সরকার গঠনে সমর্থন দিয়ে ১৯৯৬ সালে জামায়াত আলাদা নির্বাচন করে। তার জন্য ওই সময় বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষকে দায়ী করেন তাহের। তিনি বলেন, এবারও সেরকম কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকলে পরিস্থিতি খারাপ হবে। আমরা চাই এই সংসদ ও এই সরকার সুস্থ ধারায় চলুক। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব গণ্ডগোল হচ্ছে, সেদিকে আপনারা নজর দিন। যারাই বিশৃঙ্খলা করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গঠিত অতীতের সরকারের পরিণতি সম্পর্কে বিএনপিকে সতর্ক করেন বিরোধী দলীয় উপনেতা। অতীত উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিলেন, শেখ সাহেব (শেখ মুজিবুর রহমান) নিহত হয়েছিলেন… শহীদ জিয়াউর রহমানের সময়ের ঘটনাগুলো আমাদের আতঙ্কিত করে।

দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করে সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেন, উপমহাদেশে ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে, পাকিস্তানে বেনজির ভুট্টোর সময়ে, বাংলাদেশে শেখ সাহেবের (শেখ মুজিবুর রহমান) সময়ে, তারপর শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে এবং বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে আমরা অবস্থা দেখেছি। এর একটা ভয়ঙ্কর পরিণতি আমরা দেখি। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা চাই, এ ধরনের কোনো অঘটন বাংলাদেশে আর কখনো না ঘটুক।

বক্তব্যের শুরুতেই তিনি সংসদের বর্তমান অবস্থাকে অতীতের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, আজকে যারা সরকারি দলের আসনে আছেন, তারা বোধহয় আওয়ামী লীগ থেকে এসেছেন। আর আমরা যারা এদিকে আছি, তারা বোধহয় জামায়াত-বিএনপির সংসদ সদস্য। কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় ছিল এবং আমরা বিরোধী দলে ছিলাম, তখন আওয়ামী লীগ যে ভাষায়, যে ভঙ্গিতে, যে চেতনায় এবং যেমন বিষয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে বলতো এবং আচরণ করতো, ঠিক আজকে সরকারি দলের পক্ষ থেকে আমরা একই ধরনের আচরণ লক্ষ্য করছি।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই সংগ্রামে বিএনপি, জামায়াত এবং অন্যান্য দলগুলো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে সমানভাবে সংগ্রামে একত্রিত ছিলাম। অনেক সময় গোপনে একই গাড়িতে চড়ে ঘুরে ঘুরে আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলনের কর্মকৌশল এবং কর্মসূচি ঠিক করেছিলেন।

আন্দোলনের সময়কার ঐক্যের প্রসঙ্গ তুলে তাহের বলেন, আমরা সবাই তখন বলেছি যে, আমরা এই সংগ্রামের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের এই পতনের পর যে রাজনীতি হবে… আমরা সকলে মিলে একটা সুশাসনের জন্য কাজ করবো। এ পর্যন্ত কিন্তু আমরা পুরোপুরি ঐকমত্যে ছিলাম।

নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলে গেছে উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করেন, সরকার গঠনের পরে আমরা আবার একটা ভিন্ন চিত্র দেখতে পাচ্ছি, যেটা এই জাতিকে হতাশ করবে।

সংসদীয় আচরণে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, শুধু সংসদে মুক্তি দিয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। এজন্য সত্যিকারভাবেই আমাদের মনের পরিবর্তন এবং আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। একই সঙ্গে বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকার কথাও তুলে ধরে বলেন, আমরা এখানে অন্যান্য যে ঐতিহ্যগুলো আগে ছিল— কিছু হলেই ‘মানি না’, ‘আসবো না’, গণ্ডগোল করা— সেটা কিন্তু আমরা করিনি।

সংসদে ব্যবহৃত ভাষা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে তাহের বলেন, গতকাল আমি শুনেছি স্বাস্থ্যমন্ত্রী নাকি ‘তুই রাজাকার’ বলেছেন। সংসদের ভেতরে আমার মনে হয় এটি খুবই অরুচিকর ও অসংগত একটি শব্দ।

‘জুলাই সনদ’ প্রসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, ৩১টি রাজনৈতিক দল একত্রিত হয়ে তৈরি করেছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে কতগুলো জিনিস যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে তারা তাদের অনুসারী করবে— এটা কিন্তু আমাদের আলোচনার অংশ ছিল না। সেটা ছিল জুলাই সনদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা।

গণভোট ইস্যুতেও দ্বিমত তুলে ধরে বিরোধী দলীয় উপনেতা বলেন, আমরা চেয়েছিলাম যে গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন আলাদাভাবে হবে। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে খুব জোরালোভাবে বলা হয়েছিল যে গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হতে হবে। আপনাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই আমাদের নারাজি সত্ত্বেও গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন একসঙ্গে হয়েছে।

তিনি সতর্ক করেন, দেশের জন্য যেটা কল্যাণকর তা বাদ দিয়ে যদি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যা ইচ্ছা তাই করতে থাকেন, তবে এ দেশ আবার পিছিয়ে যাবে।

জামায়াত পাকিস্তান গঠনের বিরুদ্ধে ছিল, এ তথ্যের প্রতিবাদ জানিয়ে তাহের বলেন, আমরা বা জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের বিরোধী ছিল বলে যে তথ্য আসছে, তা একেবারেই অসত্য। মাওলানা মওদুদী ছিলেন ‘দ্বিজাতি তত্ত্বের’ প্রথম প্রবক্তা, তিনি সম্পূর্ণভাবে পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন।

বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাসের সময় অবস্থান নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তার ভাষায়, ম্যাডাম (বেগম জিয়া) যখন জেলে ছিলেন, তখন জামায়াত কোনো বিবৃতি দেয়নি— এটা একেবারে অসত্য কথা। আমরা বারবার বিবৃতি দিয়েছি, শুধু বক্তব্যই নয়, উনার মুক্তির জন্য রাজপথে মিছিলও করেছি।

কালের আলো/এসআর/এএএন

বগুড়ার উন্নয়নে ছাড় নয়: মীর শাহে আলম

বগুড়া প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ১১:৪৮ অপরাহ্ণ
বগুড়ার উন্নয়নে ছাড় নয়: মীর শাহে আলম

স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম বলেছেন, বগুড়া ২০ বছর ধরে বঞ্চিত ছিল- শূন্য ছিল উন্নয়নের বিচারে। সেই শূন্যস্থান পূরণ করা হচ্ছে। কাজেই এই জেলার উন্নয়নে এক বিন্দু ছাড় দেওয়া হবে না।

 যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ‘তথ্যপ্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন বগুড়ায় যুবদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় দেশব্যাপী এআই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বগুড়ায় এসে এসব কথা বলেন তিনি।

রোববার(২ আগষ্ট)  বগুড়ার মম ইন অডিটোরিয়ামে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে এ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, বগুড়া জেলার সংসদ সদস্যরাসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে সরকারের এ উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সহায়ক হবে। তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের অর্জিত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান।

উদ্বোধনী বক্তব্যে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে যুবসমাজকে প্রযুক্তিনির্ভর কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করতে সরকার কাজ করছে। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তিনি বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে এ ধরনের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

কালের আলো/জেএন/এমএসআইপি 

পার্বত্য চট্টগ্রাম: পরিচয় বিতর্ক নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সংহতি

এ এইচ এম ফারুক:
প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ১০:৩২ অপরাহ্ণ
পার্বত্য চট্টগ্রাম: পরিচয় বিতর্ক নয়, প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সংহতি

বাংলাদেশ একটি একক, অবিভাজ্য ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র। কিন্তু দেশের এক-দশমাংশ ভূখণ্ড নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি বিশেষ ভূ-রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক বজায় রাখার অপচেষ্টা চলছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল স্বায়ত্তশাসন দাবি। কিন্তু ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির জন্য উপজাতিয় নেতৃবৃন্দের দাবি দাওয়া নিয়ে জিয়াউর রহমান সরকার আলোচনা শুরু করেন। এরপর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকার ৯ বছরে ৬ বার, বেগম খালেদা জিয়ার ১৯৯১ এর সরকার ৫ বছরে ১৩ বার এবং ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী সরকার গঠিত হলে জাতীয় কমিটির সাথে ৭ বার আলোচনা করে ১৯৯৭ সালে আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততায় চুক্তিটি স্বাক্ষর করে সম্পাদিত করেছে।

কিন্তু এরপর আবার ২০০৭ সালে জাতিসংঘ সনদ (ইউএনডিআরআইপি) ঘোষণার পর থেকে শুরু হয় নতুন তৎপরতা। এখন তা গড়িয়েছে ‘উপজাতি’ বনাম ‘আদিবাসী’ শব্দগত ও পরিচয়গত টানাপোড়েন।

অথচ ১৯৯৭ সালের চুক্তির পক্ষ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) ও তার শীর্ষ নেতা সন্তু লারমা স্বজ্ঞানে ও আত্মবিশ্বাসের সাথে নিজেদের ‘উপজাতি’ পরিচয়েই চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। তবে চুক্তির দীর্ঘ এক দশক পর ২০০৭ সালেরপর কেনো নিজেদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে বিশ্বমঞ্চে ও দেশের ভেতরে প্রতিষ্ঠা করার এক মরিয়া প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে—১৯৯৬-৯৭ সালে যে গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের ‘উপজাতি’ হিসেবে মেনে নিয়ে চুক্তিতে স্বাক্ষর করল, এখন তারা হঠাৎ ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতির দাবীতে সোচ্চার কেন? এর পেছনে কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক রহস্যটাই বা কী?

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মূল পাঠ পরীক্ষা করলে দেখা যায়, চুক্তির ‘ক’ খণ্ডের ১ নং ধারায় পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একইভাবে ‘খ’ খণ্ডের ১ নং ধারায় স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের আইনে ‘উপজাতি’ শব্দটি বহাল থাকবে। চুক্তির মোট ৭২টি ধারার মধ্যে অন্তত ৫০ বার ‘উপজাতি’ বা ‘উপজাতীয়’ শব্দগুচ্ছটি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। সন্তু লারমা ও তাঁর প্রতিনিধিরা এই প্রতিটি ধারায় স্বাক্ষর করেছেন। পরবর্তীতে এই চুক্তির আলোকেই গঠিত হয় তিনটি পার্বত্য জেলায় পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন-১৯৯৮, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইন-১৯৯৮ এবং পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন-২০০১ (সংশোধিত ২০১৬)। এসব আইনের প্রতিটি অনুচ্ছেদ ও উপ-অনুচ্ছেদে ‘উপজাতি’ শব্দটিকেই প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একজন নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি ও তার সংগঠন রাষ্ট্রের সাথে দ্বিপক্ষীয় সংলাপে নিজেদের সাংবিধানিক ও আইনি পরিচয় ‘উপজাতি’ হিসেবে মেনে নেন এবং তার ভিত্তিতে বিগত প্রায় ৩ দশক (মানে প্রায় ২৯ বছর) ধরে রাষ্ট্রের প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করেন, সেখানে আজ তারাই আবার একই কণ্ঠে নিজেদের ‘আদিবাসী’ দাবি করা চরম এক স্ববিরোধিতা।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ও জনমিতির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, অঞ্চলটিতে বর্তমানে বসবাসরত মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ লাখের কাছাকাছি। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেকের বেশি নাগরিকই বাঙালি (৫১%)। অবাঙ্গালি বা উপজাতি ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমন্বিত হার প্রায় ৪৯%। এর মধ্যে প্রধান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হলো চাকমা যা প্রায় ২৫% এর মত। আর বাকি ২৪ শতাংশ মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো। অথচ, চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ে যে প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, তা কেবল জনসংখ্যাগত দিক থেকেই নয়, বরং মানবাধিকার ও সাংবিধানিক সমতার বিচারেও প্রচণ্ড বৈষম্যমূলক।

বাঙালিরা ৫১ শতাংশ হলেও চুক্তির শর্তানুযায়ী সংশোধিত জেলা পরিষদ আইনে নেতৃত্বে এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) রাখা হয়েছে। আর বাকি ৪৯ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে রাখা হয়েছে ৬৭ শতাংশ। কিন্তু সেটাও লঙ্ঘিত হয়ে আসছে। যেমন গত বৈষম্যবিরোধী সরকারের সময় পার্বত্য জেলা পরিষদে ১৫ সদস্যের পরিষদ পুনর্গঠন করা হয়। সেখানে ১৫ সদস্যের জেলা পরিষদে এক-তৃতীয়াংশ (৩৩ শতাংশ) অ-উপজাতীয় বাঙালির সদস্য সংখ্যা গড়ে মাত্র চারজন (২৬ শতাংশ), যেখানে অবাঙ্গালি উপজাতিদের প্রতিনিধিত্ব ১১ জন (৭৪ শতাংশ)। চাকরির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। উদাহরণস্বরূপ, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে সিএইচটি-ইউএনডিপির যৌথ প্রকল্পে গত ২০২৪ সালের নভেম্বরে ১৯ জনের নিয়োগে মাত্র ২ জন (১০ শতাংশেরও কম) বাঙালি নিয়োগ পান, আর অবশিষ্ট ১৭ জনই (৯০ শতাংশের বেশি) অবাঙ্গালি উপজাতীয় সম্প্রদায় থেকে নেওয়া হয়। অর্থাৎ, যেখানে সমতার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে পাহাড়ের অর্ধেকেরও বেশি বাঙালি জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিয়ত সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে।

‘আদিবাসী’ দাবির পেছনের ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্য

আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদ (আইএলও কনভেনশন ১৬৯ এবং ইউএনডিআরআইপি) অনুযায়ী ‘আদিবাসী’ বা ‘ইনডিজেনাস’ শব্দের একটি সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও অধিকারের রূপরেখা রয়েছে। কোনো জনগোষ্ঠী যদি ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি পায়, তবে সেই ভূখণ্ডের ওপর তাদের ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার’ (সেলফ-ডিটারমিনেশন), নিজস্ব ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা পায়। ফলে সেখানে মূল রাষ্ট্র বা দেশের অন্যান্য নাগরিকদের অধিকার খর্ব হয় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের আন্তর্জাতিক বৈধতা তৈরি হয়।

নৃবিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো (যেমন: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা) বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার (আরাকান), ভারত বা ত্রিপুরা থেকে অভিবাসিত হয়ে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছেন। এই ভূখণ্ডের ভূমিপুত্র বা প্রকৃত আদিবাসী বাঙালিরা। সুতরাং, আন্তর্জাতিক আইনের সংজ্ঞায় পাহাড়ে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো কখনোই ‘আদিবাসী’ নয়, বরং তারা ‘উপজাতি’ বা ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী’।

১৯৯৭ সালে যখন তারা চুক্তি করেছিলেন, তখন উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়ে একটি বিশেষ প্রশাসনিক সুবিধা আদায় করা। পরবর্তীতে যখন তারা দেখলেন যে রাষ্ট্র সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদ ৬(২) ও ২৩(ক)-তে দেশের সকল নাগরিককে ‘বাঙালি’ এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র সম্প্রদায়কে ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী, নৃগোষ্ঠী’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করল, তখন তারা কৌশল পরিবর্তন করেন। এখন ‘আদিবাসী’ শব্দের আড়ালে আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করে অদূর ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে একটি আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র বা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গঠনের অশুভ এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্র, আলাদা মানচিত্র, নিজস্ব পতাকা ও মুদ্রার মতো বিষয়গুলোর প্রকাশ ঘটিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের অন্তর্দাহ প্রকাশ করেছে।

উচ্চ আদালতের রায় ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ও চুক্তির বেশ কয়েকটি সাংবিধানিক অসংগতি নিয়ে মহামান্য হাইকোর্টে রিট (মামলা নম্বর ২৬৬৯/২০০০ এবং ৬৪৫১/২০০৭) করা হয়েছিল। ২০১০ সালের ১২ ও ১৩ এপ্রিল তৎকালীন বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এক ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। রায়ে স্পষ্ট বলা হয়, পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ আইনের অনুচ্ছেদ ৪০ ও ৪১ রাষ্ট্রের একক সত্তাকে খর্ব করে এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১-এ রক্ষিত রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। হাইকোর্ট আঞ্চলিক পরিষদকে অবৈধ ঘোষণা করেন এবং জেলা পরিষদ আইনের বেশ কিছু ধারাকে অসাংবিধানিক আখ্যা দেন।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন যে, জেলা পরিষদ আইনের ৬ নম্বর ধারায় কোনো ব্যক্তি ‘উপজাতীয়’ বা ‘অ-উপজাতীয়’ কি না, তা নির্ধারণের ক্ষমতা সার্কেল চিফ ও হেডম্যানদের হাতে দেওয়া নিশ্চিতভাবে বৈষম্যমূলক এবং সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭, ২৮(১), ২৯(১) ও ৩১-এর লঙ্ঘন। এর মাধ্যমে একজন বাঙালি নাগরিককে পার্বত্য অঞ্চলের স্থানীয় নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ ও জমির মালিকানা থেকে বেআইনিভাবে বঞ্চিত করা হয়। বর্তমানে এ মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে রিভিউ শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সন্তু লারমাসহ জনসংহতি সমিতির সদস্যদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা, সকল অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরকারের কাছে সমর্পণ করা এবং তালিকা জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত প্রায় আড়াই দশকে তারা পূর্ণাঙ্গ অস্ত্র সমর্পণ তো করেইনি, বরং পাহাড়ে অবৈধ অস্ত্রের মহড়া ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছে। একটি জেএসএস থেকে এখন ৪টি গ্রুপসহ মোট ৭টি সশস্ত্র সংগঠন পাহাড় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

সরকারি চাকরিতে কোটা, বিশেষ সুযোগ-সুবিধা এবং আঞ্চলিক পরিষদের সভাপতির পদসহ সকল সুবিধা উপজাতি হিসেবে গ্রহণ করার পর, এখন আন্তর্জাতিক চক্রান্তের অংশ হিসেবে ‘আদিবাসী’ পরিচয় দাবি করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ফ্যাসিবাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে যেখানে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে পাহাড়ে বসবাসকারী ৫১ শতাংশ অ-উপজাতি তথা পার্বত্য বাঙালিকে অধিকারহারা রেখে কোনো টেকসই শান্তি সম্ভব নয়। ‘উপজাতি’ বনাম ‘আদিবাসী’ বিতর্ক বন্ধ করে সংবিধান ও উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে পাহাড়ের প্রতিটি নাগরিকের—তা সে বাঙালি হোক বা অবাঙ্গালি—সমান অধিকার নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। নচেৎ, ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের আড়ালে পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেশের মানচিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন করার যে চক্রান্ত চলছে, তা জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

দুদক সচিব হিসেবে যোগ দিলেন সাইদুর রহমান

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: রবিবার, ২ আগস্ট, ২০২৬, ৮:০২ অপরাহ্ণ
দুদক সচিব হিসেবে যোগ দিলেন সাইদুর রহমান

দীর্ঘ ৫ মাস শূন্য থাকার পর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর সচিব হিসেবে যোগদান করেছেন মো. সাইদুর রহমান খান। যোগ দিয়েই তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে দুদক কমিশন গঠন করা হবে।

রোববার (২ আগস্ট) তিনি দুদক সচিব হিসেবে যোগদান করেন।

তিনি বলেন, আমরা রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এর অংশ হিসেবে এখানে যোগ দিয়েছি। ‎দ্রুততম সময়ে কমিশন গঠন হবে। নতুন সরকার গঠন হয়েছে। সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার আছে। সংস্কারে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

এর আগে, গত ৩০ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে দুদকের সচিব হিসেবে পদায়ন করা হয়। এর আগে তিনি গত ৫ জানুয়ারী থেকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৭তম ব্যাচের একজন সদস্য।

কালের আলো/আরডি/এমডিএইচ